ছয় দশক অথবা এর বেশি বা কম সময় ধরে এক বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন পার করছেন রেহমান সোবহান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষক, প্রথম বাংলাদেশ প্ল্যানিং কমিশনের একজন সদস্য, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান এবং সর্বোপরি একজন বুদ্ধিজীবী। এ লম্বা সময়ে আমি তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী। তিনি আজ পর্যন্ত যে পদগুলোয় দায়িত্ব পালন করেছেন, তার প্রতিটিতে ছিল তাঁর একনিষ্ঠতা ও উল্লেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্য এবং সংশ্লিষ্টরা সবসময় তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রেখেছেন।
তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ও বিবেকবান শিক্ষক। ছাত্র ও সহকর্মীদের কাছে ছিলেন দারুণ জনপ্রিয় ও সম্মানিত। এ ধরনের দায়িত্ব পালনের উচ্চ বোধ বর্তমান সময়ে দুর্লভ। কেমব্রিজ থেকে পাস করা এ শিক্ষকের ‘আরগুমেনটেটিভ স্টাইল’ দ্বারা দারুণ প্রভাবিত ছিল ছাত্ররা। অন্যদিকে একজন সহকর্মী হিসেবে তিনি আমাকে অর্থনীতি বিভাগের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট শ্রেণীর অর্থনৈতিক সিলেবাসের উন্নতি সাধনে সাহস ও সহযোগিতা করেছেন।
কর্মজীবনের প্রথম দিকে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ইস্যু, বিশেষ করে আর্থসামাজিক সমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোর প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তাঁর প্রজন্মের তিনি সেসব ব্যক্তির মধ্যে অন্যতম, যাঁরা বিশ্বাস করতেন যে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের আনুকূল্যে জনমত গড়তে হলে সমাজবিজ্ঞানীদের একটা পর্যায় পর্যন্ত অ্যাক্টিভিস্ট হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি আরো কিছু ব্যক্তির পাশাপাশি আমরা দুজনই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ ও ব্যাপ্তি পর্যালোচনায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতি সমর্থন দিয়েছিলাম।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান এমন একজন বুদ্ধিজীবী, যাঁর যোগাযোগের দক্ষতা অসাধারণ। এ গুণ আমাদের বিশ্লেষণকে আরো বেশি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। এটা প্রায় মনে রাখা হয় না যে, ষাটের দশকের শেষ দিকে একটা বড় সময় অধ্যাপক রেহমান সোবহান একজন সর্বজনস্বীকৃত সাংবাদিকের ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর সম্পাদনায় ও প্রকাশনায় ১৯৭০ সালে ফোরাম নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল— ছয় দফার সাংবিধানিক তাত্পর্যের পাশাপাশি দেশের দারিদ্র্য সমস্যা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে আলোচনাকে বেগবান করা।
সত্তরের দশকের প্রথম দিকে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি ছয় দফা দাবি সম্প্রসারণ করার জন্য। এ কাজের জন্য যে একদল উপদেষ্টাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেখানকার সদস্য ছিলাম আমরা। আমাদের কাজ ছিল একটি কনফেডারেশন হিসেবে পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ সংবিধানের ভিত্তি তৈরি করা, যা ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করার জন্য পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্য এটা পরে হয়নি।
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলার পর আমরা উভয়ই প্রায় কাছাকাছি সময়ে ভারতে পালিয়ে যাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিদেশে লবিং করার জন্য রেহমান সোবহানকে মুজিবনগর সরকারের দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি যখন যুক্তরাজ্যে ছিলেন, আমি তখন যুক্তরাষ্ট্রে। যখনই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সফরে এসেছেন, তখনই আমরা সম্মিলিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট নির্বাচকদের সঙ্গে লবিং করতাম।
স্বাধীনতার পর পরই বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে আমি প্রথম বাংলাদেশ প্ল্যানিং কমিশন গঠন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করি এর ডেপুটি চেয়্যারমান হিসেবে। এ চ্যালেঞ্জিং কাজে কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে রেহমান সোবহান যোগ দেন। আরেক সদস্য মরহুম মোশারফ হোসাইনের সঙ্গে মিলিতভাবে রেহমান সোবহান এ কমিশনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি স্বতন্ত্র ও মূল পেশাদারি কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেড় বছরের মধ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মতো চরম বেদনাদায়ক ঘটনার সাক্ষী হতে হয় আমাদের। ওই ঘটনার কিছুদিন পর অধ্যাপক রেহমান সোবহান দেশ ত্যাগ করেন। সে সময় আমি অক্সফোর্ডেই ছিলাম। আমরা একসঙ্গে অক্সফোর্ডে কয়েক বছর পার করি। এর পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং বিআইডিএসের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ওই সময়ের তেমন সাহায্যকর বা অনুকূল নয়— এমন পরিবেশের মধ্যেও বিআইডিএস নিজের পেশাদারি স্বাধীনতা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছিল। ওই সময় তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতির মোকাবেলা করা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তৃত ও উন্নত গবেষণা করার কারণে বিআইডিএস দেশের প্রধান আর্থসামাজিক গবেষণা ইনস্টিটিউট হয়ে ওঠে।
বিআইডিএস থেকে অবসর নিলেও অধ্যাপক রেহমান সোবহান কিন্তু কখনো সক্রিয় পেশাদারি জীবন থেকে ছুটি নেননি। এ ‘নীতি গবেষণা উদ্যোক্তা’ প্রতিষ্ঠা করেন সিপিডি। এটি একটি ইউনিক থিংক ট্যাংক এবং এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটাই বাংলাদেশে প্রথম। এর লক্ষ্য ছিল একদিকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে গবেষক ও নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক ও আলোচনার আয়োজন করা, অন্যদিকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ইস্যুগুলো নিয়ে গবেষণা করা। নিজ কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক ডোনারদের আগ্রহ ও সাহায্য লাভ করতে সমর্থ হয়। কিছু সময় পর উন্নয়নশীল বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এমন নীতি ইস্যুগুলো নিয়েও গবেষণা ও আন্তর্জাতিক আলোচনার আয়োজন শুরু করে সিপিডি।
রেহমান সোবহানের সম্মানে বিআইডিএসের সহযোগিতায় বণিক বার্তার আয়োজনটিকে আমি সাধুবাদ জানাই।






