আমি অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে জানি প্রথমে প্রতিবেশী হিসেবে, এর পর আমার বাবার বন্ধু হিসেবে এবং পর্যায়ক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক হিসেবে ও বিআইডিএসে আমার সিনিয়র কলিগ এবং মহাপরিচালক হিসেবে। এতে হয়তো অনেকে মনে করতে পারেন, একজন মানুষকে ভালোভাবে জানার এটিই যথেষ্ট। তবে সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রজন্ম রেহমান সোবহানের কেবল ‘পাবলিক’ চিত্রটার সঙ্গে পরিচিত ছিল। প্রথমত. একজন ‘রাগী’ তরুণ, যিনি শহরে অসমতার বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছেন, যেখানে উঠে এসেছে পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিবাদী উন্নয়নের স্বার্থে পূর্ব পাকিস্তানের শোষণ ও লুণ্ঠন। আমরা তার জনপ্রিয় লেখার, বিশেষ করে যেগুলো ‘ফোরামে’ প্রকাশিত হতো, সেগুলোর ভীষণ ভোক্তা ছিলাম।
আরো অনেকেই ‘অসমতা তত্ত্বের’ কথা বলেছেন, কিন্তু অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মতো করে এত জোরালোভাবে আর কেউ বলতে পারেননি। তাঁর কারণেই এ তত্ত্বের বহুল প্রচার হয় এবং সেটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
অষ্টম ও নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালেও আমি জানতাম এ ব্যক্তি কে; পরবর্তীতে জানতে পারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, যেখানে আমরা থাকতাম, সেখানে তিনি আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন এবং তাঁকে আমার বাবা খুব ভালো করে চিনতেন ও পছন্দ করতেন।
ষাটের দশকেও আমার কাছে অধ্যাপক রেহমান সোবহান অধরা ব্যক্তিত্বই ছিলেন। কখনো সখনো তিনি আমাদের বাসায় আসতেন, সেখানে আমার বাবার প্রকাশনা ‘নিউ ভ্যালুজ’ অথবা অবশ্যম্ভাবিভাবে রাজনীতি, সাহিত্য ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হতো। বেশির ভাগ সময়, ড. কামাল হোসেন ও তাঁর সহধর্মিণী হামেদা হোসাইন উপস্থিত থাকতেন, এঁরা দুজনই ‘নিউ ভ্যালুজ’ ও ‘ফোরামের’ সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমার বিশ্বাস, ‘ফোরাম’-এর চিন্তা ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকে এসেছে।
সত্তরের দশকে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঙ্গে আমার দেখা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। যত দূর মনে পড়ে, আমি যে কোর্সগুলো নিয়েছিলাম, তার কোনোটাই রেহমান সোবহান পড়াতেন না। তাই আমার সরাসরি তাঁর ক্লাস করার অভিজ্ঞতা নেই। আমার মনে আছে, বিতার্কিক হিসেবে একবার আমি তাঁর দলে ছিলাম। বিতর্কের বিষয় সম্ভবত ছিল ‘স্টুডেন্টস শুড নট পার্টিসিপেট ইন পলিটিকস’। এ বক্তব্যের বিপক্ষে ছিল আমার অবস্থান। জনাকীর্ণ টিএসসি অডিটোরিয়ামে আমাদের দল জনপ্রিয় ভোটে জয়লাভ করেছিল।
প্রকৃতপক্ষে রেহমান সোবহানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হয় বিআইডিএসে। আমার বিশেষভাবে মনে আছে, আইএলওর অনুরোধে ‘পাবলিক সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক কাজ করার কথা। একপর্যায়ে আইএলও পরামর্শ দেয় স্যারকে (রেহমান সোবহান) এর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য, বিশেষ করে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে দেয়ার জন্য, যেটার কাজ তখন চলছিল। যখন স্যার এগিয়ে এলেন, তখন তাঁর কাজ দেখে আমি দারুণ অভিভূত হয়েছিলাম। অধ্যাপক সোবহান ছিলেন একজন নেতা এবং তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করেন। তিনি দৃঢ়
বিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতেন, তাঁর রয়েছে অনন্যসাধারণ প্রতিভা এবং সম্মানবোধ। ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব, অসামান্য বাচনভঙ্গি ও বাকশক্তি এবং বিপুল শারীরিক ও মানসিক শক্তি তাঁকে সহজেই আমাদের অর্থনীতিবিদদের মধ্যমণি এবং অঘোষিত নেতা করে দিয়েছে।
তিনি জীবনে কখনই তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটেননি। তিনি এখনো হূদয় থেকে একজন ‘লিবারাল সোস্যাল-ডেমোক্র্যাট’। তিনি মার্ক্সবাদী ধারণা দ্বারা দারুণ প্রভাবিত হয়েছিলেন, কিন্তু পুরোপুরি ঠিক ‘মার্ক্সিট’ হতে পারেননি। দক্ষিণ এশিয়ার দৃশ্যপটে আমরা তাঁকে একজন উদার ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবেই দেখতে পারি।
স্যারের ব্যক্তিত্বের বহু মাত্রিক দিক রয়েছে, যা তাঁর ‘আন্ট্রাংকুইল রিকালেকশনস’ প্রকাশিত না হলে অজানাই থেকে যেত। যেমন স্যার নাচতে পছন্দ করেন এবং লাতিন নৃত্যের অনুরাগী, বিশেষ করে ‘চ-চ-চ’ (পযধ-পযধ-পযধ)। তাঁর বিষয়ে আরো যেসব বিষয় শুনেছি, তা হলো তিনি বক্সিং ও খেলাধুলা পছন্দ করেন। চটজলদি জবাবের কারণে তিনি আগে থেকেই সহকর্মী-বন্ধুদের কাছ থেকে সম্মান অর্জন করেছিলেন। এসব বিষয়ে তাঁর বইয়ে রয়েছে বিস্তারিত বিবরণ।
একাডেমিক কাজ
একটি ছোট্ট প্রবন্ধে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বিস্তর কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরা কঠিন। অল্প কথায় বলা যেতে পারে, ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশে ও এ অঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো তিনি সামনে তুলে ধরেছেন এবং বিশ্লেষণ করেছেন।
যদিও ষাটের দশকে আঞ্চলিক বৈষম্য (পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান) তুলে ধরায় তিনি বিশেষভাবে পরিচিত, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তিনি সর্বস্তরে যথা— স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যাবেন। তাঁর কাজের বিষয়ভিত্তিক ভাগ এটিকে পরিষ্কার করে তুলেছে। প্রথম জীবনে তাঁর কাজের সিংহভাগেরই মূল লক্ষ্য ছিল, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অবিচার’ তুলে ধরা (যেমন— দ্য প্রবলেম অব ইমব্যালান্স ইন ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব পাকিস্তান (এশিয়ার সার্েভ, ১৯৬২) অথবা ইস্ট পাকিস্তান’স রিভল্ট
এগেইনস্ট আইয়ুব (কমনওয়েলথ কোয়ারটার্লি, ১৯৬৯)। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের লেখায় বারবার উঠে আসে ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ। তিনি ‘গ্রামীণ অবিচার’ নিয়েও ব্যাপকভাবে লিখেছেন। ‘বেসিক ডেমোক্রেসিস, ওয়ার্ক প্রোগ্রাম অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ইন পাকিস্তান’ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ওইউপি, ১৯৬৮) শীর্ষক গবেষণা থেকে শুরু করে তাঁর বই এগ্রারিয়ান রিফর্ম অ্যান্ড সোস্যাল ট্রান্সফরমেশন (জেড প্রেস, ১৯৯৩), দ্য পলিটিকস অব হাঙ্গার অ্যান্ড এনটাইটেলমেন্টে (সেন ও ডেরেজ সম্পাদিত দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব হাঙ্গার, ক্ল্যারেন্ডন প্রেস) বিষয়টি উঠে এসেছে।
ন্যায়বিচার ও সমতা নিয়ে উদ্বেগ অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করে তুলেছিল। যেমন— ‘ডেমোক্রেটিজিং অ্যাকসেস টু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েথ’ লেখায় এ জায়গাটায় সরকার, সরকারি খাত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার প্রতি নজর দেয়া হয়েছে, এর বাইরে অধ্যাপক রেহমান সোবহান আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতাসহ আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্যও প্রচুর কাজ করেন। আত্মনির্ভরশীলতা ও দক্ষিণ অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, আরব অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রচারণা এবং পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার রূপান্তরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক ইস্যুগুলোর প্রতি নজর দিতে ওপেকের উদ্বৃত্ত অর্থ কীভাবে কার্যকর উপায়ে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে লিখেছেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, তেলসমৃদ্ধ (আরব) দেশগুলো, আমাদের মতো গরিব দেশগুলোর উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে তাদের নিজেদের স্বার্থেই। সে আশা অবশ্য পূরণ হয়নি।
ক্যারিয়ারের একেবারে শুরু থেকে কমপক্ষে চারটি অতিরিক্ত বিষয়ভিত্তিক জায়গা অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এগুলো হলো, ‘এক্সটারনাল ডিপেনডেন্স অ্যান্ড এইড’, ‘ইফিসিয়েন্সি অ্যান্ড জাস্টিস ইন প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট’, ‘রোল অব দ্য স্টেট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’ এবং ‘পভার্টি অ্যান্ড ইনজাস্টিস’। সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও তাদের কল্যাণ বৃদ্ধির চিন্তা থেকে তিনি কখনো সরে যাননি। তার এ ‘সমাজতান্ত্রিক’ অবস্থান এখনো বজায় রয়েছে, যদিও বিশ্বের বেশির ভাগ জায়গা থেকে সমাজতন্ত্রের ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে, এমনকি (সম্ভবত বিশেষ করে) সমাজতান্ত্রিক বিশ্বেও।
তাঁর ২৭টির বেশি বই ও প্রায় ১৫০টি প্রবন্ধ রয়েছে। এ বিপুল সংখ্যক প্রকাশনা নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। কিন্তু এর চেয়ে বেশি চিত্তাকর্ষক হলো, আরো ন্যায়পরায়ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রতিগুলো ধারাবাহিকভাবে এ লেখাগুলোয় প্রতিফলিত হয়েছে।
কিছুদিন আগে ছিল তাঁর ৮২তম জন্মদিন (১২ মার্চ)। আমি নিশ্চিত তিনি ফেলে আসা দিন নিয়ে চিন্তা করলে গভীর আত্মতৃপ্তই হবেন। আশা করি, স্যার আরো অনেক দিন বাঁচবেন এবং আরো অনেক কাজ করবেন। এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে এবং তাঁর মতো মানুষ খুব বেশি নেই বললেই চলে; যারা প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব দিতে পারেন। আমাদের একাডেমিক-অর্থনীতিবিদ সমাজের তিনি প্রধানতম সদস্য, নেতা, পরামর্শদাতা, বন্ধু, দার্শনিক ও পথপ্রদর্শক। ২০০৮ সালে নিজ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন তিনি। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে স্যারকে জানাই অশেষ ধন্যবাদ।
লেখক: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক






