দরিদ্রদের অর্থ দেয়ার জন্য যারা ধনীদের ওপর করারোপের পক্ষে, তাদের এ ধরনের পুনর্বণ্টন কেন অর্থহীন নীতি তা নিয়ে বাজে কিছু ব্যাখ্যা শুনতে হয়।
কারণ ধনী ব্যক্তিরা প্রকৃত অর্থে ধনী হলেও দরিদ্রদের সহায়তা হয় এমন কর দেয়ার মতো খুব কম লোকই আছে।
কিন্তু এর বিপরীত প্রক্রিয়া সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানে।
প্রত্যেকের কাছ থেকে পয়সা নেয়া হয়—এ রকম ঊর্ধ্বমুখী বণ্টন অল্প কিছু ব্যক্তিকে খুব ধনী করে তোলে।
একচেটিয়া ব্যবসায়ী ও মালিকরা ঠিক এ কাজটিই করেন।
তারা ভোক্তাদের ওপর বাড়তি মূল্য নির্ধারণ করে, কর ফাঁকি দেয় এবং রাজনীতিবিদদের অর্থ দেয়, যারা অল্প কয়েকজনকে সুবিধা দেয়ার জন্য অনেকের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়াটিকে রক্ষা করে।
সবচেয়ে খারাপ কথা ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচন এ ধারা অব্যাহত থাকারই নিশ্চয়তা দিয়েছে।
কভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি অনেক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
এখানে লাভের ভাগ শূন্যের কাছাকাছি হলেও বিনিয়োগকারীদের অধিক লাভ পাওয়ার জায়গা খুব কমই আছে।
এটি পুরোপুরি বোধগম্য যে ফাইজারের ভ্যাকসিন ৯০ শতাংশ কার্যকর, এ ধরনের ঘোষণার পর শেয়ারবাজার বিষয়টি উদযাপন করবে।
সমস্যা হলো শেয়ারবাজার ভবিষ্যতের সমস্ত জাতীয় আয়ের উত্স নয়।
এটি কেবল সেই অংশের সাথেই যুক্ত যা থেকে লাভ হয়।
জাতীয় আয়ের যেকোনো স্তরে মুনাফা বেড়ে গেলে বা শ্রমের দাম কমে গিয়ে শেয়ার বাড়লে শেয়ারবাজার আরো ভালো করবে।
১৯৭০-এর দশক থেকে মার্কিন জাতীয় আয়ের বেতনের অংশ সংকুচিত হয়ে আসছে।
মহামারী শুরুর পর থেকে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পনি ব্যতিক্রমীভাবে ভালো করে চলেছে।
অন্যদিকে অনেক ছোট কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেছে।
তাই যেদিন ভ্যাকসিন বিষয়ে সুখবর পাওয়া গেল, সেদিন ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজে প্রায় ৩ শতাংশ দাম বেড়েছিল, অন্যদিকে প্রযুক্তি কোম্পনির আধিপত্য থাকা নাসডাকে প্রায় ১.৫ শতাংশ দরপতন হয়েছিল।
যখন কেউ ভাবে যে কীভাবে মহামারীটি শ্রম থেকে দূরে সরে পুঁজির প্রতি জাতীয় আয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে, তখন এই বিকৃত গতিশীলতা অর্থবহ হয়।
কেবল শ্রমিকদের চাকরিই হারিয়ে যাচ্ছে না কিংবা অরক্ষিত হচ্ছে না, ছোট ব্যবসাগুলোও ক্রমবর্ধমান বড় ব্যবসায়গুলোর কাছে মার খেয়ে যাচ্ছে।
বিপরীতে এই অগ্রগতি বাজারকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলছে।
এগুলো তাদেরই সুবিধা দিচ্ছে যাদের পরিচিতি ও সুনির্দিষ্ট ভাতা রয়েছে।
অন্যদিকে খুচরা বাজার, সেবামূলক কাজ ও বিনোদন পেশার কর্মজীবীরা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছেন।
ডেমোক্রেটিক পার্টি যদি হোয়াইট হাউজে বিজয়ী হওয়া ও হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসকে ধরে রাখার পাশাপাশি সিনেটে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করত, তবে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এ সিস্টেমকে পরিবর্তন করার সুযোগ থাকত।
আমেরিকান পরিবারগুলোতে মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেমের লুণ্ঠন স্বাস্থ্য বীমার জন্য জনসাধারণের বিকল্প দ্বারা যাচাই করা যেতে পারে, এমনকি যদি আরো মৌলিক বিকল্প (যেমন ‘সবার জন্য মেডিকেয়ার’)
নাগালের বাইরেও থাকে।
নিয়োগকর্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, যার অর্থায়ন শ্রমিকদের জন্য চাপ তৈরি করে, সাধারণ করের আয়ের মাধ্যমে অর্থায়নকৃত একটি ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপন বা পরিপূরণ করা যেতে পারত।
তদুপরি যদি ডেমোক্র্যাটরা আরো ভালো কাজ করত, তাহলে বড় প্রযুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে অ্যান্টিট্রাস্ট আইনে অর্থবহ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হতো।
জলবায়ু আইন পাস করার জন্য অন্ততপক্ষে কিছু সুযোগ থাকত।
অ্যান্টিইউনিয়ন আইনের কার্যকারিতা সম্ভবত ধীর বা বিপরীত হয়ে গেছে।
তবে এখন যারা বাইডেনকে তার জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাতে ইচ্ছুক ছিলেন এমন কিছু রিপাবলিকান কংগ্রেশনাল, এমনকি কিছু কেন্দ্রীবাদী ডেমোক্র্যাটও ‘গ্রিন নিউ ডিল’
বা স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের মতো ‘সমাজতান্ত্রিক’
পদক্ষেপের বিরোধিতা করবেন।
এছাড়া আদালতগুলোও ব্যবসাবান্ধব এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকবেন।
গর্ভপাতের বিষয়টির ব্যাপারে ইদানীং খুব মনোযোগ দেয়া হয়েছে।
তবে এটা মনে রাখা দরকার যে সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি আইনি ব্যবস্থারও প্রধান, যা বণ্টনের বিষয়ে খুব কম বা একেবারে বিবেচনা ছাড়াই অর্থনৈতিক সক্ষমতার পক্ষে রায় দেন।
অর্থনীতিবিদরা এর জন্য একটি বড় দায় বহন করেন।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মহাহতাশায় পুঁজিবাদের ব্যর্থতা কেইনসিয়ানবাদকে রাষ্ট্রের জন্য এর ভূমিকাসহ ব্যাপক বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছিল।
তবে এর পরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে ফ্রেডরিক ফন হায়ক কর্তৃক সূচিত একটি প্রতিবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল এবং মিল্টন ফ্রিডম্যান ও তার সহকর্মীদের হাত ধরে এটি শীর্ষচূড়ায় পৌঁছেছিল।
এটি এ বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে যে রাষ্ট্রেরও সমস্যা রয়েছে।
জর্জ স্টিগলার আমাদের অধিগ্রহণের নিয়ম শিখিয়েছেন।
জেমস বুচানান দেখিয়েছিলেন যে রাজনীতিবিদরা সর্বদা জনস্বার্থে কাজ করবেন এ আশা করা যায় না এবং রোনাল্ড কোয়েস দেখিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করেই বাহ্যিক উন্নতি সাধন করা যায়।
দুর্বলভাবে ফ্রিডম্যান বলেছিলেন যে বৈষম্য কোনো সমস্যা নয় এবং কার্যকর করারোপের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে বিচারপতি রিচার্ড পোজনার এ ধারণাগুলো বিচার বিভাগে আনতে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ন্যায়বিচারের জন্য সমাজকে তার মোট সম্পদ সর্বাধিক বাড়াতে হবে।
তিনি ভোক্তাদের বদলে উৎপাদনকারীদের এবং দরিদ্রদের বদলে ধনী ব্যক্তিদের পক্ষে থাকার পরামর্শ দেন।
এতে অসমতাকে অসমস্যাজনক মনে করা হয়েছে, এটাকে আদর্শ সমাজের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।
ন্যায়বিচারের এ ধারণা অসংগত হিসেবে স্বীকৃত হতো যদি এটি মার্কিন আদালতগুলো নিয়মিত প্রয়োগ না করতেন।
এতদিন ধরে এ ধারণাগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত ফসল ঘরে তোলার পর পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে।
কেইনসিয়ান-উত্তর প্রতিবিপ্লবের সমস্ত ধারণা প্রত্যাখ্যান করে নয়, বরং সেগুলোর ভেতর ও বাইরে সংস্কার করে এটা করতে হবে।
পুঁজিবাদের আরো উদ্ভাবনী ও প্রতিযোগিতামূলক গঠনে ফিরতে আমাদের রাষ্ট্রকে দানবিকীকরণ থেকে দূরে রাখতে হবে।
বর্তমানে আমাদের যে সিস্টেম রয়েছে তাতে অল্পসংখ্যক লোক অধিক মানুষের অর্থ নিয়ে সমৃদ্ধ হয়।
স্নাতক ডিগ্রিবিহীন দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকানের জীবনের চাহিদা কমছে।
কারণ ওষুধ কোম্পানিগুলোকে মুনাফার জন্য মানুষকে মাদকাসক্ত ও হত্যা করার জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল।
পূর্বে প্রশংসিত বিশ্বের বৃহত্তম কিছু কোম্পানি নিয়মিতভাবে কর প্রদান করা এবং তাদের লালন-পালনকারী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাচ্ছে, যেগুলো ছাড়া তাদের অস্তিত্ব থাকে না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্থান তার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব কর্তৃক সরকারি সম্পত্তির লুণ্ঠন ও পুঁজিবাদের নিষ্ঠুরতা কমাবে।
তবে এটি কোনো ভাঙা ব্যবস্থাকে ঠিক করবে না।
আমেরিকান পুঁজিবাদের উদ্ভাবন ও কল্যাণকে উত্সাহিত করার অসীম সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বর্তমানে এর ত্রুটিগুলো আক্ষরিক অর্থেই অনেক আমেরিকানের জীবনকে বিপন্ন করছে।
রেন্ট সিকাররা সম্ভবত এখনকার মতো ভবিষ্যতেও দেশের ভালোর জন্য অনেক বেশি শক্তিশালী থাকবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
আঙ্গাস ডিটন: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ
ভাষান্তর: হাসান তানভীর





