অধ্যাপক রেহমান সোবহানের কাজ ও জীবন সম্পর্কে কিছু লিখতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। অধ্যাপক রেহমান সোবহান বাংলাদেশের স্বল্পসংখ্যক জীবন্ত কিংবদন্তির একজন, যারা দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নে বড় অবদান রেখেছেন।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে তিনি একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। একজন গবেষক হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি উচ্চমানের গবেষণা করেছেন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। বলতে গেলে পুরো বিশ্বেই প্রভাব ফেলেছে। সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের সময়ের বিভিন্ন আর্থসামাজিক সংগ্রাম ও উদ্যোগে তিনি অংশ নিয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
এ প্রবন্ধের ছোট পরিসরে তাঁর বিশাল অবদানের কথা আলোচনা করা সম্ভব নয়। আমি শুধু তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের কিছু ব্যাপারে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
শিক্ষক
আমি আগেই বলেছি, চিন্তার স্পষ্টতা ও ছাত্রদের প্রতি দায়িত্বশীলতার জন্য শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের অবদান একটি প্রজন্ম মনে রাখবে। যা তাকে শিক্ষক হিসেবে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে তা হলো, মৌলিক গবেষণা করতে এবং নিজ সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে ছাত্রদের অনুপ্রেরণা প্রদান। পরবর্তীতে তাঁর অনেক ছাত্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছেন। এদের সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান অন্যতম।
গবেষণা
অধ্যাপক রেহমান সোবহান লিখেছেন বা সম্পাদনা করেছেন, এমন বইয়ের সংখ্যা ২০-এর অধিক এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। তার লেখনীতে স্থান পেয়েছে গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ থেকে শুরু করে সমকালীন অর্থনীতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমি এখানে অধ্যাপক রেহমান সোবাহান বেশি গবেষণা করেছেন, এমন তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। এ বিষয়গুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রথমত. কেমব্রিজের শিক্ষা অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা অথবা রাষ্ট্রের কল্যাণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। তাঁর প্রথম দিকের গবেষণায় তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি খাতের ভূমিকা তুলে ধরেন। সময়ের পরিক্রমায় তাঁর লেখায় বিভিন্ন সময় এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের জটিল ভূমিকা সম্পর্কে গভীরতর জ্ঞান প্রকাশ পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত. অধ্যাপক রেহমান সোবহানের গবেষণাকর্ম, যেখানে ঠাঁই পেয়েছে গ্রামীণ উন্নয়ন, ভূমি সংস্কার ও আয় বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। বাংলাদেশের মতো দেশে দারিদ্র্য দূর করতে অবশ্যই গ্রামীণ অর্থনীতির স্থবিরতা ও বৈষম্য দূর করার উপায় খুঁজতে হবে। এজন্য রেহমান সোবহানের প্রথম বইয়ে বাংলাদেশের (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) গ্রামীণ উন্নয়নের কথা উঠে এসেছে। ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি তিনি গ্রামীণ দারিদ্র্য দূর করার জন্য সরকারি সম্পদের বরাদ্দ প্রদানে কৌশল গ্রহণ করারও পরামর্শও দিয়েছেন।
তৃতীয়ত. এবং সম্ভবত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অধ্যাপক রেহমান সোবহানের গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে সমসাময়িক উন্নয়ননীতির কাঠামোগত দিক, উন্নয়নশীল দেশে মূলধনের আন্তঃপ্রবাহ জোরদারকরণ, উন্নয়নে বৈদেশিক সহযোগিতার ভূমিকা প্রভৃতি। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও মাত্রাতিরিক্ত বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান একজন গভীর পর্যবেক্ষক। আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরনির্ভরতার নেতিবাচক দিক এবং স্বনির্ভরতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন তিনি।
সহযোগিতার শর্ত হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের ওপর ব্রেটন উডস সংস্থাগুলো যে কাঠামোগত সমন্বয় ও নীতিশর্ত চাপিয়ে দেয়, এর বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠস্বরের একজন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। এ ব্যাপারে তাঁর লেখা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই— স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসিস ইন দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড: ডিজাইন অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স ও রিথিংকিং দ্য মার্কেট রিফর্ম প্যারাডাইম। জর্জ বার্নাড শ’র কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, অধ্যাপক রেহমান সোবহান ‘রিজনেবল ম্যান’ নন; যিনি নিজেকে পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন, বরং তিনি ওই সব ‘আনরিজনেবল ম্যানদের’ একজন, যিনি বিশ্বকে নিজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নিরন্তর চেষ্টা করেই চলেছেন। সর্বকালেই উন্নয়ন ‘রিজনেবল ম্যানদের’ তুলনায় এসব ‘আনরিজনেবল ম্যানদের’ ওপর বেশি নির্ভরশীল। অধ্যাপক রেহমান সোবহান এই বিরল ‘আনরিজনেবল ম্যানদের’ দলে রয়েছেন।
পাবলিক সার্ভিস ও সুশীল সমাজ
অধ্যাপক রেহমান সোবহান এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ক্ষমতা, সম্পদ ও আয়ের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনতে চান। তাঁর লেখনীতে সবসময় গরিব ও নিপীড়িত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে।
ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অর্থনৈতিক সম্পদের ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ন্যায্য হিস্যার দাবির পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি পকিস্তানের তৃতীয় ও চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পর্যালোচনায় নিয়োজিত অর্থনীতিবিদ প্যানেলের সদস্য ছিলেন হিসেবে তাঁর জোরালো বক্তব্য পেশ করেছিলেন।
১৯৭০ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘ফোরামের’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। ফোরামের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে অধ্যাপক রেহমান সোবহান ম্যাগাজিনটিকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের মুখপাত্র করে তোলেন। একাত্তরের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সামরিক হামলা শুরু করে। তখন অধ্যাপক রেহমান সোবহান দেশের বাইরে চলে যান। ওই সময় অধ্যাপক রেহমান সোবহান মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারণা ও লবিং চালিয়েছিলেন জাতিসংঘে, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৭২ সালে এবং প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য হন। ১৯৭৪ সালের শেষ পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিআইডিএসের প্রধান ছিলেন, প্রথমে (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে মহাপরিচালক হিসেবে। তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ক নেতৃত্বে বিআইডিএস হারানো গৌরব উদ্ধারে বহুলাংশে সমর্থ হয় এবং একটি উচ্চমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে।
এ সময়ে রেহমান সোবহান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি সদস্য ছিলেন ইউএন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং, নির্বাহী বোর্ড অব দি ইউএন ইউনির্ভাসিটি ও গভর্নিং বোর্ড অব দি ইউনাইটেড নেশনস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর সোস্যাল ডেভেলপমেন্টের। অধ্যাপক রেহমান সোবহান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি ও বিআইডিএসের নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোয়, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সাহায্যকল্পে যেসব শর্তারোপ করা হয়, তার সংস্কার করার জন্য মতামত গঠনে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান ১৯৮৯ সালে বিআইডিএস থেকে অবসর নেন এবং এর ইমেরিটাস ফেলো হন। ১৯৯১ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৯৩ সালে অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রতিষ্ঠা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এটি প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, এটি এমন একটি প্লাটফর্ম হবে, যেখানে অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসা ও শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী এবং সরকারি নীতিনির্ধারকরা একসঙ্গে আলোচনা করবেন। সিপিডির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক রেহমান সোবহান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা সফলভাবে আয়োজন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে সিপিডি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিয়ে স্বাধীন পর্যালোচনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
আগেই বলেছি, অধ্যাপক রেহমান সোবহান তাঁর ছাত্রদের সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিজেদের মেধা ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। আরেকটি বিষয়ে তিনি সবসময় ছাত্রদের উত্সাহ দিতেন, তা হলো স্বাধীন চিন্তা। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে আমরা বিতর্কে জড়িয়েছি, বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল বিস্তর। কিন্তু আমাদের কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার ছিল যে, এতে আমাদের ওপর থেকে তার স্নেহ কখনো কমবে না। তাঁর আরেকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি কখনো তাঁর ছাত্রীদের দুর্বলতা নিয়ে অহেতুক সমালোচনা করতেন না।
পেশার উত্কর্ষসাধনে যেখানে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা রয়েছে, সেখানে ছাত্রদের অর্জন নিয়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান সবসময় গর্ববোধ করেন। তিনি সবসময় ছাত্রদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে এসেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, কেন অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ছাত্রীরা তাঁকে এখনো তাদের শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেন; ভূতপূর্ব শিক্ষক হিসেবে নয়।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বিআইডিএস






