আমার জন্মের দিনক্ষণ আমার পিতা স্বহস্তে অন্য ভাইদের মতো লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছেন: হি. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৪ পৃষ্ঠার জের) ৯। সন ১৩৩৯ ১ ভাদ্র। ইং ১৯৩২ ১৭ আগস্ট। হি. ১৩৫১ ১৪ রবিউস সানি বুধবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিট কৃষ্ণপক্ষ দ্বিতীয় আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরউল্লাহ সর্বশেষ লাইন ছিল আরবি অক্ষরের পুরো নাম। আমার নামের পাশের ব্র্যাকেটে লেখা ছিল বকুল, যা আমার ডাকনাম। এ নামটি অবশ্য আমার পিতা স্বহস্তে লেখেননি। সম্ভবত আমার কোনো ভাই কিংবা বোনের লেখা। আমি পিতা-মাতার নবম সন্তান এবং সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। তাই পিতা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমার জন্মবৃত্তান্তের শুরুতে ৯ কথাটি লিখেছিলেন।

বাবা বলে যাঁকে আমরা জানতাম, তিনি হলেন টুপি পরিহিত ছোট্ট দাড়িওয়ালা একটি লোক, যিনি তাঁর নিজের লাইব্রেরি ঘরে বইপত্রের মধ্যে মগ্ন থাকেন। তাঁর কাছে যাওয়ার সুযোগ তেমন ঘটত না। নামাজ পড়ার সময় তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম। এইটুকুই। তবে মাসের প্রথম দিন তিনি তাঁর বেতনের টাকা টেবিলে রাখতেন এবং ছেলেদের বলতেন, যার যা ইচ্ছে নিতে। সেখানে অবশ্য আমার মা থাকতেন না। মা থাকতেন ঘরের বাইরে। দরজার আড়ালে। আমরা যখন ইচ্ছেমতো টাকা নিয়ে বেরোতাম, তিনি সেই টাকাগুলো আমাদের হাত থেকে নিয়ে নিতেন। প্রত্যেকটি ছেলের নাম লেখা ছোট্ট কাঠের বাক্স ছিল, সেখানে তিনি টাকাগুলো রাখতেন। আমার আকর্ষণ ছিল রুপার টাকার দিকে। একটি কি দুটি আমি টেবিল থেকে তুলে নিতাম। মা এ সঞ্চিত অর্থ দিয়ে চব্বিশ পরগনায় আমাদের দেশের বাড়িতে বড় একটা বাগান কিনেছিলেন। সেখানে ছিল আম, জাম, খুদে জাম, নারকেল ফলসহ নানা রকম ফলের গাছ। গ্রীষ্মের ছুটিতে মা-বাবাসহ আমরা ভাইয়েরা যখন দেশের বাড়িতে যেতাম, তখন ডাব খেতে চেয়েছি, কেউ পেড়ে দিচ্ছে না, কিংবা কাঁচা আম ছিঁড়েছি, তাতে কেউ বকেছে, এগুলো দেখে আমার মায়ের আভিজাত্যে লাগত। কেননা দেশের এ বাগানগুলো ছিল যৌথ পরিবারের। তাই মা আমাদের জন্য বাগান কিনেছিলেন, যাতে আমরা ছিঁড়ি, ফেলি, কারো বলার অধিকার থাকবে না।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লাইব্রেরিতে প্রবেশের অধিকার শুধু তাঁর বড় ছেলে সফিউল্লাহর ছিল। আমি খুবই ছোট ছিলাম, পরে বড় ভাইদের মুখে শুনেছি লাইব্রেরিতে ঢুকলে বাবা কিছু বলতেন না। আমি নাকি তাঁর লাইব্রেরির বইগুলো নাড়তাম, র্যাক থেকে মেঝেতে ফেলতাম, আবার তুলে রাখতাম। ছোটবেলায় আমার ছবি দেখতে খুব ভালো লাগত। আমি সেসব বইয়ে নানা রকম ছবি দেখতাম। পরবর্তীকালে ওই ছবিগুলো কেটে কেটে আমি একটি  রঙিন কাগজের খাতায় লাগিয়েছিলাম।

আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন আমার বাবা আমাকে বয়েজ স্কাউট হতে বলেন। আমি স্কাউটে ফার্স্বক্লাস পর্যন্ত হয়েছিলাম। স্বপ্ন ছিল, একদিন কিং-স্কাউট হওয়ার। কিং-স্কাউটের ব্যাজটা আমাকে খুব আকৃষ্ট করত। এম্ব্রয়ডারি করা একটি মুকুট উত্কীর্ণ করা ছিল ব্যাজটি। যখন কিং-স্কাউট হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, সে সময় দেশ ভাগ হয়ে গেল ১৯৪৭ সালে। কিং-স্কাউটের নাম পরিবর্তিত হয়ে হলো কায়েদে আজম স্কাউট। আমি স্কুলে নবম শ্রেণী থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন— ছাত্র ফেডারেশনের একজন কর্মী ছিলাম। তখন কমিউনিস্ট পার্টির একটি স্লোগান ছিল: ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়। সাচ্চা আজাদি লেনা হ্যায়। কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে পাকিস্তানের অস্তিত্বই তখন বিশ্বাস করি না। তাই আমার স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হলো না। কেননা স্কাউটের নিয়ম ছিল দেশের পতাকা ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করা। ব্রিটিশ আমলে ইউনিয়ন জ্যাক ধরে শপথ নিতাম: এই দেশ রক্ষা এবং এর সব ভালো-মন্দ আমি পালন করব। কিন্তু পাকিস্তানের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে এ শপথ করতে পারলাম না। কেননা পাকিস্তানের অস্তিত্বই তখন আমরা স্বীকার করি না।

ঘরে বাবার অনেক টেনিস র্যাকেট ছিল, আর ছিল ব্যায়াম করার জন্য মুগুর, ডাম্বল ইত্যাদি। তিনি নিয়মিত এগুলো দিয়ে ব্যায়াম করতেন এবং বিকালে ইউনিভার্সিটির টেনিস কোর্টে (বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনের পার্ক) টেনিস খেলতেন। তাঁর সঙ্গে আমি টেনিস খেলার মাঠে যেতাম। আমার খুব আকর্ষণ ছিল টেনিস বলের প্রতি। অনেক সময় বাতিলকৃত টেনিস বল পাওয়ার একটা বাসনা নিয়েই তাঁর সঙ্গে যেতাম।

প্রতি রোববার দুপুরের খাবার পিতার সঙ্গে আমরা ভাইয়েরা ডাইনিং টেবিলে খেতাম। সেদিন বাড়িতে একটা আনন্দ উত্সবের মতো ছিল। আমার মা সুন্দর ফুলের কলি বা ফুটন্ত ফুলের মতো সাদা টেবিল ন্যাপকিন বানিয়ে গ্লাসে সাজাতেন। প্লেটের একধারে থাকত ছুরি, কাঁটাচামচ, টেবিল চামচ এবং প্লেটের মাথার দিকে থাকত সুপ খাওয়ার গোল চামচ। সেদিন আমাদের বাড়িতে ইংলিশ ফুড হতো। খানসামা গলাবন্ধ সাদা কোট, মাথায় টারবান পরে আমাদের পরিবেশন করত। বাবা লক্ষ রাখতেন, ছুরি কিংবা কাঁটাচামচ ধরা ঠিক হয়েছে কিনা। কখনো যদি প্লেটে কাঁটাচামচ বা ছুরির কোনো শব্দ হয়েছে, তিনি শব্দ করতে বারণ করতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর আমার বাবা বগুড়া যান আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে। আমার মা এবং আমার থেকে একটু বড় দুই ভাইসহ আমরা তখন ঢাকায় থাকি। বাবা ১৯৪৪ সালে আমাকে বগুড়ায় তাঁর কাছে নিয়ে যান। সেখানে জিলা স্কুলে আমি ক্লাস সেভেনে ভর্তি হই। বাবা বগুড়া শহরের সবচেয়ে নামজাদা রেস্টুরেন্ট আমজাদিয়ায় আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন। এবং বলেন— আমি যখন যা খাব, তা খাতায় লিখে রাখতে। মাস অন্তে তিনি টাকা দিয়ে দেবেন। বাবা তাঁর কলেজ ও সভা-সমিতি নিয়ে থাকতেন ব্যস্ত, তাই শাসন করার কেউ নেই, আমি হয়ে উঠলাম খাঁচা থেকে মুক্ত একটা পাখির মতো। বন্ধুবান্ধব জুটে গেল। রেস্টুরেন্টে খাওয়া, সেসঙ্গে সিনেমা হলে ম্যাটিনি শো দেখে আবার ইভিনিং শো দেখা একটানা চলতে লাগল। বাবা ক্ষুব্ধ। তিনি বললেন, তাঁর কাছে মাফ চাইতে। আমি মাফ চাইতে পারলাম না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার বাবা আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন। মুক্ত বিহঙ্গের মতো আমি ছিলাম, ঢাকায় আবার খাঁচায় বন্দি হলাম। কয়েক বছর পর বাবা আমাদের সবাইকে বগুড়ায় নিয়ে গেলেন। বগুড়ায় তিনি বাড়ি কিনলেন সুলতানগঞ্জ পাড়ায় এবং স্থানীয়ভাবে বগুড়ায় থাকার ইচ্ছা ছিল তাঁর। বগুড়া থেকেই আমি ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করলাম। যদিও আমার ম্যাট্রিক দেয়ার কথা ছিল ১৯৪৮ সালে। ক্লাস টেনে পড়ার সময় আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে ছিলাম। স্কুলে ক্লাসরুমে টিফিন পিরিয়ডের পর যখন নাম রোল কল করা হতো, সেই সময় আমার এক সহপাঠী অনুপস্থিত দেখে শিক্ষক তাকে অ্যাবসেন্ট করে দিয়েছিল, আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। শিক্ষকের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছিল, শিক্ষক হেডমাস্টারের কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করলে হেডমাস্টার আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁর কামরায় ঢুকে হেডমাস্টারের টেবিলে দুই হাত ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে ডেকেছেন? হেডমাস্টার রাগান্বিত স্বরে বললেন, ঠিকভাবে কথা বলো। আমি অবাক হয়ে হেডমাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে এ কথার মানে খুঁজছিলাম। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আমার ভুলটা কোথায়। রাগে হেডমাস্টারের চোখ-মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। এক পাশে বসেছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার, অঙ্কের শিক্ষক নরেন ঢোল। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মৃদু স্বরে বললেন, বশীর তুমি টেবিল থেকে হাত দুটো নামাও। ওভাবে টেবিলে হাত রেখে কথা বলা যে অন্যায়, তা আমার মাথায় আসেনি। হেডমাস্টার বললেন, তোমার বাবার কাছে তোমার সম্পর্কে নালিশ করব। আমি তাঁকে বললাম, যা কিছু অন্যায় আমি করেছি, আমাকে বলুন, আমার বাবাকে কেন? তিনি বারবার একই কথা বলতে লাগলেন শুনে আমি ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বললাম; আমার বাবা কলেজের প্রিন্সিপাল, আপনি হলেন স্কুলের হেডমাস্টার, তাঁর সম্মুখে যাওয়ার যোগ্যতা আপনার নেই। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র বলে ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে এক ধরনের আত্মগরিমা এবং সেই সঙ্গে কিছুটা ঔদ্ধত্য ছিল। একবার ক্লাস টেনে পড়ার সময় মুকুল ফৌজের মেয়েদের প্যারেডে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে সাইকেল চালিয়ে লাইন ভেঙে দিয়েছিলাম। স্কুলের মাঠের পাশে একজন সাব-রেজিস্ট্রার বাস করতেন। তা দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘খোকা, তুমি আজ যা করলে, অন্য কেউ হলে তা ছিল ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু তোমার বাবা চিরদিন বেঁচে থাকবেন না। তখন কেউ তোমাকে রেহাই দেবে না।’ সেদিন তাঁর কথায় আমি যে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করতাম, তা থেকে পতিত হলাম। দেশভাগের আগে মফস্বল শহরে তিনজন ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তি, সবার শ্রদ্ধেয়। এক. ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, দুই. সিভিল সার্জন, তিন. কলেজের অধ্যক্ষ। একে তো আমার পিতাকে এক নামে সবাই চেনে, তার ওপর তিনি কলেজের অধ্যক্ষ। ফলে আমার চলন-বলনে এক ধরনের উন্নাসিকতা ফুটে বেরোত।

আমার নানা রকম কীর্তিকলাপের কথা শুনে তিনি একদিন আমাকে ডেকে বললেন: ‘শোনো তোমার ইংরেজি গ্রামার বইতে পড়েছ না— এমিন্যান্ট ইমিন্যান্ট, প্রিন্সিপাল প্রিন্সিপাল, নটোরিয়াস ফেমাস। তুমি আমার সন্তান আইদার নটোরিয়াস অর ফেমাস, ডোন্ট বি এ মিডিওকার।’ আমার ধারণা ছিল হেডমাস্টার হয়তো নালিশ করেছেন, সেই আগাম ভয়ে আমি বাড়ি থেকে পালালাম। আমি লখনৌ পর্যন্ত গিয়েছিলাম।

শুনে তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, আর একটু সামনে আগ্রা গিয়ে তাজমহল তো দেখতে পারতে। আমার মনে হলো, যদি আগ্রায় গিয়ে তাজমহল দেখতাম, তাহলে সংসারের এ অর্থের অপচয় হতো না।

স্কুলে নাইনে পড়ার সময় বাবার লাইব্রেরিতে রাখা বসুমতী, প্রবাসী, বিচিত্রা, ভারতবর্ষ ম্যাগাজিনগুলোর সব গল্প-উপন্যাস আমি পড়েছিলাম। এমনকি বঙ্কিম, শরত্, রবীন্দ্রনাথ ও রমেশচন্দ্র দত্তের রচনাবলি— সবই পড়েছিলাম। তাঁদের লেখা পড়ে আমার ইচ্ছে হতো তাঁদের মতো লেখক হওয়ার। বাবার রিডিং টেবিলে, দেরাজে কিংবা বাবাকে উপহার দেয়া বইয়ে মোহিতলাল মজুমদার, সুকুমার সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, দীনেশচন্দ্র সেন নাম দেখতাম। তখন মনে প্রশ্ন জাগত, আমার বাবাকে তাঁরা চেনেন? তখন মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা হতো আমি আমার বাবার মতো হব।

ম্যাট্রিক পাস করার পর কমিউনিস্ট পার্টি আমাকে আর্ট স্কুলে ভর্তির নির্দেশ দেয়। সেখানে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। বাবা অবশ্য চেয়েছিলেন আমি আলিগড়ে পড়াশোনা করি। তখনকার দিনে মুসলিম সমাজে এটা ছিল এক ধরনের বাসনা। কিন্তু আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা যখন তাঁকে বলি, তিনি বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, তিনি প্যারিসে ছিলেন, তিনি দেখেছেন, আর্টিস্টদের জীবন অত্যন্ত কষ্টের এবং অনিশ্চয়তায় ভরপুর। তাঁর সন্তান অভুক্ত বা অনাহারে থাকবে, দুঃখকষ্টে দিনযাপন করবে, এটা পিতা হিসেবে তাঁর কাছে কামনা ছিল না। আমাকে সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে দেখে তিনি বললেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতনে পড়ার জন্য। কিন্তু আমার মূল উদ্দেশ্য তো শিল্পী হওয়া নয়, পার্টির সাংগঠনিক ক্রিয়াকর্মে জড়িত থাকা। তাই আর্ট স্কুলে ভর্তির জন্য জেদ ধরলাম। প্রথম কয়েক দিন তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেন না, তাঁর সঙ্গে নামাজ পড়তে ডাকলেন না। দুই-তিন দিন পর তিনি আমার হাতে ভর্তি হওয়ার জন্য টাকা দিয়ে তাঁর সঙ্গে লাইব্রেরি ঘরে নিয়ে গেলেন। লাইব্রেরিতে মেহগনি কাঠের একটি ছোট্ট আলমারি ছিল, সেখানে তাঁর দরকারি বইপত্র ছাড়া আর ছিল দুই-খণ্ড অ্যালবাম। প্যারিস থেকে ১৯২৮ সালে তিনি যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন প্যারিসে অবস্থিত ভারতীয় ছাত্র অ্যাসোসিয়েশন তাঁর বিদায় উপলক্ষে বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়ামের চিত্রগুলোর রঙিন ছবির এ দুই খণ্ড অ্যালবাম উপহার দিয়েছিল। যেহেতু এর বেশকিছু ছবি ছিল বিবস্ত্র নারীর, তাই তিনি আলমারিতে তালাবদ্ধ করে রাখতেন। ক্বচিত্ কখনো তিনি তালা দিতে ভুলে গেলে আমি কৌতূহলের সঙ্গে এ ছবিগুলো দেখতাম। তখন আমি দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, রাফায়েল, জর্জিনো, কুবে, বতিচেলিক্স, টিসিয়ান, দেলাক্রোয়া, ইনগ্রে, রেমব্রাঁ কিংবা পল গগাঁ, ভ্যান খগ, গেঁজা, পিকাসো এঁদের নাম জানতাম না। পরে আর্ট স্কুলে পড়ার সময় এ নামগুলো জেনেছি। পরবর্তীকালে যখন রোম, ফ্লোরেন্স বা প্যারিসে মিউজিয়ামগুলোয় এঁদের ছবি দেখেছি, এই চিত্রগুলো মনে হয়েছিল আমার অতিচেনা। তাই প্রথম দর্শনে যে চমক লাগত, তা আমার হয়নি। তিনি আলমারি খুলে ল্যুভর মিউজিয়ামের দুটি নিষিদ্ধ বই আমার হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দিলেন। বললেন, এই দুটি বই এত দিন ছিল আমার, আজ থেকে তোমার। তিনি মনে করেছিলেন এই নগ্নিকা রমণীরা আমার কাছে দৃষ্টিনন্দন রমণী রূপে ধরা দেবে, কামনাজর্জরিত নগ্ন ছবি হিসেবে প্রলুব্ধ করবে না। এছাড়া সেই আলমারিতে ছিল তাঁর প্যারিসে অবস্থানকালীন সংগৃহীত রাস্তাঘাট, ফোয়ারা, বাগান ইত্যাদির ভিউ কার্ড। সেসব কার্ডে কখনো কখনো দেখতাম ভাস্কর্য। আমি তন্ময় হয়ে যেতাম। সেই কিশোর বয়স থেকেই স্বপ্ন দেখতাম সেখানে যাওয়ার, দেখার।

জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল না, তাই ১৯৫৪ সালে আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম শ্রেণীতে পাস করা সত্ত্বেও আমাকে তিনি আর্ট ইনস্টিটিউটে চাকরি দেননি। তখন পোস্ট অ্যাডভারটাইজ হতো না, তিনি যাকে পছন্দ করতেন, তাকেই চাকরি দিতেন। এমনকি আমার সহপাঠী কাইয়ুম চৌধুরী যে দ্বিতীয় শ্রেণী পেয়েছিল, তাকে তিনি চাকরি দেন, কিন্তু আমাকে দেননি। এমনকি আমার জন্য বিদেশে যাওয়ার কোনো স্কলারশিপেরও ব্যবস্থা করেননি। ১৯৫৬ সালে আমার বাবা আমাকে ইতালির ফ্লোরেন্সে পাঠালেন। ১৯৫৮ সালের শেষাশেষি আমি ঢাকায় ফিরে আসি। কিন্তু এখানে এসে চাকরির কোনো সুরাহা করতে পারলাম না। ফলে আমি করাচি চলে আসি। ১৯৫৯ সালের মে মাসে করাচিতে জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনী হলো আমার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমার বাবা উপস্থিত ছিলেন। আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব দ্য মিডলইস্ট আয়োজিত সে অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয়েছিল ককটেল। তিনি সেদিকে মোটেই ভ্রুক্ষেপ করেননি। শেষ পর্যন্ত সব ছবিই তিনি ঘুরে ঘুরে দেখেছেন; সন্ধ্যায় প্রদর্শনী হলের এক কোণে মাগরিবের নামাজ পড়েছেন।

বাবা খবরের কাগজে চিত্রপ্রদর্শনীর খবর পড়তেন, আমাকে সে খবর লিখে জানাতেন। ১৯৫৭ সালের ২৬ মে পাকিস্তান অবজারভারে ওয়াশিংটন ডিসিতে পাকিস্তানের নয় শিল্পীর যৌথ প্রদর্শনীর খবর বেরিয়েছিল। সেই আলোচনায় আমার নাম ভুল ছাপা হয়েছে দেখে আমার নামের সংশোধনী দিয়ে তিনি পত্রিকার চিঠিপত্র বিভাগে চিঠি দেন; ‘স্যার, আমি বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে আপনার বিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশিত রিতা খানের ‘‘পাকিস্তানি পেইন্টিংস এক্সিবিটেড ইন ওয়াশিংটন’’ নিবন্ধটি পাঠ করলাম। একটি মুদ্রণজনিত ত্রুটির (অথবা লেখিকার একটি ভুল) প্রতি আমি আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যেসব শিল্পীর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ফ্লোরেন্স প্রবাসী মুর্তজা রশীদের নাম উল্লিখিত হয়েছে। ইনি আসলে আমার পুত্র মুর্তজা বশীর। তাঁর পুরো নাম আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরউল্লাহ। তাঁর কাজটি প্রশংসা পেয়েছে জেনে আমি আনন্দিত। —আপনারই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।’ (চিঠিটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে মুর্তজা বশীর, এই পরিচয় আমার কাম্য ছিল না। আমি বরং চাইতাম লোকে বলুক মুর্তজা বশীরের বাবা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তাই নামের শেষ থেকে উল্লাহ মুছে দিয়ে আমি মুক্তির স্বাদ অনুভব করেছি। এই পারিবারিক চিহ্নটি মুছে ফেলার ব্যাপারটি আমার মা-বাবা কেউ সহজভাবে নিতে পারেননি।

বাবা একদিন তাঁর লাইব্রেরিতে পড়ছেন। ডাকপিয়ন আমার একটি চিঠি দিল। চিঠিটি বাবার সামনে রাখতেই তিনি চোখ বুলিয়ে ফেরত দিলেন। ঘটনাচক্রে তখন আমি সেখানে। হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিয়ে দেখলাম আমার চিঠি। তিনি আমার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি অকম্পিত গলায় বললাম, ‘উল্লাহ’ কেটে দিয়েছি। নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে চাই। তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিয়ে নাম পড়লেন; বললেন, ‘তোমার মুর্তজা নামের বানানে ‘ম’-এর নিচে দীর্ঘ-উকার দাও কেন? মূর্খের বানানে ‘ম’-এর নিচে দীর্ঘ-উকার হয়। তুমি তো মূর্খ নও, তাই তুমি ‘ম’-তে লিখবে হ্রস্ব-উকার’।

১৯৬৮ সালে সেরিব্রাল থ্রম্বসিসে আক্রান্ত হয়ে বাবা যখন হাসপাতালে, তখন বারবার জানতে চাইতেন, ছবি আঁকা কেমন হচ্ছে। সে সময় আমি স্টেট ব্যাংকে (বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক) ম্যুরাল করছিলাম। মা মারা যাওয়ায় কাজে বিঘ্ন ঘটছিল, কিছুতেই মন বসাতে পারছিলাম না। বাবা বললেন, ‘দেখো, কাজ করে যেতে হবে। মা মারা গেছেন তাতে কী? তুমি তোমার কাজ করে যাও।’ আমার চোখে পানি এসে জড়ো হয়েছিল। বলেছিলাম, দোয়া করবেন। এ কাজে কত পয়সা পাব শুনে পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বলেছিলেন, ‘নাউ ইউ আর এ রিচ ম্যান’

মানুষ অনন্য। হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, প্রেম বারবার এসেছে আমার ক্যানভাসে। আর এসেছে হতাশা কিংবা রূপকের ভেতর দিয়ে আত্মার আর্তি। ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমিতে ‘সমকালীন চিত্রকলা’ শীর্ষক এক প্রদর্শনী হয়েছিল, তাতে আমার ‘ডেট লিজার্ড’ নামের একটি ছবি ছিল। বাবা ছবিটি দেখেছিলেন প্রদর্শনীতে। বাসায় এসে সোজা আমার ঘরে টোকা দিলেন। দরজায় শব্দ না করে ঘরে ঢুকতেন না তিনি। বললেন, ‘জানো, তোমার ছবিটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না। আমার ভেতরটা কেমন নড়ে ওঠে।’ মনে হলো এর চেয়ে বড় সম্মান আর হয় না। এ সম্মান অতুলনীয়। আমি তাঁকে গভীরভাবে দেখলাম, বললাম, সেই মৃত টিকটিকিটা হচ্ছে এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজে মানুষের প্রতীক, আমরা যেখানে জীবন্মৃত। আমরা প্রেতাত্মা, অশরীরী। আমি, আপনি, সবাই। চলছি, নড়ছি তবু আমাদের মধ্যে প্রাণ নেই। বোধ করি বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর সেই উজ্জ্বল চোখজোড়া দিয়ে আমাকে দেখছিলেন। তার পর মৃদু গলায় যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে এমন স্বরে বললেন, ‘তা হয়তো হবে।’ কয়েক দিন পর বাংলা একাডেমিতে ‘আধুনিক চিত্র ও আধুনিক শিল্পী’ শিরোনামে এক ঘরোয়া আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে প্রখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহী বাবাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি বলুন ডক্টর সাহেব, আপনার ছেলে তো একজন আধুনিক শিল্পী’ জবাবে তিনি হেসেছিলেন, ‘আধুনিক চিত্রের মতোই আমার ছেলে দুর্বোধ্য।’

কালেভদ্রে আমার ঘরে আসতেন তিনি। একদিন আমার ঘরে ঢুকে দেয়ালে আমার এক ছবি দেখে বললেন, ‘এসব ভূত কেন আঁকো? আর্টিস্ট তুমি, সুন্দর জিনিস আঁকবে।’ তাঁর অযাচিত উপদেশে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। ক্ষুদ্ধ হয়ে জবাব দিয়েছিলাম, সুন্দরই যে আঁকতে হবে তার কোনো মানে নেই। এক ফোঁটাও বিব্রত হননি তিনি। বলেছিলেন, ‘প্যারিসে ল্যুভে আমি দেখেছি কত চমত্কার সুন্দর শিল্পকলা সেগুলো।’

১৯৬১ সালে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মিটিংয়ের জন্য লাহোরে আসেন। ওঠেন হোটেলে। আমি তখন লাহোরে থাকি। আমি হোটেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। সেখান থেকে তাঁর সঙ্গে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। তিনি কাজ শেষ হওয়ার পর বললেন, ‘চলো, তোমার ওখানে যাই।’ আমার ঘরে তাঁকে নিয়ে যেতে ইতস্তত করছিলাম। থাকি শহরতলি সামনাবাদে। ঘর বলতে খুপরি, দেয়ালে চুন নেই, কোনো আসবাবপত্র নেই। জানালার পাটে শার্শি নেই। গরমে আসে আগুনের হলকা, শীতজুড়ে বরফের চাবুক। দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা ক্যানভাসের কোণে ঝুলে থাকে প্যান্ট-শার্ট। মেঝের মাঝে আটটি ইট জড়ো করা, তার ওপর কডের প্যান্ট ভাঁজ করে রাখা, সেখানে বসি। টাঙ্গায় তাঁর পাশে বসে ঘরের এই দৃশ্যের কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলাম। আমার ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারধারে ভালো করে চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি একসেন্ট্রিক।’ তিনি ইটের স্তূপের ওপর বসলেন। কোমরে তিনি চিটাগংয়ের বেল্ট বাঁধতেন। তার ভেতর থেকে একটা ১০০ টাকার নোট বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল এটা অনুকম্পা; হাত বাড়িয়ে এই দান নিতে মন সায় দিচ্ছিল না। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আফটার অল আওয়ার রিলেশন ইজ দ্যাট অব ফাদার অ্যান্ড সান।’

আমার শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ, মৃত্যুর কিছুদিন আগে কালি-কলমে তাঁর প্রতিকৃতি আঁকা। তিনি নিজেই আমাকে তাঁর ছবি আঁকার জন্য বলেছিলেন। তিনি আচকান পরলেন, তাঁর বহুল পরিচিত কালো টুপি মাথায় দিয়ে আমার সামনে চেয়ারে বসলেন। ইতিপূর্বে আমি তাঁর চারটি প্রতিকৃতি এঁকেছিলাম। প্রথমে ১৯৫৩ সালে। সবই আমি আঁকতাম দূর থেকে। এই প্রথম তাঁকে মডেল করলাম। যেভাবে যেদিকে তাঁকে তাকাতে বলেছি, তিনি একজন পেশাদার মডেলের মতো সেভাবেই বসেছেন। অসুস্থ তিনি, তাই তাড়াতাড়ি আঁকছিলাম। আগের মতো সেই বুক পর্যন্ত শুভ্র দাড়ি নেই; খেতে কষ্ট হতো বলে একটু গোল করে ছোট করা। গোঁফ ছাঁটা। তখনো কি জানতাম, এই আমার শেষ আঁকা, তাঁকে গভীরভাবে দেখা? মন ভরে সমস্ত সত্তা দিয়ে প্রাণ ভরে দেখা। আর এখানেই আমার দুঃখ।

 

লেখক: চিত্রশিল্পী ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে