পৃথিবীতে
এ পর্যন্ত নির্মিত
শ্রেষ্ঠতম ক্যামেরায় যদি দৃশ্যগুলো ধারণ করা যেত, প্রদর্শনীর
আগে অসম্পাদিত সেলুলয়েডে যা আসত: একজন
মানুষের শায়িত মুখের কঙ্কালের ভেতর থেকে সর্বঅর্থে জীবিত দুটি চোখ দেখছে, আশপাশে কজন
মানুষ জীবনের সব রকম প্রবাহের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নিয়মে চলমান।
সারা দিনে কয়েকবার মানুষটির ছোট আত্মজা ক্ষমা, ওই চোখ
দুটির সামনে দাঁড়িয়ে, এক আশাবোধ
থেকে, ডাকছে: ‘বাবা, বাবা’। কম্পমান
চোখ দুটি, সাড়া দিল
বোধ হয় (!), দেখে এবং
কখনো স্পষ্ট, কখনো অস্ফুট
কণ্ঠ শুনে তার আত্মীয় ও বন্ধুদের ক্ষমা, স্বরের আর্দ্রতা অনুমেয়, টেলিফোনে বলছে: ‘বাবা আজ
দুটি, আজ তিনটি
কথা বলেছে, ডান হাত
তুলে টিভি বন্ধ করতে ইশারা দিয়েছিল।’ যেকোনো কথা-স্বর
হচ্ছে সেই ধ্বনিময় উচ্চারণ, যা সাক্ষী
দেয় জীবন এখনো জায়মান।
এগারো
মাস ধরে বিছানায় শোয়া, পারকিনসন ও
বয়সজনিত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত বহুমূত্রে আক্রান্ত, সাদাটে চামড়ায়
সেঁটে যাওয়া, হয়তো তখন
শরীরের ওজন পনেরো বা ষোলো কেজির কাছাকাছি, পাঁচ ফুট
চার ইঞ্চি উচ্চতার কঙ্কাল-কাঠামোর মানুষটি
আগের সন্ধ্যায়, পরদিন (১৩
অক্টোবর, ২০২০)
সকালে হবে মৃত্যু, তার বড়
আত্মজা হেমার আশাপীড়িত ‘বাবা,
বাবা’ ডাক
শুনে, ক্ষীণ স্বরে
দিয়েছিলেন শেষ উত্তর: ‘মা’।
লেখাটির
শিরোনামে ‘পর’ শব্দটি পড়ার মুহূর্তে মনে হতেই পারে, একদিনে ওই
‘পর’-এর সৃষ্টি হয়নি।
আমরা জানি, একটি পরকে
সত্য-দৃশ্যে তৈরি
করার আগে অনেক পথ হাঁটতে হয়।
অগ্রজর
পোশাকি নাম রশীদ হায়দার আমি ব্যবহার করব না, ডাক
নাম দুলালও নয়।
পরিবারের অন্য অগ্রজরা আমাকে বলতেন, ‘তোর
বয়স তখন আড়াই বা তিন, দুলাল
জুসনারাইতে গলা খুলে ছাদে গান ক্যরতে, কী ভালো
গলা ছিলে উয়ের’, ওই
বয়সে শুনেছি ছোটরা তাকে বলে: ‘দাদু
ভাই’। তখন মনে
হতো, ধলা, সুন্দর ছেলেটির নাম ‘দাদু’। দু-একটি কথা বলতে শেখা শিশু যেমন মনে করে, সব
সময় তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা, রাতে ঘুম
পাড়ানোর জন্য গর্ভজাত চাঁদের কপালে ‘চাঁদের টিপ’ দিতে চাওয়া, কাঁদলেই কেউ
বলে ‘ওর মা
কই’, স্তন্য দেয়া মেয়েটির নাম ‘মা’।
শ্যামল
মিত্র ছিলেন তার প্রিয় শিল্পী।
‘তোমার সমাধি
আজ ফুলে ফুলে ঢাকা’, ‘যদি কিছু আমারে সুধাও’ এবং
‘ভ্রমরা তুই
যাসনে সেখানে’ তার
আবেগঋদ্ধ কণ্ঠে শুনেছি অনেকবার।
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আমি কত
যে তোমায় ভালোবেসেছি’ গাইবার
সময় কেন যে অগ্রজ চোখ বুঝতেন, বুঝিনি।
প্রাণী
মাত্রেই হোঁচটের দাস।
পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক চড়াই-উতরাইয়ে—কত
রকম হোঁচটের মধ্য দিয়ে প্রাণকে হাঁটতে হয়, আর
হাঁটা মানেই সামনে যাওয়া—যে-জন হোঁচট খেয়ে, যা অভিজ্ঞতাকে
পুষ্টি দেয়, ঋদ্ধ
করে, বসে
থাকে, কোনো নির্ভরতার
হাত খোঁজে, সেই ঘরানার
মানুষ ছিলেন না দাদু ভাই।
মনে করতেন, ‘শ্রমিকতার
বিকল্প নেই।’ গীতায় বর্ণিত কর্ম যে-অর্থে
ধ্যান, আমাদের এই
ভাই ছিলেন তার একনিষ্ঠ সেবক।
প্রতিদিনের শ্রমঘামে তার গোসল হতো অন্তত দুবার।
কবিতা
লিখতেন না অথচ দর্শনির বিনিময়ে কবিতা শোনার সংগঠন ‘পদাবলী’র গড়ে ওঠা
পর্বে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, উপন্যাসকার মাহমুদুল হক ও কবি রফিক
আজাদের সঙ্গে রাত ও দিন নেই, গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবে কাজ করেছেন।
আমাদের
পরিবারে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে হেসে ওঠা মানুষ দাদু ভাই নিজের খাদ্য রুচির স্বাদ-বিচারে মনে
করতেন, বাংলার দুটি
খাদ্য, গরম ভাত+ঘি+আঠালো
লাল আলু ভর্তা এবং শর্ষে ইলিশ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম খাবার।
বাজার করা ছিল তার একটি প্রিয় শখ নয়, কাজ। কোন মাছের
সঙ্গে কোন তরকারির রসায়ন সঠিক হবে, খুঁটিনাটি
জানতেন।
পাবনার কোনো মানুষ তার সামনে যদি প্রমিত বাংলায় কথা বলত, তাকে
বলতেন, ‘নদীয়ার
ভাষায় কথা কও ক্যা? সেই একষট্টি
সালে ঢাকায় আইছি, পাবনার একটা
শব্দর উচ্চারণও ভুলি নাই।
তুমি ঢাকায় ক্যবে আইছ্যাও?’
প্রতিটি
মানুষের কোনো না কোনো জীবন-দর্শন থাকে, দাদু ভাইয়ের চিন্তার মধ্যে যে কয়টি ছিল, তার
একটি : ‘যে
লোক হাসি এডিট করে, সে
বেশি জটিল।’
সব
রকম, প্রয়োজন
ও ব্যবহারমাফিক, পোশাক
পরতেন।
জানতেন, লুঙ্গির গিঁট
ও সব রকম
টাই বাঁধার প্রকারভেদ, ব্রেক স্যুটের
কালার কম্বিনেশন।
চুলে কলপ দিতেন না।
যেকোনো সাবান দিয়ে শেভ করতেন।
একদিন বললাম ‘সামনে শেভিং
ক্রিম, এনেছেন টোকিও
থেকে, ব্যবহার না
করে, করছেন
কাপড় কাচা সাবান?’ ‘তুই করিস, আর শোন
আইনস্টাইনকে যখন বলা হলো শেভিং ক্রিম ব্যবহার করেন না কেন? উত্তরে
তিনি বলেন, সাবান তো
সাবানই, তার আবার
পার্থক্য কী?’
কখনো
বলতাম: ‘আপনার
গল্প “কাক” ও “বৃহন্নলা”, মুক্তিযুদ্ধর পটভূমিতে লেখা উপন্যাস “অন্ধ কথামালা”, নাটক “শেকসপিয়ার দ্য
সেকেন্ড” ও
“গোলাপ গোলাপ” এবং কিশোর-উপন্যাস “যদি
দেখা পাও” উত্তম রচনা।
“কাক” গল্পটি কি হিচককের বার্ডস দেখে লেখা?’ তার
উত্তর ছিল দৃঢ়, ‘না, তখনো ঢাকায় বার্ডস আসেনি।’
প্রায়
সব লেখকই তাদের লেখা পড়ে শোনাতে ভালোবাসেন।
যতদিন, এমনকি পরেও
যখন সংসার করে আলাদা হয়েছি, দাদু ভাইয়ের
লেখার প্রথম শ্রোতা ছিলাম।
কখনো ফোনে দুতিন পৃষ্ঠা শুনতে হয়েছে।
‘কী কেমন
হলো?’ ‘ওই অংশ ভালো লাগল না’ বললে বলতেন, ‘ক্রিটিক
হইছ, ঠিক
আছে দ্যাপোনে।’ পরে দেখেছি, পরিবর্তন করেছেন।
যুদ্ধের
সময় পাকিস্তানি মিলিটারির ক্যাম্প ছিল খিলগাঁওয়ের আনসার হেডকোয়ার্টার।
বিপরীতে, দাদু ভাইয়ের
বাসার ড্রয়িংরুমে, বন্দুকের নাকের ডগায় বসে, আমরা
ছাপতাম মুক্তিযুদ্ধ, দেশ ও স্বাধীনতা বিষয়ে
সচেতনতামূলক, উদ্বুদ্ধকরণ লিফলেট।
জন, আমাদের
বন্ধু, নারিন্দায় ছিল
ওদের প্রেস, পুরো মেটার
কম্পোজ করে, কী
যত্নে, একটি অক্ষর
বা দাড়িকমাও যেন রিকশার ঝাঁকিতে পড়ে না যায়, নিয়ে
আসত।
বারবার পায়ে চাপ দিয়ে বীনু, ফেরদৌস, জন, বাবু, সোহেল আর
আমি ছাপতাম লিফলেট।
যেন সবকিছু স্বাভাবিক, দাদু ভাই
বারান্দায় সিগারেট টানছেন, টহলরত পাকিস্তানি
সৈনিক তাকে দেখছে।
এবং ঝরা ভাবি একাধিকবার চা, টোস্ট
আর মুড়ি ভাজা দিচ্ছেন।
দাদু ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আখ্যান ‘খাঁচায়’, এখন যা বললাম, পাওয়া যাবে।
১৯৭১। জুলাইয়ের ৯
তারিখ সকালে, ভাবি,
দাদু ভাই ও হেনা আপা
আমাকে বাসার শেষ সিঁড়ি পর্যন্ত নেমে বিদায় দিলেন।
বীনু আর আমি মুক্তিযোদ্ধা হতে আগরতলায় যাব।
ঝরা ভাবি তার আঙুল থেকে আংটি খুলে দিলেন।
‘প্রয়োজনে বিক্রি
করবে।’ দাদু ভাই দিলেন ২৫ টাকা।
আমাদের জন্য মতিঝিলের দোতলা বাসায় অপেক্ষা করছিলেন কামাল লোহানী আর ঢাকায় থেকেও, তাকে মুক্তিযোদ্ধা
মনে করি, দীপ্তি
লোহানী।
ওই দিনগুলোতে দীপ্তি বৌদির হাতের খাবার খেয়ে কত তরুণ যুদ্ধে গেছে।
জিয়া
ও দাদু ভাই
বাবার বিরুদ্ধে ইতিবাচক ষড়যন্ত্র করে আমাদের লেখাপড়া শেখাতে, মানুষ করতে
১৯৬৪ সালে ঢাকায় নিয়ে আসেন।
অনেক
পরে, সাল
১৯৭৭, অক্টোবরের প্রথম
সপ্তাহ, তারিখ মনে
পড়ছে না, রাত
১১টার দিকে নীলখেত মোড় থেকে জিয়াউর রহমানের সৈনিকরা আমাকে তুলে নিল।
বন্ধু দিদার ছিল সঙ্গে।
ও আর বশীর
ওই রাতে, তখন কারফিউ, হাজিপাড়ায় দাদু ভাইকে খবর দিল।
বশীর ও দিদার পরে
আমাকে বলেছে, সারা রাত
দাদু ভাই বারান্দায় হেঁটেছেন, একটার পর
একটা সিগারেট খেয়েছেন, ঝরা ভাবিও
ঘুমাননি।
আমরা
সাত ভাই।
ওপরে বলা সন পর্যন্ত চার ভাই জেল খেটেছি।
পরে আরো এক ভাই খাটবে।
জেলের অভিজ্ঞতা হয়নি বলে দাদু ভাইয়ের আফসোস ছিল।
বলতাম, ‘আপনি
বাড়ির গুড বয়, জেল
খাটবেন কীভাবে?’
