‘প্লেগ আমাদের শহরে প্রথমেই যে প্রভাব ফেলেছিল, সেটি হলো বিচ্ছিন্নতা।’ ফ্রান্সের দার্শনিক, লেখক ও সাংবাদিক আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসের একটি উক্তি এটি। করোনাভাইরাস মহামারীর ফলে এখন আমরা এ উক্তির যথার্থতা সহজেই বুঝতে সক্ষম হয়েছি। লকডাউনের মধ্যে থাকা একটি সমাজ আক্ষরিক অর্থে পরস্পর খুব কাছাকাছি থাকলেও কর্মজীবী মানুষের জীবন এতে থমকে গেছে। তবে ঘরবন্দি থাকা মানুষের মধ্যে ভীতি, উদ্বেগ, বিরক্তি এবং নানাবিধ বিড়ম্বনা থাকলেও কিছু কাজের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা কখনো এড়িয়ে যায়নি। আর সেটি হলো করোনাভাইরাস মহামারী এবং এটি কীভাবে আগামীর বিশ্বকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।

করোনা মহামারীর মধ্যে বর্তমান বিশ্বের অনেক সরকার জনগণের নিত্যদিনের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় খুব ভালোভাবে যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে আমরা কোথায় যাব, কার সঙ্গে সাক্ষাত্ করব এসব বিষয়সহ আমাদের খামখেয়ালিপনাকে নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকদের রক্ষার কাজটি বেশ ভালোভাবেই করছে। কারণ আমরা জানি, এ সময়ে অন্যের সংস্পর্শে আসাটা নিজেদের অস্তিত্বের জন্যও কতটা বিপজ্জনক। এছাড়া পার্কে হাঁটা-চলাফেরার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে জরিমানা এমনকি জেল দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি করোনার এ সময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে অন্যের সংস্পর্শে আসাটা পুরো সমাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

প্লেগ কীভাবে মানুষের মধ্যে তার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মুছে দিয়েছিল, সেটি কামুর পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এ সময়ে মানুষ তার দুর্বল জায়গা এবং ক্ষমতাহীন অবস্থানের বিষয়গুলো নিয়ে আরো বেশি সচেতন হয়েছে। প্রত্যেকেই মনে করে, মৃত্যু তার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। আর এ কারণেই মহামারী-পরবর্তী পৃথিবীতে তিনি নিজেকে মৃত্যুঞ্জয়ী বলে দাবি করতে পারেন।

কিন্তু কথা হলো প্লেগের মতো করোনা আমাদের স্মৃতিতে কতদিন স্থায়ী হতে পারে। আমরা কি এটা দিবাস্বপ্ন হিসেবে আরো কয়েক বছর মনে রাখব? বিষয়টি রুশ-আমেরিকান কবি ও লেখক জোসেফ ব্রুডস্কাইয়ের ভাষায় বলা যেতে পারে। তিনি তার লেখনীতে এক কয়েদির জেলখানার স্মৃতিচারণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন; যেখানে বলা হয়েছে, জেলখানায় দীর্ঘ সময় থাকলেও যেহেতু তার সীমাবদ্ধতা অল্প জায়গার মধ্যেই ছিল। সে কারণে জেলখানার দিনগুলো বা ঘটনা ধরে রাখার মতো জায়গা তার স্মৃতিতে নেই। ঠিক করোনার সময়টাও এমন। দীর্ঘদিন ধরে এটির ব্যাপ্তি থাকলেও ঘরবন্দি মানুষের কাছে এটি কতটা স্মৃতিময় হয়ে থাকতে পারবে?

বিজ্ঞানবিষয়ক লেখিকা লরা স্পিনি তার ‘পেল রাইডার’ বইয়ে বলেছেন, একটি মাত্র কারণে মৃত্যুর মিছিলের পরিসখ্যানে ১৯১৮-১৯২০ সালে সৃষ্ট মহামারী স্প্যানিশ ফ্লু ছিল বিশ শতকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক ঘটনা। এ মহামারীতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ছাড়িয়ে যায়। এমনকি দুটো বিশ্বযুদ্ধে মিলে মোট মৃত্যুর সংখ্যাও অতিক্রম করে স্প্যানিশ ফ্লু। স্পিনির মতে, স্প্যানিশ ফ্লুর এমন ভয়াবহতার পরও যদি মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হয়, বিশ শতকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়কর ঘটনা কোনটি, তাহলে দেখা যাবে, অধিকাংশ মানুষই স্প্যানিশ ফ্লুর নাম বলতে পারবে না। এর চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ইতিহাস থেকেও যেন এ ট্র্যাজেডি মুছে ফেলা হচ্ছে। বিষয়টি বোঝা যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি ক্যাটালগ ওয়ার্ল্ডক্যাটের একটি হিসাব থেকে। যেখানে দেখা যাচ্ছে ২০১৭ সালে ওয়ার্ল্ডক্যাট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর ৮০ হাজারেরও বেশি বই সংগ্রহ করে, যেগুলো ৪০টির ভাষায় অনূদিত ছিল। এর বিপরীতে স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে এ সময়ে মাত্র ৪০০ বই সংগ্রহ করা হয়, যেগুলো আবার মাত্র পাঁচটি ভাষায় অনূদিত। যেখানে মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় স্প্যানিশ ফ্লুতে পাঁচ গুণ বেশি মানুষ মারা গিয়েছে, সেখানে সে বিষয়টির ইতিহাস সংরক্ষণে বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় ২০০ গুণেরও কম বইয়ের সংগ্রহ। এটি কীভাবে হতে পারে?

মহামারী আমাদের অর্থনীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রভাব ফেলে। এর পরও কেন আমরা যুদ্ধ ও বিপ্লব মনে রাখি আর মহামারী ভুলে যাই?

এ বিষয়ে স্পিনির উত্তর হলো মহামারীকে একটি ভালো ও খারাপ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ফেলে কোনো গল্প দাঁড় করানো কঠিন। গল্পের প্লট অথবা নৈতিকতার বিষয় না থাকায় মহামারী আমাদের কাছে নেটফ্লিক্সের ওয়েব সিরিজের মতো মনে হয়, যেখানে একটি সিজনের পর বিরতি নিয়ে পরের সিজন আসে। মহামারীর অভিজ্ঞতা কেবল এতটুকুই থাকে যেন সবকিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু আবার কিছুই ঘটেনি। বর্তমান সময়ে সভ্যতা রক্ষার্থে আমরা মানুষকে ঘরে থাকতে বলছি এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার উপদেশ দিচ্ছি। তবে দিন শেষে আধুনিক সময়ের উপন্যাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সবকিছুই ব্যক্তির মনের মধ্যে ঘটমান কর্মকাণ্ড। যেমন কভিড-১৯-এর এ সময়ে নিজের জায়গা থেকে বললে আমার স্মৃতিতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় সেটি হলো বিমানের টিকিট, যেটি কখনো ব্যবহার হয়নি। আর ফেস মাস্ক, যেটি বারবার এবং বারবার ব্যবহার হয়েছে।

আবার ক্ষণিকের জন্য হলেও শহরের সড়কগুলোর দিকে নজর দিলে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারবে, করোনায় চারপাশে কতটা পরিবর্তন এসেছে। যেমন নিজের দিক থেকে যদি বলি তাহলে ভিয়েনা ও সোফিয়ায় আমার প্রিয় কফিশপগুলো, ওয়াশিংটন ডিসির বইয়ের দোকানগুলো বন্ধ রয়েছে। নিউট্রন বোমার মতো কভিড-১৯ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বড় আঘাত হেনেছে। যদিও বাস্তবিক পৃথিবীতে এটি কোনো ধ্বংসযজ্ঞ চালায়নি। কিন্তু ২০২০ সালের কথাই যদি বলি। দেশে দেশে বিমানবন্দরগুলো যেন সবচেয়ে বেশি অসহায়ত্বের রূপ নিয়েছে। ফাঁকা, কোলাহলহীন বন্দরে কেবল কিছু মানুষ যেন ভূতের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটি ছিল নিয়মিত দৃশ্য। এছাড়া তিন দশক ধরে বিশ্বের আনাচে-কানাচে স্বাধীনতা আন্দোলন বেড়েছে। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে এসব আন্দোলন একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্ক তৈরি করেছিল, যা বিশ্বায়নের এ সময়ে শক্তিশালী একটি প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। কিন্তু করোনার এ সময়ে স্বাধিকার এসব আন্দোলন যেন ইতিহাস হয়ে রয়েছে অথবা একটি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য থমকে গেছে।

অন্যদিকে করোনার মধ্যে বিশ্বজুড়ে সরকার মানুষকে ঘরে থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে। করোনা ঠেকানোর পাশাপাশি এটির কিন্তু একটি রূপক অর্থও করা যায়। আর সেটি হলো খারাপ সময়ে প্রিয়জনের পাশে থাকা। মানুষ যখনই ভয়াবহ কোনো বিপদের মুখোমুখি হয়, তখনই সে ঘরে ফিরতে চায়। কাছের মানুষের আরো কাছে থাকতে চায়। যেমন আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা যখন একে অন্যকে বুঝতে পারলাম যে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছি, তখনই আমরা সবাই বুলগেরিয়ায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। বিষয়টি কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে হওয়ায় কিছুটা আশ্চর্যও বটে। যদিও যৌক্তিক দিক বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত মোটেই সঠিক ছিল না। আমরা এক দশক ধরে ভিয়েনায় বসবাস ও কর্মরত রয়েছি। আমরা এ শহরকে অনেক ভালোবাসি এবং অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বুলগেরিয়ার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। তাহলে এর পরও কেন আমরা বুলগেরিয়ায় ফিরেছিলাম? এর সোজাসাপ্টা উত্তর ছিল আমরা ঘরে থাকতে চেয়েছিলাম। অর্থাত্ জন্মস্থান, বেড়া ওঠার জায়গা বুলগেরিয়ায় থাকতে চেয়েছিলাম। কারণ আমরা যেকোনো সংকটের সময় কাছের মানুষগুলোর পাশে থাকতে চাই। আমরা এমন জায়গায় থাকতে চাই যেখানে আমাদের বেড়ে ওঠা, যেখানকার চারপাশ সম্পর্কে আমরা অনেক ভালো জানি। শুধু আমরা একাই ফিরে আসিনি বরং জন্মস্থানের সম্পর্কের টানে বিদেশে অবস্থান করা দুই লাখের মতো বুলগেরিয়ান এ সময়ে দেশে এসেছে।

সংকটময় সময়ে কাছের মানুষের কাছে আসা, নিজ দেশে ফিরে আসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এটি হলো নিজ ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ ও সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া। আর এ কারণেই অনেক মানুষ সংকটের সময় নিজ দেশেই আশ্রয় নিয়ে নির্ভার থাকতে চায়। যেকোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে অবচেতনমনেই নিজ ভাষায় কথা বলে থাকি। এটি আমাদের একটি সহজাত প্রবণতা।

তবে এটাও ঠিক যে বিশ শতকের শুরুর দিকের বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির অগ্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। মোবাইলসহ অন্যান্য প্রযুক্তির বিকাশের কারণে মানুষ এখন এক জায়গায় থেকে প্রকৃত অর্থেই সর্বজনীন উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে। এ কারণেই মানুষ বিশ্বের যেখানেই বসবাস করুক, সে এখন চাইলেই সবার সঙ্গে একত্রে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারবে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট যে শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই কনিসবার্গ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও তিনি কখনো তার সেই শহর ছেড়ে যাননি। কান্টের মতো কভিড-১৯-এর সময়েও বিশ্বায়নের সংজ্ঞা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্ব এখন যেন আরো বেশি বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেলফ আইসোলেশন ও সোস্যাল ডিস্ট্যান্স ইউরোপীয়দের মন যেন আরো বেশি উদার করেছে। ইইউর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া, লকডাউন এক অর্থে মানুষকে ঘরবন্দি রাখলেও কার্যত এটি মানুষকে আরো বেশি কাছে আনতে সক্ষম হয়েছে। যাদের মাঝে যোগাযোগের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বেশি রয়েছে, তাদের জন্য কভিড-১৯ কেবল বৈশ্বিক নয় বরং স্থানীয়করণও করতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট করে এভাবে বলা যায়, ঘরবন্দি থাকা অবস্থায় আমাদের মাঝে কে বেশি সবচেয়ে কাছে ছিল, যে আমার প্রতিবেশী তিনি? না বিদেশে অবস্থানরত আমাদের স্বজনরা? নিশ্চয় স্বজনরাই আমাদের কাছে ছিল। কারণ প্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিবেশীর তুলনায় তাদের আরো বেশি আমাদের কাছে এনেছে। সে কারণেই রাস্তার মানুষের তুলনায় আমরা টিভিতে যেকোনো অনুষ্ঠান ঘোষণাকারীকে আমাদের কাছের মানুষ বলে ভাবি।

সম্ভবত ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা যে বিশ্বের সবাই এখন করোনা মহামারীর মতো একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। আমরা সবাই এখন আমাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করছি। বাসায় থেকে আমরা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আরো অনেক বেশি স্ক্রিনের সামনে থাকছি। এতে আমরা একে অন্যের মধ্যে সামঞ্জস্য ও অভিজ্ঞতার বিষয়গুলো জানতে পারছি। তবে সব মিলিয়ে করোনাকালীন এসব ঘটনা হয়তো ইতিহাসে ছোট একটি মুুহূর্ত হয়ে থাকবে। তবে দিন শেষে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে আমরা সবাই এক পৃথিবীতে বসবাসের বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হয়েছি।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 ইভান ক্রেস্তেভ: চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর লিবারেল স্ট্র্যাটেজিস, সোফিয়া, ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সায়েন্সেস, ভিয়েনা

ভাষান্তর: আল আমিন হুসাইন