১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছোট্ট একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদে। মাত্র দুই লাইনের সেই সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছিল:

“That is sub-rule (1) of rule 29, after the word ‘English’ in line 2, the words ‘or Bengali’ be inserted.”

খুবই নিরীহ একটি প্রস্তাব এবং কোনো আড়ম্বর ছাড়াই তা উত্থাপিত হয়েছিল। যাদের স্বার্থে এটা করা হয়েছিল, সেই পূর্ব বাংলাবাসীও এ প্রস্তাব সম্পর্কে আগে তেমন একটা অবহিত ছিলেন না। এমনকি দলীয়ভাবেও এটি উত্থাপিত হয়নি; ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্ব-উদ্যোগে, স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এটি উত্থাপন করেছিলেন। সেদিন সম্ভবত একমাত্র পাকিস্তানি শাসকবর্গ ছাড়া আর কেউই বুঝতে পারেননি এ প্রস্তাবের সুদূরপ্রসারী তাত্পর্য। দুদিন পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি, উক্ত সংশোধনী প্রস্তাবের সপক্ষে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বক্তব্য উপস্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পাকিস্তান গণপরিষদে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটায়। ক্ষুব্ধ প্রতিপক্ষের বাক্যবাণে ভয়ানকভাবে আক্রান্ত হন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। কংগ্রেস দলীয় সদস্যরা ছাড়া বাদ বাকি সবাই এ আক্রমণে শরিক হন। পাকিস্তান নামক সদ্যোজাত রাষ্ট্রটির তথাকথিত গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার স্বচ্ছ নেকাবটি খসে পড়ে। উন্মোচিত হয়ে পড়ে তার আসল চেহারা, যা আমরা একাত্তরে দেখেছি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংশোধনী প্রস্তাবটি সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে অগ্রাহ্য হলেও বস্তুত এর মধ্য দিয়েই রোপিত হয়ে গিয়েছিল আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার বীজ। মাত্র চার বছর পরে ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল বাঙালির প্রথম শহীদ মিনার। আর ৬৬ বছর পর আজ আমাদের ভাষা শহীদ দিবস সারা বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে। তার পিতা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার। তিনি ম্যাট্রিক ও আইএ পাস করেন যথাক্রমে কুমিল্লার নবীনগর স্কুল ও কুমিল্লা কলেজ থেকে। কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯০৮ সালে বিএ ও ১৯১০ সালে আইন পাস করেন। অল্প কিছুদিন সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন কুমিল্লার মুরাদনগর থানার বাঙ্গরা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে। এর পর ১৯১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি কুমিল্লা শহরে আইন ব্যবসা শুরু করেন। আমৃত্যু এ পেশার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বস্তুত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত ও স্বনির্মিত মানুষ। বাংলাদেশের একটি অখ্যাত গ্রামের খুবই সাধারণ পরিবারের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও অল্প সময়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তিনি নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্যায় অতিবাহিত হয়েছিল অবিভক্ত ভারতে এবং দ্বিতীয় ও শেষ পর্যায়টি পাকিস্তানে। প্রথম পর্যায়ে ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাম্প্রদায়িক স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন। বস্তুত তার রাজনৈতিক জীবনের পুরোটা সময়ই ছিল প্রবলভাবে প্রতিকূল। কিন্তু তিনি কখনই আপস করেননি। বরং সর্বত্রই তার ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ, বিশিষ্ট ও গৌরবোজ্জ্বল। এর জন্য উপর্যুপরি কারাবাস ছাড়াও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাকে এবং অবশ্যই তার পরিবারকেও। উল্লেখ্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মোট চারবার কারাবরণ করতে হয়েছিল।

করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। পরিষদে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিপক্ষে প্রধান বিরোধী দল ছিল পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস। অধিবেশনের প্রথম দিনই কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রথম প্রস্তাবটিতে বছরে অন্তত একবার পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন ঢাকায় অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি এ নিবন্ধের শুরুতে উল্লিখিত হয়েছে। উল্লেখ্য, গণপরিষদ পরিচালনা-সংক্রান্ত বিধির সংশোধনীতে বলা হয়েছিল, ‘কেবলমাত্র উর্দু অথবা ইংরেজিতেই কোনো সদস্য ভাষণ দিতে পারবেন এবং পরিষদের কার্যবিবরণী উর্দু অথবা ইংরেজিতেই পরিচালিত হবে।’ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তার উত্থাপিত সংশোধনী প্রস্তাবে উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার দাবি করেছিলেন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এ সংশোধনী প্রস্তাবটি ২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে আলোচনার জন্য গৃহীত হয়। প্রস্তাবের সমর্থনে তিনি যে দীর্ঘ যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য রাখেন, তার তাত্পর্য ছিল অসামান্য। ইংরেজিতে প্রদত্ত সেই ভাষণে যুক্তির পর যুক্তি দিয়ে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন,

‘... I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our state and therefore Bengali should not be treated as a provincial language. It should be treated as the language of the state.’

প্রসঙ্গত তিনি এও বলেন যে, পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। অতএব, বাংলা হচ্ছে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এ আপাত নিরীহ বক্তব্য সেদিন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক ধর্মরাষ্ট্রের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনসহ ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের অভাবনীয় প্রতিক্রিয়া থেকে তা সুস্পষ্ট। তারা এ প্রস্তাবের মধ্যে ‘পাকিস্তান ভাঙার বিপদ’ এবং ‘পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার’ আলামত দেখতে পান। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এ প্রস্তাবকে ‘পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস’ আখ্যায়িত করে বলেন,

As a matter of fact, when the notice of that amendment was given, I thought that the object was an innocent one... but I find now that the object is not such an innocent one as I thought it was.

পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছিল খাজা নাজিমুদ্দীনের এ বক্তব্যে— ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীরই এ মনোভাব যে, একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।’ ফলে কংগ্রেস দলীয় সদস্যদের সর্বাত্মক সমর্থন সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সংশোধনী প্রস্তাবটি অগ্রাহ্য হয়েছিল। তবে এর ফলে বাংলাভাষী মানুষের মনে যে বিপুল ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তা বিস্ফোরিত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একক প্রয়াস যে বৃথা যায়নি, তা অভ্রান্তরূপে প্রমাণ হয়েছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারির শোকাবহ ঘটনার পরও পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের ভেতরে ও বাইরে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমরের মন্তব্য স্মরণযোগ্য,

‘... শুধু ২১ শে ফেব্রুয়ারি নয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সমগ্র পর্যায়টিতে পরিষদের অভ্যন্তরে ধীরেন দত্ত বাংলা ভাষার সপক্ষে এবং ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর সরকারি নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তৃতা করেন। সেসময় মুসলিম লীগ সরকার কংগ্রেস পরিষদীয় দলের মধ্যে যাদের সবচেয়ে বেশি ভয় করত এবং যাদের প্রতি সব থেকে শত্রুভাবাপন্ন ছিল, তার মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন অন্যতম।’

গণসমিতির প্রার্থী হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচনে বিপুল ভোটে সদস্য নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য যে, ইতঃপূর্বে তার নেতৃত্বে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের একাংশের উদ্যোগে গণসমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী ছাড়াও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের পর মাত্র ৪৫ দিনের ব্যবধানে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পূর্ববঙ্গে গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করা হলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিদ্বেষমূলক আচরণের বিরুদ্ধে তিনি একটানা আড়াই ঘণ্টা বক্তৃতা করেন। পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনার জন্য গঠিত ‘ড্রাফটিং কমিটির’ সদস্য হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের নেতা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে ১৯৫৬ সারের ৯ সেপ্টেম্বর গঠিত মন্ত্রিসভায় তিনি জনস্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। শপথ গ্রহণের প্রাক্কালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতিক্রিয়া বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ:

‘...আমি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিলাম। বস্তুত যে কোনো দেশের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করা, বিশেষ করিয়া অনুন্নত দেশের, সন্ন্যাসব্রত ছাড়া অন্য কিছুই নহে। ফলে আকাঙ্ক্ষা না করিয়া কর্তব্য করিয়া যাইতে হইবে এই সংকল্প গ্রহণ করিলাম।’

দ্বিতীয় দফায় তিনি আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন ১৯৫৮ সালের ২৫ আগস্ট। মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মন্ত্রিত্বকালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভূমিকা ছিল দৃষ্টান্তমূলক ও অনুসরণযোগ্য।

ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইউব খানের সামরিক শাসনকালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একাধিকবার রাজনৈতিক নিগ্রহের শিকার হন। প্রথমে ‘ইলেকটিভ বডি ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার’ বা ‘এবডো’র আওতায় তাকে সব ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তিনি এর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রার্থী হলেও সম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়াটি একতরফা হওয়ার কারণে সুবিচার লাভে ব্যর্থ হন। বস্তুত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন সব ধরনের সামরিক ও স্বৈরশাসনের ঘোরবিরোধী। বলেছেনও অকপটে যে, ‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনগণের শাসন যেখানে আছে, তাহাই আমি বিশ্বাস করি ও সমর্থন করি।’

অব্যাহত দমন-পীড়ন সত্ত্বেও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দমে যাননি। বিচ্যুত হননি তার কর্তব্য থেকে। মনে রাখা আবশ্যক যে, তার বয়স তখন ৮০ অতিক্রম করেছে। কিন্তু তার কর্মক্ষমতা ও মনোবল ছিল অটুট। এ সময়ে দেশের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে খুবই আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। পাশাপাশি নিজের অক্ষমতা তাকে বিচলিত করে তুলেছিল। কলকাতা প্রবাসী জ্যেষ্ঠপুত্র সঞ্জীব দত্তকে লেখা চিঠিতে ছড়িয়ে আছে তার বহু প্রমাণ। নিচের উদ্ধৃতিটি লক্ষণীয়:

‘১৯৭০ ইং এই রাষ্ট্রের অত্যন্ত ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বত্সর— সেই রাজনীতি চিন্তা হইতে মুক্ত হইতে পারি নাই— মন যথেষ্ট চিন্তায় ভরপুর, তবু সক্রিয় অংশগ্রহণ করিতে পারিতেছি না, ইহা দুঃখময়।’

১৯৭১ সালের মার্চে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে আবারো দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পাক সেনাদের সশস্ত্র আক্রমণ শুরু হয়েছিল আগেই। পঁচিশে মার্চ ঢাকায় সংঘটিত হয় মানব ইতিহাসের ঘৃণ্যতম গণহত্যা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তখনো অবস্থান করছেন কুমিল্লায় তার নিজ বাড়িতে। আগরতলা খুব দূরে নয়। আত্মীয়, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাকে পুনঃপুনঃ অনুরোধ জানালেন দেশত্যাগ করার জন্য। কিন্তু তিনি অনড়। জানতেন, তাকে হত্যা করা হবে। বলেছেন, ‘আমার বাঁচার খুবই প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের জন্য, কিন্তু মনে হচ্ছে তার সম্ভাবনা নেই।’ কিন্তু কেন? ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত না বললেও আমরা জানি যে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর যে কারণে তিনি পাকিস্তান ছেড়ে যাননি, একই কারণে একাত্তরের মার্চে মৃত্যু অনিবার্য জেনেও দেশত্যাগে সম্মত হননি। বরং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তার সিদ্ধান্ত: ‘আমি দেশত্যাগ করব না, মরতে হয় জন্মভূমিতে মরব।’

একাত্তরের ২৯ মার্চ ভোররাতে পাকিস্তানি নর ঘাতকরা কনিষ্ঠপুত্র দিলীপ দত্তকেসহ এই অশীতিপর বৃদ্ধকে ধরে নিয়ে যায়। তার পর পিতা-পুত্রের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রত্যক্ষদর্শী ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের ক্ষৌরকার রমণী শীলের কাছ থেকে জানা গেছে যে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হত্যা করা হয় ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১— দীর্ঘ ২৩টি বছর। ২৩ বছর আগে পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের যুগান্তকারী ভূমিকা বাঙালিরা বিস্মৃত হলেও পাকিস্তানিরা কিন্তু ঠিকই মনে রেখেছিল। সেই আক্রোশই তারা চরিতার্থ করেছিল একাত্তরে।

[পুনর্মুদ্রণ]

 

লেখক: প্রাবন্ধিক