ইতিহাসচর্চা ছিল তাঁর কাছে সাধনার মতো। গভীর নিষ্ঠা ও অভিনিবেশসহকারে তিনি বিনির্মাণ করেছেন প্রাচীন বাংলা ও ভারতের অমূল্য ঐতিহাসিক চিত্র। তিনি ইতিহাসের একজন সার্থক শিক্ষকও বটে। আজীবন জ্ঞান বিতরণ করেছেন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষা প্রশাসক হিসেবেও স্পর্শ করেছেন সাফল্যের শীর্ষবিন্দু। অনন্যসাধারণ কৃতবিদ্য এ মানুষটি ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার। জন্ম ১৮৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার খন্দরপাড়ায়। পিতা হলধর মজুমদার ও মাতা বিধুমুখী। পদ্মার কূলবর্তী এলাকায় তাঁর বেড়ে ওঠা, তাই নদীমাতৃক বাংলার জল-হাওয়াতেই তাঁর মানসগঠন। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা আর আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল ছেলেবেলার নিত্যসঙ্গী। এক সাক্ষাত্কারে বাল্যকালের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, অল্প বৃষ্টিতেই মাঠ-ঘাট তলিয়ে যেত সব। এঘর-ওঘর যাতায়াতে কলাগাছ বা তালগাছের ভেলাই ছিল সম্বল। তারও ব্যবস্থা না হলে সাঁতার দেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তবে এসব কিছুই তাঁর মেধা বিকাশের অন্তরায় হতে পারেনি। গ্রামেই শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। সে যুগে তালপাতার ওপর লেখার চল থাকলেও অধ্যাপক মজুমদার জানান, সহজপ্রাপ্যতার জন্য তাঁরা স্কুলে কলাপাতার ওপর বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করে লিখতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখিত পাঠ্যপুস্তক তাঁরা পড়তেন। ক্লাসে একজনও মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল না, সে কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এর পর উচ্চশিক্ষার্থে ব্রতী হন এবং সেখানেও মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯০৯ সালে তিনি ইতিহাস বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক লাভ করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। দুই বছর পর একই প্রতিষ্ঠান থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এর পর তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরির জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন এবং অনেক দূর অগ্রসর হন। কিন্তু চূড়ান্ত ইন্টারভিউয়ের দিন স্ত্রী আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর আর পরীক্ষা দিতে যাওয়া হয়নি। পথ পরিবর্তন করে চলে এলেন শিক্ষা ও গবেষণায়। মোড় ঘুরে গেল জীবনের আর বিশ্ব পেল একজন অসামান্য ঐতিহাসিক, ধীমান গবেষককে।
গবেষক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু আরেক বাঙালি দিকপাল মনীষী মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তত্ত্বাবধানে। এ সময় অন্ধ্র-কুষাণ কাল নামক যে অভিসন্দর্ভ তিনি রচনা করেন, তা তাঁকে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তিতে ভূষিত করে। সময়টা ছিল ১৯১২ সাল। তাঁর বয়স তখন ২৪ বছর। পরের বছর ১৯১৩ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূত্রপাত। ১৯১৪ সালের জুলাইয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক নিযুক্ত হন। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পড়াতেন তিনি। এখানে তাঁর ছাত্র হিসেবে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন স্বনামখ্যাত লেখক শ্রীনীরদ সি চৌধুরী। তরুণ বয়সেই গবেষক হিসেবে অধ্যাপক মজুমদারের খ্যাতি যে ছড়িয়ে পড়েছিল, শ্রীচৌধুরীর লেখায় তার সাক্ষ্য মেলে। তাঁর লেখা The Autobiography of an Unknown Indian গ্রন্থে শ্রীচৌধুরী অধ্যাপক মজুমদারের শিক্ষকতার উচ্চ প্রশংসা করে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লেখেন, ‘His [R C Majumdar] lectures gave me the sense of watching the process of the writing of ancient Indian history, and not merely the experience of reading it.’ অধ্যাপক মজুমদার চাকরি বদল করে ঢাকায় চলে যাওয়ায় তাঁরা যে মর্মাহত হন, সে কথাও উল্লেখ করেন। এ বইটি অধ্যাপক মজুমদারের হাতে আসে বহু বছর পর। এক স্মৃতিকথায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ছাত্রের কাছ থেকে এমন শ্রদ্ধা ও প্রশংসা শিক্ষকমাত্রেরই পরম আরাধ্য।
১৯২১ সালে পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। সত্যেন বসু, নলিনী বসু, মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ আরো নামজাদা পণ্ডিতেরা যোগ দেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। রমেশচন্দ্র মজুমদারও যুক্ত হন তাঁদের সাথে। যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পদে। বিভাগের একমাত্র অধ্যাপক হওয়ায় তিনি এ বিভাগের সভাপতির পদও অলঙ্কৃত করেন। ঢাকায় দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে একের পর এক সাফল্যজনক কীর্তি রেখে যান তিনি। বিভাগীয় পাঠক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তাঁরই পরামর্শে এমএ ক্লাসের পাঠক্রমে অত্যাধুনিক কাল অর্থাত্ প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাছাড়া এমএ মৌখিক পরীক্ষার সময় প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের ছাত্রদের প্রাচীন ভারতীয় লিপি ও মুদ্রা দেখিয়ে জ্ঞানের পরিধি নির্ধারণের নিয়ম চালু করেন তিনি। বিশেষত পরীক্ষার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে আদর্শ, মান ও সততার সুউচ্চ মানদণ্ড স্থির করেছিল, তা তিনি বারবার স্মরণ করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, সে সময় শিক্ষকরা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন এবং ছাত্ররা তাঁদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করত। একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়, একবার গান্ধীবাদী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে একদল ছাত্র সিদ্ধান্ত নিল, সব জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে সরস্বতী পূজার অঞ্জলি দেবে ও একত্রে আহার করবে। আরেক দল ছাত্র এতে তীব্র আপত্তি জানায় এবং অধ্যাপক মজুমদারের কার্যালয়ে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। অধ্যাপক মজুমদার শান্তভাবে তাদের বক্তব্য শোনেন এবং বলেন যে, সব ছাত্র যদি একত্রে পূজা উদযাপন করতে না পারে, তাহলে শিক্ষকরাও এতে যোগ দেবেন না। তাঁর অনমনীয় দৃঢ়তায় পিছু হটে বিক্ষোভরত ছাত্ররা, কথা দেয় শিক্ষকের সম্মান রক্ষার। ছাত্রের ওপর এমনই প্রভাব বিস্তার করতেন সেকালের শিক্ষকেরা! বিভাগের একাডেমিক কর্মকাণ্ডের বাইরে ইতিহাস বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নিয়মিতই শিক্ষা সফরে বেরোতেন তিনি। ১০-১২ বার তাদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন তিনি। এ সময় ছাত্রছাত্রীদের সাথে এক গভীর প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠত, যা তিনি আজীবন পরম তৃপ্তির সাথে স্মরণ করেছেন।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার কিছুকাল পর কলা অনুষদের ডিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে অধ্যাপক মজুমদার সেখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্বও তিনি পালন করেন। ছাত্র-শিক্ষকের স্নেহের সম্পর্কের নিদর্শন মেলে এক ঘটনায়। অধ্যাপক মজুমদার লিখছেন, “একদিন ক্লাস নিচ্ছি, এমন সময় ভাইস চ্যান্সেলরের এক স্লিপ এল, ‘তুমি এখনই বাড়ি যাও; লাঞ্চ সেরে ফেরার পথে আমি এই মাত্র দেখে আসছি যে, একদল ছেলে তোমার বাড়ি ঘিরেছে।’ তখনই ক্লাস বন্ধ করে আমি তাড়াতাড়ি হেঁটে বাড়ি গেলাম। তখন দুপুর দুটো-আড়াইটা হবে। গিয়ে দেখি, হলের ৬০-৭০ জন ছাত্র দাঁড়িয়ে আছে। সেটা দোলযাত্রার দিন, তারা খেলতে শহরে গিয়েছিল, অনেক দেরীতে ফিরেছিল। ফিরে দেখে খাবার নেই। সুতরাং এর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এই শুনে আমার স্ত্রী বলেছেন, ‘তোমরা স্নান সেরে এসো, খাবারের ব্যবস্থা করছি।’ ইতিমধ্যেই তিনি দুজন ছেলেকে আমার গাড়ীতে নবাবপুর থেকে মিঠাই কিনে আনতে পাঠিয়েছেন। অল্পক্ষণের মধ্যে মিঠাই এসে গেল। ছেলেরা সবাই খাওয়াদাওয়া সেরে খুশী মনে বাড়ি চলে গেল।”
ভাইস চ্যান্সেলর সবটা শুনে ছাত্রদের আচরণে অসন্তোষ প্রকাশ করলে অধ্যাপক মজুমদারের স্পষ্ট জবাব, ‘সব ব্যাপারে অত খুঁটিনাটি নিয়ম মেনে চলা যায় না। আর এমন ব্যাপারে টাকা খরচও কিছু অপব্যয় নয়।’ ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে পরস্পর পরিচয় ও নিবিড় বন্ধনের স্থান ছিল তাঁর কাছে সর্বাগ্রে। ১৯৩৬ সালে অধ্যাপক মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকায় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। ঢাকার কর্মজীবনে বহু খ্যাতনামা ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। এও তাঁর জীবনের এক উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি, যা তিনি খুবই গুরুত্বের সাথে স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সরোজিনী নাইডু, স্যার যদুনাথ সরকার প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্দোলজি কলেজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত থাকেন এবং এর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫০ সালে অধ্যাপক মজুমদার ‘International Commission for a History of the Scientific and Cultural Development of Mankind’-এর সদস্য ও সহসভাপতি নির্বাচিত হন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, এ সিরিজের প্রথম গ্রন্থটিতে পশ্চিমা পণ্ডিতদের দ্বারা লিখিত ভ্রান্ত তথ্য ছিল। অধ্যাপক মজুমদার দায়িত্ব নিয়ে বিশেষ টীকা যোগ করে সংশোধিত আকারে তা প্রকাশ করেন।
১৯৫৫ সালে অধ্যাপক মজুমদার নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দোলজি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এ অঞ্চলের সারস্বতসাধনার অন্যতম কেন্দ্র এশিয়াটিক সোসাইটি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ উভয়েরই সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি যথাক্রমে ১৯৬৬-৬৮ ও ১৯৬৮-৬৯ সাল পর্যন্ত। এছাড়া ১৯৬৭-৬৮ সালে কিছুদিনের জন্য তিনি কলকাতার ‘শেরিফ’ (Sheriff)-এর পদেও সম্মানের সাথে আসীন ছিলেন।
এসবের পাশাপাশি তাঁর গবেষকসত্তাটিকে কখনো অবহেলা করেননি তিনি। গোড়া থেকেই গভীর নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের সাথে উচ্চমানের গবেষণা করেছেন ও সেগুলো প্রকাশ করেছেন প্রসিদ্ধ জার্নালে ও পুস্তকাকারে। এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে তাঁর প্রথম গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ হয় ১৯১৪ সালে। এর কিছুদিন পর তিনি স্যার আশুতোষের উদ্যোগে সোসাইটির কাউন্সিলের সভ্য হন। তিনিই এর অন্যতম কনিষ্ঠ সভ্য ছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নাল ছাড়াও Journal of Indian History, Indian Historical Quarterly, Journal of the Bihar and Orissa Research Societyতে একাধিক প্রবন্ধ লেখেন। ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ হয় রমেশচন্দ্র মজুমদারের Corporate Life in Ancient India শীর্ষক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ।
ঢাকায় যাওয়ার পর উপাচার্য ফিলিপ হার্টগ অধ্যাপক মজুমদারকে অনুরোধ করে বলেন, তাঁর ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একটি উত্কৃষ্ট গবেষণাকেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং তার জন্য তিনি যেন গবেষণাসমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ নেন। এ সূত্রেই ১৯২৪ সালে Early History of Bengal নামক পুস্তিকাটি রচিত ও প্রকাশিত হয়। হার্টগ স্বয়ং এর প্রুফ দেখে দিয়েছিলেন। ১৯২৭ সালে Outline of Ancient Indian History (পরিমার্জিত নাম Ancient India) প্রকাশ হয়। অদ্যাবধি পাঠকসমাজে বইটি বিপুলভাবে সমাদৃত। এ সময় বাংলার বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসের প্রতিও তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সুষ্ঠুভাবে গবেষণা সম্পাদনের লক্ষ্যে তিনি ফরাসি ও ডাচ ভাষা শেখেন এবং ভিয়েতনাম অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ওপর Champa, Ancient Indian Colonies in the Far East (1927) গ্রন্থটি রচনা করেন। পরবর্তীকালে এ বিষয়ে আরো লেখেন Suvarnadvipa, Ancient Indian Colonies in the Far East, Kambuja Desa Or An Ancient Hindu Colony In Cambodia, Hidu Colonies in the Far East.
তিন খণ্ডে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস The History of Bengal-এর পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ অধ্যাপক মজুমদারের জীবনের এক মূল্যবান কীর্তি। এর মধ্যে প্রাচীনকালের ওপর লেখা প্রথম খণ্ডটি তিনি নিজে সম্পাদনা করেন, যা ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশ হয়। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপনের এ প্রয়াস বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সমাদৃত হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড সম্পাদনার ভার পান স্যার যদুনাথ সরকার।
অধ্যাপক মজুমদারের আরেকটি বিশেষ কীর্তি ভারতীয় বিদ্যাভবন সিরিজের History and Culture of the Indian People. ১১ খণ্ডে রচিত এ প্রকল্পে ৭৫ জন বিদ্বজ্জন কাজ করেন। তা হলেও সিরিজের সিংহভাগ লেখা অধ্যাপক মজুমদার নিজেই লিখেছিলেন। এমনকি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির চাপে তাঁকে মধ্য ও আধুনিককালের ইতিহাসও রচনা করতে হয়েছে। প্রচুর পরিশ্রম করে ২৮৩টি প্লেট, ২০টি মানচিত্রসংবলিত প্রায় নয় হাজার পৃষ্ঠার এ সিরিজটি সম্পন্ন করতে হয়েছে।
‘স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস’ নামক ভারত সরকারের একটি প্রকল্পে অধ্যাপক মজুমদার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে এটি নিয়ে ভারতীয় সরকারের সাথে তাঁর তীব্র দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। এ দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে তিনি The Sepoy Mutiny and the Revolt of 1857 (one volume, 1957) এবং History of Freedom Movement in India (three volumes, 1962-63) নামক চারটি বৃহদাকার গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেন। এইচ.সি রায়চৌধুরী ও কালীকিংকর দত্তের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত Advanced History of India গ্রন্থটি ১৯৬০ সালে প্রকাশ হয়। ভারতবর্ষের ইতিহাস বিষয়ে রচিত স্নাতক পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ছাত্র-শিক্ষক মহলে এটি দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সমাদৃত। তাঁর সারা জীবনের কর্মসাধনার জন্য তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকার-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের ৯২ বছরের দীর্ঘ কর্মবহুল বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ দিনটি ছিল ১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






