এক-একটি যুদ্ধ শেষ হয় অনেক কাহিনী কিংবদন্তির জন্ম দিয়ে, যার আড়ালে বিমূর্ত থেকে যায় কিছু মূর্তিমান বাস্তব। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলে পড়ার পর রাজধানীতে প্রথম প্রতিরোধ করেছিল কারা, সেটা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই। তত্কালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, সেটা কম-বেশি সবার জানা থাকার কথা। পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি থেকে প্রতিরোধের যে শুরু, সেটা ছড়িয়েছিল সারা দেশে। এর পর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা ও বরিশালে চলেছিল সশস্ত্র প্রতিরোধ।
২৫ মার্চে ঘটনার শুরুটা বেশ নাটকীয় ছিল। সুকুমার বিশ্বাসের বর্ণনা থেকে দেখা যাচ্ছে— সূর্য ডোবার পর পৌনে ৫টার দিকেই বিমানবন্দরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তবে এই খবরটা জানাজানি হতে সময় লেগে যায় বেশ। এ সংবাদ জানতে সবাইকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরো কয়েক ঘণ্টা, রাত পৌনে ৮টা পর্যন্ত ততক্ষণে তাকে বহনকারী বিমান প্রায় করাচি পৌঁছে গেছে। এর পর দ্রুতলয়ে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে জিপ আর ট্রাকভর্তি সৈন্যরা বেরিয়ে গিয়ে অবস্থান নেয় পুরো ঢাকা শহরে। গোলন্দাজ থেকে শুরু করে সাঁজোয়া বহর নিয়ে পদাতিক বাহিনী গিয়ে ঘিরে ফেলতে থাকে পুরো রাজধানী। তিন ব্যাটালিয়ন পাকিস্তানি ঘাতক গিয়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞের জন্য ততক্ষণে প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে। রাত পৌনে ১১টার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঘিরে ফেলে। কারফিউ না থাকলেও নির্দেশ দেয়া হয় কেউ বাইরে বের হলেই গুলি ছোঁড়ার। আর এর ভয়াবহতা ঠিক টের পাওয়া যায় রাত ১২টা বাজতে না বাজতেই। তখন ঘুমন্ত শহরের নীরবতা ছত্রখান করে একসঙ্গে গর্জে ওঠে অগণিত মেশিনগান। রাজারবাগ থেকে পিলখানা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সবখানে তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। ভীতসন্ত্রস্ত নারী-পুরুষ-শিশুর আর্তচিত্কারে ততক্ষণে এক নরকের দর্শন করে ফেলেছে পুরো রাজধানী।
দুর্বিষহ এ সময়েই হয়েছিল প্রথম প্রতিরোধ। সেটা করেছিল তখনকার ইপিআর— তার পর বিডিআর আর যারা এখনকার বিজিবি— তাদের কয়েকটি অংশ। তারা রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের নানা স্থানে রুখে দাঁড়ানোর সাহসটা অন্তত দেখিয়েছিল। সরকারি নির্দেশ পালন থেকে মাতৃভূমি রক্ষার দায়টা তাদের কাছে বড় ছিল। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা অস্ত্র জমাদানের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে উল্টো অস্ত্রধারণ করেছে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। পিলখানাতে যখন ২২তম বালুচ রেজিমেন্ট হামলে পড়েছিল, সেখানে তারা বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি ইপিআরের বীর সেনানীদের সঙ্গে। তারা সংখ্যায় অল্প হলেও মরণপণ লড়ে বেশ ভালো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল একেবারে আক্রমণের প্রথম প্রহরেই। এক পিলখানাতে ঢাকা সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর সিরাজুল ইসলাম, হেডকোয়ার্টারের উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ আজাদ, ক্যাপ্টেন এম এ লতিফ কিংবা ক্যাপ্টেন দানিয়াল ইসলামের নেতৃত্বে থাকা ১৩, ১৫ ও ১৬ নম্বর উইং যে প্রতিরোধ সেদিন দেখিয়েছিল, তাতে অন্তত যুদ্ধের ঠিক শুরুতেই ভড়কে গিয়েছিল ২২তম বালুচ রেজিমেন্ট। পিলখানার ৩ নম্বর গেটে সেদিন যে গোলাগুলি হয়েছিল, তা প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ শুনে লিখে গেছেন অনেকেই। প্রশিক্ষিত বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের বিরুদ্ধে মাত্র ২০ রাউন্ড গুলি নিয়ে পাহারায় থাকা ইপিআর জওয়ানরা সেদিন যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে ইপিআরের অবদানকে তুলে ধরতে এর বেশি কিছু না বললেও চলে। বিশেষ করে ৩ ও ৪ নম্বর গেটে জওয়ানরা তাদের দুর্বল অস্ত্র নিয়েও যে প্রতিরোধ করেছিল, সেটা মুক্তিযুদ্ধের অমর বীরত্বগাথা হিসেবে শতাব্দী ধরে মনে রাখার মতো।
ঢাকার পর প্রায় সব জেলায়ই প্রতিরোধের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ইপিআরই। অন্তত চট্টগ্রামের হালিশহরে তাদের তিনটি সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেখা গিয়েছে ১১ ও ১৪ উইংয়ের পক্ষ থেকে। সেখানকার দুজন পাকিস্তানি উইং কমান্ডার আজিজ ও হামিদের নেতৃত্বে থেকে বিদ্রোহ করে বসাটা তেমন সহজ কাজ ছিল না ইপিআরের সাধারণ সেনাদের পক্ষে। সেদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে বাঙালি অফিসার বলতে যিনি ছিলেন, তিনি আর কেউ নন একজন মেডিকেল অফিসার মেজর আমিরুল ইসলাম। এর বাইরে ছিলেন মেজর শামসুদ্দিন, সেক্টর অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ও সহকারী উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন হারুন আহমদ চৌধুরী। তবে এ কয়েকজন কর্মকর্তার বাইরে সদস্য হিসেবে এগিয়ে ছিলেন এ দেশীয়রাই। সেখানে সব মিলিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি যেখানে ৪০০ জন, তার বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানি ছিলেন দেড় হাজারের বেশি। অন্যদিকে ৪০০ পাকিস্তানির মধ্যে প্রায় ১০০ জন ছুটিতে থাকায় তাদের শক্তিমত্তা কিছুটা কমে গিয়েছিল। তখন ১৪ নং উইংয়ের একটি কোম্পানি সাজেক এলাকায় অবস্থান করছিল। বাকিরা ছিল রামগড়, কক্সবাজার, টেকনাফ, বরকল, মাসলং ও উইং হেডকোয়ার্টারে। মেজর শামসুদ্দিনের বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মোতায়েন করা ছিল। বিশেষ করে ২৫ মার্চ বিকাল থেকে যে থমথমে পরিবেশ, তা বুঝতে সময় লাগেনি তার বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যের। গুজব রটে গিয়েছিল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক সফল হয়েছে। সব দাবি মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর সময়ের অপেক্ষা। তবে তারা বিপদের আঁচটা পেয়ে যায় চক্ষুচিকিত্সক ডা. জাফরের কাছ থেকে। সংবাদ রটে যায় ঢাকায় কীভাবে ক্যাম্প থেকে সৈন্যরা মুভ করছে। এ অবস্থাতেই ক্যাপ্টেন রফিক তার ইপিআর সৈন্যদের নিয়ে সরাসরি বিদ্রোহ করে বসেন। তিনি ষোলশহরে গিয়ে সব বাঙালি সৈন্যকে তার সঙ্গে যোগ দিতে বলেছিলেন। এর পর নতুন করে লড়াই শুরু করেন বাঙালি সৈন্যরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিয়ে চট্টগ্রামের যারা স্মৃতিচারণ করেছেন, সেখান থেকে জানা যায় যুদ্ধ কীভাবে ছড়িয়েছিল রণাঙ্গণ থেকে রণাঙ্গণে। অন্তত ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে বসে, তখন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি ইপিআর সদস্যদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার দাবি রাখে। পরদিন ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানিরা চিংড়ি নদী পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের সেখানেই রুখে দিতে চেয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট মাহফুজ। তিনি এই প্রতিরোধে সফল হননি। তবে সুবেদার মুতালেবের বাহিনী ফটিকছড়িতে অ্যামবুশ করে। তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনটি গাড়ি ধ্বংসের পাশাপাশি ৩০ জনের মতো পাকিস্তানি সেনা প্রাণ হারিয়েছিল।
প্রাথমিক পর্ব থেকে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত সবখানে ইপিআরের বীরত্বগাথা বেশ সুবিদিত। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে রাজশাহীর ইপিআর হেডকোয়ার্টার থেকেও ইপিআর সদস্যরা গড়ে তুলেছিলেন তুমুল প্রতিরোধ। তাদের দুটি উইং নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নানা প্রতিবন্ধক অতিক্রম করে লড়াই শুরু করেন বাঙালি সৈন্যরা। বিশেষ করে তাদের নেতৃত্বে থাকা বেশির ভাগ সদস্যই যেখানে পাকিস্তানি, সেখান থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করা অতটা সহজ ছিল না। এদিকে রাজশাহী শহরের অবাঙালি এলাকায় গিয়ে ছাউনি তৈরি করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। তারা সেখানে এতটা শক্তিশালী অবস্থানে ছিল যে, তাদের প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে ছিল। সেখানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফকাত বালুচ হজ থেকে ফিরে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন। তিনি বাঙালি হত্যার প্রশ্নে একমত হতে পারেননি। পরে তাকে বরখাস্ত করা হয়। এর পর রাজশাহীতে পাকিস্তানি সৈন্যরা হামলা শুরু করলে ঘাঁটি থেকে পালিয়ে গিয়ে ইপিআর সদস্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যান। তারা সেখানে থেকে বিভিন্ন রাস্তায় ব্যরিকেড দিতে শুরু করেন। বলতে গেলে রাজশাহীতেও প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে মূল ভূমিকাটা ছিল তাদেরই। এদিকে ২৫তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট রাজশাহী থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে। তাদের প্রতিহত করে ক্যাপ্টেন রশীদের নেতৃত্বাধীন ইপিআর বাহিনী। এ প্রতিরোধ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর নেতা মেজর আসলামসহ প্রায় ৪০ জন নিহত হন। এদিকে নওগাঁ থেকে ইপিআরের নায়েব সুবেদার সিরাজ উদ্দিন লস্করের নেতৃত্বে একটি কোম্পানি এসে যুক্ত হলে প্রতিরোধ আরো শক্ত হয়। এভাবেই ইপিআরের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা ও বরিশালে চলেছিল তুমুল প্রতিরোধ যুদ্ধ। কোনো কোনো এলাকায় তারা নিজেরা যেমন সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, এর বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েও প্রতিরোধ করতে দেখা গেছে তাদের।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী






