প্রতি
বছরই নববর্ষের আগে আমরা খেরোখাতা খুলে বসি।
একটি বছরের বর্ণিল অথবা বিবর্ণ সময়গুলোর দিকে ফিরে তাকাই।
আনন্দ আর কষ্ট সব একাকার হয়ে একটি দুর্বোধ্য পরিবেশ তৈরি করে।
এর মধ্যে দেশের উজ্জ্বল সন্তানদের হারানোর বিয়োগ-ব্যথা আমাদের
মনের ক্ষত বাড়িয়ে দেয়।
তেমনি ঔজ্জ্বল্য ছড়ানো একজন অন্তর্মুখী বিদগ্ধ ইতিহাসবিদ অধ্যাপক এবিএম হোসেন স্যারকে হারিয়েছি আমরা এ বছরই।
৮৬ বছর বয়সে স্যারের এ মৃত্যু অস্বাভাবিক
নয়।
তবে বছর দুই স্যারের শরীর ও মনে অনেক
ধকল সামলাতে হয়েছে।
এর প্রায় এক বছর আগে আমরা হারিয়েছিলাম তার সহধর্মীণী ইতিহাসবিদ অধ্যাপক শাহানারা হোসেনকে।
দুজন অধ্যাপকই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন।
শাহানারা ম্যাডাম ছিলেন ইতিহাস বিভাগের উজ্জ্বল অধ্যাপক ও প্রাচীন বাংলার
ইতিহাসের একনিষ্ঠ গবেষক।
আর এবিএম হোসেন স্যার ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের
অধ্যাপক।
দীর্ঘদিনের সঙ্গীর মৃত্যুতে স্যারের মন ভেঙে গিয়েছিল।
এর মধ্যে দু-দুবার
গোসলখানায় পড়ে গিয়ে পা ভেঙে যায় স্যারের । তাই শেষ
দিকে তেমন হাঁটাচলা করতে পারতেন না।
জাতীয়
ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
এ গুণীর কদর
দেখতে পেয়েছি আমরা।
জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির
জগতে একজন সাধক হিসেবে তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেয়া হয়েছে।
তিনিই ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ইমেরিটাস অধ্যাপক।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, বিশেষ করে
আরব স্থাপত্যকলা ও মুসলিম শিল্পকলার
ওপর তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল।
তার প্রকাশিত ১১টি গ্রন্থ ও দেশ-বিদেশের জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে
অমূল্য সম্পদ।
স্বল্পভাষী
অধ্যাপক হোসেন একজন পরিশিলীত মানুষ ছিলেন।
আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম না।
ইতিহাসের সত্য প্রকাশের জন্য তিনি ছিলেন আপসহীন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়েছি এবং এখানেই অধ্যাপনা করেছি।
তার অমূল্য গ্রন্থগুলো ছাত্রজীবন থেকেই আমাকে সমৃদ্ধ করেছে।
একাডেমিক কারণেই স্যারের সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ১৯৯৯ সালের দিকে।
এ অমায়িক মানুষটি
আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন।
আমরা অনেকেই যখন আত্মম্ভরিতার অচলায়তন থেকে নামতে পারি না, জুনিয়র
গবেষকদের মূল্যায়ন করতে পারি না, তাদের
উৎসাহ দিই না, পথ
দেখাই না, সেখানে
এবিএম হোসেন স্যার ছিলেন ব্যতিক্রম।
এ সময় বাংলা
একাডেমি আমার একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করে।
পাণ্ডুলিপিটি মূল্যায়ন করতে পাঠানো হয়েছিল স্যারের কাছে।
একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্নেহভাজন সহকর্মী জানালেন, এর পরে
একাডেমিক কাজে যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন তখন যাতে স্যারের সঙ্গে দেখা করেন।
স্যার বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন।
এ বড় মানুষটির
সঙ্গে আমার আলাপ ছিল না।
আমি রোমাঞ্চিত বোধ করলাম।
খুব অল্প দিনের ব্যবধানেই স্যারের সঙ্গে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় দেখা হলো।
প্রথম আলাপেই আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন।
আমার পাণ্ডুলিপি পড়ে কেন তিনি আনন্দ পেয়েছিলেন তা অকপটে বললেন।
গবেষণার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখলামও স্যারের কাছ থেকে।
জানালেন, এরই মধ্যে
আমার কয়েকটি বই তার পড়া হয়েছে।
শুনে আমি বিস্মিত ও আনন্দিত হলাম। উৎসাহ দিলেন
লিখে যেতে।
এরপর যতবার স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে, ততবারই স্যারের
প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘এখন
কী নিয়ে কাজ করছ বলো।
নতুন কী বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে?’
বিকৃতির
হাত থেকে ইতিহাস রক্ষার দায়িত্ব পালন তিনি পবিত্র কর্তব্য মনে করতেন।
এ প্রসঙ্গে একটি
বিষয় আমাকে স্মরণে আনতেই হবে।
২০০৭ সালে ‘ঢাকা নগরীর
৪০০ বছর’, পরে তা ‘রাজধানী ঢাকার
৪০০ বছর’ শিরোনামে একটি বড় প্রকল্প সম্পাদন করেছিল একটি খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
আমাদের দেশের ইতিহাস গবেষণায় একটি সংকট রয়েছে।
তথ্যসূত্রের অভাবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা ছিল কঠিন।
তাই হাতেগোনা কয়েকজন বাদ দিলে এ পর্বের ইতিহাসচর্চায়
অনেক ইতিহাসবিদের আগ্রহ ছিল না।
পাশাপাশি দীর্ঘকাল উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্বচর্চার সুযোগ না থাকায় অনেক মূল্যবান তথ্য ইতিহাস গবেষকদের কাছে অজানা থেকে গেছে।
এ সীমাদ্ধতার কারণে
ইতিহাস বইগুলোতে সতেরো শতকের শুরুতে ঢাকা মোগল সুবার রাজধানী হওয়ার আগে ঢাকাকে আলোয় আনার সুযোগ হয়নি।
এ হিসেবে বলা
হতো, ঢাকা
৪০০ বছরের পুরনো নগরী।
কিন্তু গত শতকের নব্বইয়ের দশকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্বচর্চা ও অধ্যয়ন শুরু
হলে সম্ভাবনার নতুন দরোজা খুলে যায়।
আমাদের হাতে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত আসতে
থাকে।
আঁকর সূত্র থেকে স্পষ্ট হয় ঢাকা হাজার বছরের পুরনো নগরী।
এতে ঢাকার ঐতিহ্য এক মুহূর্তে অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে যায়।
কিন্তু আমি অনেক চেষ্টা করেও ৪০০ বছর চর্চা থেকে অনেককেই সরিয়ে আনতে পারলাম না।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ চলতে থাকল ৪০০ বছর চর্চায়।
অর্থাৎ খণ্ডিত হতে থাকে আমাদের গৌরবের অতীত।
সাধারণভাবে
আমি বর্তমান সময়ের শিক্ষিতজনদের অনেককে ইতিহাস চর্চাবিমুখ থাকতে দেখি।
ফলে যখন ৪০০ বছরের ভ্রান্ত ধারণা থেকে সরে আসার জন্য কথা তুলি, তখন লক্ষ
করলাম আমি অনেকটা একা হয়ে পড়েছি।
এ সময় আমাকে
শুধু আশ্রয় দিয়েছিল কয়েকটি টিভি চ্যানেল ও জাতীয় দৈনিকের
সম্পাদক।
পত্রিকাগুলো এ প্রসঙ্গে লেখা
আমার কলামগুলো ছাপতে লাগল।
আর টিভি চ্যানেল আয়োজন করল টকশোর।
এই একক কলমের প্রতিবাদ চলল টানা তিন বছর।
শেষ দিকে অনেকেই একমত হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
এ সময়ে প্রথমে
যার ফোন পেয়ে আমি নতুনভাবে সাহসী হয়েছিলাম তিনি অধ্যাপক এবিএম হোসেন স্যার।
স্যার বললেন, তোমার তথ্য
আর বিশ্লেষণের সাথে আমি একমত।
ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার
এ উদ্যোগে আমাকে
পাশে পাবে।
এরপর বহুবার স্যার আমাকে সাহস জুগিয়েছেন।
বিভিন্ন ফোরামে ঢাকার প্রাচীনত্ব নিয়ে কথা বলেছেন।
অনেক পরে আমাদের এ চিন্তাকে ধারণ
করে ৭১ টেলিভিশন একটি চমত্কার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র তৈরি করেছিল।
ঢাকা সম্পর্কে অনেক পণ্ডিতজনের সাক্ষাত্কার নেয়া হয়েছিল এখানে।
এ সময়ও আমার
পাশে সক্রিয়ভাবে এবিএম হোসেন স্যারকে পেয়েছি।
একেএম
শাহনাওয়াজ: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়





