সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বজুড়ে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আশার দিক হলো, ২০২১ সাল হবে একটি সুফলপ্রদায়ী রূপান্তরের বছর।
এরই মধ্যে অর্থনীতিগুলোর জোরালো পুনরুদ্ধার শুরু হওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক মডেলগুলো পুনর্বিন্যাস করছে এবং সরকারগুলো আরো ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়ানো নিশ্চিত করতে নানাভাবে আলাপ-আলোচনা করছে, নীতি-কৌশল গ্রহণ করছে।
কিন্তু বড় ঝুঁকিটা রয়ে গেছে কভিড-১৯-এর বিদ্যমান ও নতুন ধরনের অভিঘাত মোকাবেলায় নীতিনির্ধারকদের বছরব্যাপী অত্যধিক সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা নিয়ে।
সব দেশ সেটি কতটা পারবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় থেকে যায়।
উল্লিখিত ঝুঁকি বাদে ২০২১ সাল সম্পর্কে আশান্বিত হওয়ার অন্তত চারটি ভালো কারণ আছে।
প্রথমত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হলো, সরকারি প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ বিপুল তহবিলের সহায়তায় বিজ্ঞানী ও ওষুধ কোম্পানিগুলো একটি কার্যকর কভিড-১৯-এর টিকা উদ্ভাবনে উন্মত্তভাবে-আগ্রাসীভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তার ফলও দেখা যাচ্ছে যে কিছু টিকা শিগগিরই অনুমোদন হতে যাচ্ছে।
এতে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া নিশ্চিতে হার্ড ইমিউনিটির উপায় উন্মুক্ত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, প্রচুর নিম্নব্যয়ের অর্থায়ন জোগানো পুঁজিবাজারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যক্তি খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মহামারী-পরবর্তী কৌশল সাজানো ও পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যস্ত সময় পার করছে।
স্থায়িত্বশীলতা ও কার্যকারিতা-দক্ষতার মধ্যে আরো ভালো ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছে।
একই সঙ্গে পরিচালনগত কুশলতা ও উদারতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তৃতীয়ত, মহামারীকালে ব্যবস্থাপনার অন্তর্নিহিত জটিলতাগুলো কোম্পানি এবং স্থানীয় ও জাতীয় সরকারগুলোর অসংখ্য নেতৃত্বের ঘাটতি সামনে এনেছে।
কভিড-১৯-এর অভিঘাত বড় ধরনের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সমন্বয় ব্যর্থতাও উন্মোচন করেছে।
একই সঙ্গে এ সংকট উচ্চপ্রভাববিস্তারী অনিশ্চিত ও আকস্মিক ঘটনাগুলোর অধিকতর ভালো ও বিস্তৃত মূল্যায়নের তাগিদটা সামনে এনেছে।
কাজেই এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আজকের অধিক দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে আগের পরিচালন-শাসন কাঠামোর অভিযোজন জোরদার করা জরুরি।
চূড়ান্তভাবে অনেক দেশ ও সমাজের নানা অংশ মহামারীর সময়ে বাধ্য হওয়া বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষণগুলো স্থায়িত্বশীলতা, জ্ঞান ও বুদ্ধিগত বৈচিত্র্য এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতার আরো বৃহত্তর স্বীকৃতির গুরুত্বকে পরিপুষ্ট করেছে।
নিরীক্ষণ-প্রভাবিত এ স্থানান্তর হয়তো নানা ক্ষেত্রে পরোক্ষ অর্থনৈতিক মডেলগুলোয় অতিপ্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুযোগ দেবে।
ভবিষ্যতের দেনা বাড়ানোর পরিবর্তে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের এখন আরো বেশি সম্পদের জোগান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পূর্বসূরিদের চেয়ে তারা আর্থিকভাবে বেশি সচ্ছল হয়।
আমার ভয় এই যে মহামারীসৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের চূড়ান্ত অসামর্থ্যের কারণে উল্লিখিত চার সম্ভাবনা আবার বিনষ্ট হয় কিনা।
নিশ্চিতভাবে এ ধরনের ঘটনাও এবারই প্রথম হবে না যে একটি অপূর্ণাঙ্গ জার্নি অর্থনীতিগুলোকে একটি প্রতিশ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো থেকে বিচ্যুত করতে পারে।
এক্ষেত্রে নিকট অতীতের একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট-পরবর্তী সময়ে অনেক নীতিনির্ধারকই একটি বহু বছরের আর্থিক মন্দার প্রকৃত হুমকির ওপর দ্রুত বিজয় উদযাপন করেছিলেন যে মন্দাটি একটি জোরালো, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির পরে আসার কারণে অনেকের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
সুনির্দিষ্টভাবে ধনী দেশগুলোতে এটি অর্থনৈতিক, আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সব ধরনের কাঠামোগত নাজুকতা তীব্রতর করেছিল এবং তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ব্যাহত করেছিল।
যেহেতু মহামারী থেকে বিশ্ব ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, সেহেতু ২০২১ সালে এ ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি ক্ষেত্রে দ্রুত কাজ করতে হবে।
প্রথমত, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে কভিড-১৯-এর পরিস্থিতিতেও আমরা ভালোভাবে কাজ করতে পারি।
যদি কোনো টিকা সর্বজনীনভাবে অনুমোদিত হয়ও, এটি উৎপাদন ও বিতরণে কয়েক মাস লেগে যাবে।
তদুপরি উচ্চতর টিকা প্রদান হার ও কার্যকারিতার নিশ্চয়তাও নেই।
কাজেই ২০২১ সালের দ্বিতীয় ভাগের আগে যথাযথ মাত্রার হার্ড ইমিউনিটি অর্জন নাও হতে পারে—এমনকি যদি সেই সময়সূচি অতিমাত্রায় আশাব্যঞ্জক হয়ও।
অনেক উন্নত দেশকে জরুরি ভিত্তিতে কভিড-১৯ সংক্রমণ হার প্রতিরোধ করতে হবে।
একই সঙ্গে দ্রুত পরীক্ষা, সংস্পর্শ শনাক্তকরণ, সম্ভাব্য ওষুধ ও চিকিত্সা সেবা বাড়ানো এবং যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
বিশেষ করে কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্ভোগ-কষ্ট ও মৃত্যুহারের বিষয়টি সম্পর্কে সজাগ থেকে সরকার ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত নির্দেশনাগুলোর পরিপালন জোরদার করতে হবে।
এটিই নিজেকে, পরিবারকে ও জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার একমাত্র উপায়।
দ্বিতীয়ত, সরকারগুলোকে এখন থেকে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির ওপর পড়া বিপুল চাপ মোকাবেলায় অবশ্যই অবকাঠামো আধুনিকায়ন, সবুজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, কর সংস্কারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে।
তারা যদি দ্রুত কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে মহামারী-পরবর্তী বিশ্ব করপোরেট দেউলিয়াত্ব ও প্রলম্বিত বেকারত্বে ভেসে যাবে।
এমনটি হলে বেশি মাত্রায় করপোরেট কেন্দ্রীভবন ঘটবে, বিশ্বায়ন অবসায়িত হবে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে, আয়-সম্পদ-সুযোগের অসমতার আরো অবনতি ঘটবে।
ফলে কম অন্তর্ভুক্তি ও পরিবারগুলোর বেশি আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি কম উৎপাদনশীল হবে এবং অধিক বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত হবে।
সরবরাহ ও চাহিদা উভয়ই দিকে এ বিষয়গুলো পরিব্যাপ্ত হবে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় কাঠামোগত বাধা তৈরি করবে।
তৃতীয়ত, নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই প্রকৃত অর্থনীতি থেকে অর্থায়নের বিযুক্তির বিষয়টি মোকাবেলা করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে এ বিযুক্তি এতটাই তীব্র যে ভবিষ্যত অর্থনৈতিক কল্যাণ এখন ব্যাহত হওয়ার উপক্রম।
কাজেই প্রকৃত অর্থনীতিতে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
এ তিনটি প্রাধিকারের বিষয়ে দ্রুত কাজ করতে ব্যর্থ হলে তা মহামারী-পরবর্তী অর্থনীতিকে অপর্যাপ্ত প্রবৃদ্ধির প্যারাডাইমে আটকে দেবে, অসমতা আরো বাড়াবে, সামাজিক বিভাজন-ভাঙন তীব্রতর করবে এবং আর্থিক উদ্বায়িতার পর্যায়ক্রমিক ধাক্কার ঝুঁকি তাত্পর্যজনকভাবে বাড়াবে।
এরই মধ্যে মহামারীসংক্রান্ত লিগ্যাসি ও দীর্ঘকালীন কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থায়ী অর্থনৈতিক বিচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
কাজেই দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
কেননা একটি ধীর পদক্ষেপ নতুন, উৎপাদনশীল, ভালো আয়ের সুযোগ গ্রহণের একটি মসৃণ রূপান্তর নিশ্চিতে জনগোষ্ঠীর শক্তি, উদ্ভাবন কুশলতা এবং সক্ষমতা কমাতে পারে।
২০২১ সালে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত এবং এর পরে শক্তিশালী ও টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কভিড-১৯ টিকার চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন হবে।
তবে বলিষ্ঠ উদ্যোগের সঙ্গে অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব এবং কিছুটা ভাগ্য নীতিনির্ধারকদের বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে বৈকি।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির





