মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯ মে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে, বিহারের সাঁওতাল পরগনার দুমকায়; মৃত্যু ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৬, কলকাতার নীলরতন সরকার হাসপাতালে। বাংলা ভাষার এ প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের পৈতৃক ভিটা মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। মাত্র ৪৮ বছরের জীবনে তিনি রচনা করেছেন ৪০টিরও বেশি উপন্যাস, প্রায় শতিনেক ছোটগল্প। প্রধান রচনাগুলো হলো— জননী, দিনরাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি, জীবনের জটিলতা, চতুষ্কোণ, অহিংসা, হলুদ নদী সবুজ বন ইত্যাদি উপন্যাস। লিখেছেন প্রচুর অসাধারণ ছোটগল্প, তাঁর কয়েকটি— অতসী মামি, প্রাগৈতিহাসিক, আত্মহত্যার অধিকার, কুষ্ঠ রোগীর বউ, সরীসৃপ, হলুদপোড়া, পাস-ফেল, ছোট বকুলপুরের যাত্রী, হারানের নাতজামাই ইত্যাদি। সার্বক্ষণিক লেখক ছিলেন, আমৃত্যু দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন।
এ রকম জীবনীর সাধারণ তথ্যাদি দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি লেখা শুরু করা যায়। তাতে আর দশজন বাঙালি লেখকের সঙ্গে প্রায় কোনো ফারাকই চোখে পড়ে না এই জন্য যে, একজন কীর্তিমান কথাসাহিত্যিক তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনে কয়েকখানা সফল উপন্যাস আর কিছু স্মরণীয় ছোটগল্প রচনা করবেন, তাই স্বাভাবিক। এখানে ফারাক যেটুকু চোখে পড়ে, তা তাঁর আয়ুর সীমানা। কিন্তু মাত্র ৪৮ বছরের জীবনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা পরিমাণের দিক থেকে প্রচুর। এর বেশি প্রায় আর কিছু নয়।
কিন্তু তাতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কালোত্তীর্ণ ও পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় প্রভাববিস্তারী লেখককে ঠিকঠাক বুঝে নেয়া যায় না। তাঁর রচনার পাঠকমাত্রেরই জানা থাকে বিজ্ঞান শাখার অত্যন্ত কৃতী ছাত্র মানিক প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত শাস্ত্রে পড়ার সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে একটি গল্প (অতসী মামি) রচনা করেন। ওই বাজি ধরার ভেতরেই উত্তীর্ণ-কৈশোর এক তরুণের জেদ ও জিজ্ঞাসা বুঝে নেয়া যায়। বন্ধুরা বলেছিলেন, সাময়িকপত্রের সাহিত্য সম্পাদকরা নবীনদের লেখা পড়ে দেখেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের বলেছিলেন, ‘বিষয়টি তা নয়, মুদ্রণযোগ্য লেখা পেলেই তাঁরা ছাপেন।’ তখন বন্ধুদের তার কাছে জানতে চাওয়া, ‘তুমি কী করে জানলে, প্রবোধ?’ প্রবোধকুমার মানিকের কাগজে পত্রের নাম। তখনই বাজি ধরলেন, মানিক। তিনি জানেন অমন সাময়িকপত্রের সম্পাদকদের মন ভোলানো আর মুদ্রণযোগ্য গল্প তিনিও লিখতে পারেন। কারণ প্রতি মাসে, অতগুলো ‘ভালো’ গল্প কোনো ভাষাতেই লিখিত হয় না, সম্পাদকদের মুদ্রণযোগ্য গল্প হলেই চলে। রবীন্দ্রনাথ ও শরত্চন্দ্রের কাহিনী-গদ্যের মিশেল দিয়ে মানিক লিখলেন ‘অতসী মামি’, পূর্ব বাংলার এক দম্পতির কাহিনী, যে স্বামীটি দারুণ বাঁশি বাজাতেন, গলায় রক্ত উঠত, পোড়াদহে রেল দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। প্রেমের গল্প। গল্পটা লিখে তত্কালীন বিখ্যাত ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় পাঠানোর আগে বন্ধুদের বললেন, এ গল্পের লেখক হিসেবে ডাকনামেই স্বাক্ষর করলেন, পরে যখন ‘ভালো লেখা’ লিখবেন, তখন সেখানে আসল নাম ব্যবহার করবেন। সাহিত্যের অনিশ্চিত গন্তব্যের পাঠশালায় ঢুকে পড়লেন অনার্স প্রথম বর্ষের এ ছাত্র, আমৃত্যু সেখান থেকে তার আর বেরোনো হলো না।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুদ্রিত প্রথম লেখার কথাটা এখানে একটু বিস্তারিত বলা, এ কথা সবাই জানে, এজন্য যে, এইখানেই তাঁর জেদ আর যুক্তির কিছুটা নিদর্শন পাওয়া যায়। এর পর ছাত্রত্ব রাখাই তাঁর জন্য দায় হয়ে উঠল। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেই তো হয় না, আশৈশব তাঁর ভেতরে বহমান ছিল এক ‘কেনধর্মী জীবন-জিজ্ঞাসা’; গণিতের যুক্তি সেখানে নিশ্চিত সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আর নিজেও জানিয়েছেন, জীবনকে জানার জন্য, বোঝার জন্য কোনো প্রকার ভাবালুতার আশ্রয় তিনি নেননি; অথবা উল্টো দিক থেকে ভাবলে, তাঁর চোখে যুক্তিহীন আবেগ আর অপ্রয়োজনীয় সাহিত্যিক ধোঁয়াশাপূর্ণ মানুষের মন নিয়ে কোনো কারবার ছিল না।
এজন্য একেবারে শুরুতেই, যখন নিজের জন্য স্থিরই করে নিয়েছেন, সাহিত্য রচনাই তাঁর জীবিকা হবে, পরীক্ষা পাসের ব্যাপারেও তাই ব্যর্থতা, বছর চব্বিশ-পঁচিশেক বয়সেই তিনি এমন সব গল্প ও উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছেন, বাংলা গদ্যে এর আগে তেমন লেখা প্রায় নেই। এ কথা স্মরণ রাখতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ‘যোগাযোগ’ লিখছেন তখন, আর ঔপন্যাসিক শরত্চন্দ্রের আবেগময় চরিত্রের জোয়ারের ভাসমান বাঙালির সদর ও অন্দর। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ তাঁর ২১ বছর বয়সের রচনা। অথবা, এই কাছাকাছি সময়ে লেখেন, আত্মহত্যার অধিকার, প্রাগৈতিহাসিক, সরীসৃপের মতো গল্প, এদিকে উপন্যাস জননী, পুতুলনাচের ইতিকথা আর পদ্মানদীর মাঝি। দেখার বিষয়, প্রতিটি গল্প-উপন্যাসে মানুষ ও প্রকৃতি, শুধু প্রকৃতি, নর-নারীর আন্তঃসম্পর্ক আর সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও শ্রেণী অবস্থান— প্রতিটি বিষয়ে মানিকের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই নতুন। খ্যাতিমান পূর্বসূরি আর প্রাক-সম্ভাবনাময় সহযাত্রী যেমন— বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল, বনফুল কি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মেলেই না। বাংলার মানুষকে যত সরল বলা হয়, মানিকের মানুষ তা নয়। কারণ বেঁচে থাকার জন্য মানুষে-মানুষে যে সম্পর্ক, তা খুব সরল নয়। বাংলার প্রকৃতিকে স্বাভাবিকভাবে শস্য-শ্যামল বলা হোক— সেই প্রকৃতির সঙ্গে বাঁচতে গিয়ে একদল মানুষকে নিয়ত সংগ্রামেই লিপ্ত হতে হয়। আর নর-নারীর আন্তঃসম্পর্কে প্রায়ই ‘ভিক্টোরীয়’ চোখে যে আবেগে সাধারণত দেখার এক অভ্যাস, মানিক সেখান থেকে একেবারেই যেন দূর গ্রহের এক মানুষ। মানুষের মনের গহিন তলে ডুব দিয়ে যে আসল সোনা তিনি চিনিয়ে দেন, এভাবে ধরি ধরি সন্ধান করি দেখানো প্রায় নেই। অথবা অনেক বাঙালি কথাসাহিত্যিকই ওই পথে হাঁটেন না, কারণ তাঁদের জানা আছে কথাসাহিত্যের মূল ভোক্তা মধ্যবিত্ত শ্রেণী, নর-নারীর আন্তঃসম্পর্কের ওই অন্ধকারময় গহনে নামলে ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্তের অমলিন রুচিবোধে আঘাত লাগে। অথচ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আজীবন ‘লিখে-খাওয়া’ মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায় ওই বানোয়াট রুচিবোধে কোনো প্রকার প্রলেপ না দিয়ে খুঁচিয়ে দেখিয়েছেন, এই তুমি হেরম্ব এই কুবের এই শশী এই ভিক্ষুক এই রাজকুমার; অন্যদিকে এই পাঁচী এই কপিলা এই কুসুম! এই নামের তালিকা বাড়ানো যায়। যদিও তা প্রয়োজনীয়।
সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্রের মানুষের নাম যা-ই হোক, তাঁরা তো তারই মতো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সামনে ধ্বস্ত মানুষ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, একটি বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত; ভারতবর্ষে, বিশেষত বাংলায় নরম ও চরমপন্থার রাজনীতির টানাপড়েন, আবার ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণীর স্বনির্মিত ‘আধুনিকতা’, আছে রবীন্দ্রনাথকে বুঝে না বুঝে গা ভাসানো ‘রাবীন্দ্রিকতা’, আবার বিরোধিতা, একই সঙ্গে পূর্ব আর পশ্চিম বাংলা ভুখা মানুষেরও মিছিল। ব্রিটিশ রাজশক্তি সেসব মানুষের দিকে যেন কোনো কালে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি; অথবা তাদের জানা ছিল বংশবদ একটি শিক্ষিত শ্রেণী এখানে তৈরি করতে পারলে তারাই এই বেনিয়া শক্তিকে ফুল বেলপাতা চন্দনে প্রায় পুজো করে জিইয়ে রাখবে। ঘটেছিল তাই। কথাসাহিত্যিকের চোখ এই ব্যবস্থার বিপরীতে সরাসরি আলো ফেলবেন না। অথবা এর কোনো প্রতিরোধ কিংবা প্রতিবাদ বাতলানোও তাঁর কর্ম নয়, কিন্তু এই যে মানুষ, এই অদৃশ্য চাকার নিচে অথবা চাকার সঙ্গে আবর্তিত, তাকে যথাযথ বর্ণনা করাই তার কাজ। সেকালেরও একেক প্রকার ধরন থাকে, মাত্রাও থাকে। দেখেও না দেখার ভান থাকে, থাকে লুকানোর কৌশল। অথবা না লুকিয়ে অন্য পিঠে আলো ফেলা। অর্থাত্ দেখার চোখের স্বনির্মিত বিবিধ রূপান্তর। সেখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখতে শুরু করা থেকে জীবনব্যাপী একেবারে সরাসরি আলো ফেলেছেন মানুষের মনের গহিনে যেমন— একই সামাজিক স্তরবিন্যাসের সেখানে, যাতে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে মানুষের অবস্থানকে চিহ্নিত করা যায়। পৈতৃক ও বিদ্যালয়ে পড়ার সূত্রে পূর্ব বাংলার মানুষ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় কৃষক চরিত্র প্রায় নেই। কৃষকচৈতন্য তিনি বুঝতেনও না বলে মনে হয়। কিন্তু চাকুরে নাগরিক মধ্যবিত্ত আর গ্রামীণ জনপদের অন্যান্য পেশার মানুষ তার সাহিত্যে অনেক। তবে এই সবাইকে দুই জার্মানভাষী সাহেব মার্ক্স আর ফ্রয়েডের নামে যেভাবে তকমা সেঁটে দেয়া হয়, তাতে কখনো কখনো মনে হয়, সমালোচকরা না জানেন মার্ক্সকে, না চেনেন ফ্রয়েডকে। এই কথা কোনো ঝাঁজের সঙ্গে বলা না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম দিককার রচনাকে ফ্রয়েডবাদী আর পরের (১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়ার পর) মার্ক্সবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একজন লেখকের বা শিল্পীর কর্মময় জীবনে পর্বান্তর ঘটা খুব স্বাভাবিক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকভাবে তা ঘটেছে। কিন্তু এই চিহ্নিতকরণ এতটাই মোটা দাগে যে, মানিকের মতো একজন প্রধান গদ্য লেখকের জন্য তা অবমাননাকর। প্রথম পর্বের কোনো কোনো গল্প-উপন্যাসকে যেমন— প্রাগৈতিহাসিক ও আত্মহত্যার অধিকার আর পদ্মানদীর মাঝিকে মার্ক্সীয় তত্ত্বচিন্তা দিয়ে পড়ে নিতে কিংবা পরের দিকের হলুদ নদী সবুজ বনকে যদি মার্ক্সীয় দৃষ্টি দিয়ে চিহ্নিত না করা হয়, তা হলেও সমস্যা কোথায়? এই চিহ্নায়ন তো দেখা যায় মূলত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেই, তার সমকালীন অন্যান্য ঔপন্যাসিকের মার্ক্স-ফ্রয়েড না হোক, অন্য কোনোভাবেও সাধারণ তকমা দেয়া হয় না। এমনকি তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসকেও কখনো কখনো উহ্যই রাখা হয়। মনে হয়, কবে যেন কে, যেমন জীবনানন্দকে ‘নির্জনতার কবি’ বলেছিলেন, তেমন কী উপাধি গায়ে লটকে গেল, জীবনানন্দ আর কোনো কোলাহলে এলেন না, মানিককে মার্ক্স-ফ্রয়েডের বাইরের চোখে আর দেখা হলো না।
এতে ভাষার ক্ষেত্রে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে ক্ষমতা, সেটি হিসাবের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে যায়। বাংলা গদ্যে এত সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়, ভাষায় এত ইঙ্গিতময়তা আগে-পরে খুব কম লেখকের লেখায়ই দেখা গেছে। প্রায় নেই। এটি অনুকরণযোগ্যও নয়। কারণ অনুকরণ করতে গেলে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যেতে হয়; বিষয়ই ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ত বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গেছেন। আর ভাষার ইঙ্গিতময়তা, সেখানে কখনো কখনো তীব্র শ্লেষ ও কৌতুক বোধ, কখনো কখনো ব্যঙ্গ ও কটাক্ষ— সেই ভাষাকে ব্যবহারের সেই নির্দয় চোখ তাঁর লেখায় গোড়া থেকে ছিল। খুব সহজাত, সেখানে বানানোর কোনো বিষয় নেই। আর সর্বত্রই ভীষণ ক্রুদ্ধ। একটি ঔপনিবেশিক সমাজ মানুষকে যত দরদের সঙ্গেই লেখক ‘পুতুলনাচের’ পুতুল করে তুলুন না কেন, অন্তর্গত রাগকে সরিয়ে রেখে সে পুতুলকে কোনোভাবে বাঁচানো সম্ভব নয়। ফলে শব্দের কোনো খেলার বিপরীতে মানিকের সৃষ্টি, অথচ বাংলা শব্দেরই ইঙ্গিতময় ব্যবহার। ব্যাপারটি হয়তো বুঝতেন তিনি। ‘ছন্দপতন’ উপন্যাসের এক জায়গায় লিখেছেন: ‘শব্দমদ-বেচা শুঁড়িগুলো/ কাব্যলক্ষ্মীর দেহ চিরদিন কচি রেখে দিল।/ শুঁড়িগুলো সব মরে যাক, কাব্যলক্ষ্মীর দেহে যৌবনের জোয়ার।’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু কবিতা লিখেছেন, নিজেই বলেছেন, কাঁচা কবিতা। পড়ে বোঝা যায়, কথাসাহিত্যিকের পার্শ্বরচনা।
হয়তো কথাসাহিত্যিক হিসেবে নিজের আপসহীন চরিত্রের জন্য দারিদ্র্য তাঁর আমৃত্যু সঙ্গী। মানুষের মনের গহিনে ডুবুরির মতো ঢুকে পড়ার ফলাফল তো মস্তিষ্ককেই নিজের জন্য ভারী করে তোলা। চারধারের অসুখে এক সময়ে নিজেকেই অসুস্থ ভাবা। সেখান থেকে আপাতনিরাময়ের জন্য মদে যে আশ্রয় নিয়েছে, ক্রমেই সেই মাত্রা বেড়েছে, কিন্তু ফিরতে পারেননি। অথবা ফিরতে চাননি। সুস্থ আর অসুস্থতার মাঝখানে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। কেউ কেউ মনে করেন, মাত্র ২৬ বছর বয়সে যে তরুণ কোনো একটি ভাষার চারটি প্রধান উপন্যাস (জননী, দিনরাত্রির কাব্য, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা) লেখেন, তাঁর দীর্ঘজীবন অসম্ভব। এটা বলার জন্য বলা নিঃসন্দেহে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতাকেও মান্য করা। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি কথা আবারো স্মরণযোগ্য: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালির কাকের বাসায় কোকিলের ছানা। অমন কুবের আর শশী সৃষ্টি করার মানুষ গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায় না!
লেখক: প্রাবন্ধিক






