পটভূমি: ভূমি সংস্কারের বিষয়টি উৎপাদন সম্পর্ক ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ভূমি সংস্কারের প্রধান কাজ হলো প্রতিক্রিয়াশীল (অনুৎপাদনশীল) ভূস্বামী গোষ্ঠীর প্রাধান্যে সৃষ্ট ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে নতুন উত্পাদন সম্পর্ক ও সমাজ কাঠামো গঠন এবং উৎপাদনশীলতা ও উদ্বৃত্ত সৃষ্টির প্রয়াসে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হওয়া। এতদসত্বেও বাংলাদেশে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক কাঠামোর (কৃষি কাঠামোর) পরিবর্তনকে এড়িয়ে প্রযুক্তিমুখী উন্নয়নের কৌশল গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রযুক্তিনির্ভর এ উন্নয়ন কর্মনীতির কিছু পরিবর্তন সূচিত হয়। পাকিস্তান আমলের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো দূর করে কল্যাণমূলক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের আগ্রহ ব্যক্ত করা হয় বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার দলিলে। তবে ভূমি সংস্কারের মতো জরুরি কাজে তেমন কোনো গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি এ দলিলে। সরকার ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে গৃহীত জমির মালিকানার ঊর্ধ্বসীমা পরিবারপ্রতি ৩৩ একরে পুনর্বহাল করল এবং ৮ দশমিক ৩৩ একর পর্যন্ত জমির মালিকদের ভূমি রাজস্বের ক্ষেত্রে ছাড় প্রদান করল। ভূস্বামীদের হাত থেকে ছোট ও গরিব কৃষককে রক্ষা করার জন্য কোনো কার্যকরী ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হলো না। ফলে ১৯৫০ সালের আইনের মতো এবারো উদ্বৃত্ত জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি (আবু আবদুল্লাহ ১৯৭৬), যদিও প্রথমবারের মতো ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে খাসজমি বণ্টন ও গুচ্ছগ্রামের আওতায় সমবায়ের মাধ্যমে চাষাবাদের সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবনা ছিল।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের ঘোষণা দিল, কিন্তু তা বাস্তবায়নে কৃষি/পল্লী উন্নয়নের লক্ষ্যে ভূমি সংস্কারমুখী যথাযথ রূপরেখা প্রণয়ন করল না। অথচ সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির (আইআরডিপি) নামে আখতার হামিদ খানের কুমিল্লা কর্মসূচি (মডেল) সমগ্র বাংলাদেশে সম্প্রসারণ করা হলো। ফলে এ মডেলের চিহ্নিত ত্রুটিগুলো গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ল। অসাম্য, ভূমিহীনতা ও নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া সারা দেশে বিরাজমান থাকল। এমনকি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময়ে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে গরিব কৃষকদের রক্ষা করার ব্যবস্থা না রেখেই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে উল্লিখিত আর্থসামাজিক কর্মনীতি বাতিল হয়ে গেল। এ অবস্থায় সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের রূপরেখা প্রণয়নের আর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ক্ষমতায় এসে জিয়া সরকার স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে পল্লী উন্নয়নের প্রশ্নে এমনকি গণচীনের উদাহরণ পর্যন্ত টেনে আনে। বলা বাহুল্য, আর্থসামাজিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন না এনে এবং স্বেচ্ছাশ্রমের মানসিকতা সৃষ্টির কোনো প্রয়াস না নিয়ে এ ধরনের কর্মসূচিতে সমষ্টিগত শ্রমের ফল স্বভাবতই বড় উদ্বৃত্ত কৃষকের কাছেই চলে যায়। ফলে এ কর্মসূচি ভূমি সংস্কার ও আর্থসামাজিক মৌলিক পরিবর্তনকে এড়িয়ে স্বনির্ভরতার নামে কার্যত বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর হয়ে পড়ে।
১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার ক্ষমতায় এসে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি কার্যকরী করা অন্যতম কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করে। এ উদ্দেশ্যে যথাযথ সুপারিশ প্রণয়নের জন্য ভূমি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোর যথাযথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভূমি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করা সত্ত্বেও এ কমিটি জমির স্বল্পতার প্রশ্ন তুলে সিলিং নির্ধারণের মাধ্যমে জমি পুনর্বণ্টনের নীতিকে এড়িয়ে যায়। সুপারিশকৃত মজুরি দেয়ার কোনো ব্যবস্থা না রেখে, বর্গাদারদের নিরাপত্তা ও তাদের প্রাপ্য সুরাহা না করে, জমি রেকর্ড করার কাজ স্থগিত রেখে এবং সর্বোপরি জমির সিলিং না রাখার যুক্তি প্রদর্শন করে এ কমিটি শুধু ভূস্বামীর একচেটিয়া মালিকানাকেই স্বীকার করেনি, অধিকন্তু অধিক দক্ষতা, ন্যায়নীতি এবং জনকল্যাণকে বিসর্জন দিয়ে প্রচলিত শোষণমূলক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকিয়ে রাখতে প্রয়াসী হয়।
বাংলাদেশের কৃষিতে যেখানে ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় অসাম্য বিরাজমান সেখানে ভূস্বামীর অধিকার খর্ব না করে পল্লী উন্নয়ন কর্মনীতির প্রশ্ন বাতুলতা মাত্র। তাই বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন কর্মনীতির প্রশ্নে জমির ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ, জমি পুনর্বণ্টন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বর্গাচাষীর নিরাপত্তা বিধান ও তার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ভূমি সংস্কার সংক্রান্ত সমস্যার বাস্তবানুগ সমাধান কাম্য। এ সহজ সত্যটি এড়িয়ে গেছে এ দেশের বিভিন্ন সরকার। দাতা সংস্থার অর্থায়নে বিশ্ববাজার অর্থনীতির আওতায় কাঠামোগত সমন্বয় সাধন ও বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন কর্মনীতির দিকে সাম্প্রতিক সরকারগুলো ঝুঁকে পড়েছে। এ প্রক্রিয়ায় কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও পরিচালনায় অবাধ ব্যক্তি মালিকানা ব্যবস্থার প্রভাবে সমবায় ব্যবস্থা দুর্বলতর ও অনেকাংশে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে; আত্মকেন্দ্রিক চেতনাবোধ এবং বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোর নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া আরো দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আগের সরকারগুলো (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া সরকার) অবশ্য উৎপাদন ও জনকল্যাণের স্বার্থে কৃষকদের প্রযুক্তিগত উপকরণে ভর্তুকি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু ভূমি সংস্কার প্রশ্নে নীরবতার কারণে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রযুক্তিনির্ভর পথেই এসব উন্নয়ন কর্মনীতি অগ্রসরমাণ হবে বলে মনে হয়।
সাম্প্রতিককালে অবশ্য তৃণমূল পর্যায়ে কিছুসংখ্যক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ভূমি অধিকার প্রশ্নে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভূমির অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এনজিওদের ব্যর্থতা হলো, তারা শুধু চরের জমি সংক্রান্ত কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং সমগ্র বাংলাদেশে ভূমি সংস্কার ও অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তারা নীরব। উপরন্তু তারা তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিদেশী সাহায্য সংস্থার ওপর নির্ভরশীল এবং কোনোমতেই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়। পরনির্ভরশীল এ উন্নয়ন অংশীদারিত্বকে তাই কখনো অধিকার আদায়ে গণআন্দোলনের ধারা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
উপরিক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য দুটি: প্রথমত, বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনসমূহ এবং দরিদ্র কৃষক বিশেষত কৃষি মজুর ও বর্গা চাষীদের দরিদ্র অবস্থার বিশ্লেষণ এবং দ্বিতীয়ত, কৃষি কাঠামোতে পরিবর্তিত বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ও দরিদ্র জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে পুনর্বন্টনমূলক ভূমি সংস্কারের নতুন রূপরেখা প্রণয়ন।
২. কৃষি কাঠামোর সাম্প্রতিক পরিবর্তন ও কৃষকের দারিদ্র অবস্থার বিশ্লেষণ: উল্লিখিত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশে ভূমি সংস্কার কর্মসূচির ব্যর্থতার দরুন কৃষি কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন হয়নি বটে, তবে ঐতিহাসিক ধারায় সাম্প্রতিককালে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এ অনুচ্ছেদে সাম্প্রতিককালের এ পরিবর্তনগুলো এবং দরিদ্র কৃষক বিশেষত কৃষি মজুর ও বর্গাদারদের দরিদ্র অবস্থার বিশ্লেষণ করা হবে।
২.১ জমি: উৎপাদনের দুর্লভ উপকরণ: জমি বা ভূমি বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ। উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে জমি বাংলাদেশে খুবই দুর্লভ উপকরণ। সাম্প্রতিককালে অকৃষিকাজের মাত্রা অতি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ক্রমাগতভাবে চাষযোগ্য কৃষিজমি কমে আসছে। ১৯৯৬ সালের কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ একর অর্থাৎ শতকরা ১ ভাগ চাষযোগ্য জমি কৃষি খাত থেকে অন্য খাতে (যেমন নগরায়ণ, বাড়িঘর এবং অবকাঠামোর প্রয়োজনে) চলে যাচ্ছে। চাষযোগ্য জমির এ নেতিবাচক প্রভাবে এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধির (বৃদ্ধির হার কমে আসা সত্ত্বেও) কারণে মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে আসছে। ফলে ক্রমহ্রাসমান এ সীমিত সম্পদ কৃষিতে প্রবৃদ্ধি আনয়নের পথে এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা দিয়েছে।
২.২ ভূমি বণ্টন ব্যবস্থা ও কৃষি সম্পর্ক: বাংলাদেশে গ্রামীণ উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে মালিকানা অথবা স্বত্বাধিকারভিত্তিক ভূমি বণ্টন ব্যবস্থা একটি জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়। অনেক সময় বাংলাদেশকে ভূমি ও জনসংখ্যার প্রতিকূল অবস্থা সমন্বিত ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের দেশ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বিরাজমান ভূমি বণ্টন ব্যবস্থার প্রকট বৈষম্যকে গোপন রাখার অপপ্রয়াস চালানো হয়। এ সত্ত্বেও এটা সুস্পষ্ট, বৃহৎ ও মধ্য কৃষক সমন্বিত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী অধিকাংশ জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে বৈষম্যমূলক ভূমি ব্যবস্থাকে প্রকটিত করে দুর্দমনীয় এক অশুভ শক্তিরূপে প্রতিভাত হয় (জানুজি ও পিচ ১৯৮২)।
উৎপাদনক্ষম সম্পদ বিশেষ করে ভূমিসম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে এক ধরনের সামাজিক শক্তি সৃষ্টি হয়, যা বিভিন্ন শ্রেণীর কৃষকের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তবে উল্লেখ্য, ভূমি মালিকানা ও ভোগদখল সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে (অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে) জমির মালিকানা সংক্রান্ত তথ্যের অভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট, যদিও স্বত্বাধিকার সংক্রান্ত অনির্ভরযোগ্য তথ্য তত্কালীন কৃষি জরিপে পাওয়া যেত। এমনকি স্বাধীনতার পর অধিক ব্যবহূত ১৯৭৭/৭৮ সালের ভোগদখলী জরিপ এবং সাম্প্রতিককালের কৃষিশুমারি জরিপগুলোর (১৯৮৩/৮৪, ১৯৯৬, ২০০৫) তথ্যও ততটা নির্ভরশীল নয় (মাহবুব হোসেন ১৯৮১, বিমল কুমার সাহা ২০০১)। ফলে জমির মালিকানা এবং/অথবা ভোগদখল সংক্রান্ত তথ্যের যথার্থ বিশ্লেষণ খুবই দুরূহ।
১৯৭৭-৭৮ সালের ভোগদখলি জরিপ তথ্যে লক্ষ করা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জমির মালিকানা বণ্টন খুবই বৈষম্যমূলক এবং এ বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। এমনকি মাত্র দুই বছর সময়ের ব্যবধানেও এ ক্রমবর্ধমান বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছে (জানুজী ও পীচ ১৯৮২, পূর্বোক্ত)। উদাহরণস্বরূপ এ তথ্যে লক্ষ করা গেছে, ১৯৭৭ সালে পাঁচ একরের ঊর্ধ্বে শতকরা ৮ ভাগ পরিবারের মালিকানাধীন জমি শতকরা ৪৩ ভাগ থেকে বেড়ে ১৯৭৯ সালে দাঁড়ায় শতকরা ৪৬ ভাগে। অন্যদিকে একই সময়ে দুই একরের নিচে শতকরা ৭৫ ভাগ পরিবারের মালিকানাধীন জমি শতকরা ২৪ ভাগ থেকে শতকরা ২২ ভাগে নেমে আসে (জানুজী ও পীচ, পূর্বোক্ত)।
১৯৮৩-৮৪ এবং ১৯৯৬ সালের কৃষি শুমারির তথ্য অনুযায়ী ভূমিহীনতার মাত্রা ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। যদিও বসতবাড়ির জমি নেই এমন ভূমিহীনদের শতকরা হার কমে যাচ্ছে, অন্যান্য সব ধরনের ভূমিহীনতার মাত্রাই বেড়ে যাচ্ছে এবং বসতবাড়ির জমি আছে, অথচ চাষযোগ্য জমি নেই এমন ভূমিহীনদের শতকরা বৃদ্ধির হার সবচাইতে বেশি (প্রতি বছর শতকরা ৫ দশমিক ২৩ হারে)। ৫০ শতাংশ জমির মালিকদের কার্যত ভূমিহীন ধরলে ১৯৮৩-৮৪ সালে শতকরা ৫০ ভাগ গ্রামীণ পরিবার ভূমিহীন, যা ১৯৯৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় শতকরা ৬০ ভাগে (কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী) এবং ২০০৫ সালে বিআইডিএসের ৬৪ গ্রাম জরিপের তথ্যে দাঁড়ায় শতকরা প্রায় ৭২ ভাগে। একই ধারায় প্রায় ভূমিহীনতার (এক একর পর্যন্ত জমির মালিককে হিসাবে এনে) মাত্রা ১৯৮৩-৮৪ সালে শতকরা ৬৩ ভাগ থেকে বেড়ে ১৯৯৬ সালে শতকরা ৭২ ভাগে এবং ২০০৫ সালে শতকরা ৮২ ভাগে দাঁড়ায়। তথ্যের এ বিশ্লেষণ অবশ্যই বৈষম্যমূলক ভূমি বণ্টন ব্যবস্থায় ভূমিহীনতা ও প্রান্তিকতার মাত্রার উত্তরোত্তর দ্রুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জমির (মালিকানা/ভোগদখল) বণ্টন খুবই বৈষম্যমূলক এবং অনেক ক্ষেত্রে এ বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। জাতীয় কৃষি জরিপ ১৯৮৩-৮৪ এবং ১৯৯৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কৃষিতে সন্দেহাতীতভাবে ছোট খামারের প্রাধান্য বিরাজমান। ছোট কৃষকের এ প্রাধান্য অবশ্য ভূমি বণ্টন ব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্যকে গোপন করতে পারছে না। তথ্য বিশ্লেষণে আরো পরিলক্ষিত হয়, ছোট কৃষকদের বর্ধিত সংখ্যা আনুপাতিক হারে মালিকানা/ভোগদখলি জমির পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনুরূপভাবে, বড় কৃষকদের সংখ্যা হ্রাস জমির পরিমাণকে আনুপাতিক হারে কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বৈষম্যমূলক ভূমি বণ্টনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ১৯৮৩-৮৪ এবং ১৯৯৬ সালের কৃষি জরিপ তথ্যে লক্ষ করা যায় না। এই তথ্যের সঙ্গে যদি বিআইডিএসের ২০০৫ সালের ৬৪ গ্রাম জরিপ তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাবে বিআইডিএসের তথ্য অনুযায়ী জমি বণ্টনের অবস্থা অধিক বৈষম্যমূলক। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৬ সালের জাতীয় কৃষি জরিপের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, উপরের স্তরের (বড় ও মাঝারি কৃষক) শতকরা প্রায় ২০ ভাগ কৃষক শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ জমির মালিক যেখানে বিআইডিএস জরিপের তথ্য অনুযায়ী শতকরা প্রায় ৭ ভাগ কৃষক (বড় ও মাঝারি কৃষক) শতকরা প্রায় ৫২ ভাগ জমির মালিক। অর্থাৎ বিআইডিএসের ৬৪ গ্রামের জরিপ তথ্য জমি বণ্টনে বৈষম্যের উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রায় চার দশক (১৯৬০-৯৬) ধরে ব্যাপকভাবে ছোট ও প্রান্তিক খামারের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, বড় কৃষি খামার কমে আসছে এবং বড় কৃষি খামারের তুলনায় মাঝারি কৃষি খামার অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে গেছে। এখানে উল্লেখ্য, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার (সীমিত হলেও) এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় সব শ্রেণীর কৃষকের জন্য খামারের গড় আকার কমে আসছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভূমি বণ্টনের বৈষম্যকে টিকিয়ে রেখেই খামারের কাঠামোগত এসব পরিবর্তন ঘটছে।
২.৩ বর্গাদারি ব্যবস্থা এবং বর্গাদার ও মজুরদের দারিদ্র অবস্থা: স্বত্বাধিকারের প্রকৃতি ও বর্গাদারি ব্যবস্থা অনেকটাই ভূমি বণ্টন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ভোগদখলিস্বত্ব অনুযায়ী, জাতীয় কৃষিশুমারির ভূমি বণ্টন সংক্রান্ত তথ্যে প্রদর্শিত হয়েছে। এ থেকে পরিলক্ষিত হয়, ভোগদখলিস্বত্ব অনুযায়ী ভূমি বণ্টনে স্থিতাবস্থা বিরাজমান। কৃষি খামারের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ মালিক কৃষক, শতকরা ৪০ ভাগেরও কিছু কম মালিক-বর্গাদার এবং শতকরা ১ ভাগেরও কম ভূমিহীন-বর্গাদার হিসেবে পরিলক্ষিত হয়েছে। বর্গাদারদের মধ্যে অধিকাংশই মালিক-বর্গাদার, যারা নিজেদের জমি চাষ করেও খামার সম্পদের (পারিবারিক শ্রম, হালের বলদ, কৃষি যন্ত্র ইত্যাদি) সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য বর্গা জমিতে চাষাবাদ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০ সালে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ কৃষক উভয় ধরনের বর্গাদার (মালিক-বর্গাদার ও ভূমিহীন বর্গাদার) হিসেবে নিয়োজিত ছিল, ১৯৮৩-৮৪ সালে তা কমে শতকরা ৩৭ ভাগে এবং ১৯৯৬ সালে তা বেড়ে শতকরা প্রায় ৩৯ ভাগে দাঁড়ায়। এ থেকে আরো পরিলক্ষিত হয়, সব ধরনের স্বত্বাধিকারী কৃষকদের ক্ষেত্রে খামারের গড় আকার ক্রমে কমে আসছে এবং সব কৃষিশুমারিতেই (১৯৬০, ১৯৮৩-৮৪, ১৯৮৬) বর্গাদার (মালিক-বর্গাদার) কৃষকদের খামারের গড় আকার অন্যান্য কৃষকের তুলনায় বেশি।
বর্গাচাষের মাত্রা ও বর্গাচাষের বিভিন্ন ধরন সম্পর্কিত দীর্ঘকালীন তথ্য থেকে পরিলক্ষিত হয় যে, ১৯৬০-২০০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশকের অধিক কাল সময়ে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বর্গাচাষের মাত্রা (জমির শতকরা হারে) এবং বর্গাচাষের ধরনেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৬০ সালের কৃষি জরিপে শতকরা মাত্র ১৬ ভাগ জমি বর্গাচাষের অধীনে এবং ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পেয়ে বিআইডিএসের ২০০৫ সালের ৬৪ গ্রাম জরিপে শতকরা ৩৩ ভাগে এবং বায়েস ও মাহবুব হোসেনের ২০০৩-২০০৪ সালের সমগ্র বাংলাদেশের ৬২ গ্রাম জরিপ তথ্যে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া বর্গাদারির ধরন ভাগচাষ ব্যবস্থা থেকে কমে নির্দিষ্ট খাজনায় এবং/অথবা বন্ধকি ব্যবস্থার অধীনে বর্গাচাষের প্রবণতা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০ সালের কৃষি জরিপে বর্গাচাষকৃত জমির শতকরা ৯১ ভাগ জমি ভাগচাষের অধীনে ছিল, যা ক্রমে হ্রাস পেয়ে ২০০৩-০৪ সালে প্রায় ৬০ ভাগে নেমে আসে (যদিও বিআইডিএসের উল্লিখিত ২০০৫ সালের তথ্যে শতকরা ৬৮ ভাগ পরিলক্ষিত হয়েছে)। অন্যভাবে বলতে গেলে নির্দিষ্ট খাজনা ও বন্ধকিভিত্তিক বর্গাচাষের জমি ১৯৬০ সালের শতকরা ৯ ভাগ থেকে ২০০৩-০৪ সালে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগে উন্নীত হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা জরিপেও দেখা যায়, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারকারী অঞ্চলে বর্গাচাষের মাত্রার (বিশেষত নির্দিষ্ট খাজনায়) আধিক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে (মাহবুব হোসেন এবং অন্যান্য ১৯৯১, আব্দুল বায়েস ও মাহবুব হোসেন ২০০৭)। একদিকে মালিক কৃষকদের চাষাবাদ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে যাওয়ায় অনুপার্জিত আয়ের বৃদ্ধির এবং/অথবা প্রযুক্তি ব্যবহারে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা এবং অন্যদিকে বর্গাচাষীদের কর্মসংস্থানের বিকল্প সুযোগের অভাব এ পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা প্রদান করে। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এলাকায় বর্গাচাষের মাত্রার এ ধরনের বৃদ্ধি কৃষিতে উৎপাদনশীল ধনতন্ত্র বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট বাধা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ভাগচাষ এবং বর্গাপ্রথার অন্য সব চুক্তি মৌখিকভাবে হয়ে থাকে। লিখিত চুক্তির অনুপস্থিতিতে বর্গাদারদের বর্গাচাষের কোনো নিরাপত্তা থাকে না। জমির মালিক নিজ প্রয়োজনে যেকোনো অজুহাতে এবং অথবা কোনো ধরনের অজুহাত ছাড়াই যেকোনো সময়ে বর্গাদারদের উচ্ছেদ করতে পারে। বর্গাদারদের দৃষ্টিকোণ থেকে জনসংখ্যার অধিক চাপ, বেকারত্ব, অকৃষি খাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব ইত্যাদি কারণে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা জমি চাষ করতে বাধ্য হয়। জমিস্বল্পতার কারণেও অনেক সময় বর্গাদাররা জমির মালিকের ওপর অসহায়ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বর্গাদাররা বর্গাচাষে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে কৃষি শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত থাকতে হয়। এ নিগৃহীত অবস্থা থেকে নিজেদেও রক্ষা করার জন্য বর্গাদাররা তাদের উদ্বৃত্ত শ্রম মালিকদের জমিতে নিয়োজন করে এবং মালিকদেরকে উচ্চ হারে খাজনার আকারে উদ্বৃত্ত আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
আমাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়েছে, জমির মালিকের কাছে বর্গাদারের দায়বদ্ধতা অনেক কমে এসেছে এবং বর্তমানে শতকরা মাত্র ৫ ভাগ বর্গাচাষীর এ ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে, যেখানে মালিকের জমি এবং গৃহকাজে বর্গাচাষী নিজেদের শ্রম নিয়োজন করে থাকে (বিমল কুমার সাহা ও সাহাবউদ্দিন ২০০৬, পূর্বোক্ত)। কখনো কখনো মালিকের জমিতে বর্গাচাষীর আগাম শ্রম বিক্রি মালিকের শ্রম চাহিদা মেটানোর অনিশ্চয়তা দূর করে এবং মালিক চাষীর উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব করে থাকে, যদিও এক্ষেত্রে বর্গাচাষী তার অধিক কর্মসংস্থান ও মজুরির নিশ্চয়তা পান না (আতিক রহমান ও রিজওয়ানুল ইসলাম ১৯৮৮, বিমল কুমার সাহা ১৯৯৭)। ফলে শ্রম ও বর্গাচাষের এ ধরনের আন্তঃসংযোগ অনেক ক্ষেত্রে বর্গাচাষীর স্বার্থের বিনিময়ে জমির মালিককে লাভবান করে থাকে। তবে এ ধরনের আন্তঃসংযোগ খুব কমই ঘটে থাকে (আতিক রহমান ও রিজওয়ানুল ইসলাম ১৯৮৮, পূর্বোক্ত, এম এম আকাশ ১৯৮৯, এম এ তসলিম ১৯৮৮) এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে জমির মালিক শ্রম ব্যবহারের ক্ষেত্রে মজুরি ও পারিবারিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
বৈষম্যমূলক জমি বণ্টন ব্যবস্থার দরুন অনেকাংশেই জমির মালিক শ্রম নিয়োজনের ব্যাপারে একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যায়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি মজুরদের দরকষাকষির কোনো সুযোগ থাকে না, যদিও তারা অনেক সময়ই নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করে থাকে (বিমল কুমার সাহা ও কাজী সাহাবউদ্দিন ২০০৬, পূর্বোক্ত)। উদ্বৃত্ত শ্রম সরবরাহের কারণে এবং সব সময় কর্মহীন থাকার ভয়ে তারা কখনো জমির মালিকের সঙ্গে দরকষাকষির কথা ভাবতে পারে না। ভূমিহীনতা এবং বেকারত্ব ও অর্ধ বেকারত্বের হার কিছুটা কমে আসার পরও উচ্চ হারে বজায় থাকার ১৫ কারণে প্রায়ই প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির কোনো প্রবণতা থাকে না (রিজওয়ানুল ইসলাম-আতিক রহমান ২০০৬, পূর্বোক্ত)। দরিদ্র কৃষি মজুরদের বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ না থাকায় তাদের জীবনমানের গুণগত উন্নতির তেমন কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না (বিমল কুমার সাহা ও কাজী সাহাবউদ্দিন ২০০৬, পূর্বোক্ত)।
২.৪. কৃষি সম্পর্ক ও উৎপাদনশীলতা: উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মালিক চাষী এবং বর্গাচাষীর আপেক্ষিক উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার প্রশ্ন এখন সরাসরি চলে আসতে পারে। মালিক চাষী এবং বর্গাচাষীর মধ্যে স্বত্বাধিকারী শ্রেণী অধিক উৎপাদনশীল, এ সম্পর্কে দীর্ঘকালব্যাপী অনেক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু ফলাফল পদ্ধতিগতভাবে অর্থবহ এবং সুস্পষ্ট নয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী পর্যবেক্ষণ লক্ষ করা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাগচাষীর অধিক উৎপাদনশীলতার ফলাফলে ভাগচাষ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ন্যায়সংগত হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে (এম রকিবুজ্জামান ১৯৭৩)। বস্তুতপক্ষে বর্গাচাষীর এ অধিক উৎপাদনশীলতা (যদি তা আদৌ হয়ে থাকে) গরিব ও নিঃস্ব চাষীর দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই এ উৎপাদনশীলতার প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা দাবি অযৌক্তিক এবং নির্মমতারই বহিঃপ্রকাশ। ইদানীং অনেক গবেষণায় (মাহবুব হোসেন ১৯৮১, বিমল কুমার সাহা ১৯৯৭, সাজ্জাদ জহির এবং বিনায়ক সেন ১৯৯৯) অবশ্য বর্গাচাষীদের তুলনায় মালিক চাষীদের অধিক উৎপাদনশীলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। যদি সঠিকভাবে উৎপাদনকে বিশ্লেষণের জন্য একই স্বত্বাধিকার শ্রেণীর চাষীর নিজের জমি ও বর্গা জমির তুলনামূলক উৎপাদনশীলতা পরীক্ষা করা হয়, তবে স্বভাবতই বর্গাচাষের চেয়ে মালিকানাভিত্তিক চাষ অধিক উৎপাদনশীল হবে। উল্লিখিত এ গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে মালিকানাভিত্তিক চাষের ক্ষেত্রে অধিক উৎপাদনশীলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ফলাফলের যথার্থতা এই যে, বর্গাদারদের যদি মালিকানা স্বত্ব দেয়া হয় তবে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
বর্গাদারি ব্যবস্থার পরিবর্তনের (ভাগচাষ থেকে নির্দিষ্ট খাজনায় চুক্তিভিত্তিক বর্গাচাষ) ফলে বর্গাচাষী কৃষিতে অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে উপকৃত হবে, এমনটি অনুমান করা হয় (মাহবুব হোসেন ২০০০)। কিন্তু এ অনুমানের তথ্যভিত্তিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, পরিবর্তিত বর্গা ব্যবস্থার অধীনে বর্গাদারের বিনিয়োগে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। নির্দিষ্ট খাজনার অধীনে বর্গাচাষীর উৎপাদনশীলতা জমির মালিকের উৎপাদনশীলতা থেকে অনেক কম। এমনকি নির্দিষ্ট খাজনায় বর্গাচাষীর উৎপাদনশীলতা ভাগচাষীর চেয়ে অধিক হলেও (যেমনটি সাজ্জাদ জহির ও বিনায়ক সেন, ১৯৯৯-এ প্রদর্শিত) তা সমগ্র অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারবে না। কারণ চাষকৃত জমির ক্ষুদ্র অংশ (শতকরা ১০-১৫ ভাগ) নির্দিষ্ট খাজনাভিত্তিক বর্গাচাষের অধীনে আনা হয়েছে, যা বহুলাংশে আমন অথবা বোরো মৌসুমে সীমিত ও কার্যত ফসলের বহুমুখিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। তাছাড়া এ ধরনের বর্গাচাষে সম্পূর্ণ ঝুঁকি বর্গাচাষীকে বহন করতে হয় এবং জমির মালিককে খাজনার টাকা আগাম প্রদান করতে হয় বিধায় পরবর্তী উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে সফলতা প্রদর্শনে বর্গাচাষী বাধাগ্রস্ত হন।
উল্লিখিত বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট, অতিরিক্ত খাজনার বোঝার দরুন কৃষক উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে উৎসাহী হচ্ছেন না। ভূমি সংস্কার খাজনার এ বোঝা সরিয়ে ফেলে কৃষকের বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে তার মুক্তির পথ প্রশস্ত করে, যা পরবর্তী অনুচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
৩. কৃষি কাঠামোয় পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ভূমি সংস্কারের রূপরেখা: আমাদের পূর্বের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট, ভূমি সংস্কার কর্মসূচির অকার্যকারিতার দরুন কৃষিতে শ্রেণী বিন্যাস ও উৎপাদন সম্পর্কের বিষয়গুলো অপরিবর্তিত থাকেনি। বরং সাম্প্রতিককালে কৃষি কাঠামোয় অন্তত দুটি উল্লেখযোগ্য (যদিও অপরিকল্পিত) পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। প্রথমত, ভূমিহীনতা ও নিঃস্বকরণের মাত্রা ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ভূমি বণ্টনে এক চরম বৈষম্যমূলক অবস্থায় অবতরণ; দ্বিতীয়ত, ক্রমবর্ধমান হারে বর্গাচাষের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে এখন অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় অবস্থান গ্রহণ। আমাদের পূর্বের আলোচনায় এটা পরিলক্ষিত হয়েছে যে, উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদনশীলতা বিকাশের ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত এ পরিবর্তনগুলো প্রচণ্ড এক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে; তাই প্রতিরোধের সৃষ্টিশীল প্রয়াস একান্তভাবে কাম্য।
এ অনুচ্ছেদে ভূমি সংস্কারের নতুন রূপরেখার তাত্ত্বিক এবং বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায়োগিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হবে।
৩.১ ভূমি সংস্কারের নতুন রূপরেখা: তাত্ত্বিক বিষয়গুলো কৃষি/পল্লী উন্নয়নের কর্মকৌশল হিসেবে ভূমি সংস্কারের কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য ও বিতর্ক রয়েছে। ভূমি সংস্কার কর্মসূচি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা নেয়ার জন্য বিতর্কের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো প্রথমে নিম্নে অবতারণা করা হলো।
বাংলাদেশে গ্রামীণ জীবনে ক্ষমতা কাঠামোর ভিত্তি হলো ভূমি বা জমি। সাম্প্রতিককালে ক্ষমতা ও আয়ের উৎস হিসেবে ভূমির গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে আসা সত্ত্বেও ভূমি বা জমিই গ্রামের ক্ষমতা কাঠামোর ভিত্তি এবং নতুন উপাদানগুলো (যেমন কৃষিপ্রযুক্তি, অকৃষি খাতের সম্প্রসারণ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, রাজনৈতিক সংযোগ এবং নগরায়ণ ইত্যাদি) এখনো ক্ষমতা কাঠামোর মুখ্য উপাদান ভূমির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
জমিকে কেন্দ্র করে তার মালিকানা, ভোগ বা ব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে ওঠে ভূমি সম্পর্ক। ক্ষমতা কাঠামোয় যখন এ ভূমি সম্পর্ক শোষণমূলক ও আধিপত্য বিস্তারকারী হয়ে ওঠে এবং উৎপাদনশক্তি বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, তখনই এ সম্পর্ক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। ভূমি সংস্কারের মৌলিক কাজই হলো জমি এবং উৎপাদনের অপরাপর উপকরণের মালিকানা ও ব্যবহারের ভিত্তিতে কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক বিদ্যমান, তার মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শোষণ ও আধিপত্যের হাত থেকে দরিদ্র কৃষকের মুক্তির পথকে প্রশস্ত করা।
উল্লিখিত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট, ভূমি সংস্কারের দুটি মৌলিক দিক রয়েছে। প্রথমত, ভূমি সংস্কার অনুৎপাদনশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল ভূস্বামী অভিজাত গোষ্ঠীর প্রাধান্যে সৃষ্ট ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে নতুন ভূমি সম্পর্ক ও সমাজ কাঠামো গঠন করবে। দ্বিতীয়ত, ভূমি সংস্কার প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার বিকাশ সাধন করবে। অর্থাৎ ভূমি সংস্কার প্রথমত প্রতিক্রিয়ার ভিতকে ভেঙে নতুন ভূমিসম্পর্ক গড়ে তুলবে। এ নতুন সম্পর্ক কৃষকদেরকে নিজেদের পরিশ্রমের ফল নিজেদের ভোগ করার নিশ্চয়তা দেবে। এ নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করেই প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রয়াসী হবে কষকরা। এভাবে ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি উৎপাদনশীলতা ও উদ্বৃত্ত সৃষ্টির প্রয়াসী হবে কৃষকরা। এভাবে ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি উৎপাদনশীলতা ও উদ্বৃত্ত সৃষ্টির জন্য অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হবে। এখানে উল্লেখ্য, ভূমি সংস্কার হলেই উৎপাদনশক্তির বিকাশ আপনা আপনি ঘটবে না। ভূমি সংস্কারের পরও প্রযুক্তি পরিবর্তনের প্রয়াস নিতে হবে। ভূমি সংস্কার বা উৎপাদন সম্পর্ক যেমন প্রযুক্তি ব্যবহারকে প্রভাবিত করে, প্রযুক্তি ব্যবহারও তেমনি উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তাই এ দুই বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে নয় বরং পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল করে অথবা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে কৃষি/পল্লী উন্নয়নের কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষি খাতের বিকাশকে শিল্প ও অন্যান্য খাতের বিকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। ভূমি সংস্কার ছাড়াই যদি শিল্প বিকাশের প্রধান সমস্যাগুলো (যেমন শিল্প দ্রব্যের চাহিদা সংকট, কৃষি থেকে সরবরাহকৃত মজুরি দ্রব্যের বাধা) দূর করা যায়, তাহলে শিল্প বুর্জোয়ার কাছে এটাই হবে কাঙ্ক্ষিত পথ। কারণ এতে ভূস্বামীর সঙ্গে শিল্পপতির কোনো সংঘাত হবে না। নতুন। প্রযুক্তি সংবলিত ‘সবুজ বিপ্লবের পথ’ শিল্প বুর্জোয়ার জন্য সেই সম্ভাবনা নিয়ে এল। কিন্তু নিবিড় গবেষণার ফলাফলে দেখা গেল, তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় যথোপযুক্তভাবে বৃদ্ধি করতে পারল না এবং ফলে শিল্পপতির ‘মজুরি দ্রব্যের বাধা’ এবং চাহিদা সংকট’-এর সমাধান অপূর্ণ থেকে গেল (সুখময় চক্রবর্তী ১৯৭৯)। ভূমি সংস্কারের পথকে এড়িয়ে প্রযুক্তি প্রয়োগের পথ যে অর্থনৈতিক উন্নয়নে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারে না, এ গবেষণা তারই ইঙ্গিত বহন করে। ফলে বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর পক্ষেও সব সময় ভূমি সংস্কারের যৌক্তিকতা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
ভূমি সংস্কার প্রাথমিকভাবে শ্রেণীবৈষম্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কার ছাড়া এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। পুনর্বণ্টনকামী ভূমি সংস্কারে বড় ভূমি মালিকদের কাছ থেকে নির্ধারিত সীমার উপরে যে ‘উদ্বৃত্ত’ জমি রয়েছে, রাষ্ট্র তা অধিগ্রহণ করে ভূমিহীন বা দরিদ্র কৃষকদের মাঝে বিলি করে। ক্ষুদ্র জোত অধিক পরিমাণ কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের নিশ্চয়তা দিতে পারে বলে অনেক সময় পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কারের নীতিকে গ্রহণ করা হয়। এভাবে যারা জমি পায় তাদের উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে উৎপাদনশীল পুঁজির সঞ্চালনও বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের প্রক্রিয়াকে নিচের দিক থেকে ঘটা ধনতান্ত্রিক রূপান্তর বলা চলে। এ প্রক্রিয়ার আরেকটি দিক হলো, জমি হারানোর ফলে বড় ভূমি মালিকদের পক্ষে মহাজনি ও ফটকা ব্যবসায়ে পুঁজি খাটানোর ক্ষমতাও সেই অনুপাতে কমে যায়। অর্থাৎ পুনর্বণ্টনকামী ভূমি সংস্কারের ফলে একদিকে অনুৎপাদনশীল পুঁজি সম্প্রসারণের সুযোগও কমে আসে এবং অন্যদিকে উৎপাদনশীল পুঁজির সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, ফলে কৃষি অর্থনীতি গতিশীল হয়ে ওঠে।
উৎপাদনে দক্ষতা এবং বণ্টনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনবিদিত, যদিও জমির স্বল্পতা, ক্ষুদ্র জোরে টিকে থাকার অক্ষমতা এবং সংস্কারনীতির বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবহেতু এ ধরনের বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কারকে প্রায়ই কাল্পনিক কর্মসূচি হিসেবে গণ্য করা হয়। ভূমি সংস্কারের পথে এ ধরনের বাধাগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কারের পরিবর্তে বর্গাদারি সংস্কার ও প্রশাসনিক সংস্কারের সমর্থনে অনেক ক্ষেত্রে যুক্তি প্রদর্শন করা হয়। বলা বাহুল্য, ভূমি পুনর্বণ্টনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতিরেকে বর্গাদারি ও প্রশাসনিক সংস্কার কার্যকর করা দুঃসাধ্য। কারণ বর্গাদারি ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো ভূমি বণ্টনের বৈষম্য থেকেই উদ্ভূত। তাই ভূমি বণ্টনমূলক সমস্যাকে এড়িয়ে বর্গাদারি ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাব অযৌক্তিক।
ভূমি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পক্ষে বড় বাধা হিসেবে দুটি যুক্তি প্রায়ই দেখানো হয়। প্রথমত, বণ্টন করার মতো যথেষ্ট জমি পাওয়া যাবে না; ফলে জমি পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে কৃষকদের উপকৃত হওয়ার সুযোগ থাকবে খুবই কম। দ্বিতীয়ত, আর্থিক বাধার কারণে ছোট কৃষক নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম হবে না। ফলে পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত জমিতে কৃষকদের উৎপাদন ক্ষমতা কমে আসবে এবং সবশেষে ভূমি পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
অসংখ্য কৃষকের তুলনায় উদ্বৃত্ত জমির পরিমাণ খুবই কম হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানে মনে রাখা দরকার, ‘জনসংখ্যার তুলনায় জমি যেখানে অল্প, সেখানে পুঁজিবাদী কৃষি ব্যবস্থার ধ্বংসাত্মক পরিণামের বিরুদ্ধে ছোট কৃষকের স্বত্ব স্বীকার ও রক্ষা আসলেই প্রগতির সহায়ক।’ তাই পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে কী পরিমাণ জমি কত সংখ্যক কৃষককে দেয়া যাবে, সেটি বড় কথা নয়। আসল কথা হলো, তাতে গ্রামে কায়েমি স্বার্থের উচ্ছেদ হবে এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোতের মালিকরা হবে উন্নয়ন সম্পদের অধিকারী। তাদের সৃষ্টিশীল প্রয়াস স্বল্প জমিতেও উৎপাদনের কাজে সহায়তা করবে এবং সামাজিক স্বাধীনতা লাভ করবে তারা। এ প্রক্রিয়ায় কার্যত গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ ঘটবে এবং অর্থনীতিতে সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে (রেহমান সোবহান ১৯৯৩)। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এ অসমাপ্ত কাজের জন্য যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো সুসংগঠিত কৃষক আন্দোলন। আইন যদি পাসও হয়, আমলাতন্ত্র তাকে কার্যকর করবে না যতদিন পর্যন্ত সামন্ত প্রভুঘেঁষা প্রতিক্রিয়াশীলদের কবল থেকে মুক্ত করে কৃষিকে আগাগোড়া না সাজানো যাবে (ভবানী সেন ১৯৮৪)।
অর্থনীতিবিদের মধ্যে অনেকেই (যেমন ভারতীয় কৃষি অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বি এস মিনহাস ১৯৭৪, ভি এস দান্দের এবং এন কে রাথ ১৯৭১ এবং বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে জানুজি এবং পিচ ১৯৭৯) ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিতরণযোগ্য জমির হিসাব করেছেন। এ হিসাবগুলো নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছে, জমির ঊর্ধ্বসীমা খুব নিচে নামিয়ে এনেও কৃষকদেও যথেষ্ট পরিমাণে জমি দেয়া যাবে না, যাতে করে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে। এ পর্যবেক্ষণের বাস্তবতা স্বীকার করেও এ কথা মনে রাখা দরকার যে, গণতান্ত্রিক বিপ্লব বড় জোতের অবসান ঘটিয়ে নিঃস্ব কৃষকের নিরাপত্তা বিধান করে এবং তার সৃষ্টিশীল ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ক্ষুদে ব্যক্তিচাষ তাকে স্বাবলম্বী করে না বটে, কিন্তু ব্যক্তি চাষের বাস্তব অলাভজনক অবস্থা তাকে দ্রুত সমবায়মুখী এবং তা থেকে যৌথ খামারমুখী করে তুলতে পারে (রতন খাসনবিশ ১৯৮৬)। এ কথার অর্থ এই নয় যে, কৃষকদের মধ্যে সমবায় অথবা যৌথ খামারমুখিতা আপনা আপনি গড়ে উঠবে। আসলে এ প্রবণতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মুনাফালোভী কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠতে হবে। বলা বাহুল্য, জমিতে কৃষকের ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা তথা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তাকে সমবায়/যৌথ খামারমুখী করে গড়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল প্রক্রিয়া।
আমাদের মতে, দীর্ঘকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাপক ভূমি পুনর্বণ্টনকে সমবায়/যৌথ পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করে শ্রম ও প্রযুক্তিগত উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির হারকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়া সম্ভব। কৃষির উৎপাদনশীলতাকে উৎপাদন সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু প্রযুক্তিগত প্রশ্ন তুলে কৃষি প্রশ্নকে যান্ত্রিকতার দিকে ঠেলে দেয়া ঠিক নয়। এক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হলো, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কৃষকদের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং একচেটিয়া ভূমি মালিকানা থেকে উদ্ভূত শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসানের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
উপরন্তু, ভূমি সংস্কার প্রত্যয়টি সামগ্রিক উৎপাদন ও বাজার সম্পর্কের আলোকে দেখা উচিত। এ কারণে উন্নয়নশীল কৃষি সমাজের জন্য উদ্বৃত্তের ধারণা একটি যুক্তিসংগত চিন্তা হিসেবে গণ্য হতে পারে। দ্বান্দ্বিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দুটি পরস্পরবিরোধী কৌশল (দরিদ্র কৃষক ও কৃষি মজুরদের টিকে থাকার কৌশল এবং ভূস্বামী-পুঁজিপতি-ব্যবসায়ী-মহাজনদের উদ্বৃত্ত আহরণ কৌশল) পরিলক্ষিত হয়, যা একটি সুনির্দিষ্ট আর্থসামাজিক ব্যবস্থা নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক চলকগুলোর (প্রবৃদ্ধি, আয়-বণ্টন, কর্মসংস্থান) ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি অনুন্নত, অনুৎপাদনশীল ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে অন্য একটি উন্নত, সুসংহত ও উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পৌঁছানো যায়। ভূমি সংস্কার এ অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পরিবর্তনের জন্য অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে।
৩.২ বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভূমি সংস্কারের রূপরেখা: ভূমি বণ্টনে বৈষম্য দূর করে উৎপাদনশীলতার বিকাশ ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা তত্ত্বগত এবং নীতিগতভাবে পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন করেছি। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ তাত্ত্বিক অবস্থানের যৌক্তিকতা কতটুকু এবং তার বাস্তবায়নের ধরনটাই বা কেমন হবে? এ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর খুঁজতে আমরা প্রয়াসী হব।
পুনর্বণ্টনমূলক রূপরেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বণ্টনকৃত জমি কম হলেও যত বেশি সংখ্যক সম্ভব ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন করতে হবে, তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং তাদের সৃষ্টিশীল প্রয়াস উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত হতে হবে। এক্ষেত্রে যা করণীয় তা হলো পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কার কর্মসূচি একক এবং বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়নের প্রয়াসী না হয়ে এ কর্মসূচির সঙ্গে অন্যান্য কার্যক্রম (যেমন বর্গাদারি ও প্রশাসনিক সংস্কার, সমবায় ও কৃষক আন্দোলন সংক্রান্ত কার্যক্রম) যুগপত্ভাবে কার্যকরী করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। যেহেতু এ ধরনের ভূমি সংস্কার বড় জোতের স্বার্থকে সরাসরি আঘাত করা হয়, সেহেতু এ প্রভাবশালী শ্রেণী স্বাভাবিকভাবে এ কার্যক্রমের বিরোধিতা করবে। এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সমর্থনও তারা পাবে। এক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে অসংখ্য শোষিত মানুষের সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের কথা ভাবতে হবে এবং নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় কীভাবে এ আন্দোলন দরিদ্র জনগণের স্বার্থ রক্ষায় জাতীয় আন্দোলনের রূপ দেয়া যায় তার জন্য উদ্যোগী হতে হবে।
পুনর্বণ্টনমূলক উল্লিখিত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যগত বিশ্লেষণ দরকার। অধিক পরিমাণে জমি অধিক সংখ্যক ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টনের জন্য এবং বড় জোতের প্রভাব বলয় থেকে তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য জমি মালিকানার সিলিং ৭ দশমিক ৫০ একরে নির্ধারণ করে জাতীয় কৃষি জরিপ ১৯৮৩-৮৪ এবং ১৯৯৬-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হিসাবকৃত উদ্বৃত্ত জমি বণ্টন প্রক্রিয়া আমাদের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে (বিমল কুমার সাহা, ২০০৭)। এতে দেখা যাচ্ছে, মালিকানা জমির মাত্র শতকরা ৫ ভাগ জমি উদ্বৃত্ত হিসেবে ঘোষিত হতে পারে। উদ্বৃত্ত জমি বণ্টন প্রক্রিয়ায় আনুমানিক শতকরা ২ ভাগ বড় কৃষকের ওপর আঘাত আসবে এবং শতকরা ৭৬ ভাগ ভূমিহীন ও গরিব কৃষক উপকৃত হবে। অর্থাৎ ভূমি বণ্টনের সিলিং আইনের বাস্তবায়ন হলে অতি অল্প সংখ্যক বড় কৃষকের স্বার্থের বিনিময়ে অসংখ্য ভূমিহীন ও গরিব কৃষক উপকৃত হবে।
ভূমি বণ্টন প্রক্রিয়ায় অধিক সংখ্যক গরিব কৃষক উপকৃত হলেও উদ্বৃত্ত জমি পাওয়া যাবে খুবই কম। এক্ষেত্রে বর্গাজমির অধীনে অনুপস্থিত মালিকাধীন ও গরিব বর্গাচাষীর মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা নেয়া হলে শতকরা প্রায় ১০ ভাগ জমি গরিব চাষীদের মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে যদি খাসজমি (আবুল বারকত ও অন্যান্য ২০০১-এর হিসাব অনুযায়ী ৩৩ লাখ একর খাসজমি) গরিব চাষীদের (১ দশমিক ৫ একর পর্যন্ত জমির মালিক) মধ্যে সমভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা নেয়া হয়, তবে উপকৃত চাষীদের খামারের গড় আয়তন (নিজ জমিসহ) প্রায় এক একরের মতো হবে। এভাবে প্রাপ্ত জমি সমবায়ের মাধ্যমে চাষাবাদের ব্যবস্থা হলে (আমাদের তাত্ত্বিক রূপরেখার আলোকে) গরিব কৃষক টিকে থাকতে সক্ষম হবে এবং তারা উচ্চতর পর্যায়ের মালিকানা স্তরে উন্নীত হয়ে উৎপাদনের সামাজিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় উৎপাদনের ক্ষুদ্র এককের সমূহ সমস্যার বেড়াজাল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম হবে। কৃষিতে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের যৌথ উদ্যোগের এ ধারা অনুৎপাদক শ্রেণীর উদ্বৃত্ত আহরণের প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়নে সহায়ক হবে।
মনে রাখতে হবে, তত্ত্বগত এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে উল্লিখিত পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কার শেষ বিবেচনায় উৎপাদন সম্পর্ক ও বণ্টন ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের বিষয়, যার রূপরেখা এবং গতিধারা অনেকাংশেই নির্ভর করে গ্রামাঞ্চলের ভূমিহীন, গরিব চাষী ও অসংখ্য গণমানুষের সচেতনতা, সংগঠিত শক্তি ও আন্দোলনের ওপর। আর্থসামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাই বিষয়টি হলো শ্রেণী সংগ্রামের বিষয়, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে সেই শ্রেণী বা গোষ্ঠী যারা উল্লিখিত কার্যক্রম বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।
উপসংহার: এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোর সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ বিশ্লেষণের আলোকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে আমরা পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কার কর্মসূচির নতুন রূপরেখা প্রণয়নে প্রয়াসী হয়েছি। আমাদের পূর্বের আলোচনায় এটা স্পষ্ট, দীর্ঘকাল ভূমি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে কৃষিতে শ্রেণীবিন্যাস ও উৎপাদন সম্পর্কের বিষয়গুলো অপরিবর্তিত থাকেনি। যদিও অপরিকল্পিত এ পরিবর্তনগুলো কৃষি কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন সূচিত করেনি। উল্লেখযোগ্য এ পরিবর্তনগুলো (যেমন ভূমিহীনতা ও নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ায় ভূমি বণ্টনে বৈষম্যের মাত্রায় চরম রূপ ধারণ খামারের গড় আকারের ক্রমহ্রাসমান অবস্থা, বর্গাচাষের মাত্রার ক্রমবর্ধমান ও উচ্চমাত্রায় অবস্থান) কৃষিতে উৎপাদনশীল ধনতন্ত্র বিকাশের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আমাদের বিশ্লেষণের উল্লিখিত ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি বণ্টনে বৈষম্য দূর করে উৎপাদনশীলতা বিকাশ ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কারের তত্ত্বগত ও প্রায়োগিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছি। এ রূপরেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কার কর্মসূচি একক এবং বিচ্ছিন্নভাবে কার্যকরী করার পরিবর্তে অন্যান্য কার্যক্রমের (যেমন বর্গাদারি ও প্রশাসন সংস্কার, সমবায় ও কৃষক আন্দোলন সংক্রান্ত কার্যক্রম) সঙ্গে সমন্বিত করে যুগপত্ভাবে সব কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া, যাতে করে আমরা একটি অনুন্নত, অনুৎপাদনশীল ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে একটি উন্নত, সুসংহত ও উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পৌঁছতে পারি। আমাদের প্রস্তাবিত ভূমি সংস্কারের রূপরেখা তাই। উৎপাদন সম্পর্ক ও বণ্টন ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
(বিআইডিএসের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সমীক্ষায় ২০০৮ সালে প্রকাশিত নিবন্ধের সংক্ষেপিত পুনর্মুদ্রণ)
বিমল কুমার সাহা: বিআইডিএসের সাবেক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো





