আলোকচিত্রী সাইদা খানমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আব্দুল হাই স্মৃতি পাঠাগারে। আপা ছিলেন সেই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। আমি তখন বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করে এমফিল কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। যদিও শেষ করিনি। সেই সময় একদিন আমার এক অনুজ বন্ধু স্বপ্না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার জন্য রাজীব হুমায়ূন স্যারের সহযোগিতা নিয়েছিল। তাই একদিন স্যারের জন্য ফুল নিয়ে আমাকেসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে গিয়েছিল। স্যারের রুমটি ছিল আব্দুল হাই স্মৃতি পাঠাগারের পাশের রুম। আমরা দুজন অনেকক্ষণ স্যারের জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু স্যার আসেননি। তখন আমার বন্ধুটি বলল, চলেন ফুলের তোড়াটি  সাইদা আপাকে দিয়ে দি। সাইদা আপা কিন্তু এতক্ষণ দেখছিলেন আমরা ওনার রুমের সামনে কারো অপেক্ষায় ছিলাম। তাই আপা ফুলটা হাতে নিয়ে হেসে দিয়ে বললেন, ‘যার জন্যে এনেছিলে সে আসেনি?’ আমরা তখন লজ্জা পেলাম এবং আমার খুব খারাপ লাগল বিষয়টি। তাই পরদিন একটি ফুলের তোড়া কিনে একাই গেলাম আপার কাছে। বললাম, আজকের এই ফুলের তোড়াটি  শুধুই আপনার জন্য এনেছি। আপা খুব খুশি হলেন এবং বললেন বসো।  ছোটবেলা থেকে শখ হিসেবে ছবি তুলি। ১৯৮৭ সালে মনজুর আলম বেগ স্যারের কাছে বেসিক ফটোগ্রাফি কোর্স করেছিলাম। তাই আপার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার খুব শখও ছিল। কিন্তু পরিচয়টা যে এভাবে হবে জানতাম না।

এর পর থেকে নিয়মিতভাবে এমফিল প্রথম বর্ষে সৈয়দ আকরম হোসেন স্যার ও মনিরুজ্জামান স্যারের ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আপার রুমে ঢুকতাম। বিশাল ঘর। চারপাশে বড় বড় বইয়ের আলমারি। এক পাশে একটি জানালা। সেই জানালার পাশেই আপার বসার টেবিল। আপার টেবিলের সামনে দুটো চেয়ার থাকত। একটায় আমি বসতাম। বইয়ের আলমারিগুলোর মাঝখানে রাখা টেবিল-চেয়ার। সেখানে বসে ছাত্রছাত্রীরা বই পড়ত। আপা আমার সঙ্গে গল্প করতেন নানা বিষয় নিয়ে আর মাঝে মাঝে পথের পাঁচালীর সেই মুদি দোকানদার মাস্টারের মতো ছাত্রদের শাসন করতেন ‘কথা বলবে না। সেকি ছেলে মেয়ে দুজন এক চেয়ারে বসছো কেন? সরে বসো।’ এরই মাঝে আমার পাশের চেয়ারে এসে বসত নানা বয়সী নানা পেশার মানুষ, যাদের বেশির ভাগের সঙ্গে আপার পরিচয় হয়েছে পথে হেঁটে। পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য আপা অনেক দরদি ছিলেন। একদিন এক কিশোর ছেলে এসেছিল, যে ব্যাটারি কারখানায় কাজ করত। পুরনো ব্যাটারির অ্যাসিড হাত থেকে চোখে লাগার পর থেকে ছেলেটি আর দেখতে পায় না। আপা ছেলেটিকে অসম্ভব স্নেহ করতেন।

পুরনো ছাত্ররা তাদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করতে আপার কাছে আসত। একবার এক পুরনো ছাত্র এসে আপার হাত দেখে বলল, আপা বেশি দিন বাঁচবেন না। সেটি প্রায় ৩০ বছর আগের কথা। সে কথা শুনে আপা আমাকে নিয়ে ছোটাছুটি শুরু করলেন। তার আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করতে। ছবি তুলতে। আপার লেখালেখি দিয়ে বই বের করতে। সে সময় আপার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে অনেক গুণী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। বনেদি পরিবারের মেয়ে হয়েও তিনি রিকশা ও সিএনজিতে চড়তেন। চালকদের কাছ থেকে কখনো ভাংতি টাকাটা ফিরিয়ে নিতেন না। সবসময় পাঁচ-দশ টাকা বেশি দিতেন। দিতে চাইলে বলতেন, ছেড়ে দাও দিতে হবে না। বাজার করতেও খুব পছন্দ করতেন।

আপা থাকতেন তার সবচেয়ে বড় বোন চিত্রশিল্পী মোহসিনা আলী লিলি আপার সঙ্গে। প্রথম যেদিন যাই বনানীতে, দোতলা সাদা বাড়িতে গেট পেরিয়ে লম্বা বাগান ডিঙিয়ে ঢুকতেই লিলি আপার দেখা পাই। মলমলের সুতি শাড়ি, শীতের চাদর আর মাথা ভরা সাদা চুল নিয়ে বসে ছিলেন। মাথার ওপর ভ্যান গঘের একটি পেইন্টিং কুঁচকে আছে। আমি বলেছিলাম ছবিটি খুলে আবার বাঁধাই করার কথা। লিলি আপা বললেন, আমরাই কুঁচকে যাচ্ছি, আর ছবি। জীবন যে খুব ছোট সেটা ৩০ বছর আগে বোঝার সামর্থ্য ছিল না। তাই আপার কথার অর্থ ধরতে পারিনি সেদিন। সাইদা আপা মায়ের মতোই ভালোবাসতেন লিলি আপাকে। লিলি আপা যেদিন মারা যান, আমি খবর পেয়ে রাত ১২টার দিকে গিয়ে দেখি লিলি আপার মরদেহের মাথার কাছে মমতা আপা আর পায়ের কাছে সাইদা আপা বসে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। লিলি আপাকে প্রায়ই দেখতাম টুকরো কাগজে ছবি আঁকতেন আর পাশে কিছু লিখতেন। একদিন আপার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে দেখি লিখেছেন, ‘সূর্যের আলো কাজের উৎসাহ জোগায়, চাঁদের আলো মানুষের মনুষ্যত্ব বোধকে জাগিয়ে তোলে।’ সেদিন মনে হয়েছিল সাইদা আপার জীবনের সূর্যটা ডুবে গিয়েছিল লিলি আপার মৃতুতে।

আপাদের পরিবারের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়ে মনে হয়েছিল ষাটের দশকের ইতিহাসের একটি দরজা খুলে গেল আমার সামনে। লিলি আপা ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ছাত্রী। কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী ছিলেন আরেক বড় বোন প্রফেসর হামিদা হোসেন। লন্ডনে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ঢাকার হোম ইকোনমিকস কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ছিলেন, যিনি আপাকে বিলেত থেকে রোলি কড ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন। ভগ্নিপতি ড. সালাউদ্দিন আহমেদ বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ছিলেন আপার বড় ভাইতুল্য। বাসার কাজে সহায়তাকারী মেয়েটির ভেজা শরীরের ছবি বেগম পত্রিকার প্রচ্ছদে ছাপা হওয়ার পর লোকজন গেটের বাইরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছিল। তখন সালাউদ্দিন ভাই সামাল দিয়েছিলেন।

আপার বড় ভাই আব্দুল আহাদ ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞ ও সুরকার। শান্তিনিকেতনে থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। আপার আরেক ভাই ছিলেন ফরেস্ট অফিসার। বড়জন মমতাজ হোসেন শিক্ষক ছিলেন। ওই বাড়ির প্রতিটি মানুষ ছিলেন প্রকৃত উচ্চশিক্ষিত, সংস্কৃতি বোধসম্পন্ন, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, প্রগতিশীল, সৎ এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান। তাদের প্রত্যেকের পোশাক, চলাফেরা, জীবনযাপন পরিশীলিত, সুরুচি ও বাহুল্য বর্জিত ছিল। সাইদা আপা ছিলেন বাড়ির সবার ছোট। স্বল্পবাক কিন্তু স্পষ্টভাষী। পরিবারের এই বর্ণাঢ্য মানুষের ছায়ায় বড় হওয়ায় আপার মানস গঠনে পূর্ণতা পেয়েছিল। ডাকনাম ‘বাদল’ নামেই পরিবার, পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজন তাঁকে ডাকত।

সত্যজিৎ দম্পতিও আপাকে বাদল নামেই ডাকতেন। লম্বা সময় ধরে কলকাতায় গিয়ে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে শুটিংয়ের ছবি তুলেছেন।

অনেক আগে একবার সাইদা আপা খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। মাথা ঘুরে পড়ে যেতেন। তখন চিকিৎসার জন্য পারিবারিক সম্মতি নিয়ে হুইল চেয়ারে করে আপাকে একাই কলকাতায় নিয়ে যাই। কারণ ঢাকায় আপার অসুখটা ধরা পড়ছিল না। সেবার তাঁর ভার্টিগো রোগটি ধরা পড়ে। আপা বায়না ধরলেন চিড়িয়াখানা ও গঙ্গার ধারে বেড়াতে নিয়ে যেতে। পশু-পাখি ও প্রকৃতিকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। যেতে চাইলেন সত্যজিতের বাড়ি ও শান্তিনিকেতনে। সব অনুরোধ রেখেছিলাম শুধু আপার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে। ট্যাক্সি ঠিক করেও শান্তিনিকেতন যাওয়া বাতিল করি। তখন যদি জানতাম সেটাই হবে তার শেষ কলকাতা যাওয়া তাহলে হয়তো সেটাও পূরণ করার চেষ্টা করতাম। কলকাতায় আপার শৈশবের স্মৃতিভরা পাবনার অনেকের সঙ্গে দেখা করিয়েছিলাম। এক দিদির বাড়ি গিয়েছি, যিনি আপার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। আপাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন তিনি। দেশভাগের যন্ত্রণার সুর ছিল সে কান্নায়। এরপর বিভিন্ন গল্পে মেতে উঠলেন ওই দিদি। বললেন, ‘বাদল তোদের বাড়ি যখন যেতাম তুই তখন অনেক ছোট। গরমের দিনে উদলা গায়ে একদিন ঘুরে বেড়াচ্ছিলি।’ আপা লজ্জা পেয়ে দুহাত দিয়ে চিরায়ত পরিচিত ভঙ্গিতে মুখ ঢেকেছিলেন।

আপা খুব নিরহংকার, লোভহীন, সাদামাটা জীবন ভালোবাসতেন। বিয়ে করেননি। চিন্তাচেতনায় সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী ছিলেন। এ সমাজে এখনো একটি মেয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়। বিয়ে না করার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে জানিয়েছিলেন তিনি একটি অনাড়ম্বর স্বাধীন কর্মময় জীবনের স্বপ্ন দেখতেন। বিয়ে, সন্তান, সংসার বেশির ভাগ নারীর স্বপ্ন ও কাজকে আটকে দেয়। চারপাশের নারীদের জীবন দেখে তিনি এটা টের পেয়েছিলেন। বিয়ে, সন্তান, সংসার নিয়ে এতটা বছর পর আমরা কতজন নারী পারছি নিজের কাজ, নিজের জীবনকে প্রাধান্য দিতে? জীবন তো সবার জন্য একটাই।

৩০ বছরের পরিচয়ে যতটুকু দেখেছি পুরুষ বর্জিত জীবন ছিল আপার। রানী এলিজাবেথ যেবার ঢাকা এলেন, আপা পত্রিকার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে গেলেন ছবি তুলতে। অনুষ্ঠান সমাপ্তির পর মানুষের হুড়োহুড়িতে পড়ে যান। সেদিন পায়ের চাপে পিষে মরেই যেতেন। একজন পুরুষ ফটোগ্রাফার আপাকে তুলে বাঁচিয়েছিলেন।

কয়েক বছর আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিয়ে যে করলেন না সুখী বিবাহিত মানুষদের দেখলে আপসোস হয় না? আপা বলেছিলেন, ‘এতটুকু নয়, তোমাদের চেয়ে ঢের ভালো আছি।’ আপার সঙ্গে সবসময় তার বন্ধুরা থাকত। শিক্ষাবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও অভিনেত্রী আলেয়া ফেরদৌসী আপা ছিলেন সাইদা আপার জীবনের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে, তার সঙ্গী। তারা দুজন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দিল্লি, কাশ্মীরসহ নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। পূর্ণিমা রাতে তাজমহল দেখতেও গিয়েছেন। তারপর ছিলেন অনন্যার নির্বাহী সম্পাদক দিল মনোয়ারা মনু আপা। মনু আপার আন্তরিক প্রচেষ্টায় সাইদা আপার ‘আমার চোখে সত্যজিৎ’ বইটির প্রুফ দেখা থেকে সবকিছু সম্পন্ন হয়ে অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে নিশাত জাহান রানা আপা পুনর্মুদ্রণ করেন।

আপা সবসময় সবার খরব নিতেন এবং প্রায় প্রতি মাসে তার নানা বয়সী বন্ধুদের বাসায় ডেকে একত্র করে খাওয়াতেন। আপার ভাই আব্দুল আহাদের ছাত্রী রোকাইয়া হাসিনা লিলি আপার গানে-কবিতায়-আনন্দে ভরপুর থাকত সেই দুপুর গড়িয়ে বিকাল-সন্ধ্যাগুলো। সে আড্ডায় গুণী মানুষ থাকতেন, থাকতেন আপার বোনেরা; অনুজ বন্ধু মোনালিসা, আফরিন, রানা আপা, রোখসানা প্রমুখ। উঁচু পর্বতের সৌন্দর্যময় গভীর গাম্ভীর্য পরিবেশ ছেড়ে সমভূমিতে নেমে গেলে যে রকম অনুভূতি হয়, আপার বাড়ি থেকে বের হয়ে ফেরার পথে সে রকমই অনুভূতি হতো।

বড় বোন লিলি আপার বর মারা যাওয়ার কিছুদিন পর সাইদা আপা সবাইকে ডাকলেন লিলি আপার জন্মদিন পালন করবেন বলে। বললাম, আপা এটা কি ঠিক। আমার কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বললেন, ‘সেজন্যই সবাইকে ডাকছি। লিলিবুর সেই যন্ত্রণার ভার ভুলে থাকার জন্যই তোমাদের ডাকছি একটু আনন্দ হইচই করার জন্য। এটার প্রয়োজন।’ কী গভীর জীবনবোধ! জীবন তো বহতা নদীর মতো। যে বেঁচে আছে তাকে জীবন বইতে হয়। বইবার সেই শক্তি অর্জনের জন্য লিলি আপার মন ভালো করার কি চমৎকার চিন্তা!

আব্দুল আহাদ ভাই যেদিন মারা যান সেই স্মৃতিটা মনে দাগ কেটে আছে। গুণী বড় ভাই যার সান্নিধ্যে গান আপার প্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেই ভাইয়ের মৃত্যুর দিন বড় বিষণ্ন ছিলেন। ভাইবোনের মধ্যে এ দুই ভাইবোন বিয়ে করেননি। সেজন্য হয়তো সম্পর্কটা জোরালো ছিল। খুব বৃষ্টির ভেতর কবর খোঁড়ার পর বলা হয় ওনার পরিবারের পক্ষ থেকে একজনকে প্রথম মাটি দিতে। আপা ভেজা এক দলা মাটি মুঠো ভরে কবরের ভেতন দিলেন পরম যত্নে। কিছুদিন পর আপা আমাকে ফোন করে বললেন হামিদা আপার বাসায় গিয়ে আহাদ ভাইয়ের ঘরের ছবি তুলে দিতে। ঘরটায় ঢুকে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। শুধু মানুষটিই নেই। রয়েছে তার হারমোনিয়াম, বিছানা, জুতো, ঘড়ি, চশমা সবকিছু পরিপাটি সাজানো। আপা যেমন ছিলেন লিলি আপার বাড়ি, তেমনি আহাদ ভাই থাকতেন হামিদা আপার বাড়িতে। টপ অ্যাঙ্গেল, লো অ্যাঙ্গেল—নানাভাবে ছবি তুলে দিলাম। নিজে একজন আলোকচিত্রী হয়েও ভালো ফ্লাশ না থাকার অজুহাতে আমাকে ছবি তোলার সুযোগ করে দিলেন। আজ সাইদা আপার নিজের ঘরটাই হয়তো সেভাবে পড়ে আছে। যাওয়া হয়নি আমার।

তার খুব কাছের একজন মানুষ। বাড়িতে সারাক্ষণ যার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন সেই ঝন্টুর কথা না বললে আপার স্মৃতিচারণ পূর্ণতা পাবে না। ধর্মীয় গোঁড়ামি পছন্দ করতেন না আপা। সনাতন ধর্মের মানুষ ঝন্টু, ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে আপাদের বাসায়। আপার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। শুনেছি আপার মৃত্যুতে খুব কেঁদেছে। ঝন্টুকে একদিন বলেছিলাম, তোর ধর্ম কী রে? ঝন্টু উত্তরে বলেছিল, আপা আমার কোনো ধর্ম নেই। মানুষই সব, মানুষের ওপরে আর কিছু আছে? আপাদের নিয়ে, আপনাদের নিয়েই আমার ধর্ম।

ছোটবেলা থেকে সাইদা আপা একটা গান খুব পছন্দ করতেন, ‘আমার রাত পোহালো, শারদ প্রাতে...।’ গানটি আপা বারবার শুনতে চাইতেন। কী আশ্চর্য ডিসেম্বরের ২৯ তারিখে জন্ম নেয়া মানুষটি চলে গেলেন এই বছরের শরৎকালেই।

পড়াশোনাকে প্রচণ্ড মূল্যবান মনে করতেন। নিজে দুটো বিষয়ে মাস্টার্স করেছিলেন বাংলা সাহিত্য ও লাইব্রেরি সায়েন্সে। সবসময় বলতেন, ‘পড়াশোনা ভালোভাবে শেষ করতে না পারলে লোকে সম্মান দেবে না।’

৫০-এর দশকে যে সময় শিক্ষিত পরিবারের পুরুষরাও আলোকচিত্রীকে পেশা হিসেবে নিতে ভয় পেত সে সময় আপা সভা, সমাবেশ, স্টেডিয়ামের খেলার মাঠ সর্বত্র ক্যামেরা হাতে দৃঢ়তার সঙ্গে ছুটে বেড়িয়েছেন। সাইদা আপা ছিলেন নারী আলোকচিত্রীদের পথিকৃৎ, পথিকৃৎ শব্দের অর্থ পথ প্রদর্শক।

তিনি আমাদের জন্য পথ তৈরি করেছেন। আমরা আজ সে পথে হাঁটছি।

মুনিরা মোরশেদ মুন্নী: আলোকচিত্রী ও চলচ্চিত্র সংসদকর্মী