মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে পৃথিবীর মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহে অবদান রেখে আসছে মাছ। বাংলাদেশের মৎস্য খাতে কভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও মৎস্য খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। এই মহামারী পরিস্থিতিতে এ অর্জন এক কথায় অসাধারণ। এটি অর্জন সম্ভব হয়েছে একটি শক্তিশালী ভিত্তি থাকার কারণে। দেশের ১১ শতাংশ কর্মসংস্থান হয় মৎস্য খাতে। প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। শুধু ইলিশ থেকেই জিডিপির ১ শতাংশ জোগান আসে। বর্তমানে সারা পৃথিবীর ৮৬ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। ফলে দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আর্থিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান অপরিসীম। সেখানে চাষকৃত মাছের অবদানটাই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে) মাছ চাষের গোড়াপত্তন করেন মৎস্য দপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. নাজির আহমেদ (১৯৪৭-৬০)। সাবেক পাকিস্তানে মাছ চাষে গতি বৃদ্ধির জন্য মাছের কৃত্রিম প্রজননের প্রচেষ্টা চলতে থাকে। মৎস্য দপ্তরের চাঁদপুর স্টেশনে ১৯৬৭ সালে রুইজাতীয় মাছের প্রথম সফল কৃত্রিম প্রজনন করেন ইউসুফ আলী। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে মৎস্য দপ্তরের প্রথম পরিচালক হন ইউসুফ আলী ১৯৭৫ সালে।

সাবেক পূর্ব পাকিস্তান মৎস্য দপ্তরের পরিচালক ড. নাজির আহমেদের লেখা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে দুই লাখ পুকুর, ২০ লাখ ১৯৩ হাজার ৪৫০ একর ধানি জমি, সাথে অসংখ্য নদীনালা, খালবিল, উপকূলীয় লবণাক্ত পানির এলাকা এবং বঙ্গোপসাগর। চাঁদপুরে স্থাপিত হয় মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং স্বাদু পানি মৎস্য উন্নয়ন কেন্দ্র। ১৯৭০-৭১ সালে দেশে স্বাদু পানির মাছ উত্পন্ন হয় প্রায় ২.১৪ লাখ টন এবং সামুদ্রিক মাছ ৪৫ হাজার টন (দ্য স্টেটম্যানস ইয়ারবুক ১৯৭০-৭১)। জলাভূমির হিসাব করলে দেখা যায় ষাটের দশকে আমাদের জলাভূমি ছিল ৬.৩ মিলিয়ন হেক্টর, ১৯৮৫ সালে ৫.৪ আর আশির দশকের শেষে ২.৮ মিলিয়ন হেক্টর (বিবিএস ১৯৮৯)। তবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের কারণে পলি জমে এ দেশের জলাধারের বিপন্নতা ঘটেছে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো মাছ ধরা হ্রাস, মাছের আবাসস্থল হ্রাস, মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়া, অধিক মাছ ধরার প্রয়াস, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, মাছের অভিপ্রয়াণ হ্রাস, সংযোগ খাল কমে যাওয়া, মৎস্য অবান্ধব স্লুইস গেট এবং অন্যান্য স্থাপনা ও স্টক বৃদ্ধির অপতুল প্রয়াস ইত্যাদি (এফএপি, ১৭, ১৯৯৫)।

সাধারণ জলাধারের পাশাপাশি বৃহত্তর যশোর এলাকার ৫৪৮৮ হেক্টর বাঁওড়, সিলেট এলাকার প্রায় ৩৭৩টি হাওড়ের জলায়তন কমে যাচ্ছে। নানা সংকটে আছে ৬৮,৮০০ হেক্টরের কাপ্তাই লেক। আতাউর রহমান (২০০৫) উল্লেখ করেছিলেন ২৬৫ প্রজাতির দেশীয় মাছের কথা। এর মাঝে অনেক বিলুপ্ত প্রায়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৎস্য অধিদপ্তর লেখকের উদ্যোগে স্বাদু পানির মাছের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। ওই অ্যালবামের মাছের ছবি সারা দেশ থেকে ৬০ জন কর্মকর্তার নেতৃত্বে সংগ্রহ করা হয়। এতে স্বাদু পানির মাত্র ২০১টি মাছ ও চিংড়ির ছবি সংগ্রহ সম্ভব হয়। অতএব অনেক মাছই আজ অবলুপ্ত। অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদন ১৯৭৪-৭৫ সালে ছিল ৮ লাখ ২২ হাজার টন, যা ১৯৮৪-৮৫ সালে ছিল ৫ লাখ ৭৭ হাজার টন এবং ২০১৭-১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ টনে। উৎপাদিত এ মাছের মধ্যে চাষের মাছের অবদান প্রায় ৫৬ দশমিক ২৪ শতাংশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে এলে মাত্র দুদিনের মধ্যেই গঠিত হয় মন্ত্রিসভা। বন, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় সৃষ্টি হয় ১২ জানুয়ারি ১৯৭২। সোহরাব হোসেন প্রথম এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন সৃষ্টি হয় ১৯৭২ সালে। ১৯৭৩ সালে সৃষ্টি হয় মেরিন ফিশারিজ একাডেমি। এপ্রিল ১৯৭৫-এ পুনর্গঠিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় মৎস্য অধিদপ্তর। ১৯৭৪ সালে কৃষির অবদান ছিল জিডিপির ৬০ শতাংশ। দেশে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতির জনকের দূরদর্শী পদক্ষেপে ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে দেশব্যাপী শুরু হয় ‘জাতীয় মৎস্য রক্ষা অভিযান’। স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৩ সালে এডিবির সাথে বাংলাদেশের প্রথম ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ সময় দ্বিতীয় কেবিনেটের মেয়াদে সরকার মাছ ও চিংড়ি রফতানির বিশেষ উদ্যোগ নেয়।

১৯৭২ সালেই বিশ্বব্যাংক অনেক কাজ শুরু করে, যা মাঝে ছিল অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কাপ্তাই লেক প্রজেক্ট ফরমুলেশন। এর মাঝে ১৯৭২ সালে ইএউ ৭২/০১৬ (১৯৭২) প্রকল্প শুরু হয়, যাতে ২ লাখ ২৪ হাজার ডলার অনুদান দেয় ইউএনডিপি। ১৯৭৩ সালেই আইডিএ আইডেন্টিফিকেশন মিশন কাজ শুরু করে এবং ১৯৭৫ সালে ক্রেডিট ৪০৯-বিডি নামে আইডিএ ঋণ ৭০ হাজার ডলার দিয়ে অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। কাপ্তাই লেক-১ প্রকল্প এবং অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৭৭-৭৮) ২১২.৯৫ মিলিয়ন টাকা নির্ধারণ করে রাখা হয় (বিশ্বব্যাংক অ্যাপরাইজাল রিপোর্ট ১৯৭৯)।

ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট স্কিমের অধীনে ১৯৭৪-৭৫ সালে বিল উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। একই অর্থবছরে আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে খামার উন্নয়নের কাজ হাতে নেয়া হয় এবং ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে ৬০ জন ইউনিট এক্সটেনশন অফিসার ও ২৫ জন খামার ব্যবস্থাপক নিয়োগ দিয়ে ইউনিসেফের সহযোগিতায় খামার উন্নয়ন শুরু হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ষাট থেকে সত্তরের দশকের ভেতর সরকারিভাবে প্রায় ১০১টি মৎস্যবীজ উৎপাদন খামার সারা দেশে স্থাপন করা হয়। সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের মধ্যে বেসরকারি খাতে অনেক মৎস্য খামার ও হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর পেছনে ছিল সরকারি উদ্যোগের চুইয়ে পড়া ফলাফল। সত্তরের শেষ দিকে ময়মনসিংহে মৎস্য অধিদপ্তরের অ্যাকোয়াকালচার এক্সপেরিমেন্ট স্টেশন প্রতিষ্ঠা করা হয় ডানিডার সহায়তায়। এ প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় আশির দশকের শেষ দিকে শুরু হয় ময়মনসিংহ মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্প। এর মাঝে ১৯৮৪ সালে এই স্টেশন মৎস্য অধিদপ্তর থেকে পৃথক হয়ে এফআরআই নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৮৬ সালে পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের রূপ লাভ করে। ১৯৭৮-এর মার্চ থেকে প্রথম এডিবি, ১৯৮৩ থেকে দ্বিতীয় এডিবি, ১৯৭৭ সাল থেকে মেঘনা-ধনাগদা সেচ প্রকল্প, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ডানিডার সহায়তায় নোয়াখালী ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, ১৯৭৯-৮৬ ওএলপি-১ প্রজেক্ট, উত্তরপশ্চিম মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাবে দেশব্যাপী ব্যাপক মৎস্য উৎপাদনে সাড়া পড়ে।

মৎস্য অধিদপ্তরের এসব প্রকল্পের প্রভাবে দেশব্যাপী বেশ কয়েকটি ‘জোন’ মাছ উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এর মাঝে ময়মনসিংহ, যশোর, নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর-কুমিল্লা উল্লেখযোগ্য। এরই মধ্যে প্রাইভেট সেক্টর এ উৎপাদনে গতি সঞ্চার করে। ময়মনসিংহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএফআরআইয়ের উপস্থিতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ১৯৭৬ সাল থেকে ব্র্যাক ফিশারিজ প্রোগ্রাম, ইক্লারম/ওয়ার্ল্ডফিশ, কেয়ার, কারিতাস, সিএনআরএস, প্রশিকা, আশা, সলিডারিডাড ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ অবস্থান থেকে অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। গরিবের খাবার পাঙাশ চাষে অগ্রণী ময়মনসিংহ অঞ্চল। দেশে সর্বপ্রথম সাজ্জাদ হোসেন ১৯৯১ সালে গাজীপুর হ্যাচারি থেকে পোনা নিয়ে ময়মনসিংহে ক্ষুদ্রাকারে পাঙাশ চাষাবাদ শুরু করেন। পরে ১৯৯২ সালে আল-ফালাহ গ্রুপের মাধ্যমে তিনি সরাসরি থাইল্যান্ড থেকে পোনা এনে পাঙাশ চাষ শুরু করেন। ধীরে ধীরে দেশব্যাপী শুরু হয় পাঙাশ, থাই কৈ, তেলাপিয়া, শিং, পাবদা, রুইজাতীয় মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির বাণিজ্যিক মাছ চাষ।

মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রভাবে ব্যক্তি খাতের বিকাশ ঘটে আশির দশকে। নোয়াখালীতে ১৯৮৮-৮৯ সালে নুরুল আলম যমুনা হ্যাচারি, মাসুদুল হক আল বারাকা হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করেন। যশোরের মহসীন মাস্টার সত্তরের দশকে যমুনা থেকে রেণু সংগ্রহ করে মাছ চাষ করতেন। পরে ১৯৮১-৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আধুনিক মৎস্য হ্যাচারি। প্রাথমিক সমস্যা তিনি কাটিয়ে ওঠেন কোটচাঁদপুর সরকারি হ্যাচারির বিশেষজ্ঞ এফ রাজের সহায়তায় ১৯৮২ সালে। পরে মহসীন সাহেবের ছেলে শেখ মেসবাহ হ্যাচারিটি সংস্কার-পুনর্নির্মাণ করে এর নাম রাখেন রুপালি হ্যাচারি। এছাড়া আব্দুস সালাম সরদার ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সরদার হ্যাচারি। এছাড়া শামসুল ইসলাম, রেজাউল হক, কামালুদ্দিন, ফিরোজ খান, সাইদুজ্জামান প্রমুখ আশির দশকে যশোরে হ্যাচারি স্থাপন করেন। ১৯৮৭ সালে মফিজ উদ্দিন ময়মনসিংহে শাপলা হ্যাচারি স্থাপন করেন। এরপর ধাপে ধাপে অনেকেই এগিয়ে আসেন। এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য গৌরীপুরের কপিল প্রসাদ চৌহান ঝলাক হ্যাচারি (১৯৮৯-৯০), সদরে ১৯৯০-৯১ সালে তৈয়ব আলী, মুকশেদ আলী ভাই ভাই হ্যাচারি স্থাপন করেন। ১৯৯৩ সালে আরেকজন সফল উদ্যোক্তা নুরুল হক ব্রহ্মপুত্র ফিশ সিড ফার্ম (হ্যাচারি) স্থাপন করেন। আতিকুর রহমান নামে একজন উদ্যোক্তা ১৯৮৮-৮৯ সালে আরেকটি হ্যাচারি সদরে স্থাপন করেন যা পরিত্যক্ত হয়। এছাড়া ১৯৮২-৮৩ সাল থেকে রীতিশ পণ্ডিত তার ভাই রাজীব পণ্ডিতসহ নার্সারি ব্যবসায় সফলকাম হন, তারা ১৯৯৫-৯৮ পর্যন্ত পরিচালনা করেন পদ্মা ফিশারিজ। পরে বিভিন্ন স্থাপনায় কাজ করে ২০০৪ সালে রীতিশ পণ্ডিত প্রতিষ্ঠা করেন রিলায়েন্স হ্যাচারি। ময়মনসিংহে এরপর ধাপে ধাপে অনেক সফলকাম উদ্যোক্তা হ্যাচারি ও নার্সারি ব্যবসায় জড়িত হয়েছেন। যেমন এগ্রো-৩-এর শামসুল আলম, রুপালি হ্যাচারির জাহাঙ্গীর, মুক্তাগাছার মফিজ উদ্দিনসহ আরো অনেক শিক্ষিত যুবক। দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৯২৬টি হ্যাচারি রয়েছে। এর মাঝে বেসরকারি ৮২৪টি। এসব বেসরকারি হ্যাচারি থেকে বছরে ৬,৭৪,৬৯৫ কেজি রেণু উৎপাদন হয় যা, মোট উৎপাদনের ৯৮ শতাংশেরও বেশি। সময় ও স্থানাভাবে এখানে সবার কথা উল্লেখ করা সম্ভব হলো না। 

চাষের মাধ্যমে মাছ উৎপাদন নিয়ে আলোচনার পর মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদন কেন বেড়েছে এবং করণীয় কী তা নিয়ে আলোকপাত করা হলো। একটি কারণ ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি যা আমরা সবাই উপলব্ধি করছি। এছাড়া মুক্ত জলাশয়ে পোনা ছেড়ে কৃত্রিম স্টক বাড়ানো একটি বড় কারণ। শুধু গত পাঁচ বছরে ৩৫৬০ টন পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে বিল নার্সারি কার্যক্রম। এরই মধ্যে ৩৯৬৭টি বিল নার্সারি স্থাপন ও পরিচালনা করা হয়েছে সারা দেশে। অভ্যন্তীরণ জলাশয়ে রয়েছে প্রায় ৪৩২টি অভয়াশ্রম। এর মাঝে ছযটি ইলিশ অভয়াশ্রম।

মুক্ত জলাশয়ে ২০১৩-১৪ সালে আহরণ ছিল ৭৩,৪৪৮ টন। ২০১৭-১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭,১১৯ টনে। নদীতে ধৃত মাছের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৩,২২৫ টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত আট বছরে দেশে মাছ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬%। সরকারের লক্ষ্য ২০২০-২১ সালে ৪.৫৫ মিলিয়ন টন মাছ উৎপাদন। আশা করি তা সফল হবে। আগামী দিনে মাছের এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে দরকার একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রণীত মৎস্য অধিদপ্তরের একটি মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে যা সুপরিকল্পিত। এটি অনুসরণে প্রোগ্রাম ও প্রজেক্ট গ্রহণ করা যায়।

তবে এত কিছুর পরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশের বেশি জোগান দিচ্ছে মাছ। তার পরও পুষ্টি উন্নয়নের অবস্থা কি ভালো? মোটেও তা নয়। দেশে পুষ্টিহীন লোকসংখ্যা ১৫ শতাংশের বেশি। ২০১৭ সালের হিসাবে খর্বকায় লোকের সংখ্যা ৩১%, ওজন কম ২২%, ১৫-১৯ বছর বয়সী কন্যাসন্তানের ৩১% অপুষ্টির শিকার, প্রি-স্কুল শিশুদের ভিটামিন ‘এ’র অভাব ২০.৫%, জিঙ্কের অভাব ৪৫%, পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের রক্তশূন্যতা ৪০%, প্রজননক্ষম নারীদের ৩৯.৯০% রক্তশূন্যতার শিকার।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে ক্রয়ক্ষমতার এবং সম্পদ পুনর্বণ্টনের বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতার। সেই সাথে উপযুক্ত প্রযুক্তির বিকাশের কথাও চলে আসে। মলা মাছ বা ছোট মাছ চাষের প্রযুক্তির বিকাশ আশানুরূপ নয়। বুকের দুধ দানকারী মায়েদের উপকারী একটি মাছ ফলি। এর চাষের কোনো উদ্যোগ নেই। দেশী ছোট মাছ সুরক্ষায় আরো মনোযোগী হওয়া দরকার। অভয়াশ্রম সুরক্ষা এবং নুতন নুতন স্থানে আরো মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন প্রয়োজন। জলমহাল ইজারার শর্তে বাধ্যতামূলকভাবে অভয়াশ্রম স্থাপন করার শর্ত যুক্ত করা দরকার। এছাড়া বিলের সাথে নদীর কনেক্টিভিটি স্থাপনের উপযুক্ত প্রকল্প অব্যাহত রাখা দরকার। আইপিএমের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পোকামাকড় দমন প্রয়োজন। কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেলের আদলে দেশব্যাপী কাজ করা দরকার। ইটিপি স্থাপনসহ শিল্প-বর্জ্য দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। নদী ক্যাপিটাল ড্রেজিং, খাল খনন, বিলের উপযুক্ত স্থানে অভয়াশ্রম স্থাপন—এসব কাজ অগ্রাধিকার দিয়ে করা দরকার। এছাড়া মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় ছোট মাছের অবমুক্তির প্রকল্প আবার নেয়া দরকার। বিল নার্সারিতে দেশীয় ছোট মাছের চাষ প্রযুক্তির বিকাশে গবেষণা প্রয়োজন। আমাদের মৎস্য গবেষণা ফসল খাতের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কারেন্ট জালসহ পরিবেশবিধ্বংসী জালের উৎপাদনসহ সব ব্যবহার বন্ধে আরো বরাদ্দ ও জনবল দরকার। মৎস্য অধিদপ্তরের জনবল একেবারেই অপ্রতুল। এর মাঝে রয়েছে অনুমোদিত বহু পদ শূন্য। বিশেষ বিসিএস দিয়ে হলেও এসব পদ পূরণ করা দরকার। এছাড়া নন-ক্যাডার পদে দ্রুত নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। ইলিশ রক্ষায় নির্দিষ্ট রাজস্ব বাজেটের অনুরূপ অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্য আইন বাস্তবায়নে বিশেষ বরাদ্দ কোড এবং রাজস্ব বাজেটে নির্দিষ্ট বরাদ্দ দরকার এবং মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের রেল ও অনুরূপ অন্যান্য খাতের কর্মকর্তাদের মতো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া দরকার।

মাছ চাষ ও অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদন স্থিতিশীল হলেও এ খাতে আগামীতে অনেক বিনিয়োগ আবশ্যক। এ খাতে ঋণপ্রবাহ একেবারেই অপ্রতুল। গরিবের মাছ পাঙাশ, থাই কৈ, তেলাপিয়ার উৎপাদন খরচ এবং ফার্ম গেট বিক্রয় মূল্য একেবারে কাছাকাছি। উৎপাদন খরচ কমাতে হলে দেশে সয়াবিন, ভুট্টার আবাদ বহুলাংশে বাড়ানো দরকার। যেসব আমদানি পণ্য মাছের খাবার তৈরিতে ব্যবহার হয় তাতে শূন্য শুল্কারোপ, ট্যাক্স হলিডে এসব অব্যাহত রাখতেই হবে। এছাড়া মাছ চাষের ও কৃত্রিম প্রজননের সব পণ্যে শূন্য শুল্ক প্রথা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের উৎপাদন ‘হাব’গুলোতে মাছ স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি সৃষ্টি জরুরি। বিএফডিসিকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটি কভিড-১৯-এর আপত্কালে মাছ পরিবহন ও বিপণনে বলতে গেলে কিছুই করতে পারেনি। সর্বোপরি বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা রাখতে সরকারকে অবশ্যই দৃশ্যমান সহায়তা করতে হবে। কারণ আগামী দিনে একটি স্বনির্ভর বেসরকারি খাতই মৎস্য খাতকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারে।

 

ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ: সাবেক মহাপরিচালক মৎস্য অধিদপ্তর