বাংলাদেশে জনগণের স্বার্থে কাজ করা বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এমন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে গত অর্ধশতাব্দী ধরে অধ্যাপক রেহমান সোবহান একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিরাজ করছেন। বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বিস্তীর্ণ কর্মজীবনে অধ্যাপক রেহমান সোবহান কখনই সাফল্য বা হাততালির পেছনে ছোটেননি। তবে তাঁর যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে তা হলো তার উদ্দেশ্য, সততা এবং ঠিক কাজটি করার ইচ্ছা। আজকের বাংলাদেশের সভ্য সমাজে এ গুণগুলোর বড়ই প্রয়োজন।

বিভিন্ন সময়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের চিন্তার দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া গেছে। ১৯৬০ দশকে বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রামে তাঁর গবেষণামূলক মূল্যায়ন তত্কালীন আইয়ুব খানের ‘নির্দেশিত’ গণতন্ত্রের বৈধতার ঘাটতির দিকে দৃষ্টি দিতে বাধ্য করে। স্মরণ করা যেতে পারে, আইয়ুব খানের প্রশাসন চাচ্ছিল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমর্থনের ঘাঁটি তৈরি করতে।

একই ধরনের দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৮০ দশকে, যখন তিনি বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে দাতা সংস্থাদের স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট নীতিকে গবেষণার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেন। তত্সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৃহত্তর সমস্যা ছিল নীতি তৈরিতে দাতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, যার কারণে এ দেশগুলো নিজেদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যে কাজ করা প্রয়োজন, তার প্রতি দৃষ্টি দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। প্রফেসর রেহমান সোবহানের জোরালো গবেষণাকর্ম দাতাদের স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট নীতিমালার গ্রহণযোগ্যতা কমাতে যথেষ্ট সফল হয়েছিল। একই সময়ে অধ্যাপক রেহমান

সোবহান দেশীয় প্রেক্ষিতে ঋণখেলাপি সমস্যাটিকে জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে সমস্যাটি আবার প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসেও অধ্যাপক সোবহান তার বলিষ্ঠ ও সাহসী কণ্ঠস্বর সমুন্নত রেখেছেন। যেখানে আজকের উন্নয়ন বিতর্ক অনেকটা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতমূলক বক্তব্যে আচ্ছাদিত হয়ে পড়ছে অর্থাত্ সমালোচনাহীন ও অগ্রগতির অতিউত্সাহী বয়ান প্রচারে ব্যস্ত থাকছে, সেখানে অধ্যাপক রেহমান সোবহান উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের গভীর বিস্তৃতির বিষয়টি তত্ত্ব ও তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যাপূর্বক অর্থনীতিবিদের পেশাগত দায়িত্ব প্রশংসনীয়ভাবে পালন করে যাচ্ছেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান তাই নানা কারণে আমাদের সবার শ্রদ্ধার পাত্র।

সমাজের উন্নতির অসরল পথের প্রতি আলোকপাত করার কথা বলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। নতুন প্রজন্মকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে মনে করিয়ে দেন এবং বিভ্রান্তিকর সময় ও পরিবর্তনের জটিলতার মধ্যেও নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্যে অটুট থাকতে অনুপ্রাণিত করেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান আমার শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু আমি সৌভাগ্যবান যে, ১৯৭০ দশকে বিআইডিএসে যোগ দেয়ার পর তাঁর সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলাম। তাঁর যে বিষয়টি সবসময় আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে, তা হলো তিনি তাত্ক্ষণিক বিতর্কে যতটা সময় অতিবাহিত করেন না কেন, তার চেয়ে ঢের বেশি সময় ব্যয় করেন যেন এ বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক জনমত তৈরি বা নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে, সে চেষ্টায়। এদিক থেকে তিনি একজন সত্যিকারের পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। তিনি কঠোর পরিশ্রমী একজন মানুষ। এজন্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, অধ্যাপক রেহমান সোবহানের কাছে অবসর ধারণাটি অপরিচিত। তার মনোযোগ আকর্ষণে যোগ্য ইস্যুতে কথা বলা থেকে তিনি কখনো অবসর নেননি। ৮০ কোটাতেও তিনি যেভাবে সক্রিয় আছেন, তা আমাদের জন্য যেমন অনুপ্রেরণাদায়ক, তেমনি তাঁর অর্ধেক বয়সীদের জন্যও শিক্ষামূলক।

সমাজের ভালোর প্রতি অবিচল বিশ্বাস, অন্তরে মহানুভব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষণে চিরকালের জন্য তরুণ অধ্যাপক রেহমান সোবহান শুধু একজনই। তাঁকে জানতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। আমি আশা করব, আরো অনেক বছর তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

 

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা