বশির ভাই
আর আমাদের
সঙ্গে নেই—বিষয়টি মেনে নেয়া ভীষণ কঠিন।
এ বছর
আমরা অনেক প্রাজ্ঞজনকে হারিয়েছি।
তবে আমাদের স্থাপত্যবিদদের পরিমণ্ডলে বশিরুল হকের অনুপস্থিতি সত্যিকার অর্থেই অপূরণীয় এক ক্ষতি। তিনি
ছিলেন আমাদের দেশের অন্যতম সেরা স্থপতিদের মধ্যে একজন, যিনি বাংলাদেশের
সমকালীন স্থাপত্যচর্চাকে একটি পরিশীলিত আকার দিয়ে গেছেন।
বশির ভাইয়ের কাজগুলো সদম্ভে তার অন্তর্দৃষ্টি, সৃজনশীলতা এবং বিষয়বস্তু ও সংস্কৃতির
সঙ্গে তার সুগভীর বোঝাপড়ার প্রমাণ দেয়।
তিনি সবসময় তার রেখে যাওয়া এই সুদৃঢ়
কাজগুলোর মাধ্যমে আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাবেন।
তিনি ছিলেন আন্তরিক, উদার আর
প্রাণবন্ত একজন মানুষ।
কোনো বিষয়ে পরামর্শ, দিকনির্দেশনা বা
সাহায্যের জন্য আমরা যখন তার কাছে যেতাম, তিনি কিন্তু
কখনই আমাদের নিরাশ করতেন না।
তার বাড়ি কিংবা অফিস দুটি গণ্ডিতেই অবাধে যাতায়াত করেছি।
বিভিন্ন দেশ থেকে ঢাকায় আসা আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা স্থপতিদের সঙ্গে তার বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ কিংবা রাতের আহার গ্রহণের অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে আমাদের।
তার বাড়ির অবস্থান সংসদ ভবনের কাছে হওয়ায় বিদেশী দর্শনার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার সুবিধাগুলোও উপভোগ করেছি আমরা।
সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও
সাহিত্য ঘিরে তার সঙ্গে প্রাণবন্ত আলোচনার মুহূর্তগুলো চিরস্মরণীয়।
তার সঙ্গে কাটানো সে সময়গুলোকে
আমি সবসময় মূল্যবান হিসেবেই আজীবন মনে করব।
আমাদের স্টুডিও, এমটিএ (মেরিনা
তাবাসসুম আর্কিটেক্টস), ধানমন্ডিতে তার নকশা করা একটি ভবনে অবস্থিত।
যেখানে রয়েছে চমত্কার একটি উঠান।
উঠানটির অবস্থান চারপাশে থাকা ভবনগুলোর ঠিক মাঝখানে—নকশাটি এ শহরে
বশিরুল হকের মাল্টিফ্যামিলি (বহুপরিবার) আবাসিক প্রকল্পের
চিহ্ন বহন করে।
পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের
পাশাপাশি উন্মুক্ত এ পরিসর
আমাদের জীবনে এক ধরনের
গুণগত মানও কিন্তু যোগ করে।
শিশুদের খেলায় মেতে ওঠার সুযোগ আর বাড়ির
বাসিন্দাদের শুভেচ্ছা বিনিময় বা আলাপ
জমানোর জায়গা তৈরির মাধ্যমে উঠানটি একটি মানবিক আবহ ছড়িয়ে দেয়।
ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় মানসম্পন্ন যে জীবনের
দেখা মেলে না।
তাছাড়া এ শহরের
খুব কম মানুষই
মানসম্পন্ন এ জীবনের
কথা বলে।
মহামারীজনিত কারণে ২০২০ সালে ঘরবন্দি সময়টাতে আমরা আমাদের রোজকার জীবনে এ ধরনের
একটি পরিসরের অভাব প্রচণ্ডভাবে অনুভব করেছি এবং এর গুরুত্ব
অনুধাবনেও সক্ষম হয়েছি।
তিনি কিন্তু এ প্রকল্প
তৈরি করেছিলেন একটি আবাসন কোম্পানির জন্য।
মুনাফা আয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস না করে
অনেকগুলো পরিবারের জন্য তৈরি আবাসিক ভবনগুলো ঘিরেও যে প্রয়োজনীয়
পরিমাণ পরিসর রেখে মানসম্পন্ন স্থাপত্য করা সম্ভব, তিনি তা
প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
মার্চের শুরুতে দেশে লকডাউন শুরু হওয়ার ঠিক আগে আগে একটি পারিবারিক জমায়েতে বশির ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়।
সেদিন বিদায়ের ক্ষণে উজ্জ্বল কমলা রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত বশির ভাইয়ের সেই হাসিমাখা মুখটিকে আমি সবসময় মনে রাখব।
এটাই হচ্ছে তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা, তা তো
জানা ছিল না।
বশির ভাই বাংলাদেশের স্বল্প কয়েকজন স্থপতির মধ্যে একজন, যার কাজগুলো
দেশের সমসাময়িক স্থাপত্যশৈলীর ধরন তৈরিতে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।
৪৫ বছরেরও
বেশি সময়ের স্থাপত্যজীবনে বশিরুল হক ২৫০টিরও
বেশি ভবনের নকশা করেছেন।
অবদান রেখেছেন শিক্ষাবিদ ও পরিকল্পনাকারী
হিসেবেও।
স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগে ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল
তিনি প্রয়াত হন।
তিনি স্থাপত্যের ওপর স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত ন্যাশনাল কলেজ অব আর্ট
থেকে, ১৯৬৪ সালে। গ্র্যাজুয়েশন
শেষ করে ঢাকায় ফিরে কাজ শুরু করেন স্থপতি মাজহারুল হকের অফিসে।
এরপর ১৯৭৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকো
থেকে স্থাপত্যের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে তার সঙ্গে পরিচয় হয় খ্যাতিমান
স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খানের সঙ্গে।
তিনি বশিরুল হককে তার শিকাগোভিত্তিক ফার্ম স্কিডমোর, অয়িং অ্যান্ড
মেরিলে (এসওএম) যোগদান
করতে বলেন, তবে বশির
ভাই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
১৯৭৭ সালে তিনি নিজের একটি স্থাপত্যচর্চার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন বশিরুল হক অ্যান্ড
অ্যাসোসিয়েটস নামে।
সে সময়
ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের হয়ে তিনি জাতীয় নকশা প্রতিযোগিতায় জয়ী হন।
আবাসিক প্রকল্পগুলোকে স্বতন্ত্র রীতির নকশা তাকে তার সমসাময়িকদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার নিজ গ্রামে তৈরি ভাতশালা হাউজ কিংবা ধানসিঁড়ি অ্যাপার্টমেন্ট বা কালিন্দি
অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের নকশাগুলো তার শিল্পীত স্থাপত্যশৈলীর দুর্দান্ত উদাহরণ।
এ স্থপতি
তার নিজ বাসগৃহ ও স্টুডিওটি
যে নৈপুণ্য
ও নিপুণতার
সঙ্গে নকশা করেছেন, তাতে বিভিন্ন
পরিসর ঘিরে তার সংবেদনশীলতার বিষয়টি ফুটে ওঠে।
প্রাকৃতিক আলো, সবুজের উপস্থিতির
সঙ্গে ভবন তৈরির উপকরণে সংবেদনশীলতা ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছেন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ সময়
পর ১৯৮৯
সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির
আমন্ত্রণে ডিজাইন ক্রিটিক হিসেবে তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রে যান।
১৯৯১ সালে দেশে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর বশিরুল
হক অ্যান্ড
অ্যাসোসিয়েটস প্রিজম নামের একটি এনজিওর কাছ থেকে তিনটি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ও কক্সবাজারে
ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নকশার জন্য কমিশনপ্রাপ্ত হয়।
প্রকল্পটি ১৯৯৪ সালে স্থাপত্য বিভাগে আগা খান পুরস্কারের জন্যও তালিকাভুক্ত হয়েছিল।
তার অন্য দুটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য প্রকল্পের মধ্যে একটি হচ্ছে তার নিজের বাসস্থান ও স্টুডিও
এবং অন্যটি ভাতশালা হাউজ।
তার এ দুটো
কাজও যথাক্রমে ১৯৮০ ও ১৯৯২
সালে একই পুরস্কারের জন্য তালিকাভুক্ত হয়।
২০০৪ সালে ধানমন্ডিতে ছায়ানটের নতুন ক্যাম্পাসের নকশা করার জন্য কমিশনপ্রাপ্ত হন তিনি। ঢাকার
বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ভবন, যেমন ২০০৭
সালে সানবিম স্কুল ও ২০১২
সালে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য নকশাও করেছেন।
স্থপতি হিসেবে অনুশীলনের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবেও সমভাবে অবদান রেখেছেন।
তিনি বেঙ্গল ইনস্টিটিউ ফর আর্কিটেকচার,
ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টের মাস্টার ফ্যাকাল্টির সদস্য ছিলেন এবং জড়িত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও।
২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ‘বেঙ্গল
স্ট্রিম: দ্য ভাইব্র্যান্ট
আর্কিটেকচার সিন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীতে এবং পরে ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বোর্দোয়ায় ও ২০১৯
সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে তার প্রকল্প প্রদর্শিত হয়।
ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে বাসেলের সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়ামেও তার কাজগুলো দেখানো হয়েছে।
স্থাপত্য শিল্পে অনন্য অবদান রাখার জন্য বশিরুল হককে ২০১৮ সালে হামিদুর রহমান স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে ২০১৯ সালে তার কাজ ও দর্শন
নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘বশিরুল
হক: আর্কিটেক্ট’
গ্রন্থটি।
বইটি সম্পাদনা করেছেন ইফতেখার আহমেদ ও শেখ
রুবায়া সুলতানা।
মেরিনা
তাবাসসুম:
আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত স্থপতি, প্রধান স্থপতি
এমটিএ ও একাডেমিক
ডিরেক্টর বেঙ্গল ইনস্টিটিউট





