বাংলাদেশের
স্বনামখ্যাত ব্যবসায়ী শামীম লতিফুর রহমান মারা গিয়েছেন বেশ কয়েক মাস হয়ে গেছে।
তার স্ত্রী জয়ু ভাবি ও সুযোগ্যা কন্যা
সিমিন রহমান অগণিত ট্রান্সকম নিবেদিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে
নিয়ে ব্যবসার হাল ধরেছেন, এমনকি বেশ
ভালোভাবে চালাচ্ছেনও।
পরিচয়
সেই ১৯৮৭ সালে।
সেই ৫২, মতিঝিলের
ট্রান্সকম অফিসে।
তবে তার সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগে আসি ১৯৯২ সালের শেষ দিকে।
এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোননে ডেকে নিয়ে বললেন, ফিলিপস বাংলাদেশ
থেকে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সরিয়ে ফেলতে চাচ্ছে এবং তাদের এ দেশীয় সম্পদ
বিক্রির জন্য যোগ্য ব্যবসান্রতিষ্ঠান খুঁজছে।
আমরা দুজন মিলে তিনটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নাম ঠিক করতে পারলাম।
কর্ণধারদের একজন বিলেত ফেরত, একজন যুক্তরাষ্ট্র
ফেরত, আরেকজন লতিফুর
রহমান।
আমার প্রতি নির্দেশ ছিল তাদের প্রত্যেকের ওপর একটি নাতিদীর্ঘ ‘ইনফরমেশন মেমোরেন্ডাম’ তৈরি করে তত্কালীন ফিলিপস বাংলাদেশের সিইও এলপিসি লুকারের গুলশানের বাসায় পৌঁছে দেয়ার।
এলপিসি লুকার লতিফুর রহমানের ট্রান্সকমকেই তাদের এ দেশীয় সম্পদ
অধিগ্রহণের জন্য উপযুক্ত মনে করলেন।
আমরা আবার লতিফুর রহমানের সাথে লুকার সাহেবের হাত মিলিয়ে দিলাম।
সেই থেকে শুরু লতিফুর রহমান তথা শামীম ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতার।
বিদেশী ব্যাংকের স্থানীয় মেধাবী কর্মকর্তাদের তিনি খুব ভালোবাসতেন।
এখন
একে একে মনে পড়ছে তার ফিলিপসের পর পেপসি অধিগ্রহণ, নেসলে আর
হোলসিমে আংশিক অংশগ্রহণ, ডেইলি স্টার
আর প্রথম আলোর প্রথম মেশিন আর কাগজের এলসি খোলা, এমসিসিআইতে তার
নেতৃত্বে কাজ করা আর কত কত বৈঠক—আমার
বাসায়, তার বাসায়, গাড়িতে, হোটেলের লবিতে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতদের বাসায়, প্লেনে মুম্বাইতে, দিল্লিতে, এমনকি আমাদের
হংকং ও লন্ডন অফিসে। আমাদের ব্যাংকের
সব ঊর্ধ্বতনরা তাকে দেখতেন বিশেষ সমীহর দৃষ্টিতে।
আমি নিজেও দেখেছি পেপসির সাবেক গ্লোবাল সিইও ইন্দ্রা নুয়ী, ইউনিলিভারের দক্ষিণ
এশিয়াপ্রধান সঞ্জীব মেহতা আর মাস্টারকার্ডের বর্তমান বিদায়ী গ্লোবাল সিইও আর সাবেক নেসলে ও পেপসির পূর্ব
ভারতীয় বিক্রয় প্রধান ও পরবর্তীকালে সিটিব্যাংক
এনএতে আমার রিপোর্টিং সিনিয়র অজয় বাংগা তাকে কীভাবে সম্মান করতেন।
তাকে
নিয়ে গিয়েছিলাম আমার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইবিএ আর ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ক্লাসেও ‘বিজনেস এথিকস’ নিয়ে কথা বলতে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে তার একটি বক্তৃতার বিষয় ছিলো- ‘হোয়াট
উই এক্সপেক্ট ফ্রম এ গ্লোবাল ব্যাংক?’
দেশটাকে
খুব ভালোবাসতেন শামীম ভাই।
হোটেলের কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হলে বলতেন, ‘তোমার
গাড়ি ফেরত পাঠিয়ে দাও, আমি
নামিয়ে দেব।’ আমার গাড়ি বারান্দায় ঘন্টার পর ঘণ্টা আলাপ হতো, দেশ
আর ব্যবসায়ে অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে।
ব্যাংকের মন্দ আর বেপরোয়া ঋণ নিয়ে ছিলেন অনেক চিন্তিত।
মন্দ ঋণ বারবার রিশিডিউলিংয়ের কট্টর সমালোচক ছিলেন।
আমাদের বলতেন, এমসিসিআই যাতে
সদাই কালো টাকা সাদা করার বিরোধিতায় থাকে।
তা না হলে সৎ ব্যবসায়ী-করদাতাদের প্রতি
অবিচার হয়।
মৃত্যুর
কিছুদিন আগেও তার কুশলাদি জিজ্ঞেস করে খুদেবার্তা পাঠিয়েছি।
আগেও খুদেবার্তায় কথা হতো প্রায়ই।
আমি আর এইচএসবিসির তত্কালীন ডেপুটি সিইও মাহবুব চিন্তা করেছিলাম, একদিন হঠাৎ
করে চৌদ্দগ্রাম চলে যাব তাকে দেখতে।
একসাথে
দুদিন কাটালাম মুম্বাইয়ের তাজ ল্যান্ডসএন্ড এ।
তিনি এ অঞ্চলের সেরা
ব্যবসায়ী নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আমি, এইচএসবিসির
মাহবুব আর সিটিব্যাংক এনএর শামস বাংলাদেশ থেকে তার সাথি।
ভারতের সব নামি-দামি ব্যবসায়ী
তাকে অনেক অনেক সম্মান দেখালেন।
ইউনিলিভারের সাঞ্জীব মেহতা তাকে প্রায় পায়ে ধরে সালাম করতে চাইলেন।
পেপসির দক্ষিণ এশিয়াপ্রধান তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে অনেক আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি ব্যবসায় তার দৃষ্টিভঙ্গি আর নীতিবোধ নিয়ে চমত্কার একটি বক্তব্য দিলেন।
দেশে
ফিরে তাকে আমরা একটি সম্মাননা জানালাম স্থানীয় একটি হোটেলে।
তখনো তার কট্টর অবস্থান ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা নিয়ে।
শেষ
দেখা তার বাসায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটের বিদায়ী নৈশভোজে।
তখনই বেশ কাশছিলেন।
কষ্ট হচ্ছিল কথা বলতে।
ইউরোপের বন্ধুরা নাকি বলেছিলেন তাকে ফ্রান্সে বা বিলেতে একটি কান্ট্রি হাউজ কিনে নির্মল পরিবেশে থাকতে।
শুনে আমি বললাম ক্ষতি কী? ভালোই
তো হবে।
তিনি কিছুটা রেগে বললেন, ‘আমি
আমার গ্রামের বাড়িতে থাকব।’
শামীম
ভাই একটি কথা প্রায়ই বলতেন, ব্যবসায়ীদের রাজনীতি
করার দরকার নেই, তারা
ভালো করে ব্যবসা করলেই আরো লোক কাজ পাবে আর দেশ এগিয়ে যাবে।
স্ত্রীকে, সন্তানদের, বিশেষ
করে নাতিদের খুব ভালোবাসতেন তিনি।
নাতিদের সবাইকে বলতেন, যেখানেই পড়তে
যাও, পাস
করে দেশে এসে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশই তোমাদের চূড়ান্ত ঠিকানা।
তার সাথে যারাই কাজ করেছেন তারাই জানেন, তিনি প্রত্যেককে
প্রচুর বিশ্বাস করতেন এবং নিজের মতো করে কাজ করতে দিতেন, নেতৃত্বের সুযোগ
করে দিতেন।
তার কাজ ও বিশ্বাসের গুণে
তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ভালো ব্যবসায়ীদের প্রতীক।
নরওয়ে থেকে ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প নোবেলখ্যাত পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।
গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ভালো কর্মীর সাথে তার ছিল নিবিড় যোগাযোগ।
তাদের নিয়মিত প্রশংসা করতেন, খোঁজ নিতেন। নীতির প্রশ্নে
কখনো আপস করতে দেখিনি।
পারিবারিক মূল্যবোধেও ছিলেন অটল।
এখন যখন পেছন ফিরে দেখছি, মনে হয়
তিনি অনেক পরিকল্পনা করেই শেষ দিনের দিকে এগিয়ে গেছেন।
প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তার গড়ে তোলা ব্যবসান্রতিষ্ঠানটি যাতে ভালোভাবে চলে, বিতর্কের
ঊর্ধ্বে থাকে, যাতে কর্মী
ও সাধারণ মানুষের
সম্মান ধরে রাখতে পারে।
একজন ভালো ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তার এটাই
তো বিরাট পাওয়া।
মামুন
রশীদ: সাবেক ব্যাংক
কর্মকর্তা ও পিডব্লিউসির বাংলাদেশপ্রধান





