প্রথম আধুনিক বাঙালি মুসলিম নারী চিকিত্সক, বাংলার ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গল নামে খ্যাতিপ্রাপ্ত, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী, অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী (১৯১২-২০০৭) ভারতের মধ্য প্রদেশের রঞ্জনগাঁওয়ের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার গোপালপুর গ্রামে প্রখ্যাত কাজী পরিবারে। তার পিতা ডা. কাজী আবদুস সাত্তার একজন চিকিত্সক এবং উপমহাদেশীয় রাজনীতিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। কাজী আবদুস সাত্তার ১৮৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯৫ সালে মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল থেকে এলএমএফ এবং ১৯০৯ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি নিজে কোরআনের হাফেজ ছিলেন এবং চিকিত্সা দপ্তরের চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের পর চিকিত্সাসেবার পাশাপাশি মসজিদে ইমামতিও করেছেন। জোহরা কাজীর মাতা মোছা. আনজুমান উন নেসা ১৮৮৬ সালে পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার বিলবিলাস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ছিলেন তার খালাতো ভাই। আনজুমান উন নিসা সমাজসেবক ও রাজনীতি-ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি রায়পুর পৌরসভার মহিলা কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন।

একজন মেধাবী ছাত্রী হিসেবে জোহরা বেগম কাজী বাল্যকাল থেকেই প্রথম স্থান অধিকার করে সব পর্যায়ের সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি ১৯২৯ সালে আলীগড় মুসলিম মহিলা কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বাঙালি মুসলমান আলীগোড়িয়ান হিসেবে মেট্রিক পাস করেন। তিনি ১৯৩১ সালে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন দিল্লির হার্ডিঞ্জ মহিলা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৩৫ সালে প্রথম বিভাগে শীর্ষস্থান অধিকার করে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। এ বিরল মেধা কৃতিত্বের জন্য তিনি ব্রিটিশ-ভারতের ভাইস রয় টমাস ফ্রিম্যান (১৮৬৬-১৯৪১) কর্তৃক প্রদত্ত ভাইস রয় পদকে ভূষিত হন। তিনি দ্বিতীয় বাঙালি মুসলমান নারী, যিনি ১৯৫৫ সালে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব অবসটেরিসিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্ট থেকে ডিআরসিওজি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পর তিনি লন্ডন থেকে এফআরসিওজি এবং এমআরসিওজি স্বীকৃতি লাভ করেন। প্রসঙ্গত, এর আগে ১৯৫১ সালে তারই ছোট বোন শিরিন কাজী লন্ডন থেকে প্রথম বাঙালি মুসলমান নারী হিসেবে ডিআরসিওজি ডিগ্রি লাভ করেন।

জোহরা কাজীরা চার বোন ও দুই ভাই। তার বড় দুই বোন এবং ছোট এক ভাই বাল্যকালে অকাল মৃত্যুবরণ করেন। তার বড় ভাই কাজী আশরাফ মাহমুদ ছিলেন একজন হিন্দি ‘কবি’। তিনি মাইক্রোবায়োলজিতে উচ্চ ডিগ্রিধারী ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। আশরাফ কাজী ভারত ভাগের পর মহাত্মা গান্ধীর (১৮৬৯-১৯৪৮) সঙ্গে তার পত্রালাপের কিছু দলিলসম্পন্ন বই প্রকাশ করে বিতর্কের বস্তুতে পরিণত হন। মহাত্মা গান্ধীসহ ভারতবর্ষের সমকালীন অনেক বিখ্যাত নেতার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তিনি ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন’-এর সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ছিলেন এ সংগঠনের সভাপতি। জোহরা কাজীর ছোট বোন শিরিন কাজীও ছিলেন একজন স্বনামধন্য চিকিত্সক ও কবি। শিরিন কাজী শিশুরোগ চিকিত্সায় সুনাম অর্জন করেন। তিনি অবহেলিত ও অসহায় পরিবার থেকে আসা শিশুদের ভরণপোষণ এবং তাদের লালনপালনের জন্য বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। সমাজসেবক ও রাজনীতি-ঘনিষ্ঠ শিরিন কাজী ১৯৬০ সালে ঢাকা মিউনিসিপালিটির নারী কমিশনার মনোনীত হয়েছিলেন।

জোহরা কাজীর ভাইবোনেরা এক সময় ভারতের নাগপুরে গান্ধী আশ্রম নামে খ্যাত ‘সেবাগ্রামে’ বসবাস করতেন। সে সূত্রে তারা সবাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে গান্ধীর সেবাশ্রমেই প্রথম চাকরি নেন। সেবাশ্রম পরবর্তীকালে ‘মহাত্মা গান্ধী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। যেখানে দুস্থ ও দরিদ্রদের বিনা পয়সায় চিকিত্সাসেবা দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। জনসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক আদর্শকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে ডা. জোহরা কাজী মহাত্মা গান্ধীর ‘সেবাশ্রমেই’ তার চাকরিজীবন শুরু করেন এবং কস্তুর্ব গান্ধী হাসপাতালে অনারারি সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। মহাত্মা গান্ধী তাকে কন্যার মতো স্নেহ করতেন। নিয়মিত দেখা না হলেও দীর্ঘদিন যাবত্ গান্ধীজি তাকে পত্র লিখতেন। বস্তুত গান্ধী পরিবারের সঙ্গে জোহরা কাজী পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। জোহরা কাজীর ছোট বোন শিরিন কাজীর বিয়ের সময় অভিভাবকের অবর্তমানে গান্ধীজি নিজে কন্যা সম্প্র্রদান করেন। গান্ধীজি ছাড়াও জোহরা কাজী পরিবারের সঙ্গে জওহরলাল নেহরু (১৮৮৯-১৯৬৪), মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮), মাওলানা শওকত আলী (১৮৭৩-১৯৩৮), বল্ল্লভ ভাই প্যাটেল (১৮৭৫-১৯৫০), শেরেবাংলা একে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬১), কমরেড মোজাফফর আহমদ (১৮৮৯-১৯৭৩), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯১৯-১৯৭৫) এবং বেগম সুফিয়া কামালের (১৯১১-১৯৯৯) ঘনিষ্ঠতা ছিল।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পূর্বে জোহরা কাজী ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় ১৩ বছর চিকিত্সক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশ ভাগের পর তিনি পূর্ববাংলায় চলে আসেন। ডা. জোহরা বেগম কাজীর বর্ণাঢ্য জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের শুরু ১৯৪৮ সালে যখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সক হিসেবে যোগ দেন। তত্কালীন মেডিকেল কলেজে পৃথক ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগ না থাকায় অনগ্রসর সমাজের গর্ভবতী নারীরা হাসপাতালে এসে পুরুষ ডাক্তারদের কাছে চিকিত্সা নিতে অনাগ্রহী ছিলেন। ফলে গর্ভবতী মা ও শিশুদের যথাযথ চিকিত্সায় বিঘ্ন ঘটত এবং অকালমৃত্যুর ঘটনাও ছিল অনেক বেশি। ডা. জোহরা কাজীর ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং পরে মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগ পরিপূর্ণতাপায়। ডা. জোহরা কাজী ১৯৫৫ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং সেখান থেকে অন্যান্য প্রশিক্ষণসহ DRCOG, FCPS, FRCOG ডিগ্রি এবং MRCOG সম্মাননা নিয়ে দেশে ফিরে তার পূর্বতন কর্মস্থলে প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের পর তিনি হলি ফ্যামিলি রেডক্রস হাসপাতাল এবং কমবাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে (অনারারি কর্নেল পদে) সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে সাম্মানিক অধ্যাপকও ছিলেন বহুদিন। 

৩২ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালে জোহরা কাজী নরসিংদী জেলার রায়পুর উপজেলার হাতিরদিয়ার জমিদার পুত্র প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ রাজুউদ্দিন ভূঁইয়ার (এমপি) সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৯৬৩ সালে তিনি বিধবা হন। তার নিজের কোনো সন্তান না থাকলেও নিজের ছাত্রছাত্রী ও বিভিন্ন শিশুসদন-এতিমখানার শিশুদের তিনি নিজ সন্তানের মতো করে গড়ে তুলেছেন। স্বামীর স্মৃতি রক্ষার্থে নরসিংদীতে হাতিরদিয়া হাইস্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তার জীবনদর্শন ছিল— ‘Human behaviour, benevolent approach, patience, friendly caring, devotion and dedicated service to mankind.’ তিনি ছাত্রদের বলতেন— ‘Don’t run after money, money will run after you and be sincere to your noble profession.’ 

শিক্ষক হিসেবে, বিশেষ করে পরীক্ষায় পাসের ব্যাপারে তিনি বেশ কড়া ছিলেন। তার এই কড়াকড়ি ছিল ছাত্রকে পড়াশোনা করিয়ে যোগ্যতর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। তার সময়ানুবর্তিতা ছিল কিংবদন্তিতুূল্য। ৭টার ক্লাস ৭টায়, এর কোনো নড়চড় হতো না। ব্যক্তিগত জীবনে জোহরা কাজী বেশ কড়া মেজাজের হলেও অত্যন্ত মানবিক, সংবেদনশীল, সংযমী ও সহমর্মী ছিলেন। আর শিক্ষক হিসেবে ছিলেন মেধাবী, পরিশ্রমী ও যথেষ্ট ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শস্থানীয়। তিনি ছিলেন রোগীদের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ সর্বসুনামের অধিকারী ‘চিকিত্সক’। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে মেডিকেল কলেজের মহিলা হোস্টেলগুলোর প্রশাসনিক দায়িত্বে বেগম জোহরা কাজী ছিলেন যথেষ্ট যত্নশীল, বিশেষ করে ভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলনের সময় ছাত্রীদের সুরক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন যথেষ্ট দায়িত্বশীল। তিনি বিপদগ্রস্তদের পাশে থাকতেন। অগণিত অসহায় রোগীকে তিনি সরাসরি সহায়তা করতেন, বাড়ি যাওয়ার টাকা না থাকলে টাকা দিতেন। তিনি অনেককে ডাক্তারি পড়িয়েছেন, বিদেশে পাঠিয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জোহরা কাজী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুদ্ধাহতদের চিকিত্সা এবং নানা সাংগঠনিক তত্পরতার মাধ্যমে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। 

নিরহঙ্কার, নিরাপস এবং সত্ চিকিত্সা সমাজকর্মী হিসেবে বাঙালি মুসলমান সমাজে বিশেষ সুনাম, সম্মান ও সমীহের অধিকারী হয়েছিলেন তিনি। তার নিঃস্বার্থ বোধ ও প্রাণচঞ্চল, মানবতাবাদী আদর্শের প্রবক্তা এ মহীয়সী নারী তার কাল, সময় ও সমাজকে অতিক্রম করে প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তার নিজের ছিল পড়ার নেশা। প্রচুর পড়াশোনা করতেন— গ্রামে গিয়ে মাদ্র্রাসার ছাত্রদের বলতেন পড়াশোনা করতে। প্রতিবেশীরা তাকে যথেষ্ট সহযোগী ও সহায়তাকারী হিসেবে পেতেন। মুক্তবুদ্ধির অধিকারী জোহরা কাজী ১৯২০ সালের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে দেখেছেন এভাবে— ‘সে সময় প্রচলিত ধারণা ছিল খ্রিস্টান স্কুল-কলেজে পড়লে শিক্ষার্থীদের খ্রিস্টান বানানো হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিজে খ্রিস্টান স্কুল-কলেজে পড়েছি—তাদের গির্জায় হরহামেশা গিয়েছি, কিন্তু কখনো আমার মনে হয়নি কেউ আমাকে খ্রিস্টান হতে বলেছে।’ তিনি ধর্ম, বর্ণ ও জাতপাত নির্বিশেষে মানুষকে মানুষ বিবেচনা ও মানবতাবোধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ দেখতে চাইতেন। তার ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, সহযোদ্ধাসহ সবাইকে এ মহান প্রেরণাই তিনি দিয়ে গেছেন।     

পৈতৃক নিবাসসূত্রে জোহরা বেগমের জন্ম এবং কর্মজীবনের বেশ কয়েক বছর বাংলার বাইরে অতিবাহিত হলেও তিনি বাংলা পড়তে ও লিখতে পারতেন এবং ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ও আরবির পাশাপাশি সাবলীলভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারতেন। তিনি নিজে সাইক্লিস্ট, নামি ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিস খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘকাল মানবতার সেবায় নিঃস্বার্থ কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ ডা. জোহরা কাজীকে তমঘা-ই-পাকিস্তান (১৯৬৪), বেগম রোকেয়া পদক (২০০৪), একুশে পদক (মরণোত্তর, ২০০৮) এবং বিএমএ স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। জাতীয় জাদুঘর, গাইনোকোলজিস্ট সোসাইটি, নাগরিক সংবর্ধনা পরিষদ, রোটারাক্ট ক্লাব অব বুড়িগঙ্গা, আলীগড় ওল্ড বয়েজ অ্যাসোসিয়েশন এবং মাদারীপুর জেলা সমিতি তাকে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করে। ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর জোহরা কাজীর মৃত্যু হয়। বনানী গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।  

 

লেখক: প্রবন্ধকার ও গবেষক