যে ধরনের সম্পৃক্ততা থাকলে একজন ব্যক্তিকে বলা যায় যে, আমি তাকে ভালো জানি, সে ধরনের সম্পৃক্ততা আমার সঙ্গে কখনো অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ছিল না। এক্ষেত্রে আমার রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা মনে পড়ে, যেটা খুব সম্ভবত নজরুলকে উদ্দেশ করে লেখা। ওই কবিতার দুটি চরণ ছিল এ রকম: ‘বহুদিন ইচ্ছে ছিল যাব ওপাড়ার ধারে/ভেতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে’। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ব্যাপারে আমার এই পঙিক্তগুলো মনে হচ্ছে। আমাকে অনেকটা বলা যায়, আশপাশে থাকা তার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত। এ ভক্তির কারণ তিনি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। আমি মনি করি, সৃষ্টিকর্তা ও মায়ের পরে ওই ব্যক্তিই সেরা, যিনি প্রতিষ্ঠান গড়তে পারেন, যে প্রতিষ্ঠান সাধারণ জনগণের, পিছিয়ে থাকা এবং আইনি সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কম আলোচিত বিষয়গুলো মূলধারায় নিয়ে আসে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওই ধরনের ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তা ও মায়ের পরে একজন প্রাতিষ্ঠানিক সৃষ্টিকর্তা। প্রাতিষ্ঠানিক সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে সাধারণত তিন ব্যক্তিকে আমরা আমলে নিয়ে থাকি। এক. উদ্যোক্তা বা এন্ট্রাপ্রেনিউর, যিনি প্রতিষ্ঠান গড়েন, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দুই. যারা আবিষ্কার করেন, যাদের আবিষ্কারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব হয়, তাদের জীবনে গতিময়তা সৃষ্টি হয়। তিন. নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থেকে যারা সাধারণ মানুষের কথা বলে যান এবং অকাতরে নিজে স্বপ্রণোদিত হয়ে অংকের সঠিক উত্তরটি সবার সঙ্গে বিনিময় করেন।
আমি তিন নম্বর ক্যাটাগরির নমস্য ব্যক্তির তালিকায় অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে রাখতে চাই। তার কারণ হলো, আমরা যারা অর্থনীতি পড়েছি, তাদের জীবনে বিআইডিএস ও তার প্রকাশনাগুলোর বিরাট অবদান রয়েছে। আমাকে অনেকেই বলেছেন, বিআইডিএসের জার্নালগুলো না পড়লে বৈদেশিক সহায়তা, শিল্পোদ্যোগ, দুর্নীতি, কৃষির উন্নয়ন, কৃষি কাঠামোর পরিবর্তন এবং খাদ্যবণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ে জানা যেত না। যদিও তিনি বিআইডিএসের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন না, কিন্তু বিআইডিএসকে একটি মহীরুহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ক্ষেত্রে রেহমান সোবহানের বিরাট অবদান রয়েছে। তিনি সেখানে সঠিক লোক খুঁজে বের করেছিলেন, নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং প্রতিনিয়ত লক্ষ্যে অবিচল থাকতে অনুপ্রাণিত করেছেন। পেশাগত জগতে নিঃসন্দেহে এগুলো একজন নেতার বড় গুণ। রেহমান সোবহানের মধ্যে ওইসব গুণের সফল সমাবেশ ঘটেছিল। উল্লেখ্য, আমাদের দেশ যখন সমাজবাদী অর্থনৈতিক উত্পাদন ধরন থেকে ধীরে ধীরে বাজার অর্থনীতির দিকে যাত্রা করছিল, তখন রাশিয়া ফেরত কমিউনিস্ট অর্থনীতিবিদ কিংবা শিক্ষাবিদরা ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছিলেন। সেই সময় রেহমান সোবহান তাদের কাউকে কাউকে এনে চাকরি দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে যে কী সম্ভাবনা লুক্কায়িত ছিল, তারা যে কী করতে পারেন, সেটা কিন্তু রেহমান সোবহান আমাদের দেখিয়েছেন। এটাও তার একটা বড় গুণের পরিচায়ক।
আরেকটি বিষয় বলব, তিনি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নামক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন, যেটি অত্যন্ত স্বল্পতম সময়ে তাদের নিষ্ঠা, কর্মস্পৃহা ও দলগত ঐক্যবোধের জন্য সম্মানজনক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি মনে করি, তার প্রতিষ্ঠানের কিছু কিছু গবেষণা ও পর্যালোচনা বিশেষভাবে আলোচনাগুলো নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছে। একই সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানটি অর্থনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত আমাদের অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রেহমান সোবহানের ‘টাস্কফোর্স’ রিপোর্ট বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
যে বিষয়টি না বললেই নয়, সেটি হলো তিনি যেহেতু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, তাজউদ্দীনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন, পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম সহসভাপতি অধ্যাপক নূরুল ইসলামের সঙ্গে কাজ করেছেন (পরবর্তীতে তিনিই ওই পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন) এবং স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আরো কিছু অর্থনীতিবিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন; সেহেতু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন ও অকাতরে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়নে কাজ করার গুণটি অনেকটা অলক্ষে তার মধ্যে ঢুকে গেছে। এজন্য তিনি কখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি ভুলে যাননি, হেয় করেননি। বড় কথা, সেগুলো তিনি অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে লালন করেছেন।
রেহমান সোবহান জীবনব্যাপী অন্যের সমালোচনাকে ধারণ করেছেন এবং গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন। তার একটা কলামের নাম ছিল, ‘আমার সমালোচক আমার বন্ধু’। আজকে সর্বত্র গঠনমূলক সমালোচনা, ন্যূনতম সমালোচনার জায়গাটুকু গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছে কিংবা এরই মধ্যে হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমার বারবার মনে হয় ‘আমার সমালোচক আমার বন্ধু’ রেহমান সোবহানের এ শিরোনামটির কথা। কারণ সমালোচকই বলবে আমার কী ভুল থাকতে পারে। যদি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে কেউ সমালোচনা করে, সেটা কেউ গ্রহণ করবে না। এজন্য সামষ্টিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে কেউ যদি আমার গঠনমূলক সমালোচনা করে, সে অবশ্যই আমার বন্ধু। আজকে যখন বাংলাদেশে সমালোচনার জায়গাটি ক্রমে ম্রিয়মাণ, তখন আমাদের রেহমান সোবহানকে স্মরণ না করে উপায় নেই।
পাকিস্তানের দুই অর্থনীতি তত্ত্বের বিষয়টি কারো অজানা নয়, যার অন্যতম প্রবক্তা এ রেহমান সোবহান। এক্ষেত্রে তার কিছুটা অভিনবত্ব রয়েছে। ওই তত্ত্বের মূল কথা হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক পার্থক্য, মূল্যবোধের পার্থক্য, সামাজিক বোধের পার্থক্য, অর্থনৈতিক চর্চার পার্থক্য, জীবনাচরণের পার্থক্য বিস্তর। কাজেই দুটি দেশ একসঙ্গে থাকতে পারে না, যা পক্ষান্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্লাটফর্ম তৈরি করেছে। নিঃসন্দেহে সেদিক থেকেও রেহমান সোবহানের অবদান কম নয়। আরেকটি বিষয় হলো, তিনি মানুষের দুর্বলতা নয়, তাদের শক্তিতে বিশ্বাসী। তিনি বিভিন্ন ধরনের মানুষ নিয়ে নিরীক্ষা করতে পছন্দ করেন। আমি মনে করি, রেহমান সোবহান এ অঞ্চলের গরিব মানুষকে ভালোবেসে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যেভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, সেজন্য তিনি অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক; পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ম্যানেজিং পার্টনার






