আজ প্রায় আট মাস
হয়ে গেল আব্বুকে ছাড়া। ধীরে ধীরে আব্বুকে (সা’দত
হুসাইন) ছাড়া এ
জীবনেই হয়তো অভ্যস্ত হয়ে যাব। তবে জানি না সেই
দিন কবে আসবে। কর্মব্যস্ত জীবনের প্রতি মুহূর্তে না হলেও
এ আট
মাসে এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন আব্বু-আম্মুর
কথা একবার হলেও মনে হয়নি। ২৩ এপ্রিল
২০২০, যখন আব্বুকে
আমাদের নিকুঞ্জ-১-এর মসজিদের
পাশে তার চিরস্থায়ী ঘরটিতে রেখে চলে এলাম তখন গেটের কাছে একটা গাছের নিচে বাঁধাই করা জায়গাটিতে কিছুক্ষণ বসে ছিলাম। আব্বুকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ সম্মান জানানো হচ্ছে। দুই-একটি
টিভি চ্যানেল তা ধারণ
করছে। এমন একটি সময় তারা আমার কাছে এসে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছিল। আমি কিছুই বলতে পারিনি ওই সময়।
আমি কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। তখন দেশজুড়ে লকডাউন চলছে। আমার মা আরেক
হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। খুব কাছের কিছু আত্মীয়স্বজন করোনার কারণে দেশে ফিরতে পারেনি। জানাজায় যাতে বেশি মানুষের জমায়েত না হয়,
সেজন্য আমাদের এলাকায় ঢোকার গেটে প্রহরী মোতায়েন করা হয়েছে। যে আব্বু
আমার বেঁচে থাকা অবস্থায় হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও পরিচিতজনদের শেষবিদায় জানাতে নিজে উপস্থিত হতেন, তার বিদায়
বেলায় অত্যন্ত নিকটাত্মীয় আর প্রতিবেশী
ছাড়া আর তেমন
কেউই সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি। সরকারি চাকরির শীর্ষ পদে অবস্থান করা সত্ত্বেও ব্যক্তিজীবনটা অনাড়ম্বরভাবেই কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন আমার বাবা। তাই বিধাতা হয়তো তার অব্যক্ত ইচ্ছাতেই এক অনাড়ম্বর
শেষকৃত্যের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। কোনো কিছু বোঝার আগেই মাত্র ১০ দিনের
মধ্যে আমার সুস্থ-সবল
বাবা আমাদের সবাইকে রেখে না-ফেরার
দেশে চলে গেলেন। আজ আট
মাস পর যখন
ওই সময়টার
কথা মনে করি তখন যেন মনে হয় কোনো
একটা দুঃস্বপ্ন দেখছি। আব্বুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করাটা আমার জন্য দুরূহ কারণ আব্বু যে স্মৃতি
হয়ে গেছে, এটাই তো
মানতে মন চায়
না। এখনো যতবার আমাদের বাড়িটাতে যাই ততবার মনে হয় সিঁড়ি
দিয়ে দোতলায় উঠলেই পড়ার ঘরটিতে বসে থাকা অবস্থায় প্রিয় মুখটিকে দেখতে পাব। ভরাট গলায় কেউ মনে হয় আজও
বলে উঠবে ‘মা তুমি
কখন আসছ?’ আমার বাবার
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সম্পর্কে তাকে যারা চেনেন বা জানেন
তারা কমবেশি জানেন। সেই বিষয়ে তাই কিছু না বলে
তার ব্যক্তি জীবনের কিছু কথা বলি, যা মনে
হলে এখনো চোখ পানিতে ভিজে ওঠে।
অত্যন্ত
কাজপাগল একজন মানুষ ছিলেন আমার বাবা। তাকে কাজ ছাড়া থাকতে আমরা পরিচিতজনরা খুব কমই দেখেছি। আব্বু বলতেন যে তিনি
তার সুদীর্ঘ ৪২ বছরের
কর্মজীবনে কখনো সিক লিভ নেননি। এ কারণে
আব্বু স্কুল বা কোচিং
বাদ দেয়াও একদম মেনে নিতে পারতেন না। কোনো কারণ ছাড়া স্কুল বাদ দিলে খুব বিরক্ত হতেন। কিন্তু অফিসের কাজের জন্য তাকে বাসার কাজে কম সময়
দিতে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না।
ক্লাস এইট পর্যন্ত আব্বু আমাকে নিজেই নিয়মিত পড়াতেন। আমার গণিতের শক্ত ভিতটা তার হাত ধরেই তৈরি। শুক্রবার জুমার নামাজের পর আব্বু
নিয়মিত বাজারে যেতেন। বিভিন্ন বাজার ঘুরে ঘুরে দরদাম করে কেনাকাটা করতে পছন্দ করতেন। বাস্তব জীবনেও ছাত্র অবস্থায় পড়ে আসা অর্থনীতির বিভিন্ন তত্ত্বের প্রয়োগ করতে পছন্দ করতেন। অন্যদের থেকে কম দামে
কিছু কিনতে পারলে খুব খুশি হতেন আর মিটমিট
করে হাসতে হাসতে বলতেন ‘তোমরা দরদাম করতেই জানো না।’
আব্বু
অত্যন্ত বন্ধুপ্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। তার বন্ধুদের আমি নিজের চাচা হিসেবে সব সময়
জেনে এসেছি। শত ব্যস্ততার
মধ্যেও আব্বু পরিচিতজনদের বিয়ের দাওয়াত বাদ দিতেন না। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসের কারণে আব্বু রাতে খুব কম খেতেন।
বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেও তেমন কিছু খেতে পারতেন না দেখে
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ‘খাও না তো
যাও কেন?’ আব্বু বলেছিল
যে মানুষের
সুখ-দুঃখে
শরিক না হলে
তারা তা সারা
জীবন মনে রাখে। তাঁর এ ছোট
ছোট মূল্যবোধই তাকে মানুষ হিসেবে আলাদা এক উচ্চতায়
নিয়ে গিয়েছিল।
তবে
আব্বুর সঙ্গে আমাদের ভাই-বোনদের
সম্পর্ক এখনকার বাবা-সন্তানদের
মতো এতটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। ভাইবোনদের মধ্যে ছোট হওয়ার সুবাদে আমার সঙ্গে আব্বু অনেকটা সহজ ছিলেন কিন্তু বাকিরা একটা সমীহপূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখত। তার পরও আব্বুকে কিছু বলতে হলে আম্মুকে জোরাজুরি করতাম আব্বুর থেকে পারমিশন জোগাড় করে দেয়ার জন্য। হয়তো বান্ধবীর জন্মদিনে যাব, অনেক কষ্টে
পারমিশন জোগাড় করা গেল কিন্তু সময়টা বেঁধে দেয়া। এতটার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে। অবশ্যম্ভাবীভাবে সেই সময় কোনো দিনও মেনে চলতে পারতাম না। ফলে বাসায় ঢোকার আগে যত দোয়াদরুদ
জানি সব পড়ে
ফেলতাম। তবে আব্বুর স্নেহের বহিঃপ্রকাশটা ছিল অন্যভাবে। অফিসের কোনো মিটিং থাকলে মিটিংয়ে যে লাঞ্চের
প্যাকেটটা দেয়া হতো আব্বু সেটা আমাদের জন্য বাসায় নিয়ে আসতেন। বলতেন আমার বাসার খাবার খেতেই বেশি ভালো লাগে। জানি না আব্বুর
আসলেই বাসার খাবার খেতে বেশি ভালো লাগত, না আমরা
যে খুশি
হয়ে লাঞ্চটা খেতাম সেটা দেখতে।
আব্বু বেশি খরচ করা একদম পছন্দ করতেন না। বড় হয়ে চাকরি শুরু করার পর কোনো জিনিস তাকে কিনে দিতে গেলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন দাম কত? কেনা দামের অর্ধেক বললেও বলতেন, ‘তোমরা এত টাকা নষ্ট করতে পারো। খামাখা যে জিনিসের প্রয়োজন নেই তাই কেন।’ আমিও বিরক্ত হয়ে বলতাম, তাহলে বলো তোমাকে কী কিনে দেব? আব্বু বলতেন অ্যারোসল স্প্রে। কারণ মশা মারার জন্য এত দাম দিয়ে ওষুধ কিনতে আব্বুর খুব খারাপ লাগে! চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর আব্বু নিয়মিতভাবে টক শোতে যেতেন। মাঝে মাঝে একই দিনে দু-তিনটা টিভি চ্যানেলেও টক শো করতেন। আমরা মজা করে বলতাম, টক শোতে যাওয়া আব্বুর হবি। টক শোতে যাওয়ার জন্য আব্বু আবার রঙিন পাঞ্জাবি খোঁজ করতেন। আমি ২০১৬ সালে ইউএসএ থেকে ফিরে আসার আগে আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম আব্বু তোমার জন্য কী আনব? বলে মোদি কোট! ওখানে আমি মোদি কোট কোথায় পাই! শেষমেশ অর্ডার করে ইন্ডিয়া থেকে এনে আব্বুর জন্য নিয়ে এসেছিলাম। আব্বু সেই মোদি কোট পরে টক শো করতে গেলেন। আহারে কত কিছু মনে পড়ে যায়। আব্বুর খুব শখ ছিল গাছ লাগানোর। আমাদের বাসার পাশের জায়গাটাতে আর ছাদে টুকটাক অনেক গাছ লাগিয়েছিলেন। ফল ধরলে আব্বু বাচ্চাদের মতো খুশি হতেন। কিছু সবজি আমার জন্য আলাদা করে রেখে দিতেন। সুস্থ অবস্থায় আব্বুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ৬ মার্চ। সেদিনও আমার বাসায় আসার সময় আব্বু সঙ্গে করে তার গাছের কিছু সবজি নিয়ে এসেছিলেন। ২৬ মার্চ থেকে দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠেই রোজ কাজে বেরিয়ে যাওয়া জীবনে অভ্যস্ত আমার বাবা খুব অস্থির হয়ে গিয়েছিলেন লকডাউনের সময়। বিভিন্ন উপায়ে বাইরে যেতে চাইতেন। এর মাঝেও আব্বু দুই-একবার টিভিতে গিয়েছেন। শুক্রবার বাজার ও মসজিদে জুমার নামাজ পড়েছেন। ৯ মার্চের দিকে আব্বুর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। ১০ তারিখে প্রচণ্ড জ্বর এবং ১২ তারিখ আমার সদা কর্মব্যস্ত বাবা পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ১৩ মার্চ হসপিটালে নেয়ার আগে যখন আব্বুর সঙ্গে আমার দেখা হয় তখন আব্বু আর সজ্ঞানে নেই। আমাকে চিনতে পারছিলেন না। এতটা অসহায় মনে হয় আর কখনো বোধ করিনি আমি। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আব্বুকে আইসিইউতে শিফট করা হয়। সেদিন রাতেই আব্বুর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয় এবং লাইফ সাপোর্ট দিতে হয়। বয়সের কারণে এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় শরীরে বাসা বাঁধা রোগগুলো প্রবল পরাক্রমশালী হয়ে উঠতে শুরু করে। ১০ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করার পর ২২ মার্চ রাত ১০টার দিকে আব্বু আমাদের সবাইকে ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে যান। আব্বু আর নেই বলেই কিনা জানি না তার থাকাটা যেন আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। তিনি থাকা অবস্থায় কয়েকদিন পরপর হয়তো তার সঙ্গে কথা হতো, দেখা তো হতো আরো কম। কিন্তু এখন যেন প্রতিটা মুহূর্ত মনে হয় আব্বু থাকলে কী হতো, কী বলতেন, কীভাবে কাজটা করতেন। অবচেতন মনেই যেন তার বলে যাওয়া প্রতিটা কথা, শিখিয়ে যাওয়া প্রতিটা জিনিস আরো অর্থবহ হয়ে ওঠে। তিনি যখন ছিলেন তখন যেমন তার রাশভারী উপস্থিতি সর্বতোভাবে অনুভূত হতো, আব্বু যখন নেই তখনো তিনি যেন আমাদের চারপাশে আরো প্রবলভাবে রয়ে গেছেন আমাদের দিয়ে যাওয়া তার কঠোর-কোমল ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।
সিবান শাহানা:
সা’দত হুসাইনের কন্যা ও বিআইডিএসের
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট





