মাত্র ক’দিন আগে (২৫.০২.২০১৭) জাতীয় জাদুঘরের মিলনায়তনে ড. মাহবুব হোসেন সম্পর্কে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বক্তৃতা শুনে মনে হচ্ছিল, কী করে একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব অর্ধ শতাব্দী যাবত্ একই রকম ধীশক্তি ও শ্রুতিমাধুর্যসম্পন্ন বক্তৃতা করে যাওয়া! স্যার যখন বসার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়ার জন্য পডিয়ামের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন আমি কিছুটা অস্থির বোধ করেছিলাম এই মনে করে যে, স্যারকে তো বসে বক্তৃতা দিতেই বলা যেত। স্যার শুধু দাঁড়িয়েই বক্তৃতা করলেন না, তা করলেন প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে। এ বক্তৃতা শুনতে শুনতে আরো অনেক বক্তৃতার কথাই মনে হতে লাগল। ষাটের দশকের শেষার্ধে অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে তাঁর বক্তৃতা শোনা আমার শুরু। তার পরে অসংখ্য অর্থনীতি-সংক্রান্ত সেমিনারে তাঁর মনোমুগ্ধকর বক্তৃতা শুনে এসেছি। একি কোনো সাধারণ বক্তৃতা! বহুমুখী কথা এত প্রাঞ্জল ভাষায় গুছিয়ে বলেন। প্রয়াত মাহবুব হোসেন সম্পর্কে বলতে গিয়ে যেসব কথা বলছিলেন, তা যেন অর্থনীতি ও সমাজ নিয়ে গবেষণা বিষয়ে নিজের মনের সাধনা ও বাসনার কথাই তুলে ধরলেন। মাহবুব হোসেনের গ্রামে গ্রামে ঘুরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের বিষয়টা শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ে গেল প্রতিটি গ্রামের অর্থনীতি ও সমাজ কাঠামো নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনের কথা স্যার প্রায়ই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন।

দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য: লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (এলএসই) থেকে ফিরে এসে যখন আবার তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন, তখন আমরা স্যারকে পাই উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে। এলএসই সময়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলে তিনি আমাদেরকে বিশ্লেষণী হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। ওই সময়ের একটি কথা এখনো মনে হয়। তিনি বলেছিলেন, অধ্যাপক লা মিন্ট (Hla Myint) তাঁকে বিশেষ ভাবাপন্ন বা প্রবণতার অর্থনীতিবিদ বলে মনে করলেন (Hla Myint told me I’m a biased man.)। তাঁর উত্তরে তিনি বলেছিলেন: বিশেষ প্রবণতা বা দৃষ্টিভঙ্গি কার নেই? সে নূরুল ইসলাম হোক বা আনিসুর রহমান হোক। তাঁর অভিমতের সমর্থনে তিনি গুনার মির্ডালের (Gunnar Myrdal) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন: যা দরকার, তাহলো যার যার প্রবণতা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করা। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের জন্য নিজস্ব ধ্যান-ধারণাকে জলাঞ্জলি দেয়ার কথা বাস্তবসম্মত নয়, কাম্যও নয়।

কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ও অনুচ্ছেদশূন্য বক্তৃতা: রেহমান সোবহানের বক্তৃতা শুনে বন্ধুরা আলাপ করতাম, এই যে এক-দেড় ঘণ্টা অনর্গল ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা দিলেন, এর মধ্যে কি কোনো কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি বা অনুচ্ছেদ ছিল? ছিল না বলেই আমাদের বুঝতে কি কোনো অসুবিধা হয়েছে? দুই প্রশ্নেরই উত্তর না। রেহমান সোবহানের বক্তৃতায় সম্মোহিত হয় না, তা তাঁর সমালোচকরাও বলতে পারবেন না। আশির দশকে একবার দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক মৃণাল দত্ত ঢাকায় এক সেমিনারে রেহমান সোবহানের পরে বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘If eloquence is economic logic, Rehman Sobhan has all of it.’ আমার ধারণা, মৃণাল দত্তের মতো বাজার অর্থনীতির অমিয় শক্তিতে বিশ্বাসী অর্থনীতিবিদরা রেহমান সোবহানের মতো বাজার অর্থনীতির লাগামহীন মুনাফাবৃত্তিকে সরকারি নীতির মাধ্যমে টেনে ধরার প্রয়োজনের কথা স্বীকার করতে চান না। তাই তারা রেহমান সোবহানের বক্তৃতার সম্মোহনী শক্তির কথা বলেন কিন্তু স্বীকার করতে চান না যে, তার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক যুক্তি।

হক-তোহা-মতিন-আলাউদ্দিনদের বলো: অধ্যাপক রেহমান সোবহান নিয়ে আমার স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করার চেষ্টায় সবচেয়ে বড় হয়ে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের বারান্দায়, ষাটের দশকের শেষের দিকের অগ্নিঝরা দিনগুলোর কোনো একটা দিনে, আমি যখন আমার বন্ধুদের সঙ্গে স্লোগান দিচ্ছিলাম: ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’, তখন স্যার তাঁর চিরন্তন রহস্যময়, খানিকটা আনন্দমিশ্রিত উদ্ভাসিত নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন (খুব সম্ভবত, তাঁর কক্ষে ডেকে): ‘তোমরা হক-তোহা-মতিন-আলাউদ্দিনকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলো। ওরা নির্বাচনে আসলে স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক শক্তি আরো শক্তিশালী হবে।’ এ কথাগুলো লিখতে গিয়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্পর্কে ড. আবু মাহমুদের একটি কথা মনে হলো। মাহমুদ স্যার থেকে পেতাম আমরা মার্ক্সীয় অর্থনীতির শিক্ষা। আমরা রেহমান সোবহানের জীবন ও সমাজ দর্শন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি মিষ্টি-শ্রদ্ধা-স্নেহমিশ্রিত মৃদু হাসিসহকারে বলে ওঠেন: ওঁ ‘ফেবিয়ান সোস্যালিস্ট’। শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতই দিতেন রেহমান সোবহান সেই সময়ের আমাদের মতো তরুণদের। কিন্তু ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা’ স্লোগানটি যে তাঁকে খুশি করেছিল, তা আমরা বুঝতে পারি।

অমর্ত্য সেন-রেহমান সোবহান ও মাহবুবুল হকের বন্ধন: তিন দেশ থেকে উঠে আসা এ উপমহাদেশের তিন অর্থনীতিবিদের নাম একসূত্রে গাঁথার কথা আমরা জানতে পারি অর্মত্য সেন থেকে। তাঁর বক্তৃতায় বা লেখায় এ তথ্য উল্লেখ না হলে আমরা অনেকেই জানতে পারতাম না যে, এ উপমহাদেশের অর্থনীতি পেশার সবচেয়ে পরিচিত তিনটি নাম একটি অভিন্ন সূত্রে গাঁথা আর তা হলো তাঁদের একই সময়ে কেমব্রিজে লেখাপড়ার বন্ধন। এ বন্ধনের কথা সবচেয়ে বেশি স্মরণ করেন অমর্ত্য সেন। আমার ধারণা, এটা তিনি করেন এ তিন দেশের মধ্যে সৃষ্ট ঘৃণাকে কমানোর প্রয়াসে।

মুক্ত অর্থনীতি, তাই কারো সময় নেই: বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সেমিনার ও সম্মেলন করার জন্য সদস্যদের, এমনকি কার্যনির্বাহী সদস্যদের মধ্যেও অনেকের সময় না পাওয়ার ব্যাখ্যা করেন তাঁর চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে: মুক্ত অর্থনীতি, সুতরাং বিনিময় মূল্য ছাড়া কারো কোনো সময় নেই (free economy, so no free time!)।

সোয়েট শপ বনাম মুক্ত শ্রমিক: আশির দশকের মাঝামাঝি তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে আমাদের অনেকের ছিল উচ্ছ্বাস, স্যারের ছিল দুশ্চিন্তা। অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাঁর অভিমত ছিল, এ শিল্প থেকে মূল্য সংযোজন তেমন কিছুই হবে না। আর তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল, এ শিল্পের কারখানাগুলোর ‘সোয়েট শপ’ হওয়ার সম্ভাবনায়। বিপরীতে আমার ধারণা ছিল, শিল্প-কারখানার প্রসার ও কর্মহীন মানুষের জীবিকা সংস্থানের জন্য এ ধরনের শিল্পের প্রয়োজন রয়েছে। কার্ল মার্ক্সের ‘বন্ডেজ লেবার’ থেকে ‘মুক্ত শ্রমিক’ ধারণার উল্লেখ করে (‘free wage labour’) বলতাম, অন্য মানুষের বাড়িতে ‘ঝি’র কাজ বা এ রকম ‘বন্ডেজ’ শ্রম না দিয়ে বা কর্মহীন অবস্থা থেকে বের হয়ে এসে শিল্প শ্রমিক হওয়া প্রগতির একটি বড় ধাপ। তাজরীন ও রানা প্লাজার ঘটনার পরে নিজের ভুল স্বীকার করে ছাত্রদের বলতাম: রেহমান সোবহান আমাকে এখন বলতে পারেন, তোমার ‘মুক্ত শ্রমিক’ চূড়ান্ত মুক্তি পেয়ে গেছে! তবে তা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আগুনে অঙ্গার হয়ে গেছে।

আবদুর রাজ্জাক-রেহমান সোবহান থেকে নতুন প্রজন্ম: সেদিন (৩০.০১.১৭) অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ‘জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক বক্তৃতামালার উদ্বোধনী বক্তৃতা’ শেষে কফি টেবিলে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকীকে পেয়ে, কথা বলে ও শুনে মনে হচ্ছিল, আবদুর রাজ্জাক-রেহমান সোবহানদের স্বপ্ন ও কাজকে এগিয়ে নেয়ার নতুন প্রজন্ম ঠিকই বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়ে গেছে। সাম্য-মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যয়বিচারের জন্য আবদুর রাজ্জাক-রেহমান সোবহানের মতো মানুষের মনন ও কাজকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস থেমে নেই, থাকতে পারে না।

অতৃপ্তি ও অসমাপ্ত প্রয়াস: রেহমান সোবহানের সার্বিক অর্জন অতুলনীয়। কয়েক যুগের অসংখ্য অর্থনীতির ছাত্র, তাঁর লেখার অগণিত পাঠক, তাঁর সম্মোহনী বক্তৃতার মুগ্ধ শ্রোতা ও সহযোগী অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রেহমান সোবহানের প্রভাব অপরিমেয়। এর তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে রেহমান সোবহানের প্রভাব ততটা শক্তিশালী হতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে ‘দুই অর্থনীতি তত্ত্ব’ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যেভাবে ত্বরান্তিত করেছিল, সে রকম প্রভাব পড়েনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে ও সামাজিক পরিবর্তনে। বরং উল্টো পথেই চলছে প্রিয় স্বদেশভূমি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যয় বিচারের শাশ্বত বাণী যে দেশ গঠনে সবাইকে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সে দেশ আজ উল্টোপথে চলায় রাজনীতিক বিভক্তিতে, অর্থনৈতিক অসাম্যে, সামাজিক অনাচারে ও ক্ষমতার অপব্যবহারে পর্যুদস্ত। বাজার অর্থনীতিকে সঠিকভাবে পরিচালনার অভাবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে পরিবেশের। পরিবেশ ধ্বংসের কথা বলতেই মনে হলো, আমার আরেক শিক্ষক অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদের কথা, যিনি জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার কাজে ব্রতী ছিলেন। মুজাফফর আহমেদ ও রেহমান সোবহান অনেক কাজ করেছেন একসঙ্গে। প্রায় একই সময়ে বিদেশ থেকে ফিরে ষাটের দশকের অর্থনীতি বিভাগকে আরো আলোকিত করে তুলেছিলেন এ দুজন শিক্ষক। শেষের দিকে এ দুই বন্ধু ও সহকর্মী যেন নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিয়েছিলেন। এক যুগ ধরে রেহমান সোবহান লিখে চলেছেন অবিচার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে। এ যেন ইতিহাস নির্ধারিত দায়িত্ব।

 

লেখক: অধ্যাপক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি