মহান ৭ মার্চ, ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স মাঠে লাখ লাখ জনতা তথা বাঙালির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তার মধ্যে যে কথার তাত্পর্য বোঝার ছিল— ‘... আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের, কাছে আমার অনুরোধ রইল— প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ অসহযোগে সাড়া দিলেন। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, বাংলার বড় শিক্ষিত সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যাঁরা বাংলার সম্পদ তখন বেশি ভোগ করছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই এ উক্তি বোঝেননি অথবা চরম স্বার্থপরতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু শেষরক্ষা তাঁদের হয়নি। তখন দেখেছি, নিপীড়িত দরিদ্র শ্রেণীর বাঙালিই সচেতন হয়েছিলেন এবং তাঁরা যেকোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এ কথার প্রমাণ পরে হবে।
২৬ তারিখ সকালবেলার কথা, ২৫ তারিখ দিনগত রাতে চট্টগ্রাম ইপিআর ওয়্যারলেসের মেসেজ শোনার পর থেকেই ব্যাপারটা অনুধাবন করি: আর উপায় নেই, চূড়ান্ত সংগ্রাম শুরু হয়েছে। সিগনাল বেতারের মাধ্যমে সারা বাংলার খবর নিচ্ছি ভালো, মনে হচ্ছে সবই আমাদের অনুকূলে। তখন রাজশাহী সেক্টর হেডকোয়ার্টারে বেতার শাখার ২০ জনসহ যারা সাধারণ বাঙালি সৈনিক ছিলাম, আমরা সবাই নিরস্ত্র। অসহায়ভাবে শুনছি আর চোরের মতো চিন্তা করছি— কী করা যায়? এখন পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের ওপর কোনো আক্রমণ করেনি। তবে রাজশাহী সেনানিবাসে অবস্থিত ২৫ পাঞ্জাব পাকিস্তানি মিলিটারি আওয়ামী লীগের লোকদের শহর থেকে মধ্যে মধ্যে ধরছে এবং টহল দিচ্ছে।
গত দুদিনে আমার সহকর্মী বন্ধু আমীনউল্লাহর সঙ্গে পরামর্শ করে রাজশাহী পুলিশ সুপারের কাছে তিন-তিনবার লোক পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, পরিস্থিতি পরিষ্কার, আমাদের লোকসংখ্যা কম, কাজেই তিনি যদি তাঁর পুলিশ বাহিনীকে আমাদের সঙ্গে দেন, তাহলে আমরা আমাদের অস্ত্রাগারের অস্ত্র-গোলাবারুদ হাত করে যুদ্ধ চালাতে পারি। নয়তো চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে অগ্রসর হয়ে বাঙালি ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে পারি। কারণ সীমান্ত থেকে কুকুরদের শেষ করে ক্রমে এগিয়ে আসছে রাইফেলসের বাঙালি সৈনিকরা। এসপি সাহেব অনেক বেতন পান, দুনিয়ার অনেক কিছু ভোগ করেছেন। এত আরাম নষ্ট করে, কষ্টের মধ্যে, দায়িত্বের মধ্যে তাঁর পক্ষে যাওয়া কি সম্ভব? তাই তো তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের কাজ তোমরা করো, শেখ সাহেব তো এমন কথা বলেন নাই।’ যতটুকু মনে পড়ে, সিলেটি এক ব্যক্তি এসপি ছিলেন। তবে আমার মনে হয়, এজন্য দায়ী বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির বিশ্বাস। তিনি মনে করেছিলেন, পুরো বাঙালি যখন তাঁকে ভোট দিয়েছে এবং তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে অসহযোগ আন্দোলন করেছে, কাজেই বাকিটুকু করার জন্য বলার প্রয়োজন নেই। যে যুদ্ধই হোক না কেন, তা হলো— রাজনীতির পরিণাম। কোনো ধর্ম বা কোনো নীতি এ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি উপযুক্ত নেতৃত্ব, সংগঠন, ত্যাগ ও ধৈর্য ছাড়া। ফলাফল কী হতো জানি না, তবে এসব যদি পূর্ণমাত্রায় আমরা পেতাম তাহলে হয়তো এ মুক্তিযুদ্ধের, এ স্বাধীনতার রূপ আজ অন্য রকম হতো। রাজশাহীর এসপি সাহেবের কথা যা-ই হোক, আমি নিজে পুলিশ লাইনে গিয়ে নিম্নপদস্থ সবাইকে বলে এলাম যে, তাঁদের অফিসার দ্বারা কাজ হবে না। আমাদের ওপর মার পড়বেই, সে আজ হোক আর দু-একদিন পরে হোক। কাজেই যদি আমাদের ওখানে কোনো গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান, তাঁরা যেন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন।
এ সময় একদিন ইপিআর রাজশাহী সেক্টর হেড কোয়ার্টারের অ্যাডজুটেন্ট পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইসহাক বাঙালি সৈনিকদের সরে যেতে বলেন। তিনি সিগনাল অফিসেও এসে আমাদের পালিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। চলমান পরিস্থিতিতে দুঃখও প্রকাশ করেন। তাঁর সতর্ক উপদেশের জন্য অনেক সৈনিকের জীবন রক্ষা পায়। রাজশাহীর আঞ্চলিক রেডিও কেন্দ্র আমাদের সিগনাল অফিসের সামনে, যেখানে মিলিটারি ও পুলিশ পাহারা ছিল। ক্যান্টনমেন্টের সঙ্গে আমাদের বেতার যোগাযোগ তখনো আছে। ২৭ তারিখ অনুমান বেলা ৩টার কিছুক্ষণ আগেই আমি দেখে এসেছি, স্থানীয় সাধারণ লোকেরা পুলিশ লাইনের পাশেই সরকারি সড়ক কেটে রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করেছে। আমাদের ব্যারাকের লাইনে বসে দেখলাম রেডিও বিভাগের একজন বাঙালি ডিরেক্টর ওই রাস্তা দিয়ে জিপে করে এসে বেতার কেন্দ্রের গেটে নামলেন। নেমে সোজা ভেতরে ঢুকলেন। মিনিট পাঁচেক পরে দেখি, তিনি ছাদের ওপর অবস্থান নেয়া পাকিস্তানি সেনাদের বেতার অপারেটরের সঙ্গে খুব ব্যস্ততার সঙ্গে কী যেন আলাপ করছেন। কিন্তু অপারেটরের কোনো ভাবান্তর না দেখে সাহেব নিচে গেলেন এবং কয়েক মিনিট পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন সুবেদারকে সঙ্গে করে বাঙালি সাহেব আবার উঠে এলেন। এবার সুবেদার নিজে বেতারযন্ত্রে কথা বলল। সুবেদার কথা বলার ৮-১০ মিনিট পরই দেখি, অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের দুটি গাড়ি পুলিশ লাইনের দিকে দ্রুতবেগে ছুটে গেল। ১ মিনিটও পার হয়নি, শোনা গেল হালকা চীনা মেশিনগানের গুলির আওয়াজ; সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ লাইন থেকে রাইফেলের গুলির জবাব শুনলাম। আমি বোকা হয়ে গেলাম। তবে কি পুলিশ আমার কথায় গুরুত্ব দিয়ে এ কাজ শুরু করেছে? কিন্তু যেভাবে আমি বলে এসেছিলাম, ব্যাপারটা তো তা নয়। এ অবস্থায় কিছু করারও ছিল না, উপায় নেই, চুপ করে রইলাম। কারণ আমার সম্বল মাত্র ৬টি ৩০৩ রাইফেল, ১২০টি বুলেট ও ৩টি স্টেনগানসহ ৫৪টি গুলি। রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত গুলিবিনিময় চলল। দেখলাম, পাকিস্তানি সেনাদের কত রকম যুক্তি-পরামর্শ। তখন পর্যন্ত পুলিশ যা করেছে, তার প্রশংসা না করলে পাপ হবে। বাঙালি যে বীর, ধৈর্যশীল, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেলাম। বাঙালি শুধু মরতে বা রক্ত দিতেই নয়, বরং অসহায় দরিদ্র বাঙালি আজ মারতেও শিখেছে। রাতেই পুলিশ লাইনের সব ঘটনা বেতারে নওগাঁর ক্যাপ্টেন গিয়াসকে জানালাম, সেই মুহূর্তে তাঁর তরফ থেকে কোনো উপদেশ বা সাড়া পাওয়া গেল না।
এই তারিখেই ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ নামে চট্টগ্রামের একটি রেডিও স্টেশন থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়ার একটি ইংরেজি ভাষণ শুনলাম। বুঝলাম যে, আমাদের জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তিনি নিজে প্রাদেশিক কমান্ডার ইন চিফ হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার একটা ঘোষণা পাঠ করলেন। এ ঘোষণা শোনার পর মনে নতুন আশার সঞ্চার হলো। তাহলে শুধু ইপিআর বাহিনীই নই, আমাদের সঙ্গে বেঙ্গল রেজিমেন্টও আছে।
পরদিন সকাল গেল, দুপুরে জানতে পারলাম, ডিসি রাজশাহী পুলিশ বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দিয়েছেন। কী হলো, কী হচ্ছে, কোনো কিছু বোঝার আগেই দেখি— পাকিস্তানি সেনারা সর্বপ্রকার অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আবার ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে পুলিশ লাইন ঘিরে ফেলল। গুলিবর্ষণ শুরু করল— রাইফেল, মেশিনগান, মর্টার আর কামানের গোলা। মনে হচ্ছে, রাজশাহী শহরে প্রলয় নেমেছে। বাংলার সন্তান, মহাবীর রাজশাহীর পুলিশ যুদ্ধ চালাল কিন্তু যা হওয়ার তা-ই হলো। কিছু শহীদ হলেন, অনেকেই প্রাণভয়ে পালালেন, কিছু বন্দি হলেন এবং বেয়নেটের ঘায়ে প্রাণ দিলেন। ২ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানি শয়তানরা অভিযান শেষ করে পূর্ব দিকে ছুটছে এবং বেতার কেন্দ্রের সৈনিকদের চিত্কার করে বলছে, ‘শীঘ্রই বিমান আক্রমণ হবে, সবাই সরে পড়ো।’ পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সামরিক ও বেসামরিক অনেকেই ছুটলেন; কিন্তু আমরা বুঝলাম— প্রকৃত ব্যাপার তা নয়, এটা পালানোর সংকেত। কিছুক্ষণ পরই দেখলাম, ১টি পাকিস্তানি সামরিক জিপ এসে বেতার কেন্দ্রের সামনে থামল। দু-তিনজন পাকিস্তানি সৈনিক একটা প্যাট্রল জেরিকেন নিয়ে বেতার কেন্দ্রের ভেতর গেল এবং ত্বরিতে বের হয়ে ওরা আবার জিপে উঠে চলে গেল। আমাদের বুঝতে বাকি রইল না যে, কোনো একটা অপকাণ্ড ঘটিয়েছে।
ওইদিন সন্ধ্যার সময় দেখি, ইপিআর অস্ত্রাগারে কোনো পাহারা নেই, তালাবদ্ধ। অল্পসংখ্যক ইপিআর বাহিনীর সৈনিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। আমাদের অফিসের সামনে সবাইকে জড়ো করলাম। তাদের মধ্যে আমার বন্ধু হাবিলদার হুমায়ুন কবীর বললেন, ‘বেতার কেন্দ্রের ঘরের মধ্যে আগুন জ্বলছে, অতএব প্রথমেই এটা রক্ষা করা দরকার।’ তখনই কয়েকজন ঢুকলেন বেতার কেন্দ্রে, আর আমিসহ বেশির ভাগ চললাম অস্ত্রাগারের দিকে। তালা ভেঙে অস্ত্রশস্ত্র নিতেই শয়তানের জিপ এসে আমাদের ওপর গুলি ছুড়তে লাগল। কেউ কেউ পাল্টা জবাব দিলেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের পালিয়ে আসতে হলো। সেই রাতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও চারঘাটের ইপিআরদের বিস্তারিত জানালাম এবং নওগাঁর ক্যাপ্টেন গিয়াসকে অনুরোধ করে বললাম, ‘আমাদের সাহায্যের জন্য সৈন্য পাঠান।’ তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব শুনলেন, আমার নামটাও জেনে নিলেন। এমনকি বিশ্বাস না হওয়ায় বললেন, ‘বাংলায় বানান করো।’ তা-ই করলাম কিন্তু আমাদের করণীয় বিষয়ে কোনো উপদেশ দিলেন না।
পরদিন সকালেও আমরা ঠিকঠাক পাকিস্তানি সেনাদের অধীনে অফিসে কাজ করে যাচ্ছি। তাছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। আর গোপনে চলছে আমাদের খবরাখবর। সময় স্মরণ নেই, সিগনাল অফিসে গিয়ে দেখি যে, ক্যাপ্টেন গিয়াস বেতারে অপারেটরের সঙ্গে আলাপ করছেন। আমি উত্তেজিত হয়ে অপারেটরের কাছ থেকে হেডফোন ও হাতের মাইক কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘এত শুনলেন, এত বললাম, যে তাণ্ডবলীলা দেখলাম, যা হওয়ার হয়েছে। আমাদের ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে...।’ এ কথাটা স্মরণ আছে যে, এর আগেই গিয়াস সাহেবকে সাবধান হতে বলেছি। কারণ বেতার দ্বারা আমরা সংবাদ পাই যে, ক্যাপ্টেন গিয়াস ও মেজর নজমুল হক সাহেবকে খান সেনারা হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। অবশ্য ক্যাপ্টেন গিয়াস এ সংবাদ আগে থেকে জেনে সতর্কতা গ্রহণ করেন। পাকিস্তানি গুপ্তচর ঠিকই গিয়েছিল কিন্তু ক্যাপ্টেন ও সুবেদার মনওয়ার সাহেবের তীক্ষ দৃষ্টি শয়তান এড়াতে পারেনি। ওই রাতেই ক্যাপ্টেন গিয়াস চাঁপাইনবাবাগঞ্জের রাইফেলস সদস্যদের (নিয়ে) রাজশাহী শহরের দিকে অগ্রসর হতে বলেন। এবং তিনি অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে আমাদের কমান্ড গ্রহণের জন্য নওগাঁ থেকে রাজশাহীর পথে অগ্রসর হন। দিনে অফিসে, রাতে সবাই অন্য জায়গায় গিয়ে থাকি। মার্চের ৩০ তারিখ ক্যাপ্টেন গিয়াস আমাকে ফোনে ডেকে বললেন যে, রাজশাহী থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে নওহাঁটায় পরের দিন লোক পাঠাতে। পরদিন সকাল ১০-১১টার সময় সাইকেল দিয়ে সিগনাল অপারেটর আইয়ুব আলীকে নওহাঁটায় পাঠালাম। বেলা ২টার সময় সে ফিরে এসে জানাল যে, আমাকেই যেতে বলেছেন। উপায় নেই, অনেক শয়তান আমাকে চেনে এবং শহরও মুক্ত নয়। তাই যেসব পোশাক কোনো দিন পরিনি, সেইসব পোশাক পরেই সাইকেল ছোটালাম নওহাঁটার উদ্দেশে। নওহাঁটায় গিয়ে পেলাম সুবেদার মনওয়ার আলী সাহেবকে। তিনি সবকিছু শুনলেন। সুবেদার সাহেব জানালেন যে, গোদাগাড়ী ও চারঘাটের দিকে লোক পাঠিয়েছেন। সব রাইফেলস বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে একযোগে রাহশাহী উপশহরে অবস্থিত ২৫ পাঞ্জাব ক্যান্টনমেন্টের ওপর মর্টার আক্রমণ চালানো হবে। সন্ধ্যার আগে রাজশাহী ফিরে বন্ধুদের আশ্বাস দিলাম— ভয় নেই।
৩১ মার্চ জানতে পারলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার বাঙালি রাইফেলস সৈন্যরা গোদাগাড়ী পর্যন্ত এসে পড়েছে। তখন এমন অবস্থা যে সরে পড়ার উপায় নেই; হয়তো সম্ভব হতো কিন্তু সুবেদারের সহযোগিতা পেলাম না।
সন্ধ্যার আগে বেতারগ্রাহক মাধ্যমে শুনলাম, ২৫ পাঞ্জাব একটি সংকেত সংখ্যাসহ বলছে, ‘রেলস্টেশন কা নজদিক ইকো পাঁপাঁ রোমিওঁকা কবজাঁমে হ্যায়, বোলো তো রেড কারা দুঁ।’ সংকেত চিহ্নে বুঝলাম রংপুর, আর বর্ণনায় মনে হলো গোদাগাড়ী। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সিগনাল সুবেদার সৈয়দ নেসাব আলীর খোঁজ নেই, হাবিলদার রউফের খোঁজ নেই এবং তাঁদের কাছ থেকে কোনো উপদেশও নেই। সন্ধ্যা হয়-হয়, নামাজের সময় হয়েছে খেয়াল নেই। হেডফোন কানে দিয়ে ইন্টারসেপ্ট করছি, যদি নতুন কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এমন সময় আমার সব লোক দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। হেডফোন ফেলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে, আমাদের অস্ত্রাগারে কোনো গার্ড ছিল না, পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্রাগারে আগুন দিয়ে ২৫ পাঞ্জাব ঘাঁটিতে আশ্রয় নিয়েছে। ভয়ে সবাই পালাতে ব্যস্ত, যে ছয়টা রাইফেল ও তিনটা স্টেনগান ছিল, তার দিকে কারো খেয়াল নেই। দৌড়ে উপরে গেলাম এবং অস্ত্রগুলো নিচে নিয়ে এলাম। সদর রাস্তা দিয়ে বের না হয়ে বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকে পাড়ার মধ্যে আত্মগোপন করলাম। অস্ত্রাগারে গোলাগুলির খই ফুটতে লাগল, আগুন থামল রাত ১০টায়। আস্তে আস্তে বের হয়ে আমাদের বেতার অফিসের দিকে এলাম। দুঃখের বিষয়, কাউকে খুঁজে পেলাম না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিবাসী নতুন অপারেটার ময়েজউদ্দীন ও বন্ধু নায়েক আমীনউল্ল্যাহ ছাড়া। আমার দৈহিক শক্তি কম, কাজেই আমি গলির মুখে একটি রাইফেল নিয়ে পাহারায় দাঁড়ালাম। আমীন স্টোর ভাঙল, আমীন ও ময়েজ প্রায় কয়েক লাখ টাকার বেতারযন্ত্র ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জমা করল আমার বেতার কারিগরির শিক্ষাগুরু সুবেদার মেজর মো. শওকত আলী সাহেবের বাসায়। তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ ছিলাম, তাই অসুবিধা হলো না। আজ একথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি, সেদিন আমার গুরুপত্নী অধ্যাপিকা ফিরোজা বেগম যদি আমাদের স্থান না দিতেন, তবে বাংলাদেশের স্বার্থে এতগুলো বেতারযন্ত্র রক্ষা করতে পারতাম না; তাঁর আশ্রয় ও সহযোগিতা ছাড়া কী হতো তাও জানি না।
সেই রাতেই ওই বাড়ির ভেতরের একটা ছোট কামরায় সব বেতারযন্ত্র তালাবদ্ধ করে রেখে আরেকটি কক্ষে বেতারগ্রাহক চালু করলাম গোপন সংবাদ সংগ্রহের জন্য। শওকত সাহেবের স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা বাড়িতে থাকা নিরাপদ মনে করলেন না। রাজশাহী শহরেই এক আত্মীয়বাড়ি চলে গেলেন। এ-যাবত্ রাজশাহীস্থ আমার বিভাগের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা পাইনি। কাজেই অধীনস্থ সবাইকে বলে দিয়েছিলাম আত্মগোপন করতে, যতক্ষণ পর্যন্ত না চাঁপাইনবাবগঞ্জ অথবা নওগাঁ থেকে আগত রাইফেলস সৈনিকদের সঙ্গে আমরা যোগ দিতে পারি। আমি ও আমীন পরবর্তী কর্মপন্থা আলোচনা করে আপাতত কয়েক দিনের জন্য গুরুপত্নীর বাড়িতে আস্তানা গাড়লাম।
[‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: একজন সৈনিকের স্মৃতিকথা’ বই থেকে নেয়া]
লেখক: বীরবিক্রম, বিজিবির অবসরপ্রাপ্ত সিগনাল সুবেদার





