অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা পঞ্চাশ বছরেরও আগে। সালটা ১৯৬৪, হাইকোর্টে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু মাহমুদের মামলা চলছে এবং রায় আসন্ন; তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের গুণ্ডা ছাত্রবাহিনী এনএসএফ অধ্যাপক মাহমুদের ওপর শারীরিক হামলা চালাল। আমি তখন সবে অর্থনীতির সম্মান কোর্সে ভর্তি হয়েছি। ওই সময়টায়ই শুনলাম বিভাগীয় শিক্ষক রেহমান সোবহানের কথা, যিনি এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। সেদিন থেকে আজ অবধি আমি মনে করি, অধ্যাপক সোবহানের এটাই অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। তিনি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, অর্থনীতির গূঢ় সমস্যা হোক বা সামাজিক অসাম্য; তিনি তাঁর লেখা ও কথায় তাঁর ন্যায়-নীতির স্বরূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। অর্থনীতির মূল ব্যাপার তাঁর কাছে সবসময়ই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। যাক এ নিয়ে আরো অনেকে হয়তো লিখেছেন, সেদিকে না হয় না-ই গেলাম। যদিও এটা তাঁর সত্তার সঙ্গে এমনভাবে জড়িত যে, তাঁর সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে তা সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব নয়।

অধ্যাপক সোবহানের সঙ্গে নিয়মিত প্রত্যক্ষ সম্পর্কে আসি যখন ১৯৬৫ সালে আমাদের স্নাতক কোর্সে চার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস পড়তে হয়। এর মধ্যে মনে আছে, আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি তাঁর আমেরিকার গৃহযুদ্ধের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ; এটা যে নিছক দাসপ্রথা উচ্ছেদের ব্যাপারে ছিল না, বরং তা ছিল উত্তর আর দক্ষিণের রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক উত্পাদন ব্যবস্থার মধ্যে কোনটি টিকে থাকবে, তার লড়াই, তা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছিলেন।

অধ্যাপক সোবহান কখনই নিছক অর্থনীতিবিদ ছিলেন না, মানুষকে তাঁর পুরো পরিমণ্ডলের মধ্যে দেখে এসেছেন এবং এখনো দেখছেন; সে হিসেবেই আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন। এর অন্যতম উদাহরণ ছিল তাঁর সম্পাদিত ফোরাম পত্রিকা। এটি যখন প্রকাশিত হতো, আমরা সবাই গোগ্রাসে তা গিলতাম।

অধ্যাপক সোবহানের সঙ্গে দৈনন্দিন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আমি যখন পিএইচডি শেষ করে ১৯৮০ সালে দেশে বিআইডিএসে ফিরে আসি। তখন বিআইডিএস কিছুটা অবিন্যস্ত। তত্কালীন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন ড. মনোয়ার হোসেন এবং অধ্যাপক সোবহান ছিলেন গবেষণা পরিচালক। ড. হোসেনের প্রশাসনিক এবং পেশাগত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও তার প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানের অনেককেই ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। যদিও অধ্যাপক সোবহান এসবের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। অনেক গবেষকই তাঁর কাছে গিয়ে মনের ক্ষোভ প্রশমন করার চেষ্টা করতেন।

একটা ব্যাপার মনে আছে। তখন ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের অভিঘাত মূল্যায়নের কাজ চলছিল। এতে অনেকেই জড়িত ছিলেন— আমি, মাহবুব হোসেন, ওমর হায়দার চৌধুরী, সিদ্দিকুর রহমান ওসমানী এবং আরো কয়েকজন। এতে বেশকিছু অস্থায়ী ভিত্তিতে লোক নিয়োগের ব্যাপার ছিল। প্রকল্পের দৈনন্দিন পরিচালনায় ছিলেন ড. আব্দুল গফুর। প্রকল্পের অন্যদের উপেক্ষা করে ড. মনোয়ার হোসেন কিছু লোক নিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন। অধ্যাপক সোবহানকে এ কথা জানানো হলে তিনি বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ হন এবং তত্কালীন প্রতিষ্ঠানের পরিচালককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘হামি একটা গজব (অর্থাত্ গুজব) শুনেছি যে, হামি এ প্রজেক্টের কো-ডাইরেক্টর, তা এটা কেমন হলো’। যদিও তাত্ক্ষণিকভাবে আমরা এ বাংলা শুনে হেসেছিলাম। এতে কাজ কিন্তু হয়েছিল। এ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার ফলে ওইসব বিতর্কিত নিয়োগ বন্ধ হয়ে গেল।

ড. মনোয়ার হোসেনের বিদায়, এর পর বিআইডিএসের বলা যায় স্বর্ণযুগ শুরু হয়। অধ্যাপক রেহমান পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত হলেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে যৌথ নেতৃত্বের সূচনা করলেন। তিনি যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুললেন, পরবর্তীতে যখন বিআইডিএসকে নতুন সংসদীয় সনদ দেয়া হয়, মূল প্রশাসনিক কাঠামো তা-ই রাখা হয়। উল্লেখ্য, বর্তমানের অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।

অধ্যাপক সোবহানের চিন্তাধারায় অর্থনীতি চিরকালই প্রাধান্য পেয়েছে, কিন্তু তা কেবল নিছক টাকা-আনা-পাইভিত্তিক ছিল না। এর যে বিস্তৃত পটভূমি আছে, তা তিনি নিজের লেখায়, অন্যদের উদ্বুদ্ধকরণে বারবার প্রমাণ করেছেন। যেমন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তত্কালীন রাজনীতি নিয়ে বদরুদ্দিন ওমর লিখেছেন, আর অধ্যাপক সোবহান ভাষা আন্দোলনের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামনে তুলে ধরার আগ্রহ  প্রকাশ করেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় আতিউর রহমান (বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর) এ বিষয়ে গবেষণা করেন, যা কয়েক খণ্ডে প্রকাশিত হয়। তাঁরই অনুপ্রেরণায় আমি ও ডেনমার্কবাসী ক্রিস্টেন ওয়েস্টারগার্ড বাংলাদেশে মোটামুটি আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যত গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের ওপর পেশাদার লেখা হয়েছে, তা সংগ্রহ করে কয়েকটি ভাগে বিশ্লেষণ করি। এতে আরো কয়েকজন যেমন ওমর চৌধুরী, জায়েদ বখ্ত ও সৈয়দ আব্দুল হাই (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রয়াত অধ্যাপক) জড়িত ছিলেন। এটি এখনো এটি গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের ওপর অন্যতম আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

একই ধরনের অন্য একটি বড় কাজ অধ্যাপক সোবহানের উদ্যোগে ঘটেছিল। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন। দেশে নতুন করে নতুন ধারায় উন্নয়ন সম্ভাবনা সম্প্রসারণ করতে হবে, এজন্য উন্নয়নের বিভিন্ন খাত ও চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ এবং বোঝার দরকার ছিল। তিনি আহ্বান করলেন বিভিন্ন আর্থসামাজিক ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের। অন্তত শ’খানেক কি তারও বেশি এসব বিশিষ্ট ব্যক্তি, (যার মধ্যে সরকারি/বেসরকারি সব ধরনের ব্যক্তি ছিলেন) সম্পূর্ণ তাঁর ডাকে প্রণোদিত হয়ে সাড়া দিলেন এবং সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি করলেন চার খণ্ডের টাস্কফোর্স প্রতিবেদন, যা ভবিষ্যতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দিশারি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হয়েছিল। এখানে তিনটি ব্যাপার প্রণিধানযোগ্য। এক. অধ্যাপক সোবহান ছাড়া আর কেউ এমন ছিলেন না, যাঁর ডাকে এতজন গুণী ব্যক্তি সাড়া দিতেন; এতে তাঁর পেশাদারিত্বের প্রতি সবার আস্থার পরিচয় মেলে। দুই. এ সত্ত্বেও আমার ধারণা, পরবর্তী কোনো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবেদন গ্রহণ বা সেভাবে ব্যবহার করেনি; যাতে তাঁদেরই মানসিক চিন্তার দারিদ্র্যের প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু অধ্যাপক সোবহানের তাতে বিন্দুমাত্র পেশাদারি মনোভার কমেনি। চার খণ্ডের প্রতিবেদনের একটি কেবল পরিবেশ-সংক্রান্ত (এতে আমি জড়িত ছিলাম) ছিল, যা থেকে ভবিষ্যত্ উন্নয়নে পরিবেশের ভূমিকা নিয়ে অধ্যাপক সোবহানের দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়।

বিআইডিএস ছাড়ার কিছুদিন পর অধ্যাপক সোবহান সিপিডি প্রতিষ্ঠা করেন, কিন্তু তাতে আমাদের বিআইডিএসের সঙ্গে সম্পর্ক কমেনি; বরং প্রথম ক’বছর সিপিডির ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন, বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনা (IRBD), মূলত বিআইডিএসের গবেষকদের লেখনীনির্ভর ছিল। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এসবই ছিল স্বেচ্ছাশ্রমের ফসল, যা অধ্যাপক সোবহানের প্রতি প্রচণ্ড শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম ছাড়া সম্ভব ছিল না।

অধ্যাপক সোবহানের বহু ধরনের টুকরো টুকরো স্মৃতি আছে, যাতে তাঁর রসবোধ (কখনো কখনো শ্লেষাত্মক) মননশীলতা দুয়েরই পরিচয় মেলে। মনে আছে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ের কথা, যখন একদিন তিনি দেশে নির্বাচনহীন অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বললেন, এমনকি নরখাদকরা ও নির্বাচন করছে, আমাদের এখানে হবে না কেন (why are we not having it when even cannibals are having them)। ওই সময়ে আসলেই বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চলছিল, সেদিকে ইঙ্গিত করেই তিনি একথা বলেন।

আবার আপাতদৃষ্টিতে অনেক তথাকথিত উন্নয়নের মধ্যে যে ফাঁকি আছে, তা তাঁর চোখে ধরা পড়েছে। একদিন কথা প্রসঙ্গে বললেন, রাস্তায় যা গাড়ি দেখছ, এগুলো তো ব্যবসার লাভ দিয়ে কেনা না, সরকারি টাকায় কেনা, সবাই তো ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে প্রথমেই নিজের জন্য, আর একটা ছেলেমেয়ের জন্য কিনে ফেলে; এগুলো আসলে সরকারেরই গাড়ি। এতে খোঁচাটা ছিল আসলে সরকার এবং ব্যবসায়ী মহল দুদিকেই।

মনে পড়ে একবার একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে তিনি ঘণ্টাখানেক বক্তৃতা দিলেন, একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করে, হয়তো তাতে সব বাংলা শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারিত হয়নি; কিন্তু বাংলার প্রতি তাঁর যে দরদ, তার বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় হয়নি। এখন ত তিনি পরিষ্কার বাংলায় সব বলতে পারেন।

মানুষের সুখে-দুঃখে তাঁর সহমর্মিতার অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কমবেশি হয়েছে। আমার অতি ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ওমর চৌধুরীর ইন্তেকালের কথা কেউ তাঁকে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার জানাজায় এসে শরিক হন। একইভাবে তিনি আমার বাবার জানাজায়ও শরিক হয়েছিলেন।

অধ্যাপক সোবহানের মানবিক গুণের আরেকটি হলো, তিনি কখনই মতভেদ বা বিরোধকে ব্যক্তিপর্যায়ে নেননি এবং নেন না। তাঁর মধ্যে বহুজনের স্বভাবজাত প্রতিশোধপরায়ণতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আসলে অধ্যাপক সোবহানের পেশাদারিত্ব, পেশাদারিত্বের বহুমুখিনতা, আবার একই সঙ্গে মানবিক গুণ— এ সবকিছুর সমন্বয় সহজে মেলে না। পেশাদারিত্ব ও বহুমাত্রিক মননশীলতা, জীবনকে উপভোগ করা (যেমন প্রথম দিকে ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার ঢাকায় এলে তিনি নিয়মিত দোকান থেকে ক্যাসেট নিয়ে দেখতেন বলে জানি) এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি ভালোবাসা সবমিলেই আমাদের শিক্ষক এবং অগ্রজপ্রতিম অধ্যাপক সোবহান। বাংলায় যদি ‘To sir with love’ ধরনের কোনো চলচ্চিত্র হয়, তবে তিনি তার মুখ্য চরিত্র হতে পারেন; এমনকি হয়তো বললে অভিনয়ও করতে পারে তাতে।