১৯০১ সালের অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখে কোচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে বাংলা গানের সুরসম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে এন্ট্রাস এবং কোচবিহার কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষা পাস করে বিএ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এ সময় কলকাতা গিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান রেকর্ড করে সংগীত জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তার গানের সুমধুর কণ্ঠ তাঁকে অচিরেই সাফল্য এনে দেয়। মেধাবী ছাত্র হলেও লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই বাংলা সরকারের রেকর্ডিং বিভাগে চাকরি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
সংগীতের প্রতি আব্বাসউদ্দীনের অনুরাগ ও আকর্ষণ ছিল সহজাত। কোনো ওস্তাদ বা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে তালিম নিয়ে তিনি গান শেখেননি। গ্রামেগঞ্জে পল্লীগায়কের কণ্ঠে জারি, যাত্রা, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি শুনে গানের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় গেয়ে তা রপ্ত করেন। কেবল কলকাতায় অল্প সময় ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখেন।
গ্রামোফোন কোম্পানিতে প্রথমে যে গান রেকর্ড করেন, তা ছিল আধুনিক গান। ১৯৩০ সালে হিজ মাস্টার্স ভয়েস কোম্পানি তার কণ্ঠে ‘স্মরণ পারের ওগো প্রিয় এবং কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’ গান দুটি রেকর্ড করে। দ্বিতীয় রেকর্ডকৃত দুটি গান ছিল ‘ওগো প্রিয়া নিতি আসি তব দ্বারে’ এবং ‘আজ শরতের রূপ দীপালি’।
হিজ মাস্টার্স ভয়েস ছাড়াও মেগাফোন টুইন রিগ্যাল প্রভৃতি কোম্পানিতেও তিনি গান রেকর্ড করেন, যা তার জনপ্রিয়তার স্বাক্ষর বহন করে। ওই সময় একজন মুসলমান গায়কের জন্য এ ছিল দুর্লভ সম্মানের বিষয়। বর্ধমানের মোহাম্মদ কাসেম কীর্তনাদি গান রেকর্ড করে নাম করেছিলেন, কিন্তু স্বনামে নয়— কে মল্লিক ছদ্মনামে।
গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান রেকর্ডিং সূত্রে আব্বাসউদ্দীন কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। নজরুল ছিলেন প্রতিভাদীপ্ত এক জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো। কাব্যে ও গানে তার অসাধারণ পদচারণা এ সময়ের দেশবাসীকে বিস্মিত করেছিল। প্রখর রবি-রশ্মিও তা ঢাকতে পারেনি। সংগীতের ক্ষেত্রে নজরুল ইসলাম একাধারে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। প্রতিভার এমন অপূর্ব সমন্বয় খুব কম মানুষের জীবনে ঘটে। কাজী নজরুল ইসলাম সেই দুর্লভ প্রতিভারই অধিকারী ছিলেন। আব্বাসউদ্দীন আহমদ মুখ্যত কণ্ঠশিল্পী, বাংলা গানের সুরের জাদুকর। তিনি নজরুল ইসলামের গান সভা-সমিতি-জলসায় গেয়ে এবং গ্রামোফোন রেকর্ডে ধারণ করে দেশের গ্রামেগঞ্জে মাঠে-প্রান্তরে ছড়িয়ে দেন। বাংলার মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেসব গান শুনেছে আর আবেগে-আনন্দে আপ্লুত এবং ভাবে-রসে বিভোর হয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ বলেন, তিনি নজরুলের ৯২টি গান কণ্ঠে ধারণ করেন।
কয়েকটি গান ছিল এরূপ:
স্বদেশী গান— কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙে ফেল কররে লোপাট।
নমো নমো নমো বাংলাদেশ মম/চির মনোহর চির মধুর।
ইসলামী গান— ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।
ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর।
প্রেমের গান— বেণুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধূর।
অনেক ছিল বলার যদি সেদিন ভালবাসতে।
পল্লীসংগীত— নদীর নাম সই অঞ্জনা/নাচে তীরে খঞ্জনা।
কুঁচ বরণ কন্যারে তার মেঘবরণ কেশ ইত্যাদি।
নজরুল ও আব্বাসউদ্দীন বাংলার সংগীতবিমুখ মুসলিম সমাজকে সংগীতমুখী করে তোলেন। যেখানে গান শোনা নিষিদ্ধ ছিল, সেখানে গান করা দুরূহ কাজ ছিল। আব্বাসউদ্দীন সেই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। সংগীত মানুষকে কেবল আনন্দ দান করে নয়, মানুষের মনে শুদ্ধ চিন্তা ও মহত্ ভাবনার জন্ম দিয়ে। অ্যারিস্টটল শিল্পের এই বোধকেই ক্যাথারসিস বলেছেন। আব্বাসউদ্দীন আহমদ নানা ধরনের গান করলেও পল্লীসংগীতে তাঁর অনন্য ও অনবদ্য অবদান। পরবর্তীতে আবদুল আলীম, ভূপেন হাজারিকা প্রমুখ লোকসংগীত প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আব্বাসউদ্দীনের নাম এখনো কিংবদন্তির মতো মানুষের মনে দানা বেঁধে আছে। ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে’। ‘নদীর কূল নাই কিনার নাই রে’ ইত্যাদি গান আমরা পঞ্চাশের দশকে স্কুলজীবনে শুনেছি। গ্রামোফোন রেকর্ডের গানকে ‘কলের গান’ বলা হতো। ধুতুরার ফুল সদৃশ এরূপ কলের গান গ্রামের অনেক পরিবারে ছিল। আমাদের বৃহত্ যৌথ পরিবারেরও ছিল। আব্বাসউদ্দীনের দরদভরা কণ্ঠের এসব গান তরুণ মনে অদ্ভুত মাদকতা এনে দিত। চিলমারী বন্দরের ভাবনা মনের মধ্যে সেদিন যে স্বপ্নের জাল সৃষ্টি করেছিল, তা আজো মুছে যায়নি। রংপুরের চিলমারীর বন্দর আমার আজো দেখা হয়নি। দেখার সুযোগ হলে মন নিশ্চয়ই সেই কল্পলোকের ‘গাড়িয়াল ভাই’কে খুঁজবে।
আব্বাসউদ্দীন ভাওয়াইয়া, চটকা ভাটিয়ালি, জারি-সারি বিচ্ছেদী, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদি, কীর্তন, বিয়ের গান, মাগনের গান প্রভৃতি লোকসংগীতে কণ্ঠ দিয়েছেন। এখানে কতক জনপ্রিয় গানের উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করা গেল না।
১. কি ও বন্ধু, কাজল ভ্রমরা রে।
২. ও কন্যা, হস্তে কদমের ফুল।
৩. প্রেম জানে না রসিক কালা চান।
৪. গাও তোল গাও তোল কন্যা হে।
৫. আমার গহীন গাঙের নাইয়া।
৬. রঙিলা নায়ের মাঝি।
৭. আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে।
৮. আগে জানলে তো ভাঙ্গা নৌকায় চড়তাম না।
৯. নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে।
১০. আল্লা মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই— ইত্যাদি।
বয়সে প্রবীণ যারা তাদের কাছে গানগুলো পরিচিত, কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত। তালিকা থেকে তারা আঁচ করতে পারবে, আব্বাসউদ্দীন কী ধরনের গান করেছেন।
বাংলা লোকসংগীতে আব্বাসউদ্দীনের অবদান বিবিধ: এক. লোকসংগীত চিরকাল লোকসমাজের খণ্ড খণ্ড গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এক এক অঞ্চলের গান সেই অঞ্চলেই পরিচিত ছিল। আব্বাসউদ্দীন আঞ্চলিক গান তার পরিশীলিত কণ্ঠে তুলে এনে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে গেয়ে এবং বিশেষ করে রেকর্ডে ধারণ করে দেশের সর্বত্র প্রচার করেন। এতে রংপুরের ভাওয়াইয়া গান রংপুরের সীমানা ছাড়িয়ে সব অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। দুই. বাংলা লোকসংগীত পল্লী গায়কেরা লোকোত্সব, মেলা, পূজা-পার্বণে গেয়ে সাধারণ মানুষের আনন্দ বিধান করতেন। তাঁরা আজো তা করে থাকেন। শহরের শিক্ষিত সমাজের কাছে তা অপরিচিত ও অপাঙেক্তয় ছিল। আব্বাসউদ্দীনই প্রথম এ ধারার গানকে শহর-গঞ্জের শিক্ষিত শ্রেণীর শ্রবণযোগ্য ও উপভোগ্য করে তোলেন। এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম ও কবি জসীমউদ্দীন তাকে পূর্ণ সহযোগিতা দান করেন। স্মরণ করা যায় যে, ড. দীনেশচন্দ্র সেন ওই সময়ে মৈমনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ গীতিকা সংগ্রহ সংকলন ও সম্পাদনা করে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। আব্বাসউদ্দীন প্রমুখ বড় মাপের শিল্পী লোকসংগীত প্রচারে এগিয়ে না এলে এ জগত্ শূন্যই থেকে যেত। তিন. আব্বাসউদ্দীন যেসব ধারার লোকসংগীত গেয়ে প্রচার করেন, সেসবের অনেক গান তিনি নিজেই সংগ্রহ করেন। এ কাজটি করতে গিয়ে তিনি একজন সংগ্রাহকের ভূমিকাও পালন করেছেন। এ সময় লোকসাহিত্য-সংগীত সংগ্রহে শিক্ষিত মানুষের যে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়, তা এর একটি পরোক্ষ ফল বলেই স্বীকার করতে হয়। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করার আছে, তা হলো তিনি বাংলার লোকসংগীতকে শুধু বাংলাদেশের সর্বসাধারণের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেননি, বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করতে বিদেশে গেছেন এবং স্বয়ং গান গেয়ে বাংলা গানের বাণী ও সুর-মাধুর্য বিশ্ববাসীর কাছে প্রচার করেছেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি দূরপ্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের নানা দেশ ভ্রমণ করেন। গান গেয়ে তিনি সর্বত্র ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন।
আব্বাসউদ্দীন সর্বমোট ঠিক কত সংখ্যক পল্লীসংগীত সুরারোপ ও কণ্ঠ দান করেন, তার পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। তিনি প্রায় এক হাজার গানে কণ্ঠ দান করেন বলে জানা গেছে। এর একটি ভালো অংশ লোকসংগীত ছিল বলে অনুমিত হয়। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠস্বরকে ধরে রাখার জন্য যেমন তার গানের সিডি ক্যাসেট প্রকাশ করার দাবি আছে, তেমনি গানের বাণীকে ধরে রাখার জন্য গান ও স্বরলিপি প্রকাশের দাবি আছে। আমরাও এই দাবি উত্থাপন করছি। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সদয় দৃষ্টি প্রদর্শন করবে। বিশেষত মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর যে বিরূপ চাপ পড়েছে, তাতে নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐহিত্য সম্পর্কে একটা শূন্যতা ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। ব্যান্ড পার্টির নামে পপসংগীতের যে উন্মাদনা তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে, তাতে আমাদের এ আশঙ্কা আরো বৃদ্ধি পায়। রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীতের শিল্পীর অভাব না থাকলেও লোকসংগীতের শিল্পী কমে আসছে। ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ইউরোপের রেনেসাঁর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। এমনকি খেলাধুলার জগতে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেরও নাম উচ্চারণ করতে হয়। সেকালে তাদের সাফল্য সারা জাতিকে মাতিয়েছিল। মনে রাখা দরকার, অনুকরণ দ্বারা কোনো জাতি বড় হতে পারে না। নিজেদের মেধা, শ্রম, সম্পদ ও ঐতিহ্য কাজে লাগিয়ে নব নব সৃজনশীলতার মধ্য দিয়েই জাতিকে এগোতে হবে। আমাদের আত্মবিস্মৃতি ও পদস্খলন রোধ করার জন্য আব্বাসউদ্দীনকে স্মরণ ও তার অবদানকে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন আছে।
আব্বাসউদ্দীন আত্মজীবনীতে এক জায়গায় বলেছেন যে, বাংলার পল্লীসংগীতকে জনপ্রিয় করার বাসনা নিয়ে তার শিল্পী জীবন শুরু করেছিলেন। তিনি লোকসংগীতকে কেবল জনপ্রিয় করে তোলেননি, তিনি এর অন্তরের রূপটিকেও উদ্ঘাটন করেছেন। ভাওয়াইয়ার কথাই বলি। সেকালের তুখোড় বক্তা সৈয়দ বদরোদ্দজা কোচবিহারের মহারাজের আমন্ত্রণে সেখানে যান। তিনি বক্তৃতার শুরুতে বলেন, কোচবিহার আসার আগে কোচবিহারকে চিনতে পেরেছি আব্বাসউদ্দীনের গানের মাধ্যমে। এত সুন্দর ভাওয়াইয়া গানের সুর যে দেশের মানুষের কণ্ঠে শোভা পায়, সে দেশ কাব্যময়, এ ধারণাটাই আমার মনে দানা বেঁধেছিল। অপর রাজনৈতিক বক্তা নলিনী সরকার বলেন, ‘আব্বাসউদ্দীনের ভাওয়াইয়া গান যেদিন প্রথম শুনি জিজ্ঞাসা জাগল মনে এ কোন দেশের গান এত করুণ এত মিষ্টি। কোচবিহার বলে এক জায়গা আছে সেই দিনই উদ্ধার করলাম।’ তিনি কেবল আনন্দ বিধানের জন্য লোকসংগীত প্রচার করেননি। এর সঙ্গে একটি দেশের ও জাতির অন্তর্জীবনের স্বরূপটিও তুলে ধরেছেন। আর এখানেই তার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
[বাংলাদেশ লোক সংগীত পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘কালজয়ী আব্বাসউদ্দীন’ বই থেকে পুনর্মুদ্রণ]
লেখক: সাবেক উপ-উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






