একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘অপরাশেন সার্চলাইটের প্রধান টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বিশেষ করে এর দুটি ছাত্রাবাস ইকবাল হল ও জগন্নাথ হল, শহরের বস্তিগুলো, হিন্দু-অধ্যুষিত শাঁখারী বাজার, রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার ও পিলখানার ইপিআর সদর দপ্তর। কারণ তারা আশঙ্কা করেছিল প্রতিরোধ এলে তা প্রধানত এ জায়গা ক’টি থেকেই আসবে। সন্ধ্যারাতের দিকে বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র ও তরুণরা গাছ কেটে এবং আলকাতরার ড্রাম ইত্যাদি টেনে এনে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী ট্যাংক নিয়ে বেরিয়ে পড়ার পর, তাদের অগ্রগমনের মুখে এসব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। চারপাশে অগ্নিবৃষ্টি করতে করতে, ব্যারিকেড মাড়িয়ে গুঁড়িয়ে, কোথাও নিজেরা সরিয়ে আবার কোথাও অন্যদের সরাতে বাধ্য করে তারা বিশ্ববিদ্যালয় তথা শহরকেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকে। ট্যাংক-কামান-মর্টারসজ্জিত সশস্ত্র দানববাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র ও অপ্রস্তুত বেসামরিক বাঙালিরা সে রাতে ঢাকা শহরের কোথাও বলতে গেলে কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি। পাকিস্তানি বাহিনী সত্যিকার প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশ বাহিনী এবং পিলখানায় তখনকার ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সশস্ত্র ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জওয়ানদের তরফ থেকে। বলা বাহুল্য, এ দুই বাহিনীও অস্ত্রসম্ভার ও প্রশিক্ষণের দিক থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমকক্ষ ছিল না। ফলে অসমসাহসিকতা ও মরণপণ লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও দীর্ঘক্ষণ তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারেনি। অনেক প্রাণহানির পর একপর্যায়ে তাঁদের পিছু হটতে হয়। তাঁদের মধ্যে সে রাতে যাঁরা পালিয়ে বেঁচেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ পোশাক পাল্টে ও সাধারণ বেসামরিক জনগণের সঙ্গে মিশে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। তারপর মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে, যেসব জায়গায় তখন পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী পৌঁছতে পারেনি, সেখানে ছাত্র ও তরুণদের অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ দেন এবং কোথাও কোথাও পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। এপ্রিলের শেষাশেষি দেশের ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়লে তারাও সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান এবং সেখান থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেন।
বর্তমানে যে বাহিনীটির নাম বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং স্বাধীনতার পর যার নামকরণ করা হয়েছিল বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস), পাকিস্তান আমলে তারই নাম ছিল ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)। ব্রিটিশ ভারতে ১৭৯৫ সালে প্রথমে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৮৬। সেটা ছিল কোম্পানির শাসনামল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রামগড় ও তার আশপাশের এলাকায় বিদ্রোহী তত্পরতা দমনে এটি গঠন করে। ১৭৯৯ সালে ঢাকার পিলখানায় বাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। এর পর নানা সময়ে এ বাহিনীর পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ ঘটেছে। এর কার্যপরিধি সম্প্রসারিত হয়েছে। সেসঙ্গে এর নামও বদলেছে। যেমন একসময় এর নাম হয় ফ্রন্টিয়ার গার্ড, তারপর বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ। ভারত বিভাগের ঠিক আগে এই বাহিনীর নাম ছিল ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস। সে সময় সীমান্ত প্রহরাই ছিল এর প্রধান কাজ। যদিও জরুরি অবস্থায় দেশের ভেতরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বেও তাদেরকে নিয়োজিত করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা সীমান্তে জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ বাহিনী বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে এ বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য সে সময় ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে পদকও লাভ করেন।
প্রধানত গুর্খাদের নিয়ে গঠিত হলেও বিহার, পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশসহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরাও কমবেশি এ বাহিনীতে নিয়োগ পেত। যদিও বাঙালিদের তখন এই বাহিনীতে নেয়া হতো না। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) নামে এ বাহিনীকে পুনর্গঠন করা হয়। বাহিনী পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসের একজন ইংরেজ কর্মকর্তা কর্নেল টি আই বাওয়ার্সকে। যদিও বাহিনীটি নিয়ন্ত্রণের ভার থাকে প্রদেশের তত্কালীন পুলিশপ্রধান (আইজি) জাকির হোসেনের ওপর। বাহিনীর পুরনো সদস্যদের প্রায় সবাই এরই মধ্যে ভারতে অপশন দিয়ে চলে যাওয়ায়, শুরুতে ক্যালকাটা আর্মড পুলিশ বাহিনী (১৯৪৬-এর দাঙ্গার সময় মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে যা গঠিত হয়), পশ্চিম পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফেরত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ইপিআর যাত্রা করে। সে সময় ইপিআরের দ্বার বাঙালিদের জন্য উন্মুক্ত হলেও সাধারণ সিপাই পদের ঊর্ধ্বে তাদের নিয়োগ দেয়া হতো না। এমনকি জেসিও ও এনসিও পদের জন্যও লোক আনা হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। এভাবে সামরিক বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান) মতো ইপিআরেও বাঙালিরা প্রথম থেকেই বৈষম্য-বঞ্চনার শিকার হন।
পাকিস্তান আমলেও আধা সামরিক বাহিনী হিসেবে ইপিআর ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। যদিও এর কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হতো সামরিক বাহিনী থেকে। সবসময় সীমান্ত পাহারাই ছিল এ বাহিনীর প্রধান কাজ। সেসঙ্গে দেশের ভেতরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর অতিরিক্ত হিসেবে এ বাহিনী মোতায়েন করা হতো। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর সীমান্তে চোরাচালান দমন ও অবৈধ যাতায়াত রোধ এ বাহিনীর বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারিত হয়। সেসঙ্গে সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালককে এ বাহিনীর প্রধান করে এর সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়। যুদ্ধপরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে ইপিআর সামরিক অভিযানেও অংশ নেয়। যেমন ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে ইপিআর লাঠিটিলা, দহগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, আসালং ও বড়ইবাড়িতে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধে অংশ নেয়। এ বাহিনীরই একজন অধিনায়ক মেজর তোফায়েল সে সময় লক্ষ্মীপুরের যুদ্ধে বিশেষ সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব নিশান-ই-হায়দার লাভ করেন।
ইপিআরের অধিনায়কদের অনেকে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব বা বালুচ রেজিমেন্ট থেকে এলেও, এর সাধারণ সৈনিকদের বেশির ভাগই ছিলেন গ্রামবাংলার সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা ছিল সহজাত। পোশাকি বাহিনীর সদস্য হিসেবে, বাহিনীর শৃঙ্খলা মেনে চললেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁরা ছিলেন সচেতন। বিশেষ করে বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ তাঁদের সবসময় পীড়িত করত। নিজেদের বাহিনীর ভেতরেও এ বৈষম্য-বঞ্চনার অভিজ্ঞতা তাঁদের সচেতনতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দেশের সর্বত্র ইপিআর সদস্যদের ব্যাপকভাবে নৌকায় ভোটদানের ঘটনায় এ সচেতনতার প্রতিফলন ঘটে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা যাতে নির্বাচনে ভোট দিতে না পারে, তার জন্য এ সময় পিলখানা ও অন্যান্য ইপিআর ক্যাম্পে চেষ্টা চালানো হয়। শেষাবধি শেখ মুজিবের হস্তক্ষেপে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়। ভোটদানে এ বাধা দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ সময় ইপিআরের ভেতর বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। অবাঙালি অফিসারদের অনেকে এ সময় তাঁদের পরিবার-পরিজনকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেন। ১৯৭১-এর ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দিলে পূর্ব বাংলার জনগণের মতো ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের মধ্যেও তা তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ইপিআর বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্যোগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। যেমন চট্টগ্রামে সেক্টর অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন (পরবর্তীকালে মেজর) রফিকের নির্দেশে ৯ তারিখে সেখানকার তিনটি উইংয়ের সবক’টিরই বাঙালি-অবাঙালি কমান্ডার ও সৈনিকদের অবস্থানের একটি গোপন তালিকা তৈরি করা হয়। এছাড়া হাটহাজারীতে অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি গোপন ডিপো তৈরি করা হয়। এরই পাশাপাশি তিনি তাঁর অধীনস্থ কয়েকজন সৈনিকের মাধ্যমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেন। একই রকম ব্যাপার ঘটে সিলেট, রংপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর প্রভৃতিসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও। চুয়াডাঙ্গাতে হাবিলদার মেজর মজিবুর রহমান তো মার্চের প্রথম দিকেই অস্ত্রাগারের একটি বিকল্প চাবি তৈরি করে রাখেন। আর মার্চের ২৩/২৪ তারিখে দেখা যায় পিলখানা সদর দপ্তরসহ সারা দেশের ইপিআর কার্যালয়ে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়েছে।
উল্টোদিকে পাকিস্তানিদের তরফেও এ সময় আক্রমণের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সীমান্ত এলাকা থেকে অবাঙালি ইপিআর সৈন্যদের সরিয়ে এনে তাদেরকে উইং কিংবা সেক্টর হেডকোয়ার্টারে জমায়েত করা হয়। কোয়ার্টার গার্ড থেকে বাঙালিদের সরিয়ে সেখানে অবাঙালিদের নিয়োগ দেয়া হয়। বাঙালি সৈন্য যেখানে বেশি, সেখানে অবাঙালি গার্ড কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। ভারী অস্ত্রশস্ত্র সব সেক্টর হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসা হয়। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, অবাঙালি অফিসাররা তাঁদের ব্যাটম্যান, আর্দালি ও বাবুর্চি হিসেবে বাঙালিদের সরিয়ে অবাঙালিদের নিয়োগ করেন। বাঙালি অফিসাররাও একইভাবে অবাঙালিদের সরিয়ে বাঙালিদের নিযুক্ত করেন। এ সময় আবার কয়েকজন ইপিআর কমান্ডার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি চালনার আদেশ অমান্য করায় তাঁদেরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পিলখানায় নিয়ে এসে বন্দি করা হয়। এছাড়া বাঙালিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা আক্রমণ প্রস্তুতির আভাস পাওয়া যায়, যখন উচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা হেলিকপ্টারে করে পিলখানায় এসে সেখানে গোপন বৈঠক করেন। ২৫ মার্চ রংপুরে ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহ মালিক এমন একটি বৈঠকে ১০ নং ইপিআর উইংয়ের বাঙালি ডেপুটি কমান্ডার নওয়াজেসকে বাদ দিয়ে অন্যদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন।
১৯৭১-এর মার্চে ছয়টি সেক্টর ও ১১টি উইং মিলে সারা দেশে ইপিআরের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার। এর মধ্যে সদর দপ্তর পিলখানায় ছিল আড়াই হাজার। ২৫ মার্চ বেলা ২টার দিকে পিলখানায় অবস্থানরত ২২ বালুচ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানিকে পিটি ড্রেসে পুরো এলাকা পরিদর্শন করতে দেখা যায়। ব্যাপারটি ছিল খুবই অস্বাভাবিক। ভরদুপুরে এভাবে পিটি ড্রেসে সৈন্যদের ঘোরাঘুরি ইপিআরের বাঙালি সৈন্যদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করে। আসলে বালুচ রেজিমেন্টের ওই সৈন্যরা গেটগুলোসহ বাঙালি সৈন্যদের অবস্থান দেখে নিচ্ছিল। রাত ৯টার দিকে বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের মুভ করতে দেখা যায়। রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ তারা পুরো পিলখানায় অবস্থান নেয়। তারপর ঠিক ১২টার সময় আক্রমণ শুরু করে। সে সময় কেন্দ্রীয় কোয়ার্টারগার্ডে ১৮ জন বাঙালি গার্ড উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁরা পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পাননি। তাছাড়া তাঁদের কাছে মাত্র পাঁচ রাউন্ড করে গুলি ছিল, যা দিয়ে ওই আক্রমণ মোকাবেলা করা সম্ভব ছিল না। ৩ ও ৪ নম্বর গেটে ডিউটিরত ইপিআর সদস্যরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও, তারা পাকিস্তানি সেনাদের পরিকল্পিত ও ব্যাপক আক্রমণের মুখে টিকতে পারেননি। অল্প সময়েই পাক বাহিনী পুরো পিলখানা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। সে রাতে অনেক ইপিআর সদস্য শহীদ হন। অনেকে হন বন্দি। কিছু জওয়ান পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হন। পিলখানায় ইপিআর বাহিনীর যে সদস্যরা পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হন, তাঁদের অনেককেই পরে মোহাম্মদপুর শরীরচর্চা মহাবিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর দিনের পর অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।
পিলখানায় যখন বালুচ রেজিমেন্ট ইপিআর বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়, ঠিক একই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর আরেকটি দল ডিআইটি ভবনের ওপর থেকে গভর্নর হাউজে অবস্থানরত ইপিআর বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। গভর্নর হাউজে এ সময় শ’খানেক ইপিআর সদস্য পাহারারত ছিলেন। সে রাতের ঘটনা জানা যায় কর্তব্যরত সুবেদার বছির আলীর দেয়া বিবরণ থেকে। তিনি তখন সবে গার্ড চেক করে ১ নং গেটে একজন সিপাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসতে থাকে। তিনি ইপিআর জওয়ানদের পজিশন নিয়ে চুপচাপ থাকতে বললেন। তাঁরা তাই করলেন। রাত ২টার সময় তিনি গভর্নর হাউজে অবস্থানরত উইং কমান্ডার মেজর জাহানজেবকে এ বিষয়ে অবহিত করলে তিনি দরজা না খুলেই ঘরের ভেতর থেকে তাঁকে বলেন, ‘চুপচাপ পজিশন নিয়ে থাকো। গেটগুলো ভালো করে বন্ধ করে দাও। ইপিআর জওয়ানরা তা-ই করলেন। সারা রাত চুপচাপ পজিশন নিয়ে থাকলেন। পরদিন অর্থাত্ ২৬ মার্চ, সকাল পৌনে ৯টার দিকে বালুচ রেজিমেন্টের একটি প্লাটুন গভর্নর হাউজের ১ নং গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ইপিআর সদস্যদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এ সময় মেজর জাহানজেব ও ক্যাপ্টেন জিলানি এসে সবাইকে বলেন অস্ত্র সমর্পণ করতে। কিন্তু তাঁরা তাতে রাজি নন। তাঁরা নির্দেশের জন্য বছির আলীর দিকে তাকালেন। এর পরের ঘটনা বছির আলীর জবানিতেই শোনা যাক: ‘আমাদের কাছে যে অস্ত্র ছিল, তা দিয়ে এক প্লাটুন বালুচ সৈন্য খতম করা যেত। কিন্তু পরে আমরা একজনও বাঁচতে পারতাম না। কারণ পাক সেনাদের সঙ্গে ছিল ট্যাংক আর আমাদের পিছু হটবার সব পথ বন্ধ ছিল।’ অস্ত্র সমর্পণ করে সেদিন গভর্নর হাউজের ওই ইপিআর সদস্যরা প্রাণে বেঁচে যান। তারপর ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে তাঁদের বেশির ভাগই সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এঁদের অনেকে পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
গভর্নর হাউজের ইপিআর সদস্যরা অস্ত্র সমর্পণ করে প্রাণে বেঁচে গেলেও, প্রেসিডেন্ট হাউজে ডিউটিরত ইপিআর বাহিনীর দুটি কোম্পানিকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাকিস্তান বাহিনী তাঁদের বন্দি করে। ২৯ মার্চ প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে তিনটি দলে ভাগ করে বন্দিদের রমনা কালীবাড়ির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর হাতবাঁধা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামিয়ে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়। সেদিন ১০০ জন ইপিআর সদস্যকে এভাবে হত্যা করা হয়। আহত হয়েও দুজন বন্দি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তাঁরা হলেন নায়েক মুজিবুল হক ও নায়েক মোহাম্মদ আলী। এঁদের দুজনই পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। এছাড়া ঢাকার মিরপুরেও ইপিআরের দুটি কোম্পানি মোতায়েন ছিল। পঁচিশে মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ওপর আক্রমণ চালায়। আকস্মিক হামলার মুখে তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের প্রায় সবাকেই বন্দি করে।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক





