বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে বিশ্বে কৃষির রোল মডেল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষি উন্নয়নবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। দেশের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষির বহুমুখী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রও বেড়েছে। অনেকেই কৃষিকে কর্মসংস্থানের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কৃষি এখন বাংলাদেশে ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হিসেবেও পরিচিত হচ্ছে। কৃষিবান্ধব সরকার কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণে বহুমুখী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কৃষকের তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চালু হয়েছে কৃষকের বাজার, অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্ম ব্যবহার করে পণ্য সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রির ব্যবস্থাসহ নানামুখী উদ্যোগ। ফলে কৃষি পেশায় এখন তরুণ, যুবক বয়সের অনেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে ভাবতে শুরু করেছে। ই-কৃষি ব্যাপক হারে প্রতিদিন জনপ্রিয় হচ্ছে। তবুও উৎপাদিত কৃষিপণ্যকে সরাসরি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর বিষয়ে গৃহীত কার্যক্রমকে বেগবান করতে চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে। উন্নত দেশে কৃষিপণ্যের সংগ্রহোত্তর অপচয় রোধ কমাতে প্রক্রিয়াকরণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কৃষিপণ্যকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে অনেক আগে থেকেই, সেখানে আমাদের দেশে ফসলের সংগ্রহোত্তর অপচয় অনেক বেশি, যেমন ফলমূল ও সবজি ফসলে ২০-৪৫ শতাংশ আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অধিক উৎপাদনের ফলে ক্ষতির পরিমাণ তারও বেশি হয়। আমাদের দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের প্রায় ১ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতের কাজে ব্যবহার করা হয়, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ২ দশমিক ৫, মালয়েশিয়ায় ৮৩, ফিলিপাইনে ৭৮, ব্রাজিলে ৭০ ও যুক্তরাষ্ট্রে ৭০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের জন্য সেখানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের উদ্যোক্তার জন্য বিপণন নীতি, মানদণ্ড ও সার্টিফিকেশন প্রতিষ্ঠান সহজীকরণ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে আগ্রহী কৃষিপণ্য প্রস্তুতকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমিতি বা দলকে (গ্রুপ) স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা গ্রহণ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন ইত্যাদি। উদাহরণস্বরুপ উত্তম কৃষিচর্চা (জিএপি-গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস), স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিধিবিধান বা খাদ্য আইনবিষয়ক ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত করা। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উপযুক্ত মোড়কজাত দ্রব্যাদি, ন্যূনতম ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্য বিপণন করতে লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা সহজ করা, যাতে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোক্তারা স্বল্প সময়ে বিপণন নিশ্চিত করতে পারে, যা তার আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।

উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে বিভিন্ন ফলমূল ও শাকসবজির উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ, যার প্রভাব রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকান, ভ্যান ও ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে হরেক রকমের কৃষিপণ্য বিক্রি করতে দেখতে পাওয়া যায়। ভরা মৌসুমে কৃষিপণ্যের দাম অল্প থাকায় কৃষক ও ব্যবসায়ী অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয় আবার সংগ্রহোত্তর অপচয়ের পরিমাণও অধিক হয়। ওইসব কৃষিপণ্যকে প্রক্রিয়াজাতের আওতায় আনা গেলে দেশের মানুষের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র জনসাধারণ লাভবান হবে। এছাড়া মানসম্মত খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মোতাবেক ২০১৫-১৬ সালে পৃথিবীর ১৪টি অঞ্চলের ১৯৪টি দেশে প্রায় ৩৪ হাজার ২৫৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের বিভিন্ন উৎপাদিত সামগ্রী বাংলাদেশ হতে রফতানি হয়। এসব পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগ, আমেরিকা অঞ্চলে ২৩ ভাগ, এশিয়ায় প্রায় ১১ ভাগ, মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২ ভাগ ও অন্যান্য অঞ্চলে অবশিষ্ট প্রায় ৯ ভাগ রফতানি করা হয়। উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে প্রায় ১১৩২ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্য (হিমায়িত, সতেজ ফল ও সবজির জুস, জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি ইত্যাদি) রয়েছে যা মোট রফতানি মূল্যের মাত্র শতকরা ৩ দশমিক ৩০ ভাগ। আমাদের উৎপাদিত অনেক কৃষিপণ্যই উত্কৃষ্ট মানের (আম, কলা, আনারস, কাঁঠাল, মিষ্টিকুমড়া, কচুর লতি, সজিনা ইত্যাদি) হওয়ায় যথাযথ প্রক্রিয়াজাতের ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে (ইউরোপ, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে) অধিক পরিমাণে রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখবে এবং দেশের এই বিপুল জনসাধারণের খাদ্য ও পারিবারিক পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বেগবান করবে, পাশাপাশি কৃষি শিল্প বিকশিত হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে অনেকাংশে সহায়তা করবে এবং এসডিজির (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারবিষয়ক লক্ষ্য পূরণেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কাজে ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি সরবরাহে উদ্যোগ নেয়া

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার অপরিহার্য। যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত কাজে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য তৈরি করতে ড্রায়ার, স্লাইসার, রিফ্রাক্টোমিটার, সিলিং মেশিন, ওয়াশিং মেশিন, হ্যান্ড প্যাকেজিং মেশিন ইত্যাদি সরবরাহ করা গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজেই শুকনো খাদ্য দ্রব্য যেমন—ফলমূল ও শাকসবজি শুকানো, আচার, চাটনি, জুস, জেলি, জ্যাম ইত্যাদি তৈরি করতে পারবে। ভরা মৌসুমে অনেক সময় এক নাগাড়ে কয়েকদিন বৃষ্টি হলে সে সময় ড্রায়ার অপরিহার্য। এছাড়া রৌদ্রে শুকানোর সময় পশু-পাখি, মোকামাকড়, ধুলাবালি খাদ্যদ্রব্যে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে রোগজীবাণুর আক্রমণের ব্যাপক আশঙ্কাও সৃষ্টি হয়। হ্যান্ড রিফ্রাক্টোমিটার ব্যবহার করে সঠিকভাবে ফলের জ্যাম, জেলি, টমেটো সস, ড্রাইড প্রডাক্ট তৈরি করা যায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলে অল্প সময়ে সারা বছর যেমন বিবিধ খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুত করতে সক্ষম হবে তেমনি তা সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় চাহিদা মোতাবেক বিক্রি করতে সচেষ্ট হবে নিঃসন্দেহে।

কাঁচামাল সরবরাহ ও সহজলভ্য করতে উদ্যোগ নেয়া

প্রক্রিয়াজাতের কাজে বিভিন্ন রকম কাঁচামাল প্রয়োজন, যা খাদ্যদ্রব্যের উত্কর্ষসাধনসহ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার কাজে ব্যবহার করা হয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হবে না এবং বিএসটিআই কর্তৃক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতের কাজের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করার বিধান আছে। খাদ্য প্রস্তুতকারী স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা ভরা মৌসুমে ফলমূল ও শাকসবজি যেমন—আম, আনারস, পেঁপে, কাঁঠাল, আমড়া, চালতা, জলপাই, টমেটো ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, বরবটি, মটরশুঁটি ইত্যাদি স্বল্প মূল্যে কিনে সারা বছর ব্যবহার করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে পারে, কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ করতে না পারায় তা সম্ভব হয় না। ফলে উদ্যোক্তা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাসায়নিক সামগ্রী সহজলভ্য করা হলে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বল্প মূল্যে সরবরাহ করা হলে তারা অনায়াসে ফলমূল সংরক্ষণ করে সারা বছর মানসম্মত খাদ্য তৈরি করতে পারবে এবং তা বিপণন করতেও সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আগ্রহী উদ্যোক্তা নির্বাচনের মাধ্যমে এবং নামমাত্র মূল্যে রাসায়নিক দ্রব্যাদি সরবরাহ করা হলে নিঃসন্দেহে প্রক্রিয়াজাতের কাজে অনেকেই উৎসাহী হবে এবং সহজেই এ পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে উদ্যোগী হবে।

প্যাকেজিং প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও সহজলভ্য করতে উদ্যোগ নেয়া

প্যাকেজিং উত্কর্ষসাধন যেমন ভোক্তাকে যেকোনো খাদ্যদ্রব্য কিনতে আকৃষ্ট করে তেমনি খাদ্যসামগ্রীতে মূল্য সংযোজনও (ভ্যালু অ্যাডিশন) করে। খাদ্যসামগ্রীকে বিভিন্ন অণুজীবের হাত থেকে রক্ষা করে সংরক্ষণকাল বাড়ায়। এছাড়া উপযুক্ত প্যাকেজিং আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতা নিয়ন্ত্রণ করে খাবারের গুণগত মান ঠিক রাখে। দেশে অল্প পুরুত্বের পলিপ্রোপাইলিন প্যাকেটে সাধারণত খাদ্যদ্রব্য প্যাকেটজাতের কাজে ব্যবহার করা হয় যা মানসম্মত নয়। কিন্তু ফুড গ্রেড প্যাকেট আমাদের দেশে সহজলভ্য নয় আবার তা ব্যয়বহুল এবং অল্প পরিমাণ তৈরি করতেও অনেক প্রতিষ্ঠানই আগ্রহী হয় না। স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তার জন্য একটি নির্দিষ্ট খাদ্যসামগ্রীর আকার অনুযায়ী প্যাকেট কিনতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন তা উদ্যোক্তার জন্য কষ্টসাধ্য। প্যাকেজিং উপকরণ আমদানিতে শুল্ক কমানো বা প্রয়োজনে শুল্ক প্রত্যাহার, প্যাকেজিং উপকরণ দেশে উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ, প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি স্থাপনে উৎসাহিত করা ইত্যাদির মাধ্যমে প্যাকেট ও প্যাকেটজাত দ্রব্য সহজলভ্য এবং ব্যাপক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হলে স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা উৎসাহী হবে এবং ভোক্তা নির্দ্বিধায় প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসামগ্রী কিনতে আগ্রহী হবে।

প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসামগ্রী তৈরির কাজে ক্ষুদ্র ঋণের উদ্যোগ নেয়া

অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অর্থের অভাবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কাজে আগ্রহী হয় না। প্রক্রিয়াজাতের কাজে কাঁচামাল কিনতে অর্থের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে উদ্যোক্তারা কিস্তিতে সহজেই প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারবে। ফলে উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে তার ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করতে পারবে, যা তাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করবে, দারিদ্র্যের অবসান ঘটবে ও পরিবারের সদস্যের আত্মকর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। সর্বোপরি উদ্যোক্তা তার কাজে অধিক মনোযোগী হবে এবং চ্যালেঞ্জ অতি সহজেই গ্রহণের মাধ্যমে উদ্যোক্তার কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কাজকে অধিক বেগবান করবে বলে আশা করা যায়।

উদ্যোক্তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া

উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির প্রয়োগ, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি করা, খাদ্যদ্রব্য যথাযথ সংরক্ষণ ও বাজারজাতসহ অন্যান্য মানদণ্ড বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অবহিত করা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। প্রশিক্ষণ প্রদানে সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন—কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষি গবেষণা, কৃষি বিপণন, বিসিক, বারটান, বিসিএসআইআর, বিএসটিআইসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা সরাসরি যুক্ত থাকলে তা অধিক ফলপ্রসূ হবে এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়বে। প্রশিক্ষণে বিশেষ করে নারীদের অধিক হারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, প্রয়োজনে পুরো পরিবারকে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। এতে পুরো প্রশিক্ষণটি তারা সহজেই আত্মস্থ করতে পারবে এবং নিজেরা হাতে-কলমে করে আস্থা অর্জন করবে, যা উদ্যোক্তাকে অনুপ্রাণিত করবে। ফলে পরিবারের সবার আত্মকর্মসংস্থান হবে এবং পারিবারিক আয়ও বাড়বে।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসামগ্রী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিপণন ও কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তঃসংযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তা নিশ্চয়তা পেলে ভরা মৌসুমে অধিক পরিমাণে বিভিন্ন ফলমূল ও শাকসবজি সহজেই সংরক্ষণ করতে পারবে এবং তা নিজ দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করবে। ফলে কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বছরব্যাপী খাদ্যসামগ্রী প্রক্রিয়াজাত কাজে নিয়োজিত থাকবে এবং অনায়াসে তৈরীকৃত খাবার সবার কাছে বিক্রি করতে পারবে। ফলে ফসলের সংগ্রহোত্তর অপচয় কমবে, বিভিন্ন রকম খাবার শহর ও স্থানীয় বাজারে ধীরে ধীরে সহজলভ্য হবে এবং ভোক্তা সহজেই স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করতে পারবে। ভোক্তা তার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার অনায়াসে কিনে বছরব্যাপী খেতে পারবে।

প্রক্রিয়াজাতের কাজে প্যাক হাউজ ও কুলবুট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া

সতেজ ফলমূল ও শাকসবজি মাঠ থেকে সংগ্রহ করার পর এর শ্বসন প্রক্রিয়া দ্রুত চলতে থাকে। ফলে গুণগত মানের অপচয় হয় এবং দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে সংগ্রহোত্তর পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্যাকিং হাউজ সুবিধা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেখানে সর্টিং, গ্রেডিং, ওয়াশিং, প্যাকিং এবং প্যাকেজিং সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। খাদ্য প্রস্তুতকরণ কাজে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করার জন্য প্যাকিং হাউজ ব্যবহার অপরিহার্য। উদ্যোক্তাদের অঞ্চলভিত্তিক গ্রুপ গঠন করে প্যাকিং হাউজ ব্যবহার ও নিজ উদ্যোগে রক্ষণাবেক্ষণ করার মাধ্যমে স্বল্প খরচে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কাজ অনায়াসে করতে পারবে। আবার কুলবুট স্থাপনা তৈরিতে স্বল্প খরচ প্রয়োজন। এটি মিনি কোল্ড স্টোরেজের মতো কাজ করে। একটি নির্দিষ্ট রুমকে ইনসুলেটর দিয়ে আবৃত করে ওই রুমে এয়ার কন্ডিশনার সংযোগ ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিলে সতেজ ও প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্যকে দীর্ঘ সময় গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে সংরক্ষণ করা যায়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও সমবায় সমিতির মাধ্যমে প্যাক হাউজ ও কুলবুট প্রযুক্তি নির্মাণ করে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তারা উৎসাহী হয়ে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণে এগিয়ে আসছে।  

স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্য বিপণনের জন্য ন্যূনতম বিধিবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া

প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা সম্প্রসারণে পৃথিবীর অনেক দেশেই স্থানীয় পর্যায়ে বিপণনের জন্য স্বতন্ত্র বিধিবিধান বা ব্যবসায় নীতি রয়েছে। প্রতিটি দেশে স্থানীয় পর্যায়ে একটি রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট-বিএসটিআইয়ের অনুরূপ একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান) থাকে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব হবে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা মেনা চলার শর্তগুলো তৈরি করা ও সার্বক্ষণিক তা পর্যবেক্ষণ করা এবং সেটির নামমাত্র মূল্যে লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া, লাইসেন্স নবায়ন করা ও প্রয়োজনে বাতিল করা, খাদ্যপণ্যের ন্যূনতম মানদণ্ড নিরূপণ করা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা, প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ভোক্তাদের অভিযোগকে তাত্ক্ষণিক মূল্যায়ন করা ও প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেয়া। প্রতিষ্ঠানটি ন্যূনতম বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবে যেমন—মোড়কজাত, পণ্যের তথ্যসহ মোড়কের গায়ে লেবেলিং, খাদ্যপণ্যের নির্ধারিত মূল্য, প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার সর্বোচ্চ কতদিন ব্যবহার করা যাবে সেটির তারিখ উল্লেখ থাকা ইত্যাদি, যা প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের সাথে সামঞ্জ্য রেখে তৈরি করবে। এটির মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে স্থানীয় উদ্যেক্তাদের জন্য প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যপণ্য তৈরিতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা প্রতিপালন, নিরাপদ খাদ্য আইন ও খাদ্যপণ্য বিপণনের বিধিবিধান প্রয়োজনে সহজীকরণ করা। তবে অবশ্যই সেটি জনসাধারণের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হবে না এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্যের ব্যবসা স্থানীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে। ফলে উদ্যোক্তা স্থানীয় খাদ্য আইন বা বিধিবিধান অনুসরণ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ (উদাহরণস্বরূপ ক্ষুদ্র উদ্যেক্তা প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তা প্রতি মাসে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত) খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিপণন করতে পারবে। ফলে স্থানীয় বাজার থেকে ভোক্তা হাতের নাগালে অনায়াসেই আস্থার সাথে স্বল্প মূল্যে নিরাপদ খাদ্যপণ্য (স্থানীয়ভাবে বাড়িতে তৈরি করা, যা হোমমেড নামে পরিচিত) সারা বছর পেতে পারে আবার লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সহজীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ের ন্যূনতম খাদ্য প্রক্রিয়াজাতের বিধিবিধান অনুসরণ করে উদ্যোক্তারা অতি সহজেই খাদ্যসামগ্রী তৈরি করে নিজেই বিপণন করতে আগ্রহী হবে এবং উৎসাহিত হয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্বুদ্ধ হবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

 

ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী: উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর