আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি ১৯৫৯ সালে। জনাব রেহমান সোবহান তখন যুবক শিক্ষক। বিলাত ফেরত রেহমান সোবহানের সাবলীল ইংরেজি ও উচ্চকণ্ঠ আমাদের আকর্ষণ করত। যারা অর্থনীতির ছাত্র নয়, তারাও জনাব সোবহানের ক্লাসে পেছনের বেঞ্চে বসে বক্তৃতা শুনত।

২। তখন ‘নিউ ভ্যালুস’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশিত হতো। খুব সম্ভব অনিয়মিত। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক খান সারোয়ার মুরশিদ। ‘নিউ ভ্যালুস’ জার্নালের একটি সংখ্যায় জনাব সোবহানের দুই অর্থনীতি-বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল পাকিস্তান সরকার কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করছে। কোনো অর্থনৈতিক ভৌগোলিক/রাজনৈতিক এলাকার একটি অঞ্চল অপেক্ষাকৃত উন্নত হলে নতুন বিনিয়োগ সেখানে আকৃষ্ট হয়; অনুন্নত অঞ্চল আরো  পেছনে পড়তে থাকে।

৩। পাকিস্তান সরকারের শোষণ আমাদের অজানা ছিল না; পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধ, রাজনৈতিক বক্তৃতায় বহুল আলোচিত। প্রশিক্ষিত অর্থনীতিবিদের লেখা এটাই আমি প্রথম পড়ি।

৪। জনাব সোবহান ‘রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম’ কর্মসূচির ওপর একটি বিশ্লেষণধর্মী/ সমালোচনাধর্মী বই প্রকাশ করেন। ১৯৬৩-৬৪ সালে পড়েছি। এখন যতটুকু মনে করতে পারি, গ্রামীণ অবকাঠামো কর্মসূচিতে সেচ উপেক্ষিত ছিল। নিম্নমানের রাস্তাঘাট অনেক হয়েছিল। উপেক্ষিত সেচ সম্পর্কে আলোচনা ছিল বিরল। এ এলাকার কৃষি অর্থনীতির জন্য ছোট খাল-বিল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫। জনাব সোবহানকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। তিনি তখন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য। আমি বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিবের দায়িত্বে। পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে খাতওয়ারি বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক হতো। পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চিফ জনাব নূরুল ইসলাম তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করতেন। জনাব সোবহান তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রতি উদাসীন ছিলেন না, কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট অথবা ন্যূনতম ঘাটতি ব্যয় (balanced budget & low deficit financing) ঋজু ধারণার সমালোচনা করতেন। মাননীয় মন্ত্রী জনাব জেনারেল ওসমানীর কাছে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বেশি আবেদন সৃষ্টি করতো না, উচ্চ কণ্ঠ ধ্বনি অধিক কার্যকর ছিল।

৬। ১৯৯০ সালে অন্তর্বর্তী সরকারে জনাব সোবহান উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। বাংলাদেশে আর্থসামাজিক অবস্থা ও ভবিষ্যত্ সম্পর্কে তিনি বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের লেখা নিয়ে তিন খণ্ডে বইটি প্রকাশিত হয়। সরকারের কোনো খরচ হয়নি। ঢাকার ইউনিভার্সিটি প্রেস লি. বইটি প্রকাশ করে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা জানতে ওই তিন খণ্ড বই এখনো প্রাসঙ্গিক।

৭। ২০০১ সালে আমার সঙ্গে সরকারের চাকরি সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর জনাব সোবহানকে আরো ভালো করে জানার সুযোগ পাই। আমার বন্ধু ও সহকর্মী সৈয়দ আব্দুস সামাদ এবং আমি একসঙ্গে সময় কাটাতাম, দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করতাম। আমাদের অতীত জীবনের আনন্দ-বেদনা-ঈর্ষা বাদ থাকত না। তখন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কোনো আমন্ত্রণে সাড়া দিইনি বলে মনে পড়ে না। জনাব রেহমান
সোবহান ছিলেন সিপিডির প্রধান— আমাদের আজীবন শিক্ষক।

৮। তেল-গ্যাস নিয়ে একটি সেমিনারে আলোচনার কথা মনে পড়ে। প্রয়াত মন্ত্রী জনাব এএসএইচকে সাদেক উপস্থিত ছিলেন। তিনি একসময় জ্বালানি সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। উক্ত সেমিনারে সামাদ ও আমি উপস্থিত ছিলাম। আমাদের ভূমিকা ছিল মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের গ্যাস কনসেশন প্রদান নীতির অর্থনৈতিক যুক্তি উপস্থাপন করা। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. সামাদের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি (আমি কমিটির সদস্য ছিলাম) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে বিশ্লেষণ ও পরামর্শ দিত। সামাদ অর্থনীতিতে পিএইচডি এবং নিরন্তর অর্থনীতি চর্চা করে।

৯। সেমিনারের পর সামাদ এবং আমার জনাব সোবহানের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা হলো। স্যার আমাদের আলোচনা সম্পর্কে কী মনে করেন? জনাব সোবহানের সাক্ষাত্ পেতে কোনো অসুবিধা বা দেরি হলো না। তাঁর কাছে আমরা অকপটে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘স্যার, আমাদের কত নম্বর দিলেন’। স্যারের উত্তর অমায়িক ও নিরহঙ্কার, ‘তেল-গ্যাস সম্পর্কে যে জানে না, তাঁরা তোমাদের গ্রেড দেবে কী করে, তোমাদের কাছ থেকে হয়তো কিছু শিখতে পারে।’

১০। আমার চাকরি শেষ হওয়ার পর, জনাব সোবহানের সুপারিশে আমি কয়েকবার বিদেশে সেমিনারে গেছি। চেন্নাইয়ে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সেমিনার এবং লন্ডনে সেমিনারের কথা মনে পড়ে। লন্ডনে একটি সেমিনারের বিষয়বস্তু ছিল যুক্তরাজ্য সরকার বৈদেশিক সহায়তা কীভাবে অর্থবহ করতে পারে। কমনওয়েলথ অফিসের অন্যটির আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, কমনওয়েলথ কী উপায়ে উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কমনওয়েলথের আর্থিক ও টেকনিক্যাল সম্পদ সীমিত; প্যাসিফিক সাগরের দ্বীপ-রাষ্ট্রগুলোয় প্রধানত তাঁদের কাজ সীমিত।

১১। জনাব সোবহানকে যতটুকু জেনেছি, তিনি উদার মনের অধিকারী; ঈর্ষা বা অহঙ্কার প্রকাশ করতে দেখিনি এবং আমাদের পরিণত বয়সেও তাঁর পুরনো ছাত্রদের প্রতি স্বভাবসুলভ স্নেহ দেখেছি।

 

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা