দুই অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক অসমতা তত্ত্বের ওপর তর্কসাপেক্ষে অধ্যাপক রেহমান সোবহান সবচেয়ে উর্বর/প্রলিফিক লেখক। এই দুই তত্ত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে জোরালো করেছিল।
আমি তাঁর একজন গর্বিত ছাত্র, সহকর্মী এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলাম তাঁর সহযাত্রী। তিনি তাঁর লন্ডন বেজ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে পুরো বিশ্বে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং আমরা বোস্টন বেজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সমর্থন জোগাড়ের কাজ করেছি।
১৯৭১ সালের শেষভাগে একটি এমআইটি ফোরামে তাঁর সঙ্গে কো-স্পিকার হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার এবং আমাদের সঙ্গে আরো ছিলেন প্রেসিডেন্ট আবু এস চৌধুরী।
আমার বয়স এখন ৭৩ বছর। ৫৬ বছর পরও আমি এখনো ঘুমের মধ্যে তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, মনে হয় কোনো বিষয়ে লেকচার দিচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স এনেক্স ভবনে অর্থনৈতিক ইতিহাস ক্লাসে তাঁর ভরাট কণ্ঠ শুনেছি (১৯৬৩)। এ কণ্ঠ শুনেছি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন অ্যানুয়াল কনফারেন্সে (১৯৬৫), নিউইয়র্কে রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত পাকিস্তান কনফারেন্সে (১৯৬৯)। শেষ দুই কনফারেন্সে পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বিতর্ক করেছিলেন তিনি।
প্রতিটি বিষয়ে তাঁর বাস্তব, বিতর্কিত, অনুগ্রাহী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আপনি হয়তো তাঁর মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন, কিন্তু সহজে তাঁর যুক্তি উড়িয়ে দিতে পারবেন না। তিনি বক্তৃতা দিতে পছন্দ করেন। এমনকি যখন তিনি আপনার সঙ্গে কথা বলছেন, তখনো তিনি বক্তৃতা দিচ্ছেন। আপনাকে এটি মানিয়ে নিতে হবে এবং তাঁর চিন্তাধারা দিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা শিখতে হবে। তিনি খুব দ্রুত চিন্তা করতে পারেন। আপনি যদি অসতর্ক হয়ে পড়েন, তবে দেখবেন তিনি আপনাকে পেছনে ফেলে কয়েক মাইল এগিয়ে গেছেন।
ব্যর্থতা? হ্যাঁ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশন এবং জাতীয়করণ। আমার ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি, আমি এ দুটোর সমর্থক ছিলাম। এ জাতি এবং জাতির পিতাকে আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার ফলস্বরূপ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে, জাতি ও জাতির পিতার কাছে ক্ষমা চাইতে তিনি আমার ও অন্যদের দলে ভালোমনে যোগ দেবেন। এ ব্যর্থতা সত্ত্বেও অধ্যাপক রেহমান সোবহান বাংলাদেশে ফের আসেন বিআইডিএস, সিপিডি এবং তাঁর লেখা ও বক্তৃতার লেবাসে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রাণশক্তি নিয়ে।
ইতিহাস এর প্রভাব বিচার করবে কিন্তু আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হলো, বাংলাদেশের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অপ্রতিহত দেশপ্রেম। বাংলাদেশের জনগণের, বিশেষ করে এ দেশের গরিব, পিছিয়ে পড়া, খাদ্য সংকটে থাকা এবং দুর্ভিক্ষপীড়িতদের স্বার্থ রক্ষার উত্সাহিত যোদ্ধা হতে কেউ তাঁকে বিরত রাখতে পারেনি। মানুষ যদি ভুলে যায়, তবে বলি— ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি বিআইডিএসের দুর্ভিক্ষের ওপর করা গবেষণার পেছনে তিনি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলেন, যেখানে আমি তাঁর নির্দেশনায় কাজ করেছিলাম। তিনি বক্তৃতা দিতে সবচেয়ে ভালো পারেন। এ কাজ যেন তিনি আরো বহুদিন করে যেতে পারেন, তার জন্য প্রার্থনা করি। মহান আল্লাহ তাঁকে দীর্ঘজীবন দান করুন, যাতে আমরা তাঁর কাছ থেকে আরো অনেক কিছু শিখতে পারি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ






