ষাট ও
সত্তরের দশকে মাকে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবেই দেখেছি। আমরা দুই ভাই-বোন।
আমার মা ভাষাসৈনিক
ও জাতীয়
অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিভাগে। আমাদের বড় হওয়ার
সময়ে বাড়িতে তিনি যে পরিবেশ
তৈরি করেছিলেন সেখানে সর্বদা পড়াশোনার চাপ ছিল তা নয়,
কিন্তু একটা বোঝাপড়া ছিল: আমাদের একটা
ন্যূনতম পর্যায়ে কৃতকার্য হতে হবে। আমার বাবা ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ একজন আইন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কাজেই বেশির ভাগ সময় ওনাকে আইন পেশায় মনোনিবেশ করতে হয়েছে। আমার নানা বিচারপতি মুহাম্মদ ইব্রাহিম ও বাবা
যেহেতু আইন পেশায় ছিলেন সেহেতু আমার জন্ম থেকেই এটাই আমার পেশা হবে বলে বোধ হয় ধারণা
করা হয়েছিল। তবে আমি কিন্তু আমার মায়ের মতো ইতিহাসবিদ হতে চেয়েছিলাম। এখনো আইনের তুলনায় ইতিহাসের প্রতি আমার আকর্ষণটা বেশি।
বাড়িতে আমরা
গান শিখতাম, আমার বোনকে
নাচের স্কুলে পাঠানো হতো। বাড়ির সামনে মাঠ। খেলাধুলাও হতো। তবে সবকিছুর জন্য সময় নির্ধারিত ছিল। খুব উদার একটা আবহ ছিল। বিষয়টা এমন ছিল যে তোমাদের
সব স্বাধীনতা
দেয়া হচ্ছে, তবে তোমাদের
নিজেদের বিচার করতে হবে এবং কিছু সীমা তোমরা অতিক্রম করতে পারবে না।
মানুষকে মানুষ
হিসেবে গ্রহণ করার শিক্ষাটা আমরা পরিবার থেকে পেয়েছি। এরপর বর্ণ, ধর্ম, ভাষা—আর এগুলো
যে একজন
মানুষের প্রাথমিক পরিচয় নয় তা
আমরা বাবা-মা
দুজনের কাছ থেকে শিখেছি। তবে মা বিষয়টিকে
আমাদের নানাভাবে যেমন সিনেমা, সাহিত্য, সংগীত
কিংবা ভ্রমণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। তিনি বুঝিয়ে দিতেন সংকীর্ণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীটা অনেক বড় এবং
মানুষের পরিচয়ে মানুষকে জানতে হবে ও শ্রদ্ধা
করতে হবে।
বাবা ২০০৩
সালে প্রয়াত হওয়ার পর মা
আমার সঙ্গী আর আমি
মার সঙ্গী হয়ে যাই। আমার বোন বাইরে থাকে। এরপর ১৭ বছর
ধরে মা আমার
সঙ্গে। এ সময়ে
তার একটা বিবর্তন আমি দেখেছি। তিনি বাঙালি, তিনি একজন
ভাষাসৈনিক—সব
সময় তিনি তা ধারণ
করতেন। তবে শেষ জীবনে এটাই তার প্রাথমিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে তিনি একটা মানদণ্ড তৈরি করতেন যে আমরা
বায়ান্ন কিংবা একাত্তরে কী চেয়েছিলাম।
তারপর এত দশক
পার হয়ে কী পেয়েছি।
সবকিছু মিলিয়ে তিনি দেখতেন যে আমাদের
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
হচ্ছে আমাদের বাঙালি সত্তা। মায়ের কাছে এটা অনেক বড় বিষয়
ছিল। আমার সঙ্গে তার যখন এ বিষয়ে
আলোচনা হতো তখন তিনি আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে চাইতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ বিষয়ে
তিনি খুব সচেষ্ট ছিলেন। বাংলাদেশী তো বটেই
বাঙালি এবং একজন নারী যোদ্ধা—এ
তিনটি পরিচয় নিয়ে তিনি ভীষণ গর্বিত বোধ করতেন।
বিশ্ববিদালয়ের দায়িত্ব
সামলে মা কিন্তু
অনায়াসে আমাদের বড় করে
তুলেছেন। তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে প্রায় ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বিদেশী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। বেশির ভাগ কাজ ছিল শিক্ষকতা বিষয়ক। মা আধুনিক
তুরস্ক ও কামাল
আতাতুর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ছিলেন, ইস্তানবুলে গিয়ে
পড়িয়েছেন। এখানে ও আমেরিকাতে
বেশ কিছুদিন ছিলেন। জাতিসংঘের হয়ে বিভিন্ন কাজে যুক্ত থেকেছেন। গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তার ওই ব্যস্ততার
দিনগুলোতেই কিন্তু আমরা ভাই-বোন
বড় হয়ে
উঠছি। তবে মা বাড়িতে
না থাকলেও
তার অনুপস্থিতি কিন্তু আমরা অনুভব করিনি। কারণ মা বাড়িতে
না থাকলেও
তিনি যে ব্যবস্থাটা
করে গিয়েছিলেন আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা মেনে
চলতাম। বাবাও তা মেনে
চলতেন।
মায়ের সঙ্গে
তো আমার
অনেক স্মৃতি রয়েছে। তার ৮৭ বছরের
জীবনে অনেক ঘটনা রয়েছে। ছোটবেলায় বই নিয়ে
আলোচনা—আমি
মায়ের সঙ্গে সাধারণত এ কাজটা
করতে ভালোবাসতাম। আমার ১০-১১
বছর বয়সে তিনি আমাকে বরিস পাস্তেরনাকের ডক্টর জিভাগো, তলস্তয়ের ওয়ার
অ্যান্ড পিস, ডাফনে ডু
মরিয়ার বা পার্ল
বাকের বই ধরিয়ে
দিতেন। আমি আর মা
একসঙ্গে বসে গান শুনতে ও সিনেমা
দেখতে খুব পছন্দ করতাম। আমরা দেশী-বিদেশী
বিভিন্ন সিনেমা দেখতাম। আমরা যে একটা
জনরার সিনেমা বা গান
পছন্দ করতাম তা কিন্তু
নয়। মা আর
আমার মধ্যে এই যে
মেলবন্ধন এটা আমার কাছে খুব মূল্যবান মনে হয়। এভাবে অনেক সময় কেটেছে। মা ঘুরে
বেড়াতে খুব পছন্দ করতেন। থিয়েটার দেখতে যেতেন।
মনে আছে,
মায়ের সঙ্গে সাহিত্যিক বা ঐতিহাসিক
চরিত্রগুলো নিয়ে খুব আলোচনা হতো আমার। আলোচনায় মত্ত হতে খুব পছন্দ করতেন। শেষ দিকে আলোচনা করতে করতে মা যখন
সময়-কাল
ভুলে যেতেন। আমি গুগল করে বলতাম। তখন মার মনে পড়ত। মা এক
আলোচনা থেকে অন্য আলোচনায় চলে যেতেন। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের খুব পছন্দ করতেন মা। বঙ্গবঙ্গু থেকে শুরু করে কামাল আতাতুর্ক। ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো নিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত গবেষণা করে গেছেন ।
পড়ার পাশাপাশি
মা লিখতে
খুব ভালোবাসতেন, তবে পছন্দ
করতেন ঘর সাজাতে।
আমার মায়ের বাসার লাইব্রেরিতে যখন বসি তখন আমি তিন প্রজন্মের ইতিহাস খুঁজে পাই। মা বোধ
হয় এটা
তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। বিভিন্ন ধাপে ধাপে লাইব্রেরিটা সাজানো হয়েছে। এখানে আমাদের তিন প্রজন্মের দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ধাপে ধাপে ইতিহাসের অগ্রগতিটা দেখা যায়। এটাই মনে হয় মায়ের
কাছ থেকে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মা কখনো
কিন্তু আমার সামনে আমাকে নিয়ে প্রশংসা করেননি। আমি বাইরে থেকে শুনেছি সেসব। মা সব
সময় বলতেন ‘নিজের সত্তা, নিজের বিবেক
দিয়ে কাজ করবে। যে সিদ্ধান্তটা
দেবে সেটা জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হতে হবে তা নয়,
কিন্তু তুমি যদি মনে করো এটা আইনের আঙ্গিকে সঠিক এবং আইনের মানদণ্ডে এটাই খাটে তাহলে তোমাকে সেটাই করতে হবে। যতই তা অজনপ্রিয়
বা সমালোচক
সিদ্ধান্ত হোক না কেন।
তোমাকে নিজের কাছে সঠিক থাকতে হবে।’
জীবনের শেষ
দিকে মা আমাকে
একটা বিষয় শিখিয়ে গেছেন যে মানুষের
সবকিছুই মানুষের প্রাপ্তির খাতায় থাকে না। প্রাপ্তি ছাড়া যে জীবনটা
অসম্পূর্ণ রয়ে গেল—তাও
কিন্তু নয়। মা শিখিয়েছেন,
গন্তব্যস্থলে যাওয়ার আগে যাত্রাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গন্তব্য তো শেষ
হয়ে যায়। কিন্তু যাত্রাপথে কী শিখলাম
কী পেলাম
তাই বোধ হয় জীবনের
সবচেয়ে বড় মাপকাঠি
হয়ে দাঁড়ায় যে জীবন
সুখী, সফল ও
সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা। মায়ের কাছ থেকেই এটাই শিখেছি।
মা তার
আত্মজীবনীটা লিখে যেতে চেয়েছিলেন। কাগজপত্র সব রয়েছে।
মায়ের এ আফসোসটা
ছিল। এ গুরুভারটা
মা আমাকে
দিতে চাননি অথচ দায়িত্বটা আমার কাঁধেই পড়েছে।
সব সাজানো
আছে। ম্যাটেরিয়ালস ফর অটোবায়োগ্রাফি
নামে; পেপার ক্লিপিং,
চিঠি, ছবি সব
গুছিয়ে রেখে গেছেন। কিন্তু লিখতে পারেননি। দায়িত্বটা আমাকে পালন করতেই হবে। হয়তো অটোবায়োগ্রাফি হবে না, বায়োগ্রাফি হবে।
এছাড়া আরো একটা কাজ রেখে গেছেন তা হচ্ছে,
মা তার
বাবার দুটো ইংরেজি বইয়ের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। সব কাজ
শেষ। এখন একবার এডিট করে বই দুটো
ছাপাতে দিতে হবে।
মায়ের শুরুর
দিকের কাজগুলো সব ইংরেজিতে
ছিল। মায়ের পিএইচডি থিসিস অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, এরপর ইউনিভার্সিটি
প্রেস থেকে ইংরেজিতেই বের হয়। এরপর দুটো সংস্করণ বাংলা একাডেমি থেকে বাংলায় বের হয়েছে। এক বছর
আগে শেষ সংস্করণটা বের হয়। বাংলা ভাষায় জ্ঞানের পরিধি কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে
সচেতন ছিলেন মা। বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সঙ্গে তিনি বহুদিন ধরে যুক্ত ছিলেন। তাদের প্রধান কাজ বাংলা ভাষায় ইতিহাসের গবেষণা করা। এ দর্শন
নিয়ে মা তার
গবেষণা কাজগুলো বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এরপর তার বাবার বইগুলোও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। মাকে নিয়ে আমি ভীষণ গর্ব অনুভব করি। আমার মা বাংলাদেশের
নারী ভাষাসৈনিক। বাংলা ভাষাকে প্রতিটি পর্যায়ে আমি কীভাবে ব্যবহার করতে পারি, এ বিষয়টা
আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
সৈয়দ রেফাত
আহমেদ:
ভাষাসৈনিক ও জাতীয়
অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদের সন্তান এবং বিচারপতি





