আমাদের দেশে বিভিন্ন মৌসুমে নানা রকমের ফল পাওয়া যায়। সারা বছর উৎপাদিত ফলের প্রায় ৬০ শতাংশ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ (মে-আগস্ট) এ চার মাসেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন রকম দেশীয় ফল পাওয়া যায়, তবে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, আনারসই প্রধান। পাওয়া যায় জাম, আমলকী, আতা, করমজা, জামরুল, বেল, গাব, কাঁচা তাল ইত্যাদি। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদন হয় ২১ শতাংশ, যার মধ্যে আমড়া, কামরাঙা, কদবেল, চালতা অন্যতম। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলে উৎপাদন হয় মোট ফলের ১৯ শতাংশ, যার মধ্যে কুল, বেল, কলা, সফেদা অন্যতম।

বাংলাদেশ একটি আর্দ্র ও উষ্ণমণ্ডলীয় দেশ হওয়ায় এখানে প্রায় ১৩০ প্রজাতির ফল জন্মে। তার মধ্যে প্রচলিত ও অপ্রচলিত প্রায় ৭০টি ফলের চাষাবাদ হয়। ফল শরীরের ভিটামিন ও খনিজ লবণের প্রধান উৎস এবং ভেষজ বা ঔষধি গুণসমৃদ্ধ। নিয়মিত ফল খেলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ জীবন লাভ করা যায়। মোট উৎপাদিত ফলের প্রায় ৫৩ শতাংশ বাণিজ্যিক বাগান থেকে উৎপাদন হয়, বাকি ৪৭ শতাংশ ফলের জোগান আসে বসতবাড়ি ও তত্সংলগ্ন জমি থেকে। কাজেই ফলসমৃদ্ধ দেশ গড়তে দুই জায়গাতেই ফল চাষে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি মানসম্মত ফল উৎপাদনের জন্য বাণিজ্যিক বাগানের পরিমাণ বাড়াতে হবে। তবে অপারসম্ভবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে পাহাড়ি এলাকা। বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাহাড়ি অঞ্চল। পাহাড় ছড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের কিছু অংশে, ময়মনসিংহের দক্ষিণাংশে, সিলেটের উত্তরাংশে, কুমিল্লার পূর্বাংশে, নোয়াখালীর উত্তর-পূর্বাংশে ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামেই আছে দেশের মোট জমির প্রায় ১০ শতাংশ। এসব পাহাড়ের অনেকটা ভূমি বনাঞ্চল। ভূমিবৈচিত্র্যের জন্য মাঠ ফসলের চেয়ে উদ্যান ফসল চাষে পাহাড় বেশি উপযোগী। উদ্যান ফসলের মধ্যে বহু রকমের ফল পাহাড়ে চাষ করা যায়। পাহাড়ে প্রায় ২০ রকমের ফল খুব ভালোভাবে চাষ করা যায়। বর্তমানে পাহাড়ে বেশ কয়েক রকমের ফলের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে যেমন—আম, কলা, কাঁঠাল, লেবু ও আনারস। নতুন ফলের মধ্যে ড্রাগন ফল, মাল্টা ও কমলা চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তারলাভ করেছে। বান্দরবানের রামুতে চাষ করা হচ্ছে কাজুবাদাম। খাগড়াছড়িতে প্যাসন ফল চাষের সফলতাও দেখা গেছে। এরই মধ্যে সরকার এ অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও পুষ্টির চাহিদা উন্নয়নের জন্য পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

ফল চাষে জমি বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, বছরে ১০-১১ শতাংশ হারে ফল চাষের জমি বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চারটি ফলের মোট উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম ও পেঁপেতে চতুর্দশতম স্থানে আছে বাংলাদেশ। আর মৌসুমি ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে দশম। আম, কাঁঠালের বাইরে মৌসুমি ফলের মধ্যে আছে জাম, লিচু, কুল, কামরাঙা, পেঁপে, বেল, লেবু, আনারস, আতা, সফেদা, লটকন, তরমুজ, ফুটি ইত্যাদি। একই সঙ্গে নিত্যনতুন ফল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ সফলতা পেয়েছে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় আম। একসময় শুধু রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া ও ফজলি আমের ওপর দেশের চাষীরা নির্ভরশীল ছিলেন। এক যুগ আগে আম্রপালি আমের উদ্ভাবন আম চাষের সব ভৌগোলিক বাধা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেশের মোট উৎপাদিত আমের ৪০ শতাংশ এই জাতের। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে আম্রপালির চাষ ব্যাপক হারে বেড়েছে। তবে সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, রংপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচুর আম হয়। এমনকি পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে লবণাক্ত অঞ্চল, অনাবাদি সিলেটসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আমকে দীর্ঘ সময় ভোগ করার জন্য বাণিজ্যিক বাগান করার সময় আগাম, মধ্যম ও নাবি জাতের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। যেমন আগাম জাতের মধ্যে নীলউদ্দিন, গোলাপবাস, গোলাপখাস, রাজবৈশাখী, বৈশাখী, গোবিন্দভোগ আমচাষীদের আগাম ভালো বাজারমূল্য দিচ্ছে। আমের ক্ষেত্রে গৌড়মতি, বারি আম-৪-এর মতো নাবি জাতগুলো আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আম প্রাপ্তির সময়কে দীর্ঘায়িত করেছে। আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতি, বারি আম-৪, বারি আম-১০, ব্যানানা ম্যাংগো, ডায়াবেটিক আম ফল বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। পরিকল্পনা করে আমের সঠিক জাত নির্বাচন করে আমবাগান করলে বছরে সাত মাস ধরে বাগানে আম পাওয়া সম্ভব। বাঙালিদের এ ঐতিহ্যবাহী ফলকে টিকিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগসহ আরো কৃষি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশবিদ্যালয়সহ আরো অন্যান্য বিশবিদ্যালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ফলগাছ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বসতবাড়ির আঙিনায়ও বাণিজ্যিকভাবে চাষোপযোগী বিভিন্ন উন্নত জাতের উচ্চফলনশীল বামন প্রকৃতির আমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার, আমের ব্যাগিং, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি রফতানি উপযোগী আম উৎপাদনে সহায়তা করবে। সেই লক্ষ্যে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন কন্ট্রাক্ট ফার্মের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে আম রফতানি করছে। তবে কিছু গুজব রয়েছে যে আমে ফরমালিন দেয়া হয়, সেটা পুরোপুরি ঠিক নয়।

কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। ‘ভিটামিন-এ’সহ অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল কাঁঠালকে বলা হয় মাংসের বিকল্প। সারা বিশ্বে বছরে ৩৭ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়। সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল হয় ভারতে, যার পরিমাণ ১৮ লাখ টন। দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ, ১০ লাখ টনের বেশি। পুষ্টিমানের দিক থেকে অন্যতম সেরা এ ফলের আমদানি খুব দ্রুত হারে বাড়াচ্ছে চীন। তারা মূলত উৎপাদনে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে কাঁঠাল আমদানি করে। জাপান, মালয়েশিয়ার মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কাঁঠাল আমদানির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ ও ভারত থেকে কাঁঠাল আমদানি না করে অন্য দেশ থেকে আমদানি করার কারণ হচ্ছে, এ দুই দেশের কাঁঠালে আঠা থাকে। আর এখানকার কাঁঠালে এক ধরনের বুনো গন্ধ থাকে, যা পূর্ব এশিয়ার মানুষের পছন্দ নয়। তবে শীতকালীন কাঁঠালে এ ধরনের গন্ধ ও আঠা কম থাকে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে একটি শীতকালীন কাঁঠালের জাত খুঁজে পেয়েছেন যা নিয়ে বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গবেষণা করছে। এছাড়া থাইল্যান্ড থেকে আঠাবিহীন কাঁঠালের চারা আমদানি করা হচ্ছে। যদি তা দেশে উৎপাদনের উপযোগী হয় তাহলে শিগগিরই কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে। ‘আঠাবিহীন কাঁঠালের চাহিদা বিশ্ববাজারে দিন দিন বাড়ছে। আমাদের দেশের মধ্যবিত্তদের মধ্যে আঠালো হওয়ার কারণে কাঁঠাল খাওয়া নিয়ে এক ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা রয়েছে। আঠাবিহীন ও সুগন্ধি কাঁঠালের চাষ বাড়লে অত্যন্ত পুষ্টিকর এ খাবার দেশের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাবে।

আমাদের খুব প্রিয় ফল লিচু, যা এখন দিনাজপুর ছাড়িয়ে পাবনা, নাটোর, মেহেরপুর এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৭.৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে ৮০ হাজার টন লিচু উৎপাদন হয়েছে। লিচুর উন্নত জাতের মধ্যে বেদানা, বোম্বাই, চায়না-২, চায়না-৩, বারি লিচু-৩, বারি লিচু-৪ বাণিজ্যিক বাগানগুলোতে ব্যাপক চাষ হচ্ছে। পেয়ারা উৎপাদনে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। এ অর্জন হয়েছে গত ১০-১২ বছরে। একসময় শুধু দেশী পেয়ারার চাষ হতো। আমাদের সবার মুখে কাজি পেয়ারার কথা, যা বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। সিডলেস জাতের পেয়ারা ও থাই জাতের পেয়ারা বেশ জনপ্রিয়। একসময় পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে সবচেয়ে বেশি পেয়ারা হতো। বর্তমানে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ জেলায় পেয়ারার চাষ হয়। উল্লেখ্য, পেয়ারার কিছু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার উদ্ভাবনের মাধ্যমে সারা বছর পেয়ারাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে।

লেবু ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ একটি জনপ্রিয় ফল। এটা সারা বছর মানুষ খায়। তবে এই করণাকালীন প্রাদুর্ভাবের সময় যেন মানুষের রুটিনের মধ্যে খুব শক্তভাবে যুক্ত হয়েছে। লেবুর অনেক জাতের মধ্যে পাতি লেবু, কাগজি লেবু, এলাচি লেবু, সিডলেস লেবু, সরবতি লেবু, বাতাবি লেবু, কমলালেবু ও মাল্টা লেবু উল্লেখযোগ্য। সারা দেশে লেবু চাষ হলেও মৌলভীবাজার, সিলেট, খাগরাছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলায় সর্বাদিক পরিমাণ লেবু উত্পন্ন হয়। বর্তমানে সীমিত আকারে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশ থেকে লেবু রফতানি হয়। ছাদে লেবু চাষ অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বারি মাল্টা-১, বাউকুল, আপেলকুল, ড্রাগন ফল ছাদ বাগানের মাধ্যমে ফল চাষে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রকল্পের মাধ্যমে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পঞ্চগড়সহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই মাল্টার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। বেশকিছু বিদেশী ফল যেমন ড্রাগনফল, মাল্টা, স্ট্রবেরি, কাজুবাদাম, রামবুটান, সাওয়ার সপ বা টক আতা, আলুবোখারা, ম্যাঙ্গোস্টিন, ক্যানিস্টেল বা জামান ফল, প্যাশন ফল, পার্সিমন, অ্যাভোক্যাডো, কোকো, আঙুর, পিচফল, চেরি, লংগান, সৌদি খেজুর, শানতোল, রক মেলন ইত্যাদির আগমন ঘটেছে, যা উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। ড্রাগন ফল জুনের পর থেকে শীতকাল পর্যন্ত আর মাল্টা অক্টোবর-নভেম্বরে সংগ্রহ করা যায়।

ফলের ব্যাপক পুষ্টিগুণাগুণ আর অর্থনৈতিক লাভ, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০০৮-০৯ সালে ফল রফতানি করে বাংলাদেশ প্রায় ১৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করে। সবচেয়ে বেশি আয় করেছে ২০১২-১৩ সালে, প্রায় ৭২ মিলিয়ন ইউএস ডলার। এরপর কমতে শুরু করে এবং ২০১৫-১৬ সালে এসে দাঁড়ায় মাত্র ২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। উল্লেখ্য, আমদানিকারক দেশগুলো হলো ভারত, ইউকে, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ইউএই, সিঙ্গাপুরসহ কানাডা, জার্মানি, জাপান ও ইউএসএ। তবে রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ যায় ভারতে। গড়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের দিনে ২১০০ কিলোক্যালোরির প্রয়োজন। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে ১১.৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠী। তারাই পুষ্টিহীনতায় ভোগে বেশি। শারীরিক বিকাশজনিত বিভিন্ন রোগ যেমন— শারীরিক বৃদ্ধি থেমে যাওয়া বা স্টান্টিং, অন্যদিকে জনগণের ভেতরে ওজন ও স্থূলতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মূলত হয়ে থাকে প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতির কারণে। তাই আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে খাদ্যতালিকায় ফলকে আরো বেশি করে আনতে হবে। এজন্য ফলের জোগানও বেশি থাকতে হবে। প্রতিদিন একজন লোকের ১৫০-২০০ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার, কিন্তু আমরা পাই তার অর্ধেক মাত্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রচলিত ফলের সাথে সাথে হারিয়ে যাওয়া অপ্রচলিত ফল, বারোমাসেই পাওয়া যায় এমন ফল এবং দীর্ঘদিন ধরে ফল পাওয়া যাবে এমন ফলের আবাদ বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। সর্বোপরি পুষ্টি ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সর্বোচ গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ নীতিমালা করে প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে। যা করণীয়:

১. পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা আনতে হবে। এজন্য প্রাইমারি অথবা মাধ্যমিক স্কুলে সিলেবাসে পুষ্টির বিষয়টি আলোচনায় আনা যেতে পারে এবং বয়স্কদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ২. উন্নত মানের চারা কলম উৎপাদন সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নার্সারি থেকে ফলের চারা নিয়ে, সবাই আশানুরূপ সুফল পেলে ফলচাষী লাভবান হবে এবং অন্যরা আগ্রহী হবে। ৩. ফল মেলা উদযাপনের সাথে সাথে ভালো নার্সারি মালিককে নিরপেক্ষভাবে পুরস্কৃত করা। এতে ফল চাষে কৃষকের মাঝে উৎসাহ বাড়বে।  ৪. বাড়ির পাশে, ছাদে ও বাণিজ্যিক ফল বাগান প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের দেশে উৎপাদিত মোট ফলের একটা বড় অংশ বসতবাড়ি থেকে আসে এবং পারিবারিক পুষ্টি ও বাড়তি আয় এ বাগান থেকেই অর্জন করা সম্ভব। করনাকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি পড়ে না থাকে, সে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাতে পারে ১১ কোটি শতক পতিত জমি, যা মোট জমির প্রায় ৫ শতাংশ। এ জমিতে দ্রুতবর্ধনশীল ফলগাছ এবং দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি ফলগাছের সমন্বয়ে মিশ্র ফলবাগান সৃষ্টি করায় প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে। ৫. অমৌসুমে উৎপাদিত ফলের জাত সম্প্রসারণ করতে হবে। বাংলাদেশ ফলের সমারোহ, যা মধুমাসে ৬০ শতাংশ পাওয়া যায়। ড্রাগন ফল, মালটা, লেবু, পেয়ারা ইত্যাদি অমৌসুমে পাওয়া যায়। এগুলো বেশি করে চাষাবাদ করা গেলে অমৌসুমেও পুষ্টি গ্রহণের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। তাছাড়া কাজুবাদাম ও নারকেল যেমন ভিয়েতনাম থেকে সিয়ামগ্রিন ও সিয়ামব্লু নামের জাত এনে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। ৬. পাহাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিক ফল যেমন আম্রপালি ও রাঙগুয়াই জাতের আম, লিচু, মাল্টা ও খাটো জাতের নারকেল, কলা, ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ইত্যাদির সম্প্রসারণ করতে হবে। ফলভিত্তিক অর্থনীতি পাহাড়ি জনগণের জীবনযাত্রায়ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। উৎপাদিত ফল এ দেশের সব মানুষের ফলের চাহিদা পূরণ করে বাড়তি ফল রফতানি করে হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে। ৭. ফলের রফতানি ও বাজার সম্ভাবনা তৈরি করতে হবে। কীভাবে ফলের রফতানি বাড়ানো যায় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়, সেগুলো বিবেচনায় আনতে হবে। আমাদের দেশে ২৫-৪০ শতাংশ পোস্ট-হারভেস্ট লস হয়। লস কীভাবে কমানো যেতে পারে তা নিয়ে প্রচুর গবেষণা করা যেতে পারে। ফল সংরক্ষণের জন্য এলাকাভিত্তিক হিমাগার স্থাপনসহ পরিবহনের জন্য কুলিং ভ্যান ও প্যাকেজিং ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সমিতি তৈরি করে কৃষিঋণ দেয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সাথে বাণিজ্যিক বাগানের চুক্তি হতে পারে, যাতে ফলচাষী অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পাশাপাশি পোস্ট-হারভেস্ট লস কম হয় কিংবা না হয়। বাংলাদেশের উৎপাদনের দিকে চিন্তা করে কিছু ফল যেমন—কাঁঠাল ও কলার প্রক্রিয়াজাতের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে প্রচুর কাঁঠাল ও কলার চিপস পাওয়া যায়। ফলে প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আরো উৎসাহিত করতে হবে। আবার শিল্পে জোগানকারী কাঁচামাল নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করার জন্য ক্রপ জোনিং করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে ফল উৎপাদন টেকসই করা যাবে। আর টেকসই উন্নয়নই দিতে পারে ক্ষুধামুক্তি, খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন, টেকসই কৃষি ব্যবস্থা ও সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।

 

ড. মো. আশরাফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়