গত
শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে
উত্তমসুচিত্রা, দুটি নাম সন্ধিযুক্ত, মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীদের, তাদের
অভিনীত ‘বই’ না দেখলে নিদ্রা হারাম, ভাত লবণপূর্ণ, রুচিমান যত্নে শিখিয়েছেন: কীভাবে পরিশীলিত
দৃষ্টিতে তাকাতে হয় নারীর দিকে, পুরুষের দিকে। ওই সুরুচিমান্য
ব্যবহার ও আচরণে প্রেমপর্বে
এবং ৫২ বছরের সংসার জীবনে, সমৃদ্ধ হয়ে
ছিলেন দাদু ভাই ও ঝরা ভাবি।
মাথার
পেছনে ডাবগাছ ও আকাশ।
দুজন যেভাবে শারীরিক স্পর্শের মধ্যে থেকেও, শ্রীসৌন্দর্য বজায়
রেখে স্পর্শহীন, প্রসন্ন, দুজনের
দৃষ্টি আগামী দিনের বিভাবের মধ্যে নিবন্ধিত, ওই ছবি
যখন প্রথম দেখি, ভাবিকে বলেছিলাম: ‘সুচিত্রাউত্তম।’
দাদু
ভাই ও আমাদের দেখা
সর্বংসহা ঝরা ভাবি প্রসঙ্গে কথা হলে বড়রা বলেন, ‘দুলালঝরা’। লক্ষণীয়, এখানেও নাম দুটি সন্ধিযুক্ত।
ঝরা ভাবি দাদু ভাইকে তাঁর জীবনের জন্যে মনোনীত করেছিলেন, আমার ধারণা, মানুষটি লেখক, সেই জন্যে।
ভাবি
মারা গেছেন প্রায় ষোলো মাস আগে, যদি
এ রকম হতো, ভাবি নয়, দাদু
ভাই মারা গেছেন আগে এবং কেউ ভাবিকে বলছেন, ‘আপনি
বিধবা হলেন।’ বোরহেসের মৃত্যুর পর এক সাংবাদিক মারিয়া কোদোমাকে বিধবা হওয়ার কথা বললে, মারিয়া বলেছিলেন, ‘প্রেমিকা কি
কখনো বিধবা হয়?’ আমি
প্রায় নিশ্চিত, ঝরা ভাবিও
বলতেন একই উত্তর।
একদিন
দাদু ভাই আমাকে বললেন, ‘ঝরাকে
কিছুই দিতে পারিনি।’ আমি বললাম: ‘পৃথিবীর
শ্রেষ্ঠতম প্রেমিকের সংলাপ।’ যেমন অনেক বছর আগে, মনে
পড়ে, নিউইয়র্ক
থেকে ভাবিকে লিখেছিলেন, ‘এই
নগরে তোমার জন্য কিছুই নেই।’ ভাবি কথাটি আমাকে বলার পর, দেখি, তার মুখ দীপ্তিমতী।
‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা’ কতবার
বলেছেন দাদু ভাই, কিন্তু
ভাবির মৃত্যুর পর, পরম
আশ্রয় হারানোর হূদয়-ক্ষত কষ্টে, রবীন্দ্র-উচ্চারণ থেকে
নেয়া ব্রত তিনি আর ধারণ করতে পারলেন না।
আজিমপুরে
ঝরা ভাবির কবরে যখন দাদু ভাইকে নামানো হচ্ছিল, আমার মনে
পড়ে : সিম্পোজিয়ামে
বলা প্লেটোর কথা: ‘পিপল
ওয়ার হারমাফ্রোডাইটস আনটিল গড স্পিল্ট দেম ইন টু, অ্যান্ড
নাউ অল দ্য হাভস ওনডার দ্য ওয়ার্ল্ড ওভার সিকিং ওয়ান অ্যানাদার. লাভ ইজ
দ্য লঙ্গিং ফর দ্য হাফ অব আওয়ারসেলভস উই হ্যাভ লস্ট।’ দার্শনিকের বাক্যের শেষে যোগ করা যায়: বিচ্ছিন্ন
দুজন পরস্পরকে খুঁজে পেয়েছে, তাদের প্রেম
কবরেও একত্রিত।
দাদু
ভাই ও ঝরা ভাবির
কাছে আমি ছিলাম ,দ১৯৬৯ থেকে
১৯৮০ পর্যন্ত।
আমাদের ভাইবোনদের সম্মানজনক মাটির ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়ার জন্য, প্রথমে জিয়া
ও দাদু ভাই
এবং পরে যোগ দিয়েছিলেন ঝরা ভাবি, এখন তিনজনই
প্রয়াত, উদয়াস্ত শ্রম
দিয়ে যে ভিত তৈরি করে গেছেন, তার নাম
হতে পারে: আশ্রমের ছায়া।
সবাই
জানে, প্রিয়জনের জন্য
কথা ও বাক্যের ক্রিয়াপদে
অতীতকাল ব্যবহার হাহাকার-সঞ্চারী।
জাহিদ
হায়দার: রশীদ হায়দারের
ভাই





