নিলুফার
মঞ্জুরকে আমি একভাবে চিনি যে তিনি আমার মেয়েদের স্কুল সানবিমসের প্রিন্সিপাল।
আমার মনে আছে, আমি
যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ছিলাম তখন শিক্ষার মানোন্নয়নবিষয়ক একটি সভা আয়োজন করেছিলাম।
সেখানে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।
তার স্বামী মঞ্জুর ইলাহীর সঙ্গেও নানাভাবে দেখা হতো।
আমরা
শিক্ষা সম্পর্কে নানা কথা বলি।
কিন্তু শিক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
এখন আমরা বুঝতে পারি যে শিক্ষা আসলে নিম্নমানের শিক্ষাও হতে পারে আবার মানসম্মত শিক্ষাও হতে পারে।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি বাংলাদেশে একটি অন্যতম প্রধান এজেন্ডা এবং সেখানে নিলুফার মঞ্জুরের ভূমিকা বা অবদান স্বীকার করতেই হবে।
শিক্ষার
মাধ্যম নিয়ে নানা বিতর্ক জারি রয়েছে।
বাংলা মিডিয়াম বনাম ইংরেজি মিডিয়াম।
এগুলো মূল বিতর্ক নয়।
মূল বিতর্ক হলো মানসম্মত শিক্ষা ও নিম্নমানের শিক্ষা। নিলুফার মঞ্জুরের
সঙ্গে যখন কথা হয়েছে, তখন দেখেছি
তিনি এসব বিষয়ে খুব সাবলীল আলোচনা করতেন।
এই বলার মধ্যে তার একটা কৃতিত্ব ছিল।
আমার
মেয়েদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে নানা অভিব্যক্তি শুনেছি।
তারা বলেছে, তিনি খুব
সহজেই মিশতেন।
আমরা যারাই একটু ক্ষমতার জায়গায় বা দায়িত্বের জায়গায় যাই, তারা
নিজেদের দূরের মানুষ করে ফেলি।
নিলুফার মঞ্জুর কিন্তু সফলভাবে একটি স্কুল পরিচালনা করেছেন, প্রিন্সিপাল ছিলেন
অথচ কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কারো কাছেই তিনি দূরের মানুষ হননি।
এই যে তিনি কাছের মানুষ হতে পারলেন, এটি একটি
বড় অর্জন।
এটিই কিন্তু আজকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সংকট।
যারা দায়িত্বে আছেন, যারা ক্ষমতায়
আছেন, যারা নীতিনির্ধারণে
আছেন, যারা সমাজকে
বৃহত্তর জায়গায় নেয়ার অবস্থানগুলোয় আছেন, তারা নিজেদের
দূরের মানুষ করে তুলেছেন।
দূরের মানুষ হলো মূলত মানুষের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়া এবং দূরের মানুষ শুধু একতরফা কথাবার্তা বলেন।
কাছের মানুষ কিন্তু দুদিকেই সক্রিয় থাকেন।
তিনি বলেনও, অন্যের কথা
শোনেনও।
বলা এবং শোনা—একই
সঙ্গে দুটি করার মানুষ ছিলেন নিলুফার মঞ্জুর।
আজকে
আমরা ক্রমেই বুঝতে পারছি আধুনিক বিশ্বে চলার জন্য শুধু বড় অবকাঠামো, প্রযুক্তি নয়, সফট স্কিলসও প্রয়োজন।
আচরণ, মূল্যবোধ ও
সময়ানুবর্তিতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমার মেয়েদের আনা-নেয়ার
মধ্য দিয়ে বুঝতে পেরেছি নিলুফার মঞ্জুর রুটিন মেনে মূল্যবোধগুলো মাথায় রেখে সবকিছু পরিচালনা করতেন।
তিনি মানের বিষয়ে সব সময় প্রেরণা ও তাগাদা দিতেন। এটা তার
অনেক বড় গুণ।
তিনি সেই অর্থে বিশেষ কোনো তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না।
তার পরও তিনি কাছের মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে একজন রোলমডেল হয়ে উঠেছিলেন।
তার শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি একটা প্রেরণার আশ্রয়স্থল হিসেবে ছিলেন।
নিলুফার
মঞ্জুরের আরেকটি ভূমিকা অনবদ্য।
তিনি চাইলেই নীতিনির্ধারকদের একজন হতে পারতেন।
সেভাবেও ভালো ভূমিকা রাখতে পারতেন।
কিন্তু তিনি এবং আরো কয়েকজন প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজ করে গেছেন।
বাংলাদেশে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি নিজেও নীতিনির্ধারণী জগতে চলাফেরা করেছি।
এখন বুঝি যে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারা এবং নিলুফার মঞ্জুরের এ অবদানটি আরো
গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থে যে প্রতিষ্ঠান গড়া শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নয়, সমাজের
মধ্যে—বেসরকারি
জগতেও সঠিক মূল্যবোধের ও শর্টকার্ট না
খোঁজার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ভীষণ দরকার।
সানবিমসের মাধ্যমে তিনি সেই বিষয়টিও বড় করে দেখিয়ে গেছেন।
সফল প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগর হিসেবে আমরা তাকে সব সময় স্মরণ করব।
আরেকটি
বিষয় উল্লেখ করব, আমাদের
মধ্যে অনেকেই, বিশেষ করে
যারা অর্থবান, তারা টাকাপয়সার
বিনিময়ে নানা উপকরণ দিয়ে এক ধরনের শর্টকার্ট রাস্তা খুঁজছেন।
নিলুফার মঞ্জুর শর্টকার্টের পক্ষপাতী ছিলেন না।
তিনি নিয়ম মানা, দোষ করলে
সেই বিষয়ে সতর্ক করা, সঠিক
পথে আনার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার বেলায় কোনো ছাড় দিতেন না।
তার পপুলার হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না।
অনেকের পপুলার হওয়া নিয়ে একটা সমস্যা তৈরি হয়ে যায়, তখন
তারা শর্টকার্ট খোঁজেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শর্টকার্টে বড় হওয়াকে কখনো উৎসাহিত করেননি।
শুনেছি, নিলুফার মঞ্জুর অর্থনীতির শিক্ষার্থী ছিলেন।
সেদিক থেকে তিনি আমাদের পেশার একজন সহকর্মী।
যদিও পরবর্তী সময়ে এ পেশায় তিনি
সেই অর্থে থাকেননি।
তিনি শিক্ষা উন্নয়নে নীরবে কাজ করে গেছেন।
বাংলাদেশে এ ধরনের আরো
অনেককেই দরকার, যারা নিজ
নিজ পেশায় রোলমডেল হিসেবে তৈরি হবেন।
আজকে আমাদের এ ‘কাছের
মানুষের’ অভাব
খুব বেশি অনুভূত হচ্ছে।
রোলমডেলের অভাব খুব বেশি।
জোর গলায় চিত্কার করে নিজের অবস্থান জানান দেয়া নয়, নীরবে
নিজের কাজগুলো করে মূল্যবোধের ভিত্তিতে শর্টকার্ট না খোঁজার মানসিকতা নিয়ে রোলমডেল হয়ে ওঠা মানুষ আজ ভীষণ প্রয়োজন।
নিলুফার মঞ্জুরের চলে যাওয়ার মাধ্যমে তার অর্জনের ধরনটা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
প্রতিটি ক্ষেত্রে, পেশায় এ
ধরনটা বড্ড দরকার।
আমি তার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
যেভাবে তিনি রোলমডেল হয়ে উঠেছিলেন, সেই রেশটা
থেকে যাবে।
আমি আশা করি, শুধু
স্মৃতিচারণের মাধ্যমেই এটা শেষ হবে না, যে
অর্থে রোলমডেল বলেছি—নিলুফার
মঞ্জুর কাছের মানুষ হয়ে, মূল্যবোধের
ধারক হয়ে, শর্টকার্ট
না খুঁজে, সঠিক পথে
থেকে মানের বিষয়ে কোনো ধরনের আপস না করে কাজ করে গেছেন—তার
সংখ্যা বাড়বে।
এটি হলেই তা হবে তার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধার্ঘ্য ও স্মৃতিচারণ।
নির্বাহী
চেয়ারম্যান, পিপিআরসি; চেয়ারম্যান, ব্র্যাক





