সিঙ্গাপুর কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চল তাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন এবং সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে সক্ষম হয়েছে।
এক্ষেত্রে তারা তাদের অভ্যন্তরীণ কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তিরও উন্নয়ন ঘটিয়েছে।
বর্তমানে আসিয়ান (অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস) এবং আরো তিনটি দেশ—এ সংঘের ১০টি সদস্য দেশের সাথে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত হয়েছে—তাদের সাফল্য নিয়ে গর্ব করতে পারে।
মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জিডিপির অংশ, জনশক্তির উন্নয়ন ও বিশ্ববাণিজ্যে উত্তরোত্তর অংশগ্রহণে এ অঞ্চলে রুদ্ধশ্বাস অর্থনৈতিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
অত্যন্ত দক্ষ ও সীমিত খরচের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে অঞ্চলটি ‘বিশ্বের কারখানা’য় পরিণত হয়েছে।
তুলনামূলক জটিল পণ্য কম খরচে বিশেষায়িত উপায়ে এবং কিছু নির্দিষ্ট অর্থনীতির জন্য লাভজনক ব্যবস্থায় তা উৎপাদন এ সাফল্যের মূল।
পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদার সাথে মিলিয়ে পর্যাপ্ত জোগান দেয়ার মাধ্যমে ব্যবসায় তারা এগিয়ে গেছে।
এ প্রবৃদ্ধি কৌশল এমনকি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির মতোই কার্যকর ও টেকসই।
কিন্তু এখন গভীরভাবে আঞ্চলিক একীভূতকরণ ও বিশ্বায়নে পরিবর্তিত আরো কঠিন পরিস্থিতিতে আসিয়ান ও তিনটি দেশের অর্থনীতিকে অবশ্যই এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে।
কভিড-১৯ অতিমারী এসে সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করে পরস্পর নির্ভরশীল বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থবির করে ফেলেছে, যার মধ্যে অনেক দেশকে এ বছর গভীর মন্দা মোকাবেলা করতে হবে।
এ অতিমারী আমাদের দেখিয়েছে যে সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাধাগ্রস্ত হলে তা একটি শিল্প ব্যবস্থাকে পুরোপুরিভাবে বা আংশিক বন্ধ করে দিতে পারে।
কিছু নির্দিষ্ট দেশের সরবরাহ করা খাদ্য, চিকিত্সাসামগ্রী, ওষুধ ও কাঁচামালের পাশাপাশি নিজস্ব নানা উৎপাদনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শঙ্কিত করে ফেলেছে।
ফলে জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবা যথাসম্ভব অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় উৎপাদন ও গ্রহণ করার উপায় খুঁজছেন।
যেসব দেশের বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে, তারা স্বনির্ভরতার যুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে পারবে বা অতিমারী-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুরবস্থার কথা ভেবে তা করতে বাধ্য হবে।
অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বা সরবরাহ ব্যবস্থার আঞ্চলিকীকরণের মাধ্যমে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে তৈরি হওয়া বিশ্বায়নবিরোধী হাওয়া আরো জোরদার হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি আঞ্চলিক ব্লকে ভাগ হয়ে যাবে।
ফলে বর্তমানে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোরকে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে হবে।
এমতাবস্থায় বিস্তৃত পর্যায়ে এ পুনর্গঠন সম্পাদনের ফলে সবাই কিছু জটিলতার সম্মুখীন হবে।
উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং দুঃখের বিষয়, বাহ্যিক নানা চাপে অর্থনীতি আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো দেশ বা অঞ্চল যা কভিড-১৯-এর চেয়ে কম সংক্রামক কিন্তু মারণ ক্ষমতার রোগে আক্রান্ত হলে বিশ্বায়নবিরোধী পৃথিবীতে এর উৎপাদন ব্যবস্থা পুনর্গঠন দুরূহ হবে।
অন্তর্মুখী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কোনো সমাধান আনবে না।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা বা সংকট নিরসনের লক্ষ্যে বিশ্বায়ন বাড়ানো প্রয়োজন, কমানো নয়।
ওষুধ ও এর কাঁচামালের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদে বেশির ভাগ পণ্য ও কাঁচামালের জন্য দেশগুলো অন্য দেশের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করতে পারে।
এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু দেশ ও উেসর বাইরেও নিজেদের চাহিদার জোগান খোঁজা এবং সংরক্ষণের চেষ্টা করা জরুরি।
সিঙ্গাপুর যেভাবে বিচিত্র পদ্ধতির খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, সেটিকে লক্ষ্য করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে স্থিতিস্থাপকতা রক্ষা মূলনীতি হওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে ২০০৮ সালের মন্দা-পরবর্তী সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অর্থনীতি দারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়, আসিয়ান ও তিনটি দেশের অর্থনীতি তখন অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে স্থিতিশীলতা ও অভিযোজনের প্রমাণ রেখেছে।
ফলে ২০০৮-১৫ সালের মধ্যে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির ওপর বৈদেশিক চাহিদা—জিডিপিতে রফতানির প্রভাব দেখে বোঝা যায়—উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়।
যা হোক, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক জিডিপিতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অবদানের অনুপাত কমার ফলে বিশ্বায়ন থেকে সরে না এসে বরং একটি নতুন ভারসাম্য অবস্থার মধ্য দিয়ে এসেছে।
বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে উৎপাদন অঞ্চল অনুসারে অনেক পণ্যের সরবরাহ দীর্ঘায়িত হয়েছে।
আসিয়ান ও তিনটি দেশের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় স্বল্প খরচে পণ্য উৎপাদনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গিয়ে ভোক্তাদের মুনাফায় অবদান রাখে।
তদুপরি ২০০৮-পরবর্তী এক দশকে পরিষেবার ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থার বিশ্বায়ন খুবই দ্রুত সংঘটিত হয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্নতির কারণে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের খরচ কমার মধ্য দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার চাহিদা অত্যন্ত বেড়ে গিয়ে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ব্যবসার সুযোগ বেড়ে যায়, যা ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে মুনাফা করার সুযোগ করে দেয়।
একইভাবে আরো সাশ্রয়ী আকাশ ভ্রমণের কারণে বৈশ্বিক পর্যটন খাতও বড় লাভের মুখ দেখেছে।
এখন প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটন ব্যবস্থা কিছু কারণে খানিক জটিল অবস্থা সৃষ্টি করলেও পর্যটকের চাহিদা অনুসারে সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম।
আসিয়ান ও তিনটি দেশের এ অপ্রতিদ্বন্দ্বী উন্নতি কোনো অপ্রত্যাশিত বিষয় ছিল না।
সবল সামষ্টিক অর্থনৈতিক মূলনীতির পাশাপাশি উপযুক্ত কোষাগার ও অর্থনৈতিক অংশের বৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়িয়ে এ অঞ্চলকে সংকটের মধ্য থেকে দ্রুততার সাথে বের করে নেয়া নীতিনির্ধারকদের জন্য সহজ হয়েছে।
একই রকম পদক্ষেপ বর্তমানে প্রয়োজন।
যদিও কভিড-১৯-এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং এর ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির ত্রুটিগুলো প্রকট।
তবু এ মুহূর্তে উৎপাদন ও সরবরাহে আঞ্চলিকীকরণ করার বিষয়টি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে আসবে।
তার বদলে সরবরাহ ব্যবস্থার এ দুর্বলতা দূরীকরণের জন্য বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করার সাথে সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উৎপাদনের উত্স-বৈচিত্র্য বাড়িয়ে স্থিতিশীলতা তৈরি এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান, সংঘ তৈরি করার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন প্রয়োজন।
এ পদক্ষেপগুলো পরবর্তী কোনো সংকটের সময়ে সংকট মোকাবেলায় সরকারগুলোর প্রস্তুতি ও সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বিশেষত আসিয়ান ও এর সঙ্গে যুক্ত তিনটি দেশের জন্য এ ফলাফল বিশেষভাবে সহায়ক হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
হো-ই খর: আসিয়ান+৩-এর সামষ্টিক অর্থনীতি গবেষণা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের ভূতপূর্ব সহকারী পরিচালক
ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান





