মওলানা ভাসানী ছিলেন সম্পূর্ণ এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক নেতা। রাজনীতিকে তিনি যেভাবে বুঝেছিলেন, আমাদের অন্য কোনো জাতীয় নেতা রাজনীতিকে সেভাবে বোঝেননি। মওলানা ভাসানীর শ্রেণী-চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের অনেক কমিউনিস্ট নেতা গলদ্ঘর্ম হয়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে মওলানা ছিলেন কখনো পেটি বুর্জোয়া নেতা, আবার কখনো ধনী কৃষকদের প্রতিভূ, আবার কখনো জাতীয় বুর্জোয়া নেতা। এ কথা ঠিক যে, মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক নেতাদের একটি শ্রেণী-চরিত্র থাকে, অর্থাত্ তারা যে শ্রেণীতে জন্মগ্রহণ করুন না কেন, জীবনবোধ ও উপলব্ধি থেকে তারা সমাজের কোনো না কোনো শ্রেণীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতি করেন। এ প্রসঙ্গে অনেকেরই জানা একটি পুরনো গল্প মনে পড়ে। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম অধিবেশনে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পর্কে এক নতুন তত্ত্ব হাজির করেন। তাঁর তত্ত্বের মূল কথা ছিল, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ, পুঁজিবাদী শিবিরের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা এবং পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তাঁর এই তত্ত্বকে তত্কালীন চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সংশোধনবাদী তত্ত্ব বলে নিন্দা করে। এ ঘটনার পর চীনের প্রধানমন্ত্রী জো অ্যান্ড লাই ও নিকিতা কুশ্চেভের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে জো অ্যান্ড লাই কুশ্চেভের প্রতি মন্তব্য করেছিলেন যে, তাদের দুজনের মধ্যে একটা মিল রয়েছে, দুজনই তাদের নিজস্ব শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান চৌ এন লাই তাঁর শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে সর্বহারাদের বিপ্লবী পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে কয়লা খনি শ্রমিক পরিবারের সন্তান ক্রুশ্চেভ তাঁর শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে বুর্জোয়া স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সুতরাং রাজনৈতিক নেতাদের শ্রেণী-চরিত্র বিশ্লেষণ যে, একটি অত্যন্ত জটিল বিষয় তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে কর্মকাণ্ডের আলোকে একজন নির্দিষ্ট নেতাকে বিশেষ স্বার্থের প্রতিভূ হিসেবে দাঁড় করানো যায় বৈকি।

মওলানা ভাসানীকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো শ্রেণীর পক্ষে দাঁড় করাতে চাইলে তাকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করা যায় না। আমাদের দেশে অনেকে মওলানা ভাসানীকে চীনের জাতীয় নেতা সান ইয়েত সেনের সঙ্গে তুলনা করেন। চীনের কমিউনিস্টদের জন্য সান ইয়েত সেন ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য মিত্র। তেমনি আমাদের দেশে যারা কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের জন্য মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য মিত্র।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ দেশের কমিউনিস্টরা মওলানা ভাসানীকে বুঝতে পারেননি। তারা হয়তো আশা করেছিলেন, মওলানা তাদের মতো তাত্ত্বিক ভাষায় কথা বলবেন। কিন্তু মওলানা সুনির্দিষ্ট কোনো তত্ত্বে দীক্ষা নেয়ার মানুষ ছিলেন না। চীন সফর করে আসার পর তাঁর চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি যে ছোট বইটি লিখেছিলেন তার প্রথমেই উল্লেখ ছিল, ৮৬ বছর বয়সে এসে নতুন করে দীক্ষা নেয়ার সুযোগ আমার নেই। তবে এ কথায় তাঁর সম্পর্কে যা বলা যায় তা হলো, তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না, আবার কমিউনিস্টদের বিরোধীও ছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সিপিএম নেতা হরে কৃষ্ণ কুমার হায়দার আকবর খানকে বলেছিলেন, তোমাদের কী সৌভাগ্য, তোমরা মিত্র হিসেবে মওলানা ভাসানীর মতো একজন জননন্দিত নেতাকে পেয়েছ। হরে কৃষ্ণ কুমারের মতো পোড় খাওয়া ভিনদেশী কমিউনিস্ট নেতা মওলানা ভাসানীর গুরুত্ব বুঝলেও দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, শেষ পর্যন্ত এ দেশের কমিউনিস্টরা তাকে ভুল বুঝেছিল। সে ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গেলে বিশাল গবেষণার প্রয়োজন। সে সুযোগ এই নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে নেই।

মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন স্বপ্রাণ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গরিব মানুষের নেতা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। জিন্নাহের সঙ্গে বৈঠকে মওলানা বাংলার কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে হু-হু করে কেঁদে ফেলেন। জিন্নাহর মন্তব্য ছিল, অমন আবেগপ্রবণ নেতা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। মওলানা ভাসানী কখনো রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, এমনটি ভাবেননি। তিনি শুধু চেয়েছিলেন রাষ্ট্রের নিম্নবর্গের মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশার কথা রাষ্ট্রের কর্ণধারদের কর্ণে পৌঁছে দিতে। তিনি ছিলেন মজলুম মানুষের নেতা। তাকে যথার্থভাবেই বলা হতো মজলুম জননেতা। ক্ষমতার অধিকারী না হয়েও রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে তাঁর ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা। তাঁর সম্পর্কে আরেকটি গল্প হলো, ১৯৬৪ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। সেই বৈঠকে যারা তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে শুনেছি, বৈঠকের নির্দিষ্ট সময়ে মওলানা প্রেসিডেন্ট ভবনে হাজির হন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব তাকে নিজ ভবনের দরজায় সাদর সম্ভাষণ জানান। সম্ভাষণ পর্বের পর পরই ভাসানী নামাজ পড়ার জন্য জায়নামাজ চাইলেন। তাকে নামাজ পড়ার জন্য ব্যবস্থা করে দেয়া হলো। তাঁর নামাজ দীর্ঘ এক ঘণ্টা ধরে চলল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেন। পরে তাদের মধ্যে আলোচনা হলো। বৈঠক শেষে সঙ্গীদের একজন মওলানাকে প্রশ্ন করলেন, হুজুর আপনি এত দীর্ঘ নামাজ পড়লেন কেন? প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের সময় মেনে চলার রেওয়াজ আছে। হাসিমুখে মওলানা ভাসানী জবাব দিলেন, নামাজের জন্য সময় কি বাঁধা থাকতে পারে। কত দোয়া-দুরুদ পড়তে হয়। আসলে আমি বুঝতে চেয়েছি আমার সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে আইয়ুব কতটা সিরিয়াস। সেই বৈঠকে তিনি রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। আরো তুলে ধরেছিলেন, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের দাবি-দাওয়ার কথা। মওলানা সাহেবের প্রথম দাবি ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর বন্ধু সীমান্ত গান্ধী আবদুল গফফার খানের মুক্তি। আইয়ুব কিছুতেই এ মানুষটির মুক্তিতে রাজি ছিলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে গফফার খান ছিলেন পাকিস্তানের শত্রু। এমন মানুষকে কিছুতেই মুক্ত হয়ে রাজনীতি করতে দেয়া যায় না। কিন্তু মওলানা ছিলেন অনড়। আইয়ুব বললেন, মওলানা সাহেব, আমি পূর্ব পাকিস্তানের সব কমিউনিস্টকে জেল থেকে ছেড়ে দেব এবং যাদের ওপর হুলিয়া আছে সেগুলো প্রত্যাহার করে নেব। কিন্তু মওলানা নাছোড়বান্দা, শেষ পর্যন্ত গফফার খানকে মুক্তি দেয়ার কথা দিলেন আইয়ুব। গফফার খান মুক্তিলাভের কয়েক মাস পর আবার কারারুদ্ধ হন। কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে আইয়ুবের কথা ছিল, রাষ্ট্রের পক্ষে এসব দাবি মেনে নেয়া সম্ভব নয়। বরং আপনিই বলুন, আমি কীভাবে এসব দাবি পূরণ করব। মওলানার জবাব ছিল, আমি জানি না কীভাবে এসব দাবি পূরণ করতে হয়। আমি একজন এজিটেটর, দাবি কীভাবে পূরণ করতে হয় সেটা আপনার বিষয়। আইয়ুব খানের সঙ্গে মওলানা ভাসানীর এ বৈঠক নিয়ে অনেক বিরূপ সমালোচনা হয়েছিল। সমালোচনা যাই হোক না কেন, তিনি আইয়ুবের সঙ্গে সাক্ষাতে জনগণের কথাই বলেছিলেন।

বন্দিমুক্তির প্রশ্নে মওলানা ভাসানীর বলিষ্ঠ ভূমিকা দেখা গেছে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়। সে সময় বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বিচারের মুখোমুখি। তিনি দুজন সাংবাদিকের মাধ্যমে মওলানা ভাসানীর কাছে খবর পাঠিয়েছিলেন, তাদের মুক্তির দাবিতে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলতে। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জনসভা ছিল। তার আগের দিন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি রক্ষীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। সার্জেন্ট জহুরুল হকের মরদেহ জানাজার জন্য পল্টন ময়দানে নিয়ে আসা হয়েছিল। জানাজা শেষে মওলানা বক্তৃতা শুরু করলেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল আগুন ঝরানো। তিনি বললেন, আমরা শেখ মুজিবকে বাস্তিল দুর্গের মতো ক্যান্টনমেন্ট ভেঙে মুক্ত করে আনব। বক্তৃতায় ফরাসি বিপ্লবের সময় বাস্তিল দুর্গের পতনের কথা তাঁর গভীর ইতিহাস বোধেরই পরিচায়ক। বড় মাপের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও মওলানা ভাসানী বিশ্ব ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ টেনে বক্তৃতা করতেন। ইতিহাসের প্রসঙ্গ এমনভাবে তুলে ধরতেন যে, উপস্থিত জনগণের জন্য সেগুলোর তাত্পর্য অনুধাবনে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হতো না।

উল্লেখ্য, পল্টনের এ জনসভার সভামঞ্চে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা শেষ না হতেই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অগ্নস্ফুিলিঙ্গ দেখা গেল। আগরতলা মামলার প্রধান বিচারক বিচারপতি এস এ রহমান বাংলা একাডেমির পাশে অবস্থিত ঔপনিবেশিক ধাঁচে নির্মিত একটি ভবনে বসবাস করতেন। বিচারপতি রহমান পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে এক কাপড়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে চলে যান এবং সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তান। এ রকম বক্তৃতাকে বলে আগুন ঝরানো বক্তৃতা। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতার কণ্ঠ ও ভাষা ছিল অগ্নিপ্রবাহের মতো। সেকালের খুব কম নেতাই মানুষকে এভাবে উদ্বেলিত ও উদ্দীপ্ত করতে পারত।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিপক্ষ দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলো কঠোর সমালোচনার সুরে বলত, মওলানা জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর রাজনীতি ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনামে মওলানা ভাসানী সম্পর্কে নিন্দাসূচক এসব বক্তব্য স্থান পেত। ১৯৬৯-এর আন্দোলনের এক পর্যায়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান সফর করেন। সেখানে বিভিন্ন শহরে বিশাল সব জনসমাবেশে অত্যন্ত জ্বালাময়ী ভাষায় তিনি বক্তব্য রাখেন। মওলানা ভাসানী অত্যন্ত চমত্কার উর্দু বলতে পারতেন। তাই তাঁর পক্ষে জনগণের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া ছিল খুবই সহজ। এ সফরের সময় তিনি করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বক্তব্য রাখেন। সংবাদ সম্মেলনে যাওয়ার আগে তাঁর দলের নেতারা তাকে সাবধান করার জন্য জানান যে, সাংবাদিকরা তাকে বিব্রতকর প্রশ্ন করবে। কিন্তু মওলানা ছিলেন নির্বিকার। তিনি জানতেন তাঁর প্রত্যুত্পন্নমতিতার কাছে সাংবাদিকরা হার মানবে। তাঁর বক্তব্য দেয়ার পর শুরু হলো সাংবাদিকদের প্রশ্নের পালা। সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করল মওলানা আপনি কেন বারবার জ্বালাও-পোড়াওয়ের কথা বলছেন। এর জবাবে মওলানা ভাসানী বললেন, এসব তো আমার কথা নয়। এসব কথা তো বলেছেন আমার এবং আপনাদের প্রিয় কবি ইকবাল। তারপর পরই তিনি ইকবালের সেই বিখ্যাত কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুরু করলেন। বললেন ইকবালই তো বলেছেন, ‘যে ক্ষেতের ফসল পায় না খেতে কৃষাণ, সে ক্ষেতে আগুন জ্বালিয়ে দাও, আগুন জ্বালিয়ে দাও।’ অবাক বিস্ময়ে মওলানা ভাসানীর সহকর্মীরা লক্ষ করলেন, সম্মেলন কক্ষজুড়ে উপস্থিত সব সাংবাদিকই তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ইকবালের কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুরু করেছে। মওলানা ভাসানীর বড় ধরনের কোনো ডিগ্রি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। এ ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, অনেক প্রাজ্ঞ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তারা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভূতপূর্ব স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম। মওলানা ভাসানী ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মওলানা ভাসানী ঢাকায় ফিরলেন ১৯৬৯-এর ২৪ মার্চ। তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেয়া হলো। হাজার হাজার ছাত্র-শ্রমিক-কর্মী লাল পতাকা হাতে মওলানা ভাসানীকে বহন করে নিয়ে যাওয়া ট্রাকটিকে অনুসরণ করল। সেই ট্রাকে আরো ছিলেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তোয়াহা, রাশেদ খান মেনন, আমি নিজে এবং আমার সহোদর মাহফুজ উল্লাহ। মিছিল শেষে তিনি ন্যাপের কোষাধ্যক্ষ মরহুম সাইদুল হাসানের বাসায় উঠলেন। ঢাকায় মওলানা ভাসানীর কোনো বাড়িঘর ছিল না। সম্ভবত তিনিই ছিলেন একমাত্র জাতীয় নেতা, যার রাজধানী শহরে কোনো প্লট বা বাসস্থান ছিল না। রাত ৮টার দিকে আমিসহ বেশকিছু ছাত্র-কর্মী তাঁর শোয়ার ঘরের মেঝেতে বসে তাঁর পশ্চিম পাকিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা শুনছিলাম। সেই আসরে আরো উপস্থিত ছিলেন সদ্য কারামুক্ত কমিউনিস্ট নেতা সমর সিংহ। মওলানা বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। সবার মুখে একই স্লোগান— ‘সোস্যালিজম আবেই আবে’, অর্থাত্ ‘সমাজতন্ত্র আসবেই আসবে’। পশ্চিম পাকিস্তানের সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে এ স্লোগান ছিল খুবই স্বাভাবিক। পশ্চিম পাকিস্তানের একদিকে বড় বড় পুঁজিপতি ও জমিদার এবং অন্যদিকে ছিল কৃষাণ ও শ্রমিক। সেখানে শ্রেণী-দ্বন্দ্বই ছিল মুখ্য। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন রকম। এখানে জাতীয় দ্বন্দ্ব ও জাতীয় মুক্তির চেতনা প্রখর থেকে প্রখরতর হয়ে উঠেছিল। তাঁর পাশাপাশি শ্রেণী-চেতনার স্লোগান উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল, তখন স্বাধীনতা ও মুক্তির স্লোগানের পাশাপাশি স্লোগান উঠত— কেউ খাবে, কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। মালিক খাবে, শ্রমিক খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। জোতদার খাবে, কৃষক খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। বৈঠকি আসরে অশিতিপর বৃদ্ধ মওলানা ছিলেন মধ্যমণি। তাঁর হিউমার ও কথা বলার ঢঙ ছিল খুবই আকর্ষণীয়। এক পর্যায়ে মওলানা ভাসানী আমাকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন রাখলেন, মহবুব, (তিনি আমাকে মহবুব বলতেন),  মার্শাল ল’ হলে কী করবা। আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, হুজুর মার্শাল ল’ হবে নাকি। ঠিক তখনই কমিউনিস্ট নেতা সমর সিংহ বললেন, এ রকম বিশাল গণঅভ্যুত্থানের মুখে মার্শাল ল’ হওয়া সম্ভব নয়। হলে সে মার্শাল ল’ জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে। মওলানা ভাসানী মুচকি হেসে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বললেন, তোমরা কমিউনিস্টরা পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে চিনলা না। কমরেড সমর সিংহ চুপ করে গেলেন। কমিউনিস্টরা তাদের রাজনৈতিক প্র্যাকটিসে রাষ্ট্রতত্ত্বের বহু ব্যবহার করে। রাষ্ট্রতত্ত্বের ওপর লেনিনের বিখ্যাত গ্রন্থটি হচ্ছে ‘The State and Revolution’। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত বামপন্থী অ্যাকটিভিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী তারেক আলী তাঁর ‘Pakistan: Military Rule or People’s Power’  গ্রন্থে মওলানা ভাসানীকে তাত্ত্বিকতাবর্জিত বা Atheoretical নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৯৬৯-এর আন্দোলনের সময় তারেক আলী মওলানা ভাসানীর সঙ্গী হয়ে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরেছেন। মওলানাকে তিনি খুবই শ্রদ্ধা করতেন, তত্সত্ত্বেও মওলানা ভাসানী মার্ক্স-লেনিন খুব একটা পড়েননি বলে মন্তব্য করেছিলেন। একজন মজলুম জননেতা হিসেবে মওলানা তাঁর রাজনীতিতে মার্ক্স-লেনিনের দর্শনের মূল নির্যাস গ্রহণ করেছিলেন। তাই যদি না হতো তাহলে তিনি কীভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র-চরিত্র সম্পর্কে এ রকম গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মন্তব্য করতে পেরেছিলেন। মওলানা ভাসানী যখন আমাদের সঙ্গে এ রকম বৈঠকি আলাপ করছিলেন, ঠিক তার পরদিনই জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মওলানা ভাসানী যখন ব্রিটেনে নির্বাসনে ছিলেন, তখন ব্রিটেনের বামপন্থী ছাত্র মজলিসের পক্ষ থেকে মওলানা ভাসানীকে মার্ক্স-লেনিন তত্ত্বের পাঠ দেয়ার চেষ্টা হয়। ফিরোজা মুখার্জি নামে এক ভারতীয় কমিউনিস্ট নারী মওলানা ভাসানীকে বেশ কিছুদিন মার্ক্স-লেনিনের তত্ত্ব বোঝানোর প্রয়াস নেন। মওলানা ভাসানী ফিরোজা মুখার্জির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনতেন, কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেননি। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ জনগণের ভাষায় কথা বলেছেন। জনগণের ভাষায় কথা বলার কাজটি খুব সহজ নয়। মার্কিন সাংবাদিক আনা লুই স্ট্রং তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, পৃথিবীর তিনজন নেতা জনগণের ভাষায় কথা বলতে খুবই পারঙ্গম। এরা হলেন, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, ইন্দোনেশিয়ার ডি এন আইবিত ও চীনের মাও সে তুং। জনগণের ভাষায় কথা বলার সামর্থ্য রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি অতি অপরিহার্য গুণ। যারা জনগণের ভাষায় কথা বলতে পারেন, তারা খুব সহজেই জনগণের হূদয়ে ঠাঁই করে নিতে পারেন।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন মওলানা ভাসানী। অনেকেই জানে না যে, ১৯৬৮ সালে ঘেরাও আন্দোলনের সূচনা করে মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক স্থবিরতার বরফ গলাতে শুরু করেন। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় অত্যন্ত সফল হরতাল কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে মওলানা ভাসানী প্রমাণ করলেন, আইয়ুব খান যেভাবে দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে দেশে কবরের নীরবতা সৃষ্টি করেছেন, সেই নীরবতা ভেঙে দেয়া সম্ভব। যে সময় কমিউনিস্ট নেতারাও মনে করতেন হরতাল সফল হবে না, কিন্তু মওলানা ভাসানী মাত্র একদিনের ডাকে রাজধানীতে অত্যন্ত সফল হরতাল পালন করেন। জনগণের নাড়ির স্পন্দন বোঝা নেতৃত্বের গুণ। মওলানা ভাসানী গভীরভাবে বুঝতেন জনগণ কী ভাবছে, কী চাইছে, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মনোজাগতিক পটভূমি মওলানা ভাসানী তৈরি করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সর্বপ্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনে
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি অংশগ্রহণ করবে না। এ সিদ্ধান্ত অন্য দলগুলোকে মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন বর্জনের পথে চলতে বাধ্য করে এবং একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি রচনা করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে লৌহমানব আইয়ুব খান বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। এক সামরিক শাসকের বিদায়ের পর অন্য সামরিক শাসকের ক্ষমতায় আরোহণ পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকেই পরস্ফুিটিত করেছিল।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেমে গেলেও সামরিক শাসন জারির মধ্য দিয়ে মওলানা ভাসানী সংগ্রামের নতুন কৌশল গ্রহণ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, দেশের বিশাল কৃষক শ্রেণীকে জাতীয় আন্দোলনের মঞ্চে নিয়ে আসা। তিনি কৃষক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সামরিক শাসনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই তিনি পাবনার শাহপুরে কৃষক স্বেচ্ছাসেবক সম্মেলনের আহ্বান জানান। সামরিক শাসনের বিধি-নিষেধ মনে রেখে সম্মেলনের মাঠটিকে ঘেরাও করে দেয়া হলো। মাথার উপরে সব কাপড়ের ছাউনি। সম্মেলনে অনেক সাহসী স্লোগান উঠেছিল। সরকার সম্মেলন পর্যবেক্ষণের জন্য আকাশে হেলিকপ্টারের মহড়ার আয়োজন করে। পরবর্তীকালে একই ধরনের সমাবেশ হয়েছে মহীপুর ও টাঙ্গাইলে। মওলানা কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রত্যেককে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে নাম লেখাতে বললেন। আরো বললেন, কৃষক স্বেচ্ছাসেবকরা মাথায় লাল টুপি পরবে। যে টুপিতে কৃষকের প্রতীক লাঙল খচিত থাকবে। তিনি বললেন, প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবককে নিজের কান পর্যন্ত উঁচু সুন্নতি লাঠি রাখতে হবে। প্রয়োজনে এ লাঠি জোতদার, মহাজন ও ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে হবে। কৃষক স্বেচ্ছাসেবকরা লাল টুপি বাহিনী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল। শাহপুরের পরবর্তী সম্মেলনগুলো লাল টুপি সম্মেলন বলে আখ্যায়িত হলো। লাল টুপি বাহিনী গঠন গ্রাম-গ্রামান্তরে কৃষকদের মধ্যে অভূতপূর্ব জাগরণের সৃষ্টি করেছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, তিনি সুন্নতি লাঠির কথা বলেছিলেন। আসলে তিনি কৃষকদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে শ্রেণী-চেতনার সঙ্গে সমন্বিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সারা পূর্ব পাকিস্তানে ১০ লাখ কৃষক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠিত করা। আজকের মতো সেই সময় রাজনীতিতে প্রচুর অর্থের ব্যবহার ছিল না। একটি টুপি তৈরি করতে তখন ব্যয় হতো ২৫ পয়সা। এক হাজার স্বেচ্ছাসেবককে টুপি দেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল ২৫০ টাকার। অনেক সময়ই এই টাকা জোগাড় করতে না পেরে বহু উত্সাহী স্বেচ্ছাসেবককে টুপি দিতে পারিনি। যারা স্বেচ্ছাসেবক হতে আগ্রহী অথচ টুপি পায়নি, তাদের দুঃখ-বেদনার অন্ত ছিল না। অনেকে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। কৃষকরা বুঝতে পেরেছিল বহুকাল পর তাদের নিজস্ব শক্তি অর্জনের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠিত করার কাজে মওলানা ভাসানীকে সহযোগিতা করেছিলেন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মীরা। এদের মধ্যে কমরেড আব্দুল মতিন ও আলাউদ্দিনের নাম উল্লেখযোগ্য। তারা তখন পার্টিকে কৃষকদের মধ্যে নিয়ে যেতে স্বেচ্ছাসেবক গঠনের সুযোগটিকে ব্যবহার করেছিলেন। গ্রামে গ্রামে সন্ধ্যার পর বাড়ির উঠানে কৃষকদের নিয়ে বৈঠক হতো। সেসব বৈঠকে কৃষক নেতারা একদিকে যেমন বলতেন কীভাবে কৃষকরা শোষিত-বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে তারা বলতেন, তারা পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে চান। কৃষক স্বেচ্ছাসেবক গঠনের উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছিল উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোয়। দেশের অন্য জেলাতেও ব্যাপকভাবে না হলেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বহু স্বেচ্ছাসেবক ইউনিট গঠিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় এসব কমিউনিস্ট কর্মী চারু মজুমদারের তত্ত্বের প্রভাবে এক পর্যায়ে গণসংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে বসে। ফলে স্বেচ্ছাসেবক গঠনের তত্পরতা ১৯৭০-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের দিকে থেমে যায়। কারণ কমিউনিস্ট কর্মীদের সহযোগিতা ছাড়া মওলানা ভাসানীর একার পক্ষে স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন গড়ে তোলা ও তা বিস্তার করা সম্ভব ছিল না। অন্য নেতারা এতটা কষ্ট করে গরিব মানুষকে নিয়ে সংগঠন করতে প্রস্তুত ছিলেন না। আমি নিজে ৯০টি গ্রামে গ্রাম বৈঠক করেছিলাম। ওই সময় আমার ওপর গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। সে সময় মওলানা ভাসানীর নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশে ১০ লাখ কৃষক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠিত করা গেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ভিন্ন চরিত্র ধারণ করতে পারত। চীন ও ভিয়েতনামে যেভাবে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে কৃষকরা অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, বাংলাদেশেও তা হতে পারত। এ কথা সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধে কৃষক-শ্রমিকরা ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু তাতে কৃষক-শ্রমিকের মুক্তির প্রশ্নটি যথাযথভাবে সংশ্লেষিত করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে যেসব কমিউনিস্ট নেতা প্রথম দিকে কৃষক স্বেচ্ছাসেবক গঠনে উদ্যোগী হয়েছিলেন, তারা শ্রেণী-শত্রু খতমের তত্ত্বে বিভ্রান্ত হয়ে মারাত্মক ভুল করে বসে। তাদের এই ভ্রান্তির খেসারত আজো তাদের দিতে হচ্ছে।

মওলানা ভাসানী ছিলেন বাংলার কৃষক সংগ্রামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের শেষ প্রতিনিধি। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচের বেড়াজালে জড়িয়ে না পড়ে কী করে কৃষকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের আলোকে তাদের শ্রেণী-চেতনাকে প্রখর করা যায়, সে কথাই ভেবেছেন মওলানা ভাসানী। তিনি শ্রেণী-ঘৃণার কথাও বলতেন, তিনি যখন প্রথম কৃষক সমিতি গঠন করেন, তখন তাঁর বক্তব্যে নবী-রাসুলদের কথা স্থান পেত। তাঁর মতে, আমাদের নবী-রাসুলরা গরিব মানুষের মুক্তির কথাই ভেবেছেন। তিনি বিশেষ করে হযরত মূসা (আ.) দৃষ্টান্ত দিয়ে বলতেন, হযরত মূসা (আ.) ছিলেন মেষ পালকদের নেতা। ফেরাউনের মিসরে মেষ পালকরা ছিল শোষিত শ্রেণী। শোষণের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কাহিনী ও উপাখ্যান থেকে যেসব দৃষ্টান্ত মওলানা ভাসানী তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করতেন, কৃষকরা সেসব খুব সহজেই উপলদ্ধি করত এবং তাদের হূদয়ের কথা বলে মনে করত। তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে কৃষকদের জাগ্রত করার এ কৌশলটি মোক্ষম কৌশল হিসেবে কাজ করেছে। প্রতিক্রিয়াশীলরা তখন প্রচার করত বামপন্থীরা আল্লাহ-খোদা মানে না। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারের মুখে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা কৃষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি নিরসনে বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছিল।

মওলানা ভাসানী কী করে এ রকম একজন গণমানুষের নেতা হয়ে উঠলেন, তা বুঝতে হলে তাঁর শৈশব এবং তাঁর বড় হয়ে ওঠার ব্যাপারটি বুঝতে হবে। মওলানা ভাসানীর জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতে, আনুমানিক ১৮৮৫ সালে সিরাজগঞ্জ শহরের অদূরে ধানগড়া গ্রামে। শৈশবে তাঁর নাম ছিল চেঙ্গা মিয়া। এ নাম থেকেই বোঝা যায় তাঁর পরিবারের শ্রেণীগত পরিচয়। তাঁর পিতা হাজী শরাফত আলী মোটামুটি সচ্ছল ও ইজ্জতবান মানুষ ছিলেন। অল্প বয়সেই তিনি হজব্রত পালন করেছিলেন। এ থেকে মওলানা ভাসানীর পারিবারিক সচ্ছলতার বিষয়টি বোঝা যায়। শৈশবের যে স্মৃতি তাকে আলোড়িত করেছিল সেটি হলো, দুর্ভিক্ষ। তাঁর বয়স যখন ১০ কিংবা ১২ তখন যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে দুই টাকা, আড়াই টাকা মণ চাল চার টাকা হয়ে গিয়েছিল। তাঁর ভাষায়, মানুষ জোয়ার বাজরা খেয়েও বাঁচতে পারেনি। মহামারীতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু তাকে যত না নাড়া দিয়েছে, তাঁর চেয়ে অনেক বেশি করে নাড়া দিয়েছে দুর্ভিক্ষে সাধারণ মানুষের মৃত্যু ও কষ্ট। ১০-১২ বছর বয়সে যে মানুষটির এ রকম অনুভূতি, পরিণত বয়সে তিনি বিদ্রোহী ভাসানী না হয়ে পারেন কি? মওলানা ভাসানীর কৈশোর সম্পর্কে ভাসানী গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘মায়ের মৃত্যুর দু-এক বছরের মধ্যে তিনি তাঁর চাচার গৃহে আশ্রয় থেকে অব্যাহতি নেন। গৃহ ত্যাগের পরবর্তী তাঁর সেই দিনগুলো ছিল অত্যন্ত করুণ। শৈশবের সেই ছন্ন ছাড়া জীবন, গ্রাম-গ্রামান্তর তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। অনাহারে কেটেছে বহুদিন। আশ্রয় নিয়েছেন অজানা-অচেনা অসংখ্য মানুষের গৃহে। যমুনা নদীতে জেলে নৌকায় কেটেছে তাঁর কত দিন কত রাত। মাছ ধরেছেন জেলেদের সঙ্গে। মাঠে-ঘাটে ক্ষেত-খামারে কাজ করেছেন কৃষকের সঙ্গে।’ এভাবেই মওলানা ভাসানী সাধারণ মানুষকে চিনতে পেরেছিলেন, হয়েছেন তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার, একাত্ম হয়েছেন তাদের সঙ্গে। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের এই পটভূমি তাকে পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানী করে তুলেছিল।

উনিশ শতকের শেষ দিকে অথবা বিশ শতকের প্রথম দিকে ইরাক থেকে ভারতে আসা আধ্যাত্মিক পুরুষ সৈয়দ নাসির উদ্দিন বোগদাদির সাহচর্যে আসেন তিনি। মওলানা ভাসানী এ আধ্যাত্মিক পুরুষটির সেবায় নিয়োজিত হন। সাধক নাসির উদ্দিন বোগদাদি এই তরুণকে প্রচণ্ড স্নেহ করতেন। পাঠশালায় মওলানা ভাসানী বাংলা শিখেছিলেন। নাসির উদ্দিন বোগদাদির সংস্পর্শে এসে শিখলেন আরবি ও উদু এবং ইসলামী ধর্ম শাস্ত্র  সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানও অর্জন করেন। মওলানা ভাসানীর ভালো নাম ছিল আব্দুল হামিদ খান। আব্দুল হামিদের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে নাসির উদ্দিন বোগদাদি তাকে পাঠালেন দেওবন্দে, শায়খুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসানের কাছে। ১৯০৭ থেকে ১৯০৯ পর্যন্ত আব্দুল হামিদ দেওবন্দে ছিলেন। সেখানে মওলানা হোসেন আহমদ মাদানির কাছে তিনি কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। দেওবন্দ তখনো ভারতের অন্যতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র। ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র হলেও দেওবন্দ ছিল প্রগতিশীল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আদর্শবাদের পীঠস্থান। যে আব্দুল হামিদ দুর্ভিক্ষকে জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হিসেবে মনে রেখেছেন এবং যিনি দেওবন্দের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনার আলোকে আলোকিত হয়েছেন, পরিণত বয়সে তিনি আমাদের সবার চেনা মওলানা ভাসানীতে পরিণত হন।

মওলানা ভাসানীর বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন একটি প্রবন্ধের পরিসরে বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃৃত। তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ১৯১৭ সালে। সে সময় তিনি ছিলেন চিত্ত রঞ্জন দাসের জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক। চিত্ত রঞ্জন দাসের সাহচার্যে এসে তিনি তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেন। চিত্ত রঞ্জন দাসের ভক্ত থাকা অবস্থায় ১৯১৯ সালে মওলানা মোহাম্মদ আলীর প্রেরণায় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। মওলানা ভাসানী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পর্যায়ে যেসব রাজনৈতিক সভা করতেন, সেসব সভায় বহুবার তিনি মওলানা মোহাম্মদ আলী, শওকত আলী, আল্লামা আজাদ সোবহান, মওলানা হাসরত
লোহানী ও মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্নির কথা স্মরণ করতেন। তারা সবাই ছিলেন ইসলামী সাম্য-মৈত্রীর এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় উজ্জীবিত। কতবার তাঁর মুখ থেকে শুনেছি ভারতের প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাবক মওলানা হাসরত লোহানীর নাম— এসব মওলানাকে কেউ প্রতিক্রিয়াশীল কিংবা পশ্চাত্পদতার ধারক ও বাহক বলবেন এমনটি ভাবা যায় না।

১৯১৭ সালে কংগ্রেসের ৩৩তম অধিবেশনে মওলানা ভাসানী দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন। সেই সম্মেলনে তিনি সর্বভারতীয় নামজাদা নেতাদের দেখতে পান এবং তাদের বক্তব্য শোনেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মোহন দাস মরণ চাঁদ গান্ধী, চিত্র রঞ্জন, মোহম্মদ আলী, শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, বাল গঙ্গাধর তিলক, হাসান ইমাম, হাতেম আজমল খাঁ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ। এসব নেতার বক্তব্য নিজ কানে শোনার ফলে মওলানা ভাসানী জাতীয় আন্দোলনের গর্জন অনুভব করেন। তার আগ পর্যন্ত দরিদ্র কৃষকদের ওপর জমিদার ও মহাজনদের শোষণ ও অত্যাচার প্রতিরোধে তিনি বেশি সময় ব্যয় করেন। ১৯১৯ সালেই ভাসানী কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্য হন এবং কারাবরণ করেন। ১৯২১ সালে চিত্ত রঞ্জন দাসের নেতৃত্বে বাংলায় যে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছিল, ভাসানী তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯২২ সালে গান্ধী ও চিত্ত রঞ্জন দাসের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে চিত্ত রঞ্জন দাস স্বরাজ্য দল গঠন করেন। ওই সময় ভাসানী যুগপত্ উত্তর বাংলা কংগ্রেস ও স্বরাজ্য দলের হয়ে কাজ করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সে সময় অনেকেই যুগপত্ একাধিক দলের হয়ে কাজ করেছেন, যা আজকের দিনের সংঘাতময় রাজনীতিতে কল্পনাই করা যায় না। উত্তরবঙ্গে জমিদার মহাজনবিরোধী সংগ্রামের জন্য ভাসানী তাদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। ভাসানীকে পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করে আসামে চলে যেতে হয়। ১৯২৪ সালে আসামের ধুবরী জেলার ভাসানচরে অভিবাসিত বাঙলি কৃষকদের নিয়ে এক বিশাল সম্মেলন করেন। সেই থেকে তিনি ভাসানীর মওলানা হিসেবে পরিচিত হন। ১৯২৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত খিলাফত সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন ভাসানী। আসাম পর্যায়ে মওলানা ভাসানী লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলনের জন্য খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। আসাম সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী একটি ভৌগোলিক লাইন অতিক্রম করে বাঙালি কৃষকদের অভিবাসন স্থাপন করা নিষিদ্ধ হয়েছিল। মওলানা এই লাইন প্রথারই বিরোধিতা করেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মওলানা ভাসানীর কাছে শুনেছি, আসামের যতটুকু সমৃদ্ধি ও উন্নতি হয়েছে সেটি বাঙালি কৃষকদের অদম্য সাহসের ফলেই সম্ভব হয়েছে। বাংলা থেকে যাওয়া গরিব কৃষকরা আসামের বন-জঙ্গল সাফ করে সেখানকার জমিকে আবাদযোগ্য করেছেন। সেই মানুষগুলো ভেদ-বৈষম্যের শিকার হবে মওলানা তা কিছুতেই মানতে পারেননি। ব্রিটিশ সরকার মওলানাকে বাংলা থেকে আসামে চলে যেতে বাধ্য করেছিল। বাংলার স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মওলানার জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল একাধিকবার। সন্তোষের মহারাজার সঙ্গে তাঁর বিরোধ হয়েছিল। মওলানা ভাসানী প্রাচীন নথিপত্র ঘেঁটে জানতে পারেন যে, খোশনোধপুরের (সন্তোষ) জমিদারের প্রকৃত মালিক মনমতো রায় চৌধুরী নন— প্রকৃত মালিক ছিলেন সুফি ধর্ম প্রচারক হযরত শাহ জামান। সন্তোষের জমিদার আত্মসাত্ করে সেখানকার জমি করায়ত্ত করেছিলেন। মওলানা ভাসানী এর প্রতিবাদ করেন। এছাড়া ঈদের সময় গরু কোরবানি করা নিয়ে মহারাজার সঙ্গে তাঁর সরাসরি বিরোধ সৃষ্টি হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নাম করে জেলা প্রশাসক টাঙ্গাইল মহকুমা তথা ময়মনসিংহ জেলা থেকে মওলানা ভাসানীকে বহিষ্কার করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মওলানা ভাসানী অনেকগুলো কৃষক সমাবেশ করেছেন। এসব সমাবেশের মধ্য দিয়ে কৃষক চেতনা শানিত হয়েছে। কৃষকরা উপলব্ধি করেছেন তারা একা নন। কৃষকদের ব্যক্তিতান্ত্রিক খণ্ডিত বিচ্ছিন্ন জীবনে সামষ্টিক চেতনা এভাবেই বাংলা ও আসামে সৃষ্টি হয়েছিল। তিরিশের দশকে আসামে অনেকগুলো আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। এ সময় ভাসানী মূলত কৃষকদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। এ পর্যায়ে তিনি মুসলিম লীগ সংগঠনের কাজে নেমে পড়েন। ১৯৩৭-এর নির্বাচনে মওলানা ভাসানী দক্ষিণ হুগলি থেকে মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন। আসাম লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ভাসানীই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি বাংলায় বক্তৃতা করতেন। অসমীয় সদস্যরা তাদের মাতৃভাষা বাংলা পরিত্যাগ করে ইংরেজিতে ভাষণ দিতেন। সংসদে প্রশ্নোত্তরকালে ইংরেজি জবাবের প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, আমি বাংলায় উত্তর চাই। ১৯৪৪-এর ৭-৮ এপ্রিল ভাসানীর সভাপতিত্বে বরপেটায় আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান আন্দোলনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তিনি এ অধিবেশনের আয়োজন করেছিলেন। সম্মেলনের প্রাক্কালে মওলানা ভাসানী ‘নিবেদন’ শীর্ষক এক প্রচারপত্রে বলেন: ‘পাকিস্তান অর্জন ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে আমাদের অগ্রগতি অর্জন সম্ভব নয়। যেকোনো পন্থায়, আপনাদের জীবন ও ধন-সম্পদের বিনিময়ে হইলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।’ ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস উপলক্ষে ভাসানী একটি ইংরেজি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। এর শিরোনাম ছিল, Achieve Pakistan or Parish। সিলেট আসামের অন্তর্গত একটি জেলা ছিল। মওলানা ভাসানীর সক্রিয় প্রচারণার ফলে সিলেট রেফারেন্ডামে সিলেটবাসীরা পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয় এবং সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ঐতিহাসিক কারণে সিলেট আজ বাংলাদেশের অত্যন্ত মূল্যবান এলাকা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মওলানা ভাসানী বিভিন্ন জনসভায় বলতেন, বাংলাদেশ অসম্পূর্ণ। ১৪টি জেলা এখনো বাংলাদেশের বাইরে রয়ে গেছে। আসামে মওলানা ভাসানীর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অধ্যায় কেটে গিয়েছিল বলেই হয়তো মওলানা এই অসম্পূর্ণতা অনুভব করতেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বেই পূব পাকিস্তানে ব্যাপক গণভিত্তি নিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের নামে বিরোধী রাজনীতির সূত্রপাত। এ দলটি ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ নামে নতুন অসাম্প্রদায়িক পরিচিতি অর্জন করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা সব গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য প্রেরণার উত্স ছিল। বিরোধী রাজনীতির জন্ম দিয়ে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন বারবার। তিনি তাঁর অনেক বক্তৃতায় পাকিস্তানের একসময়কার প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বিরোধীদের প্রতি যে অসহিষ্ণু মন্তব্য করেছিলেন তা বারবার উল্লেখ করতেন। লিয়াকত আলী খান বিরোধীদের উদ্দেশে বলতেন, ‘শির উচাল দেঙ গে’ অর্থাত্ কল্লা কেটে ফেলব। মুসলিম লীগের অসহিষ্ণুতার ফলে মওলানা ভাসানী নিজ পথে চলতে শুরু করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তা মেনে নিতে পারেনি। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে জারি করা হয়েছিল ৯২ (ক) ধারার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন। ওই সময় মওলানা ভাসানী ছিলেন ব্রিটেনে নির্বাসিত। খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস তার লেখা ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ গ্রন্থটিতে ভাসানীর নির্বাসন পর্বের ওপর বিস্তারিত লিখেছেন। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ৯২ (ক) ধারার শাসন ব্যবস্থায় মেজর জেনারেল ইস্কান্দর মির্জ্জা হয়েছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর। মির্জ্জা সাহেব ঘোষণা করলেন, ভাসানী যদি দেশে ফেরেন তাহলে তাকে এমন সুদক্ষ বন্দুকচালককে দিয়ে গুলি করা হবে, যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়। পাকিস্তান পর্বের রাজনীতিতে মওলানা ভাসানী একদিকে যেমন কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের কথা বলতেন, অন্যদিকে তিনি গণতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সর্বদাই ছিলেন অত্যন্ত মুখর। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে মতান্তর ঘটে। ফলে তিনি আওয়ামী লীগের মধ্যকার বামপন্থী ও প্রগতিশীল এবং পশ্চিম পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনপন্থী নেতাদের নিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠনের সময়ও তাকে সরকারি দলের গুণ্ডামি ও সন্ত্রাসের মোকাবেলা করতে হয়েছে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ছিল। ১৯৫৪ সালে যে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল তা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পাকিস্তান জাতীয় সংসদে সরকার গঠনে নিয়ামক ভূমিকায় থাকত। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে তা সম্ভব হয়নি। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক আইন জারির মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের লৌহমানবে পরিণত হন। কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানকে আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টার ভূমিকা পালন করেন। জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে মওলানা ভাসানীকে বহুবার বলতে শুনেছি যে, তিনি ৩৩ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে সংখ্যা সাম্যনীতির বিরুদ্ধে জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে মওলানা ভাসানী ছিলেন সোচ্চার। এ দাবি পাকিস্তানের শাসকরা শেষ পর্যন্ত ১৯৭০-এর নির্বাচনে মেনে নিয়েছিল বলেই সারা পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হয়। ১৯৭০-এ দক্ষিণ বাংলায় প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মওলানা ভাসানী স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবি উত্থাপন করেন, সেদিনকার জনসভায় মওলানা ভাসানীর ভাষণটি ছিল অত্যন্ত হূদয়স্পর্শী। দক্ষিণ বাংলায় বিরান জনপদ সফরের পর ভাসানী বললেন, সেখানে একটি ঘুঘু পাখিও আমি দেখিনি। তিনি পাকিস্তানি শাসকদের চরম অবহেলার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ওরা কেউ আসেনি। কবি শামসুর রাহমান মওলানা ভাসানীর সেদিনকার ভাষণ শুনে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সফেদ পাঞ্জাবী’।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মওলানা ভাসানী ভারতে চলে যান। কিন্তু সেখানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য স্বাধীনতা ভোগ করেননি। তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, তা নিয়ে বিশাল ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছিল। সম্ভবত ভারত সরকার তাকে নজরবন্দি করেছিল এবং তাঁর চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায়ে তিনি প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক পরামর্শ সভায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি যেদিন দেশে ফিরলেন, তখনই ছুটে গিয়েছিলাম সন্তোষে তাকে দেখার জন্য। ভারতে তিনি কেমন ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, আমার বন্ধু জহরলালের মেয়ে ইন্দিরা আমার খুব সেবাযত্নের ব্যবস্থা করেছে। বারবার পীড়াপীড়ি করার পর তিনি বললেন, বুঝই তো আমরা ভিন্নপন্থী। সেভাবেই তারা আমাকে দেখেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকালে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্য তিনি অনেকগুলো তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন, সম্ভবত ভারত সরকারের সহযোগিতায়। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠানো মওলানা ভাসানীর চিঠিপত্র ও তারবার্তা ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশ ডকুমেন্টস গ্রন্থে ছাপা হয়েছে। উত্সাহী পাঠক সে বইটি দেখে নিতে পারেন।

বাংলাদেশ উত্তর-কালে মওলানা ভাসানী গণতান্ত্রিক অধিকার, ভুখা মানুষের খাদ্যের দাবি এবং বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীতির প্রতিবাদে বহু জনসভা, গণমিছিল এবং অনশন ব্রত পালন করেছিলেন। এজন্য তাকে সন্তোষে গৃহবন্দি হতে হয়েছিল। তাঁর প্রকাশিত সাপ্তাহিক হক কথার প্রকাশ তত্কালীন সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। অনেকে মনে করেন, এসব সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর হার্দিক সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক অবশ্য নতুন কিছু নয়। বাকশাল গঠনের পর প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান সন্তোষে গিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী নিজ হাতে তাকে খাবার পরিবেশন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বুকে মাথা রেখে বলেছিলেন, আমি তাঁর বুকেরই মানুষ। ১৯৭৬ সালে ফারাক্কা লংমার্চ করে মওলানা ভাসানী গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি এ ব্যাপারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী সেই চিঠির জবাবও দিয়েছিলেন। আজ মনে হয় মওলানা ভাসানীকে হারিয়ে আমরা একজন খুব বড় মাপের অভিভাবককে হারিয়েছি। আজ আমাদের জাতীয় জীবনে যত সংকট সেসব সংকটে মওলানা ভাসানীর মতো একজন অভিভাবকের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। এই মজলুম জননেতা ছিলেন একজন পিতৃতুল্য অভিভাবক নেতা।

 

লেখক: ৬৯-এর আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা; পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক; সাবেক অধ্যাপক, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়