স্যার সম্পর্কে কিছু বলার সুযোগ দেয়ার জন্য আমি আজকের সান্ধ্য-ভোজের আয়োজকদের (সানেম ও ড. সেলিম রায়হান) আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এ সুযোগকে আমার জন্য এক দুর্লভ সম্মান হিসেবে বিবেচনা করছি।

স্যার সম্পর্কে বলতে গেলে বিরাট একটা সমস্যা হচ্ছে, কোত্থেকে শুরু করব এবং কতটুকু বলব। তবে আমাদের ভাগ্য ভালো যে, স্যার শুধু তাঁর জীবনব্যাপী কাজ-কর্ম দিয়েই আমাদের মুগ্ধ ও ব্যস্ত রাখেননি, তিনি নিজেই তাঁর একটি মনোমুগ্ধকর সুস্বাদু আত্মজীবনীও সম্প্রতি আমাদের উপহার দিয়েছেন। অবশ্য তাঁর আত্মজীবনীর পরবর্তী স্বাধীনতা-উত্তর খণ্ডের জন্য আমরা সবাই এখনো আরো অধীর হয়ে অপেক্ষা করছি।

খণ্ডের তাঁর প্রকাশিত আত্মজীবনী থেকে এরই মধ্যে আমরা জানি শৈশবে শৈলনিবাসে কী কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে তিনি গড়ে উঠেছিলেন, কীভাবে একটি অভিজাত সম্ভ্রান্ত পরিবার ও ধনী ব্যবসায়ী পিতার সন্তান হয়েও স্যার সেসব সংস্কার অতিক্রম করে একজন গণমানুষের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ হলেন এবং বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে না পারলেও তাদেরকে গভীরভাবে ভালোবেসেই ফেললেন। এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের ভাগ্য জড়িয়ে ফেললেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে— সেসবই তার প্রকাশিত আত্মজীবনীতে বিধৃত আছে অনেক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে, প্রাঞ্জলভাবে, তীক্ষভাবে, সরসভাবে এবং সাহিত্যিক দীপ্তিতে ভরপুরভাবে। আমি সেদিকে যেতে চাই না। আপনাদের অনুরোধ করব আমার বা অন্যের মুখে ঝাল না খেয়ে আপনারা নিজেরাই বইটি পড়ে দেখবেন।

আমি বরং আমার স্যারের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বোঝাপড়ার কথা বলি। স্যারের কাছ থেকে আমি নানাভাবে রাজনৈতিক অর্থনীতির পাঠ গ্রহণ করেছি। লক্ষ করেছি স্যার কখনো বিমূর্ত অর্থনীতির ভক্ত ছিলেন না। সবসময় অর্থনীতি-রাজনীতি-জনগণের বাস্তব সমস্যা, সংগ্রাম, কল্যাণই স্যারের মূল অভীষ্ট ছিল। একটি বাংলা বইয়ের কথা বলি— স্যারের এ বইটি এখন অবশ্য বাজারে পাওয়া যায় না। তবে তাঁর রচনাবলিতে এ বইয়ের প্রবন্ধ পাঁচটি নিশ্চয়ই আছে। বইটির নাম ছিল ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংকট: বাংলাদেশের অর্থনীতি-বিষয়ক প্রবন্ধাবলি’ বইটি জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী থেকে ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে আজ থেকে ৩৪ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল। এ বইটির ৫টি প্রবন্ধের চারটিই আমি অনুবাদ করেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল ২৮ বছর আর স্যারের বয়স ছিল ৪৭ বছর। ৪৭ বছর বয়সে সেই বইয়ের ভূমিকায় স্যার খুবই তীক্ষভাবে, খুবই স্পষ্টভাবে এমন কতকগুলো কথা বলেছিলেন, যা তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার অর্থনীতি চর্চার মূল ‘ক্যাম্পাস’ হিসেবে কাজ করছে। আমার সৌভাগ্য যে, এ রকম একটা দিকদর্শন সেই যুবক বয়সে স্যারের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। ওই বইয়ের প্রবন্ধ ও ভূমিকাটি বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়েই আমি প্রথম স্যারের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত ও প্রবলভাবে উদ্বুদ্ধ হই। স্যারের সেই ভূমিকার একটি অংশ পাঠ করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমার মনে হয় এটি এখনো সমান সজীব ও সমান প্রাসঙ্গিক।

