অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্পর্কে নতুন কিছু বলার সুযোগ কম। সেজন্য তাঁকে সম্মাননা জানানোর উপলক্ষে বরং আমার নিজের স্মৃতিচারণ করার কিছুটা সুযোগ নেব। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে সবে ভর্তি হয়েছি। ক্লাসের ডিবেটিং ক্লাবের দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। প্রথম দিনের বিতর্কের বিষয় ছিল পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র। বিতর্ক অনুষ্ঠান শুরুর পাঁচ-দশ মিনিট আগে মাথায় বুদ্ধি এল সূচনা বক্তব্যের জন্য প্রফেসর রেহমান সোবহানকে অনুরোধ করে দেখলে কেমন হয়! বিনা নোটিসে হঠাত্ এমন প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে হাজির হলেও তিনি বিরক্ত না হয়ে বরং সানন্দে রাজি হলেন। সেদিনই তাঁর অসাধারণ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও অনুকরণীয় বচনশৈলীর প্রথম পরিচয় পাই।

বলা বাহুল্য, সেদিনের বিতর্কে পুঁজিবাদের পক্ষে দলের ভরাডুবি হয়েছিল। বাজারমুখী সংস্কার নিয়ে রেহমান সোবহানের লেখা ও বক্তব্যের সঙ্গে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। কিন্তু সেদিনের সেই বিতর্ক অনুষ্ঠানে দেয়া তাঁর পনেরো মিনিটের তাত্ক্ষণিক বক্তৃতা সম্ভবত আমার তরুণ মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল এবং পরবর্তীতে আমার নিজের অর্থনৈতিক মতাদর্শকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করেছিল। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন অর্থনীতি পুরস্কার প্রবর্তন করে, তখন প্রথমবারের মতো পুরস্কারটি দেয়া হয় রেহমান সোবহানকে। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের সম্মাননা বক্তৃতা দিতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশে রাষ্ট্র বনাম বাজার নিয়ে বিতর্ক মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রবক্তারা একটি অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হন, কারণ রেহমান সোবহানের বিপক্ষে বিতর্কে দাঁড়ানোর মতো কাছাকাছি যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির তখনকার প্রফেসর ল্যান্স টেইলর রেহমান সোবহানের সম্মানে প্রকাশিত গ্রন্থে তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে: বাজার অর্থনীতি নিয়ে দৃশ্যত অন্তহীন বিতর্কে প্রচলিত গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রেহমান সোবহানের দীর্ঘদিনের বলিষ্ঠ অবস্থান বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিবাদের এক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে (দ্রষ্টব্য, আবু আবদুল্লাহ ও এআরখান, স্টেট, মার্কেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: অ্যাসেজ ইন অনার অব রেহমান সোবহান, ইউপিএল, ১৯৯৬, পৃ: ৬৫)

বাংলাদেশ ব্যাংকের সেদিনের অনুষ্ঠানে দেয়া আমার বক্তৃতার আরো কিছু উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক হবে: ‘তাঁর সঙ্গে বিতর্কে পেরে ওঠা কঠিন হলেও তিনি বিপক্ষের সমালোচনাকে সবসময় স্বাগত জানান এবং যুক্তিযুক্ত প্রমাণ হাজির করা গেলে তিনি তাঁর অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতেও দ্বিধা করেন না। ...‘উনিশশ আশির দশকে যখন বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ সমর্থিত মুক্তবাজার মতবাদ আদর্শিক গোঁড়ামির পর্যায়ে পরিণত হয়, তখন বিশ্বব্যাপী ভিন্নমতের শক্তিশালী প্রবক্তাদের অন্যতম ছিলেন রেহমান সোবহান। এসব ভিন্নমতাবলম্বীর কারণেই পরবর্তীতে বাজার অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের যথাযথ ভূমিকা পুনর্মূলায়ন করার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ... ‘রেহমান সোবহানের সব লেখালেখি, গবেষণা ও নাগরিক সক্রিয়তার পেছনে বরাবর একটি চালিকাশক্তিই কাজ করেছে, আর তা হলো একটি সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। এ জীবনব্যাপী ব্রত প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের নানা পর্যায়ে, নানা পরিসরে।’ (দ্রষ্টব্য: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, পপুলার ইকোনমিকস: আনপপুলার অ্যাসেজ, ইউপিএল, ২০০২, পৃ: ১৪২-৪)।

নিজের গবেষণার বাইরে রেহমান সোবহানের বড় গুণ হলো, তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক ও নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা। ১৯৯০-৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য হিসেবে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতিনির্দেশনা তৈরির জন্য যে উনত্রিশটি টাস্কফোর্স তৈরি করেন, দেশের আড়াইশ গবেষক ও বিশেষজ্ঞকে তিনি সেগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। বিনা পারিশ্রমিকে তৈরি বহুল আলোচিত সেই টাস্কফোর্স রিপোর্টগুলো পরে চার খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। অনেকটা এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সাল থেকে রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনা’ নামে যে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়ে আসছে, সেগুলো তৈরিতেও তিনি অসংখ্য গবেষককে সংগঠিত করেছেন।

রেহমান সোবহান যে এত বিপুল সংখ্যক গবেষকের নেতৃত্ব দিয়ে গবেষণার এসব বড় বড় কর্মযজ্ঞের আয়োজন করতে পেরেছেন, তার পেছনে সম্ভবত কাজ করেছে তাঁর ব্যক্তিত্বের এক ধরনের কর্তৃত্বসুলভ, কিন্তু আকর্ষণীয় ও উত্সাহব্যঞ্জক উপাদান। তাঁর নেতৃত্বের এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমারও সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ হয়েছে। লেখালেখির বিষয়ে আমার একটা খুঁতখুঁতে স্বভাব আছে, যে কারণে সময়মতো কোনো লেখা শেষ করতে পারি না। স্যারকে সেজন্য একাধিকবার অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে; সেজন্য এ সুযোগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ কর্মদিবসে তিনি আমার কাছ থেকে ম্যাক্রো অর্থনীতি-বিষয়ক টাস্কফোর্স রিপোর্টটির অপেক্ষায় ছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের হাতে টাস্কফোর্স রিপোর্টগুলো জমা দেয়ার কথা এবং আমার রিপোর্টটি তার মধ্যে ক্রমতালিকায় প্রথম।

স্যার শুধু ফোন করে মৃদুবাক্যে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন বিকালের মধ্যে রিপোর্টটি তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলাম।

লেখার শুরুতে যে বলেছিলাম, রেহমান সোবহান সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই, সেটা পুরো সঠিক নয়। আসলে তাঁকে যত দেখেছি তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশালতায়, ততই মুগ্ধ-বিস্মিত হয়েছি। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থটি পড়ে তাঁকে আবার অনেকটা নতুন করে আবিষ্কার করেছি, বিশেষত তাঁর প্রথম জীবন ও পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে (রেহমান সোবহান, আনট্র্যাংকুইল রিকালেকশনস: দ্য ইয়ারস অব ফুলফিলমেন্ট, সেইজ পাবলিকেসন্স, ২০১৬)।

বইটির আকর্ষণীয় রচনাশৈলী দেখে মনে হয়েছে, তিনি অনায়াসে একজন ঔপন্যাসিকও হতে পারতেন। তবে সর্বোপরি যে প্রশ্নটি মনে জাগে, তা হলো রেহমান সোবহানের জীবন ও কর্মের বিশালতাকে আজো কি আমরা পুরোপুরি বুঝতে ও মূল্যায়ন করতে পেরেছি?

 

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা