বাংলাদেশ পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশ হওয়া সত্ত্বেও ১৬৪.৬ মিলিয়ন মানুষের বসবাস। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ০.৫৪ শতাংশ চাষযোগ্য কৃষিজমি বিভিন্ন অবকাঠামো, বসতবাড়ি, কল-কারখানা ইত্যাদি নির্মাণের দরুন অকৃষি জমিতে রূপান্তর হচ্ছে। ফলে দেশের প্রধান খাদ্য ‘চালের’ ক্ষতি হচ্ছে ০.৮৬ থেকে ১.১৬ শতাংশ। আবাদি জমি হ্রাস পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটানো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেমন—উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, সেচ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সারে ও যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদান, সহজ শর্তে কৃষিঋণ বিতরণ ইত্যাদির জন্য দেশের শস্য নিবিড়তা অনেক বেড়েছে। যেটি ১৯৫৪ সালে ছিল মাত্র ১৫৪ শতাংশ সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৪ শতাংশে। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০০১-০২ থেকে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত দেশের প্রধান খাদ্যশস্যগুলোর উৎপাদন প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। স্বল্প জমিতে অধিক উৎপাদন করতে গিয়ে মাটির ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন ফসলের উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত আবাদের ফলে সারের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ফসলের অধিক ফলনের আশায় কৃষক প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করছে। ফলে জমি হারাচ্ছে তার উর্বরা শক্তি। ষাটের দশকে যখন সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয় তখন থেকেই কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে একটা সময় ধারণা করা হতো কৃষকরা শুধু ইউরিয়া সারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরিয়া সারের পাশাপাশি অন্যান্য সারের ব্যবহারও বেড়েছে ব্যাপক হারে। এর অন্যতম কারণ হলো ইউরিয়া সারের মতো অন্যান্য সারেও অত্যধিক পরিমাণ ভর্তুকি। গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্তকে উপেক্ষা করে ধাপে ধাপে ভর্তুকির মাধ্যমে সারের দাম কমানো হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শুধু ডিএপি সারের মূল্য ২৫ থেকে ১৬ টাকায় আনার জন্য সরকারের অতিরিক্ত ৮০০ কোটি টাকা খরচ হবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভর্তুকি দেয়া সার কৃষকের নিট আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এসব ভর্তুকি দেয়া রাসায়নিক সার সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তার তদারকি তেমন নেই। সুপারিশকৃত সারের মাত্রার চেয়ে অধিক কিংবা কম সার প্রয়োগ করলে মাটির স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে, যেটা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনের জন্য হুমকি তৈরি করবে।
তাছাড়া অনিয়ন্ত্রিত সার প্রয়োগের ফলে সারের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ফলন কম হচ্ছে অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে কৃষকের কাঙ্ক্ষিত লাভ তো হচ্ছেই না, অনেক ক্ষেত্রেই লোকসানের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ফসফরাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রয়োগের ফলে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফলন কমতে পারে। সুতরাং কৃষি খাতের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে মাটির গুণাগুণ ধরে রাখা অতি জরুরি। যার জন্য দরকার টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনা। উন্নত দেশগুলো মাটির উর্বরতা সঠিক রাখতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিলেও তা থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বিশ্বের অনেক জায়গায় মাটির উর্বরতা ধরে রাখার জন্য জমিকে পতিত রেখে বিশ্রাম দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একদিকে চাষ্যযোগ্য জমির পরিমাণ কম অন্যদিকে অধিক জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা কষ্টসাধ্য বিধায় ভৌগোলিক এবং আবহাওয়াগত সমস্যা ছাড়া জমিকে বিশ্রাম দেয়া সম্ভব নয়।
মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক বিষয় জড়িত। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মাটির উর্বরতা ধরে রাখার জন্য বেশকিছু সুপারিশমালা প্রদান করেছে। তার মধ্যে কনজারভেশন পদ্ধতিতে (ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে রেখে সর্বনিম্ন চাষের মাধ্যমে জমি ব্যবহার) জমি চাষ, ফসল পরিবর্তন এবং মাটিতে পুষ্টি উপাদান ধরে রাখতে সক্ষম (লিগিউম ফসল) ফসলের আবাদ, অধিক পরিমাণে ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে সংরক্ষণ, জৈব সারের প্রয়োগ বাড়ানো, সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক সময় রাসায়নিক সার প্রয়োগ ইত্যাদি অন্যতম। মাটির টেকসই উর্বরতা ব্যবস্থাপনার জন্য এসব সুপারিশমালা অনুসরণ করে ফসল আবাদ করা একান্ত জরুরি। তবে এসব সুপারিশমালা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ এটি বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের অধিকাংশ ধানের জমি আজও সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হচ্ছে, যেখানে জমির অবস্থান ভেদে তিন-চার চাষ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিছু কিছু ফসলের ক্ষেত্রে সাত-আটবারও জমি চাষ হয়। ফলে মাটির উপরিস্তরের পলিযুক্ত উর্বর অংশের ক্ষয়, মাটির জৈব উপাদান ও পানির ভারসাম্য নষ্ট, মাটির উপকারী অণুজীব ধ্বংসসহ নানাভাবে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া অতিমাত্রায় জমি চাষ উৎপাদন খরচও বাড়ায়। অন্যদিকে কনজারভেশন পদ্ধতিতে জমি চাষ করলে সনাতন পদ্ধতির তুলনায় ১০-১৫ দিন আগে বীজ বোনা যায়, সার ও বীজ কম লাগে, পানি কম লাগায় সেচের খরচ কম হয় এবং ভূমিক্ষয় রোধে সহায়ক। কয়েক বছর ধরে মাঠপর্যায়ে ধান চাষে খরচ বৃদ্ধি এবং ধানের স্বল্পমূল্যের কারণে কৃষক তেমন লাভের মুখ দেখছে না। ধানের জমিকে যদি বিনাকর্ষণ (কনজারভেশন চাষের তিনটি পদ্ধতির মধ্যে একটি) পদ্ধতিতে চাষের আওতায় আনা যায়, তবে উৎপাদন খরচ যেমন কম হবে তেমন ফলন বৃদ্ধির কারণে কৃষক লাভবান হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কনজারভেশন চাষাবাদ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু বাংলাদেশে কনজারভেশন চাষাবাদ পদ্ধতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে তেমন দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চলের কিছু জায়গায় এটি দেখা গেলেও দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে এ চাষ পদ্ধতির তেমন প্রসার ঘটেনি। কিছু সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প এবং অঞ্চলভিত্তিক সংগঠন এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলেও কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয়তা তেমন পায়নি। তার অন্যতম কারণ হলো কনজারভেশন পদ্ধতিতে জমি চাষকে শ্রমিক সাশ্রয়ী করতে হলে যে পরিমাণ যান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন সেটা বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি।
চাল প্রধান খাদ্য হওয়ায় বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ জমিতেই ধান আবাদ হচ্ছে। একই জমিতে দীর্ঘ সময় ধরে শুধু ধানই আবাদ হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা খুবই স্বাভাবিক। মাটির উর্বরতা ধরে রাখার জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফসলের ধরন পরিবর্তন করা প্রয়োজন। জমিতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফসলের ধরন পরিবর্তনের নানামুখী উপকারিতা রয়েছে। এটি জমির আগাছা দমনে সহায়ক, পোকামাকড়ের আক্রমণ কমায়, ফসলের রোগবালাই কম হয়, সর্বোপরি ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। একইভাবে লিগিউম ফসল আবাদ করলে এটি বায়ুমণ্ডলস্থ নাইট্রোজেন মাটিতে আবদ্ধ করে, মাটির জৈব উপাদানের পরিমাণ ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির অভ্যন্তরীণ পুষ্টিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে। ফলে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য শস্যবৈচিত্র্য সব জায়গায় এখনো সমানভাবে হয়নি।
বাংলাদেশে যে ৩০টি এগ্রো-ইকোলজিক্যাল জোন রয়েছে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের ভিন্নতার জন্য আবহাওয়াগত এবং মাটির বৈশিষ্ট্যের যে তারতম্য রয়েছে সেজন্য চক্রাকারে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফসল পরিবর্তন করা কৃষকদের জন্য দুরূহ। উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অধিক লবণাক্তের দরুন রবি মৌসুমে তেমন ফসল হচ্ছে না। কৃষকরা খরিফ-২ মৌসুমে বর্ষার পানিকে কাজে লাগিয়ে শুধু আমন ধান রোপণ করেছে, যেটাকে লবণাক্ত মাটির প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একইভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের খরা, বন্যা ও পাহাড়ি এলাকায় মাটির বন্ধুরতাও দেশের শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির পথে অন্যতম বাধা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কৃষকরা যাতে বিভিন্ন ফসল নির্দিষ্ট সময় অন্তর চক্রাকারে আবাদের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে পারে তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হলে সেটি করতে হবে। তাছাড়া শস্য নিবিড়তা বাড়ানোসংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনায় লিগিউম-জাতীয় ফসলকে প্রাধান্য দিতে হবে।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের কম, যেখানে আদর্শ মাটিতে সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ পরিমাণ জৈব পদার্থ থাকা বাঞ্ছনীয়। কৃষকদের মধ্যে জৈব সার প্রয়োগের অনীহা প্রবল। এর অন্যতম কারণ হলো রাসায়নিক সার যত সহজে প্রয়োগ করা যায় তত সহজে জৈব সার প্রয়োগ করা যায় না। এটি প্রয়োগ অনেক শ্রম ও সময়সাপেক্ষ। কৃষক পর্যায়ে জৈব সার প্রয়োগের আগ্রহ বৃদ্ধি করা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু জৈব সারকে কৃষক পর্যায়ে রাসায়নিক সারের মতো সহজলভ্য করার জন্য যে পরিমাণ উদ্যোক্তা প্রয়োজন সে পরিমাণ উদ্যোক্তা তৈরি হয়নি। উন্নয়নবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে ‘সার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৯৯’ প্রণীত হলে বাণিজ্যিকভাবে অনেকে জৈব সার উৎপাদন ও বাজারজাতে আগ্রহী হয়, তার মধ্যে অন্নপূর্ণা জৈব সার অন্যতম। সারা উত্তরাঞ্চলে অন্নপূর্ণা জৈব সার প্রায় এক হাজার টন জৈব সার সরবরাহ করে। তাছাড়া বাংলাদেশের ফুড সেফটি নেটওয়ার্কের আওতায় পাঁচটি সংগঠন জৈব কৃষির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষে থেকেও নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্যোগগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) উৎপাদন এবং এর সম্প্রসারণ, সেনসি প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পূর্ণ জৈব সার ব্যবহার করে অর্গানিক সবজি উৎপাদন অন্যতম। আবার মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট তত্ত্বাবধানে বেসিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়োভিলেজের একটি মডেল তৈরি করা হয়েছে, যাতে গ্রাম পর্যায়ে কৃষকরা জৈব কৃষির প্রতি আগ্রহী হয়। এসব কার্যক্রমকে টেকসই করতে হলে গবেষণা কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা প্রয়োজন। সারা দেশে জৈব সার উৎপাদন ও বাজারজাত করার জন্য অধিকসংখ্যক উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে সরকারি আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন ফসল (ধইঞ্চা, কালোজিরা, কালাই ইত্যাদি) রয়েছে, যেগুলোর অবশিষ্টাংশ মাটিতে পচে সবুজ জৈব সার তৈরি হয়। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের ফসলের আবাদ বৃদ্ধি এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ যাতে কৃষকরা জমিতে রাখে সে ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
টেকসই মাটির উর্বরতার জন্য সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিতভাবে সার প্রয়োগ করলে কৃষকরা যে ফলন পায় তার থেকে ৩০-৪০ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সারের সুপারিশমালা অনুযায়ী সার প্রয়োগের প্রবণতা অনেক কম। ধানের তুলনায় আলু, ভুট্টা, গম ইত্যাদি ফসলে অনিয়ন্ত্রিত সার প্রয়োগের প্রবণতা আরো বেশি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ রাসায়নিক সারে একের অধিক পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকে। যেমন ডিএপি সারে নাইট্রোজেনের পাশাপাশি ফসফরাস ও টিএসপি সারে ফসফরাসের পাশাপাশি সালফার বিদ্যমান থাকে। কৃষকরা সাধারণত সার প্রয়োগের সময় সারের বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের অনুপাত বিবেচনা না করেই সার প্রয়োগ করে। তাছাড়া বাংলাদেশে কৃষকদের মধ্যে মাটি পরীক্ষা করার প্রবণতা খুবই কম। গবেষণায় দেখা গেছে, মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৯৪ শতাংশের কৃষকই তার জমির মাটি পরীক্ষা করেনি, যেটি ইঙ্গিত করছে যে বেশির ভাগ কৃষকই জানে না তার জমিতে কোন কোন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া কৃষকরা সারের সুপারিশের জন্য কৃষি অফিসে না গিয়ে সারের ডিলার কিংবা অভিজ্ঞ কৃষকের শরণাপন্ন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কৃষকরা সারের সঠিক সুপারিশ পাচ্ছে না।
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বড় কৃষকরা আর্থিক সচ্ছলতাকে কাজে লাগিয়ে অধিক সার প্রয়োগ করছে আবার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রে পরিমাণমতো সব সুপারিশকৃত সার প্রয়োগ করতে পারছে না। সুতরাং সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেটি মাটির উর্বরা শক্তিকে হ্রাস করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সারের সুপারিশমালা প্রণয়ন করছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল পাঁচ বছর পরপর এগ্রো-ইকোলজিক্যাল জোন অনুসারে সারের সুপারিশমালা নবায়ন করে। এ নবায়নকৃত সারের সুপারিশমালা কৃষকদের কাছে সহজভাবে উপস্থাপনা করতে হবে এবং কৃষকরা যাতে এটা অনুসরণে সার প্রয়োগ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। বেশি ফলন আর অর্থনৈতিক ফলনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অর্থনৈতিক ফলন সবসময় লাভজনক। সারের সুপারিশমালা সবসময় অর্থনৈতিক ফলনকে গুরুত্ব দিয়ে করা হয়। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ইউনিয়ন পর্যায়ে বুকলেট, লিফলেটসহ যেসব নির্দেশিকা প্রদান করেছে সে আলোকে সার প্রয়োগে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। ভালো হয় কৃষক পর্যায়ে স্বল্পমূল্যে মাটি পরীক্ষার কিটের বিস্তার ঘটানো, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকরা তাদের মাটি পরীক্ষা এবং সে অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে পারে। এজন্য কিট ব্যবহার প্রসঙ্গে কৃষকদের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট মাটি পরীক্ষার কিট উদ্ভাবন করেছে। তাছাড়া সারের ডিলারদেরও সারের সুপারিশসংক্রান্ত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে এবং তারা যেন ইচ্ছামতো সার বিক্রি করতে না পারে সেজন্য আইনের কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ভীতিকর। গবেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রক্রিয়ায় ২০৬০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান ফসলগুলোর ফলন ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সুপারিশকৃত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পণা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা গেলেই কেবল বৈশ্বিক পরিবর্তিত জলবায়ুর বিরূপ প্রক্রিয়া মোকাবেলা করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
মো. শফিকুল ইসলাম: পিএইচডি ফেলো, কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা





