বাংলাদেশের লোকসংগীতের ইতিহাসে আব্দুল আলীম (১৯৩১-১৯৭৪) এক অবিস্মরণীয় নাম। কণ্ঠস্বরের অসাধারণ ঐশ্বর্য নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন। গানের কথা ও সুর তাঁর সুললিত-মিষ্টি মধুর কণ্ঠের সহযোগে যেন স্পর্শগ্রাহ্য হয়ে উঠত। আব্দুল আলীম পূর্ব বাংলার মানুষ ছিলেন না। পশ্চিম বাংলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল পূর্ব বাংলার নদীর কল্লোল আর প্রান্তরের সুর। আব্দুল আলীম ২৭ জুলাই ১৯৩১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার তালিবপুর গ্রামের সুন্দর পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মায়ের নাম খাসা বিবি ও পিতার নাম ইসব শেখ (ইউসুফ শেখ)। তিনি পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য কৃষিজমির ওপর নির্ভর করে পারিবারিক ভরণপোষণ নির্বাহ করতেন।

আব্দুল আলীমের শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয় মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে। এ গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ভাগীরথী নদী। তর্জা, লেটো, মুর্শিদি, জারি, সারির পীঠস্থান মুর্শিদাবাদ। বালক আলীম প্রকৃতির কোলে নির্বিবাদে বড় হতে লাগলেন। মাঠে-ঘাটে-নদীতে-হাওড়ে বনে-জঙ্গলে সর্বদাই কিশোর আলীম গান করে বেড়ান। হূদয়ের গভীরে সেই সুর অনুরণন তোলে। কেউ তাঁকে বলেন বাঁশের বাঁশি, কেউ বলেন বাংলার কোকিল, কেউ বলেন সুরের জাদুকর।

আব্দুল আলীম শৈশব থেকেই দুরন্ত আর ডানপিটে। কোনোভাবেই নিয়ম-শাসনের আওতায় রাখা যায় না। পাঠশালায় যাওয়ার চেয়ে তাঁর মন পড়ে থাকে বনবাদাড়, মাঠ আর নদীতে। গানের শিক্ষক রেখে গান শেখার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ফলে গ্রামে-গঞ্জে যেসব গান শুনতেন, সে গানগুলোই তিনি নিজের কণ্ঠে তুলে নিতেন। গ্রামের লোক বালক আলীমের গান শুনে মুগ্ধ হতেন। পালা-পার্বণে আব্দুল আলীমের ডাক পড়ত। আলীম গান গেয়ে আসর মাত করতেন।

আব্দুল আলীম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি। তিনি মুর্শিদাবাদে ওস্তাদ গোলাম আলীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং সংগীতশিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ওস্তাদের সহযোগিতায় কলকাতা যান। সেখানে মেগাফোন কোম্পানিতে কাজী নজরুল ইসলাম ও অমর লোকশিল্পী আব্বাস উদ্দীনের সান্নিধ্যে আসেন। ঢাকায় তিনি ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, কানাই লাল শীল ও মোমতাজ আলী খানের কাছে সংগীতশিক্ষা লাভ করেন। মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সেই গ্রামোফোন রেকর্ডে মোহাম্মদ সুলতানের লেখা ‘আফতাব ঐ বসলো পাটে’ ও ‘তোর মোস্তাফাকে দেনা মাগো’ গান দুটি রেকর্ড হয়। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পল্লীগীতি পরিবেশন করে জনসাধারণের কাছে মরমি লোকসংগীতের একনিষ্ঠ গায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। দরাজ সুরেলা কণ্ঠের আব্দুল আলীমের গান দেশ, প্রকৃতি, আকাশ আর প্রান্তর, অপার্থিব এক জগতের হাতছানি, নদীর অন্তহীন চলমানতা ও নিরন্তর ভাঙা-গড়া যেন জীবনেরই প্রতীক হয়ে শ্রোতার মনকে অপূর্ব মাধুর্যে কখনোবা বিচ্ছেদ ব্যথায় ভরিয়ে তুলত। জাদুময়, মোহময় কণ্ঠে নিজস্ব গায়কির দক্ষতায় বাণী ও সুরের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিতেন সাবলীল আনাসাস কারুকাজে। তিনি শুধু লোকসংগীতশিল্পী ছিলেন না লোকসংগীতের মুখপাত্রও ছিলেন। গান ও গায়কের মধ্যে স্থান হয়নি কোনো কৃত্রিমতার।

আব্দুল আলীমকে ভাটিয়ালিসিদ্ধ শিল্পী বলা যায়। ঠিক একই কথা বলা যায় মুর্শিদি-মারফতি গানের ক্ষেত্রেও। আব্দুল আলীমের ভাটিয়ালি গানে যেন আবহমান বাংলার নদীগুলোর প্রকতি ও প্রবাহের সুর ধরা পড়ে। নদীর প্রবাহের মতো সহজ, সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল তাঁর কণ্ঠ। কয়েকটি জনপ্রিয় ভাটিয়ালি গান— নদীর কূল নাই কিনার নাই রে, কলকল ছলছল নদী করে টলমল, নাইয়া রে নায়ের বাদাম তুইলা কিংবা রূপালী নদীরে রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল প্রভৃতি অসাধারণ গানের শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁর গাওয়া মুর্শিদি, মারফতি গানগুলো শুনলে অনুধাবন করা যায় যে, তিনি ছিলেন একজন অধ্যাত্মচেতনায় নিমগ্ন এক মরমি শিল্পী। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি গান উল্লেখ করা হলো— কেহই করে বেচাকেনা কেহই কান্দে, রাস্তায় পড়ে ধরবি যদি তারে, চল মুর্শিদের বাজারে, দুয়ারে আইসাছে পালকি/ নাইওরি গাও তোলো, এই যে দুনিয়া/ কিসের লাগিয়া, পরের জায়গা পরের জমিন/ ঘর বানাইয়া আমি রই, হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ, আমারে সাজাইয়া দিও নওশারও সাজন প্রভৃতি। লালন ফকিরের ‘চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি’ গানটি তাঁর জাদুকরি কণ্ঠের অপূর্ব গায়কিতে অনির্বচনীয় সুরমাধুর্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে গান গেয়ে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ঢাকার প্রথম চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশসহ প্রায় অর্ধশত চলচ্চিত্রের কণ্ঠশিল্পী ছিলেন তিনি। কয়েকটি চলচ্চিত্রের নাম— সুতরাং, কাগজের নৌকা, অরুণ বরুণ কিরণমালা, এ দেশ তোমার আমার, নদী ও নারী, বেদের মেয়ে, রূপবান, অবাঞ্ছিত, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, এতটুকু আশা, পালা বদল, লালন ফকির, সুজন-সখি, নবাব সিরাজদ্দৌলা, গাঁয়ের বধূ, সাগর ভাসা প্রভৃতি।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘উজান গাঙের নাইয়া’ গানটি আব্দুল আলীমের কণ্ঠে হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) থেকে রেকর্ড হয়। এছাড়া আমায় পোড়াইলিরে তোর রূপের আগুন দিয়া, উজান দেশের মাঝি ভাইধন, ওলো সুন্দরী কার কথায় কইরাছ এত মন ভারী, ও পদ্মা নদীরে, ওলো সুন্দরী তুই ঘরে আয়, পরের জায়গা পরের জমিন, মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়, দুয়ারে আইসাছে পালকি, ভোমরারে গাইও না গুন গুন প্রভৃতি গান আব্দুল আলীমের কণ্ঠে এইচএমভি থেকে রেকর্ড হয়েছিল।

আব্দুল আলীম ঢাকার সংগীত মহাবিদ্যালয়ে পল্লীগীতি বিভাগে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপকের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। রাশিয়া, চীন, বার্মায় (মিয়ানমার) সংগীত পরিবেশন করে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন। নিখিল পাকিস্তানে সংগীত সম্মেলনে সংগীত পরিবেশন করে পেয়েছিলেন পাঁচটি স্বর্ণপদক। তিনি ১৯৭৭ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) এবং ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।

আব্দুল আলীমের কণ্ঠ উপযোগী গান রচনা করছেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, কবি আজিজুর রহমান, আবদুল লতিফ, খান আতাউর রহমান, ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান, কানাই লাল শীল, সিরাজুল ইসলাম, শমশের আলীসহ অনেকে। আব্দুল আলীমের গানের সংখা প্রায় ৫০০ হবে। তাঁর গানে বিরহ-বেদনা-বিচ্ছেদ ফিরে ফিরে এসেছে। প্রেমে, প্রকৃতিতে, ভক্তিতে সংগীতের মাধ্যমে এক অনির্বচনীয় লোকের সন্ধান দিয়েছেন তিনি। দরদভরা মায়াময় সুরের আহ্বানে জীবন ও মৃত্যুকে তিনি নিঃসংশয় করতে শিখিয়েছেন। আমাদের শ্রবণ ও মনকে তিনি প্রশান্ত করে গেছেন। তিনি আমাদের স্বদেশকে স্বজন করেছেন। নিজস্ব গায়কি ও সুর-মাধুর্যের গুণে আব্দুল আলীম ছিলেন একজন অনন্যসাধারণ শিল্পী। ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এ জননন্দিত শিল্পী মাত্র ৪৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়