স্যার লিখেছিলেন, ‘যেহেতু বর্তমান বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতাই আমাদের দেশের সব সংকটের মূল উত্স, তাই একটি প্রগতিশীল স্থায়ী সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি রচনার জন্য বর্তমান ব্যবস্থার আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন সাধনই একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পথ। দুর্ভাগ্যবশত ঠিক এ পর্যায় পর্যন্ত এসেই বুর্জোয়া বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ থেমে যায়, তারা সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে থাকে এবং উত্সকেও আবিষ্কার করে। এ জ্ঞানের ভিত্তিতে কিছু নতুন নীতিমালা ও পরামর্শও প্রণীত হয় অথবা কখনো কখনো এমনকি নতুন ঈপ্সিত সমাজের বিস্তৃত বর্ণনাও এসব লেখায় পাওয়া যায়। কিন্তু কীভাবে যে সেই ঈপ্সিত সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটবে, তার বর্ণনা এসব বুর্জোয়া বিশ্লেষণে কখনই থাকে না। যদিওবা থাকে, সেগুলো কতগুলো বিমূর্ত বাক্যের আকারে, যেমন— জ্ঞানকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজন আছে ইত্যাদি। পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য রাজনৈতিক সংগ্রামের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোও তাদের লেখায় হয় অনুপস্থিত থাকে অথবা বিমূর্ত ও অস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। কোন কোন শ্রেণীকে সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে, কোন কোন শ্রেণী হবে সম্ভাব্য শত্রু, সংগ্রাম কতখানি তীব্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে সমাজের উত্তরণ প্রক্রিয়ার সঠিক উপলব্ধি ও বর্ণনা সম্ভব নয়। একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এ উপলব্ধির প্রয়োজন আরো বেশি। এ প্রয়োজনই রাজনৈতিক কর্মীর দৃষ্টিতে যে ভিন্নার্থ নিয়ে ধরা দেয়া, তা হচ্ছে সমাজের শ্রেণীগুলোকে চিহ্নিত করা, রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র নির্ধারণ এবং বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে জনগণের আচরণ বা সাড়া কী ধরনের হবে, তা অনুধাবন করা। কিন্তু বুর্জোয়া তত্ত্বের পরিধি এতটা বিস্তৃত নয়। কদাচিত্ এসব বিষয়ে তারা আলোচনা করে থাকে। জনগণকে সংগঠিত করার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামের ব্যাপারটি নিয়ে তাদের কোনো ঔত্সুক্য নেই বা থাকলেও তা বড়জোর প্রান্তিক উত্সাহের পর্যায়ভুক্ত।’

স্যার ৪৭ বছর বয়সেই ছিলেন পৃথিবীখ্যাত। স্যারের ওই বয়সেই সবচেয়ে বিরাট অবদান হচ্ছে পাকিস্তান ‘দুই অর্থনীতির দেশ’— সেটা যে টিকবে না, তা আগেই অনুধাবন করা, সাহসের সঙ্গে সেই ভবিষ্যদ্বাণী করা এবং ইতিহাস যখন সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণিত করছে, তখন সেই সংগ্রামের সম্মুখভাগে থেকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক উপাদানগুলো অগ্রিম নির্মাণ করা। স্যার এ পর্যায়ে নিজের ভূমিকাটি বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর আত্মজীবনীতে তিনটি অধ্যায় লিখেছেন। এ অধ্যায়গুলোর শিরোনাম থেকেই আমরা সেই সময়ে স্যারের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও বিবর্তনকে সবচেয়ে ভালোভাবে চিনে নিতে পারি। শিরোনাম তিনটি হচ্ছে—

১. From Political Economy to Politician Economist— রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে রাজনীতিবিদ অর্থনীতিবিদ হওয়া।

২. Engagement with the National straggle— জাতীয় সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করা।

৩. Fulfilment : Witness to the Birth of a Nation.

আত্মচরিতার্থতা অর্জন: একটি জাতির জন্মসাক্ষী হওয়া। স্যারের এ বিশাল সাফল্যের দিকে যখন তাকাই, তখন নিজেদের মনে হয় খুবই ব্যর্থ ও ছোট। স্যার তাঁর ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করেছেন। আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করতে পারিনি। ১৯৮২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত স্যারের সঙ্গে আমার অসংখ্য ইন্টার্যাকশন হয়েছে। স্যারের অধীনে অনেক গবেষণাকর্মে আমার যুক্ত থাকার সুযোগ হয়েছে। অসংখ্য সেমিনারে মুগ্ধ হয়ে তাঁর বক্তব্য শুনেছি। আমেরিকার নিউ অরলিন্সে আমি স্ত্রীর স্কলারশিপ সূত্রে কিছুদিন যখন ছিলাম, তখন স্যার সেখানে মাস্টারি করার ক্ষেত্রে আমার যাতে সুবিধা হয়, সেজন্য এমন একটি টেস্টিমোনিয়াল লিখে পাঠিয়েছিলেন, যা আমার চিরকাল মনে থাকবে। সেখানে স্যার লিখেছিলেন, বিদেশে আমাকে মাস্টারির চাকরি দিলেও দ্রুতই আমাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হয়; যাতে আমি দেশে এসে আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারি। আমি ফিরে এসেছি, কিন্তু স্যারের আশা পূরণ করতে পেরেছি বলে মনে করি না। স্যার সম্পর্কে বলতে থাকলে আমি বলে শেষ করতে পারব না। কিন্তু আমাকে থামতেই হবে। কারণ খাবার সামনে রেখে দীর্ঘ বক্তৃতা দেয়ার জন্য আপনারা সবাই আমাকে দোষারোপ করবেন।

শুধু স্যারের আরেকটি অন্যতম ব্যতিক্রমী গুণের কথা বলে শেষ করতে চাই। যে গুণটি এ দেশে খুবই দুর্লভ। স্যার এমন একজন মানুষ, যার মুখে কখনো তাঁর সতীর্থদের ব্যাপারে কোনো ব্যক্তিগত সমালোচনা বা অহংসূচক কথা শুনিনি। বাঙালিদের তথাকথিত সাধারণ বৈশিষ্ট্য পরশ্রীকাতরতা, হিংসা-দ্বেষ এসব সংকীর্ণতা থেকে অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রথম আলোয় কিছুদিন তিনি কলাম লিখেছিল, ‘আমার সমালোচক আমার বন্ধু’ এ নাম দিয়ে। তাঁর রচনাবলির বাংলা অংশ নিয়ে গঠিত চতুর্থ খণ্ডের শিরোনামও তিনি দিয়েছেন এটাই।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান আদ্যপান্ত গণতান্ত্রিক এবং এখনো তা-ই আছেন। স্যার জীবনবাদী মানুষ, জীবনকে তিনি উপভোগ করেছেন, আত্মচরিতার্থতা অর্জন করেছেন।

স্যার দীর্ঘদিন বাঁচুন। আমার ধারণা স্যার যত দিন বাঁচবেন, তত দিন আমরা তাঁর সান্নিধ্য পাব, তত দিন তিনি তাঁর সৃজনশীল কাজ অব্যাহত রাখবেন এবং তা থেকে আমরা উপকৃত হব। স্যারের জন্য রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

[১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে সানেম (South Asian Network On Economic Modeling)-এর দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলন শেষে ব্র্যাক ইনে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সম্মানে একটি বিশেষ ভোজ-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে লেখক এ বক্তৃতাটি প্রদান করেন।]

 

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়