প্রফেসর রেহমান সোবহান হলেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি ডাকলে সবাই আসেন। গত তিন দশক তিনি অনেক লোককে ডেকেছেন ওনার ডায়ালগে। ডায়ালগ কী নিয়ে— অর্থনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি, গভর্ন্যান্স বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে। এসব বিষয় বাংলাদেশের জন্য সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজো আছে। তিনি তার ডায়ালগে যাদের ডাকতেন তারা হলেন— অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, সমাজকর্মী। এরা যে যে ধারণারই হোন না কেন, এদের ডেকে প্রফেসর রেহমান সোবহান অসংখ্য ডায়ালগের আয়োজন করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, মতের বহুধার মাধ্যমে সরকার ও সমাজের জন্য সঠিক বিষয়টি যেন উঠে আসে। আমিও তাঁর অনেক ডায়ালগে উপস্থিত ছিলাম এবং উপকৃত হয়েছি এই অর্থে যে, আমি যা জানতাম না, অন্যের মুখ থেকে তাই শুনেছি। আবার নিজের পারা বিষয়গুলোকেও অতি জোরালোভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। প্রফেসর রেহমান সোবহান বিআইডিএসের মহাপরিচালক ছিলেন। আমার দেখামতে, তিনি যত দিন এ সংস্থার ডিজি ছিলেন, ততদিন এ সংস্থায় প্রাণটা যেন বেশিই ছিল। ওই সংস্থা থেকে অবসরে এসে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন বেসরকারি উদ্যোগের প্রথম থিংক ট্যাংক The CPD— Centre for Policy Dialogue। এই CPD ধীরে ধীরে গড়ে উঠে আজ গবেষক ও পলিসি মেকারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সবাই চেয়ে থাকে, কোন অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে CPD কী বলে। আমি যতটা CPDকে দেখেছি, এ সংস্থা অনেকটা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নীতি অবস্থানের ঘাটতি এবং শূন্যতা নিয়ে সরকার ও অন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করত। আজকে CPDর কাজের ধরন অনেকটা পাল্টেছে। এ সংস্থা এখন শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতি নয়, বরং পার্শ্ববর্তী অন্য দেশের অর্থনীতিগুলো নিয়েও গবেষণা ও কার্যপত্র উপস্থাপন করছে। CPDর আরেকটা বড় অবদান হলো, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর মধ্যে কীভাবে আরো কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে ব্যাপারে পলিসিগত অবস্থান তুলে ধরা। প্রফেসর রেহমান সোবহান CPDর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।
আমি প্রফেসর রেহমান সোবহানের ছাত্র, সেই ১৯৬৭-৭০ সালে যখন তিনি পাকিস্তান ইকোনমিকস নামের কোর্সটি পড়াতেন। আমার সঙ্গে তত্কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে একঝাঁক মেধাবী ছাত্র পড়তেন, যাদের প্রায় সবাই পরবর্তীকালে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সমাজকর্মী, প্রশাসক ও সাংবাদিক হয়েছেন। ওই সময় পাকিস্তান ইকোনমিকস কোর্সটি পড়ানোর জন্য ধরাবাঁধা কোনো পাঠ্যপুস্তক ছিল না। আমাদের পড়ার উত্স ছিল তত্কালীন পাকিস্তান ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (PIDE) প্রকাশনা ও গবেষণাপত্র। তবে স্যার আমাদের ক্লাসে তার নিজস্ব অবজারভেশন দিতেন। স্যার তখন Forum নামের একটি মাসিক পত্রিকা বের করতেন, যা শিক্ষিত সমাজের কাছে অতি আকর্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা দেখতাম Forum অনেকের হাতে। ওই পত্রিকার মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অসমতা, স্ববিরোধিতা ও পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্যের বিষয়গুলোকে তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে তুলে ধরা হতো। আমাদের ক্লাস ও পরীক্ষাগুলো ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ পর্যন্ত চলেছিল। এর পর আর চলেনি। মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্যার চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধে।
আমি যখন ১৯৯৯-২০০২ সাল পর্যন্ত অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান, তখন স্যারকে একটা সেমিনারে পেয়ে বলেছিলাম, স্যার আসবেন কি আপনার সেই পুরনো কর্মক্ষেত্রে শিক্ষক ও ছাত্রদের সামনে কিছু বলতে? স্যার সানন্দে রাজি হয়েছিলেন। ২০০০ সালের কোনো একদিন তিনি এলেন সেই সেমিনার রুমে, যে সেমিনার রুমে শিক্ষক হিসেবে তিনি অনেকবারই এসেছিলেন। স্যারের সঙ্গে ছিলেন আজকের সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয়। স্যার তার শিক্ষকতা জীবনের, তার তত্কালীন ছাত্রদের, তার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া এবং সংগঠন নিয়ে মন খুলে অনেক কথা বললেন। তত্কালীন ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর আজাদ চৌধুরীও আমার আমন্ত্রণে সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। বিভাগের শিক্ষকরা, ছাত্ররা মন খুলে স্যারের কথা শুনলেন। স্যারকে চেয়ারম্যানের রুমে বসিয়ে এক কাপ চা পান করতে দিয়েছিলাম। একজন শিক্ষক তার পুরনো ছাত্রদের পেলে খুশিই হন। স্যারও সেদিন খুশি হয়েছিলেন। আমি আর স্যারকে কীভাবে সম্মান জানাতে পারতাম জানি না। আমার কাছে মনে হয়েছিল, ওটাই ছিল একজন শিক্ষককে উত্তম সম্মান জানানোর একমাত্র পথ। আজ স্যারের বয়স হয়েছে অনেক। আমরা স্যারের জন্য দোয়া করি।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের
অনারারি প্রফেসর ও প্রফেসর রেহমান সোবহানের প্রাক্তন ছাত্র






