জয়নুল আবেদিন ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্ময়কর এক শিল্প-প্রতিভা। তিনি ছিলেন একাধারে একজন অসাধারণ মেধাবী শিল্পী, অনুপ্রেরণাদানকারী শিল্পগুরু ও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পকলা চর্চার কৌশলী সংগঠক। তিনি বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার জনক। আবার একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের পুনরুদ্ধারকারী। তিনি নিজেও ছিলেন একজন সংস্কৃতিবান বাঙালি। তার মানবিক গুণাবলির জন্যও তিনি বিশিষ্ট। প্রচণ্ড শক্তিশালী ও অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্পী জয়নুল আবেদিন শিল্পকলাকে কখনই সাধারণ জীবনের বাইরের কোনো বিষয় বলে গণ্য করেননি। তাঁর কাছে শিল্প ছিল জীবনেরই এক প্রকাশ আর এর উদ্দেশ্য মানবসমাজকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলা। তাঁর শিল্প সব সময়ই সাধারণ মানুষের কথা বলেছে। তিনি নিজেও উঠে এসেছেন তাদের মধ্য থেকেই। তাদের জীবন, তাদের অন্তহীন সংগ্রাম, তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা— সব কিছুই তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাঁর কাজের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ ও বাংলার নিসর্গ ছিল তাঁর অতি প্রিয় বিষয়।

জয়নুল আবেদিনের জন্ম বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার এক সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারে ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ব্রহ্মপুত্র নদের প্লাবন অববাহিকার অত্যন্ত শান্ত সুনিবিড় ও রোমান্টিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শৈল্পিক মানসিকতা নির্মাণে প্রকৃতির প্রভাব ছিল অসামান্য ও সুদূরপ্রসারী।

ময়মনসিংহে তাঁর জীবনের শুরুতেই তিনি শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে বহুদূরের সেই শহর কলকাতায় গিয়ে শিল্পকলা শেখার দীর্ঘ ও কঠিন ছাত্রজীবন শুরু না করা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন।

শৈশবে তাঁর ওপর প্রকৃতির প্রভাব এবং কলকাতায় আর্ট স্কুলে ইউরোপীয় বাস্তববাদী ধারার শিল্পাঙ্কন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ তরুণ জয়নুল আবেদিনকে গ্রামীণ নিসর্গশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি তখন সাঁওতাল পরগনা ও ময়মনসিংহের নৈসর্গিক দৃশ্যের ওপর বেশকিছু স্মরণীয় স্কেচ ও জলরঙ চিত্র আঁকেন। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা তাঁর একগুচ্ছ জলরঙ ছবির জন্য তিনি ১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত চিত্রপ্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ বছরই তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলের শিক্ষক নিযুক্ত হন।

এর পর কিছুকাল জয়নুল আবেদিন প্রাকৃতিক পরিবেশেরই এক রোমান্টিক রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তখন ছিলেন এক অরাজনৈতিক ব্যক্তি, একজন বিশ্বস্ত নিসর্গশিল্পী। কিন্তু ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনকে একেবারে বদলে দেয়। গ্রামবাংলার রোমান্টিক নিসর্গশিল্পীকে রূপান্তরিত করে ফেলে এক দুর্দান্ত বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বে। অতঃপর সারাটি জীবনই বিক্ষুব্ধ থেকে গেছেন তিনি।

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় কলকাতা মহানগরে ঘটেছে মানবতার চরম অবমাননা। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্যান্বেষণে তীব্র প্রতিযোগিতা চলেছে মানুষ আর কুকুরের মধ্যে। ঊনত্রিশ বছর বয়স্ক জয়নুল এ রকম অমানবিক দৃশ্যে প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হন, আতঙ্কে শিউরে ওঠেন, আবেগাপ্লুুত হয়ে পড়েন। কিন্তু সে আবেগ তিনি কাজে লাগান সেসব দৃশ্যের শিল্পরূপ দিতে। অন্যভাবে বলা যায়, সেই আবেগই তাকে তাড়িত করে, বাধ্য করে অমানবিক পরিস্থিতির এক মানবিক নির্মাণে।

জয়নুল তখন আর্ট স্কুলের একজন শিক্ষক, তাঁর আয় সামান্য। দুর্ভিক্ষের বাজারে উন্নতমানের শিল্পসামগ্রী তখন যেমন ছিল দুর্লভ, তেমনি দুর্মূল্য। সে কারণে তিনি বেছে নেন শুধু কালো কালি আর তুলি। শুকনো তুলিতে কালো চীনা কালির টানে স্কেচ করতে থাকেন অতি সাধারণ সস্তা কাগজের ওপর। ব্যবহার করেছেন কার্টিজ পেপার। এসব কাগজ ছিল ঈষত্ পীত বর্ণের। এমনকি তিনি প্যাকেজিং কাগজও ব্যবহার করেছেন। সাধারণ স্বল্পমূল্যের এসব অঙ্কনসামগ্রী ব্যবহার করে তিনি যে শিল্প সৃষ্টি করলেন, তাই পরিণত হলো অমূল্য সম্পদে। এমন এক অসাধারণ শক্তিশালী অঙ্কনশৈলীর মাধ্যমে তিনি দুর্ভিক্ষের করুণ বাস্তব দৃশ্যাবলি চিত্রায়িত করলেন, যার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের চিত্র-ঐতিহ্যে ছিল না। দুর্ভিক্ষের এসব চিত্র শিল্পী জয়নুল আবেদিনকে অমরত্ব দেয়।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলো। তারপর জয়নুল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম প্রদেশ পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর সম্মানজনক চাকরিটি ছেড়ে ঢাকায় এসে নর্মাল স্কুলের সাধারণ অঙ্কন শিক্ষকের কাজ পান। কিন্তু তখন থেকেই তিনি এ দেশে শিল্প আন্দোলনের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকায় একটি শিল্পকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার তাঁর উদ্যোগটি ছিল রীতিমতো বিপ্লবাত্মক ঘটনা। তাঁর শিল্পী হিসেবে খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তত্কালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালি সরকারি কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সালে এ দেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা। তখন এর নাম ছিল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস।

ইনস্টিটিউটকে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষরূপে। (শুরুতে অবশ্য কয়েক মাসের জন্য শিল্পী আনোয়ারুল হক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন)। জয়নুল মাত্র দুই কামরার সেই ইনস্টিটিউটকে ১৯৫৬ সালের মধ্যেই এক অতি চমত্কার আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেন। পরে এটি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় এবং স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। আরো পরে মহাবিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তরিত হয় এবং এর বর্তমান পরিচয়, চারুকলা অনুষদ। শাহবাগে এর সুপরিসর নান্দনিক ক্যাম্পাস।

এরই মধ্যে ১৯৫১-৫২তে জয়নুল আবেদিন সরকারি বৃত্তি নিয়ে এক বছরের জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন চারুকলা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। তিনি নিজের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীও করেন। তাঁর কাজ ইংল্যান্ডের বিদগ্ধজনের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে। তখন তিনি ইউরোপও ভ্রমণ করেন। তাঁর এ ইংল্যান্ড ও ইউরোপ ভ্রমণটি শুধু যে তাকে পাশ্চাত্য জগতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাই নয়, এতে করে তাঁর দৃষ্টি আরো প্রসারিত হয় এবং সম্ভবত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের চারুকলা চর্চা শুরু থেকেই এক প্রাণবন্ত আধুনিকতার চরিত্র গ্রহণ করতে পেরেছিল। আবেদিনের এ ইউরোপ ভ্রমণ তাকে বাংলার সমৃদ্ধ লোকশিল্পের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কেও বিশেষভাবে সচেতন করে তোলে। তাঁর এ মানসিকতা নিজের কাজের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। ১৯৫১ সালে এবং এর অব্যবহিত পরে আঁকা তাঁর ছবিতে একটি অসাধারণ আঙ্গিকের পরিচয় পাওয়া যায়। এ আঙ্গিকের প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা যায়, জয়নুল গ্রামবাংলার অতি সাধারণ প্রাত্যহিক অথচ অত্যন্ত প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন দৃশ্যাবলি এঁকেছেন। অধিকাংশ কাজ জলরঙ বা গোয়াশে করা। ব্যবহূত জলরঙের বৈশিষ্ট্য হালকা ও অনুজ্জ্বল তুলির টান। ছবিতে কম্পোজিশন বা স্পেস ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচ্যধর্মী। অন্যদিকে বিষয় উপস্থাপনা ও ড্রইং পাশ্চাত্য-বাস্তবধর্মী। এভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এক অপরূপ সমন্বয় ঘটেছে তাঁর শিল্পকর্মে। ‘ঝড়’ শীর্ষক ছবিটি এক অসাধারণ কাজ। এতে বাংলাদেশের কালবৈশাখীর আকস্মিকতা ও উদ্দামতা ধরা পড়েছে অতি চমত্কারভাবে। বিন্যাসের সংক্ষিপ্ততায় ছবিটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। একইভাবে আঁকা তাঁর আরো দুটি সুন্দর জলরঙ ছবি ‘মই দেয়া’ ও ‘বিদ্রোহী গরু’।

দেশে ফিরে ’৫২-৫৩তে জয়নুল গড়ে তোলেন এক চমত্কার নতুন ঢং, যাকে ‘আধুনিক বাঙালি’ ঢং বলা চলে। জয়নুলের এ ঢঙের কাজে বাংলার লোকশিল্পের নানা মোটিফ এবং রঙবিন্যাসের প্রভাবও লক্ষণীয়। তাঁর এ সময়ের কাজগুলোকে রোমান্টিক মেজাজের বলে চিহ্নিত করা যায়। এ ঢঙের ছবি সবই অবয়বভিত্তিক, তবে তাঁর নিজস্ব নতুন আঙ্গিকেই উপস্থাপিত। আধা বিমূর্ত জ্যামিতিক ফর্মে নির্মিত হয়েছে মানব-মানবীর শরীর। অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত পারসপেক্টিভের শর্ত মানা হয়নি। জলরঙ, গোয়াশ ও তেলরঙ, নানা মাধ্যমে আঁকা ছবির এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল প্রাথমিক রঙের ব্যবহার। ছবিগুলো আকারে আয়তনে ছোট বা মাঝারি। অধিকাংশ ছবি মহিলাদের জীবনযাপন নিয়ে। মা ও শিশুও রয়েছে। গ্রামীণ কর্মীপুরুষের জীবনও ধরা পড়েছে এ সময়কার কাজে। একটি গোটা সিরিজ গড়ে উঠেছে এসব ছবি নিয়ে। এগুলোর মধ্যে কিছু স্মরণীয় কাজ হলো ‘পাইন্যার মা’, ‘পল্লী রমণী’, ‘আয়না নিয়ে বধূ’, ‘একাকী বনে’, ‘মা ও শিশু’, ‘তিন পল্লী রমণী’, ‘গুণ টানা’, ‘মুখ চতুষ্টয়’ ইত্যাদি।

জয়নুল আবেদিন অবশ্য তাঁর এ শিল্প আঙ্গিকটি খুব বেশি দিন ধরে রাখেননি। পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগেই তিনি বরং ফিরে যান তাঁর প্রথম পর্যায়ের বাস্তবধর্মী আঙ্গিকে, যার বৈশিষ্ট্য ছিল গতিময় ও শক্তিশালী রেখা। মাঝে মধ্যে তিনি বিমূর্ত প্রকাশবাদী আঙ্গিকে কিছু ছবি এঁকেছেন, তবে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিল বাংলার খেটে খাওয়া কর্মীমানুষের জীবন সংগ্রামের ছবি আঁকাতেই। ১৯৫৯ সালে তাঁর আঁকা বিশাল তেলরঙের একটি কাজ, শিরোনাম ‘সংগ্রাম’— এ ধারারই প্রতীক। এ ছবিতে দেখা যাচ্ছে গরুর গাড়ির এক চালককে প্রাণপণ শক্তিতে কাদার মধ্যে আটকে যাওয়া তার গাড়িটিকে ঠেলে তুলতে। চালকের এ সংগ্রাম এক নিঃসঙ্গ একক মানুষের সংগ্রাম, এ সংগ্রামের যেন কোনো শেষ নেই।

১৯৬৯ সালে তত্কালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার গণআন্দোলন হয়েছিল। স্বৈরশাসনের শুরু ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবিই ছিল গণআন্দোলনের মূল কথা। তখন এ দেশের চিত্রশিল্পীরাও জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন এবং ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আর্ট কলেজে ‘নবান্ন’ শীর্ষক এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। আপাদমস্তক এক বাঙালি জাতীয়তাবাদী জয়নুল, বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

১৯৭০ সালের ‘নবান্ন’ প্রদর্শনীতে এরই জন্য বিশেষভাবে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি স্ক্রল চিত্র নিয়ে নেতৃত্ব দেন জয়নুল আবেদিন। স্ক্রলের কাগজের প্রস্থ ছিল চার ফুট। কালো চীনা কালি, জলরঙ আর মোম ব্যবহার করেছেন স্ক্রলটি আঁকতে। এ চিত্রমালায় তিনি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। ‘সোনার বাংলা’ ও সুখ ও শান্তির দিনের চিত্র দিয়ে শুরু, তারপর ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার ক্রম-নিঃস্বতার পরিণতি, চরম দারিদ্র্যাবস্থা, দুর্ভিক্ষ এবং অবধারিতভাবে দুঃখী-দরিদ্র মানুষের গ্রামত্যাগী হয়ে শহরমুখী যাত্রা। এ এক মহা আলেখ্য। স্পর্শকাতর দৃশ্যাবলি, হূদয়স্পর্শী উপস্থাপনা, অত্যন্ত সহজ সরল আঙ্গিক অথচ অসাধারণ তাঁর আবেদন।

জয়নুল আবেদিন ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে যারা সংগ্রাম করেন, তাদের সবার সঙ্গেই একাত্মতা জানাতে উত্সাহী ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে যখন তাঁর বয়স প্রায় ৫৬, তিনি আরব লীগের আমন্ত্রণে ছুটে যান মধ্যপ্রাচ্যের সমরক্ষেত্রে, আল-ফাতাহ গেরিলাদের সঙ্গে চলে যান যুদ্ধফ্রন্টে। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকেন, তাঁর সেসব ছবির প্রদর্শনী হয় একাধিক আরব দেশে। মুক্তিযোদ্ধারা তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্যালেস্টাইন থেকে দেশে ফিরতে না ফিরতে জয়নুলের নিজের দেশেই এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হানে উপকূলীয় এলাকায়। তিন লক্ষাধিক মানুষ ১২ নভেম্বরের ঝড়ে ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়। প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খান জয়নুল আবেদিন। তিনি বসে না থেকে একটি রিলিফ টিমের সঙ্গে ছুটে যান দুর্যোগ আক্রান্ত এলাকায়। দুঃখী মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। পরে তিনি সেখানকার মর্মস্পর্শী দৃশ্যাবলির কিছু কিছু তুলে ধরেন তাঁর তুলিতে, কালিতে। দুর্যোগ এলাকা থেকে ফিরে এসে নবান্ন আঙ্গিকেই আঁকেন আবার একটি দীর্ঘ স্ক্রলচিত্র। ‘মনপুরা ৭০’ শীর্ষক এ স্ক্রলটি ছিল ৩০ ফুট দীর্ঘ। কালো কালি এবং মোম-সহযোগে আঁকা হয়েছে স্ক্রলের ছবি। এতে দেখানো হয়েছে স্তূপীকৃত লাশের দৃশ্য, ‘আমরা শুধু মৃত্যুতেই একতাবদ্ধ হই’—এ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে জয়নুল দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলতেন। ‘মনপুরা ৭০’ একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ চিত্রকর্ম।

উনিশ সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সেরে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নিজ দেশে বন্দিজীবন কাটাতে বাধ্য হলেন জয়নুল।

মুক্তিযুদ্ধ জয়নুলের মনে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিজয় অর্জনের পর পরই তিনি পূর্ণোদ্যমে লেগে যান শিল্পচর্চা সংগঠনের কাজে। এবারে লোকশিল্প তাঁর কাছে প্রাধান্য পেতে থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জয়নুল আবেদিনকে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের সংবিধানের অঙ্গসজ্জার। তিনি প্রবল উত্সাহের সঙ্গে কাজটি সমাধা করেন। তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করেন কয়েকজন তরুণ শিল্পী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক সংকট তাকে অত্যন্ত ব্যথিত করে। তাঁর কর্মচাঞ্চল্যে কিছুটা ভাটা পড়তে থাকে। তাঁর মন খারাপ হতে থাকে। তিনি যেন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর নিজের সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি ছুটলেন তাঁর আজীবন লালিত স্বপ্ন ‘লোকশিল্প জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার কাজে। তাঁর ইচ্ছে ছিল এ জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে দেশের মূল্যবান লোকশিল্প; ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এখান থেকেই নতুন প্রেরণা পাবে। জয়নুল নিজের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য ময়মনসিংহে একটি চিত্রশালা প্রতিষ্ঠার কথাও ভেবেছেন। এসব কাজের জন্য সরকার তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছিল। প্রয়োজনীয় কিছু অর্থ মঞ্জুরিও দিয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানেরই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার শুরুটা তিনি তাঁর মৃত্যুর আগেই দেখে যেতে পেরেছেন।

দীর্ঘ ছয় মাস ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সরকার দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীর চিকিত্সার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। কিন্তু মাত্র ৬২ বছর বয়সেই তাঁর জীবনাবসান হলো। অবশ্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আঁকার কাজ অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে তারিখে তাঁর মৃত্যুর মাত্র কদিন আগে ঢাকার পিজি হাসপাতালে শুয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ঢঙে শেষ ছবিটি আঁকেন, দুটো মুখ, বলিষ্ঠ মোটা রেখায়, কালো কালি আর মোম ব্যবহার করে।

১৯৭৩ সালে তাকে ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করে। পাকিস্তানের পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৬৫) এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৭৩) তিনি ছিলেন ভিজিটিং প্রফেসর। বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭৫ সালের ১৭ মার্চ তাকে জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত করে। আজীবন তিনি ছিলেন জনগণের শিল্পী এবং জনগণেরই মানুষ। আবার দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক এবং পণ্ডিতরা তাকে অতি উঁচু দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর অসাধারণ শিল্প-প্রতিভা এবং তাঁর মহত্ মানবিক গুণাবলির জন্য তিনি বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন, সরকার এবং জনগণের কাছ থেকে পেয়েছেন সম্মান। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার শিল্পাচার্যের শিল্পভাণ্ডার থেকে ৮০৭টি শিল্পকর্ম বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে নামমাত্র মূল্যে হস্তান্তর করেন। এ সংগ্রহ জাদুঘরের এক অমূল্য সম্পদ। শিল্পাচার্যের স্ত্রী জাহানারা আবেদিনের সংগ্রহেও দুর্ভিক্ষ চিত্রসহ তাঁর কিছু মূল্যবান সৃজনকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। তাছাড়া দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সংগ্রহশালা ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে তাঁর অসংখ্য শিল্পকর্ম সংরক্ষিত হয়েছে। সম্প্রতি জয়নুলের ওপর বেশ কিছু জীবনীগ্রন্থ ও অ্যালবামধর্মী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ইতালির খ্যাতনামা প্রকাশনা সংস্থা Skira ও ঢাকার বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ প্রকাশনা (২০১২) Rosa Maria Falvo সম্পাদিত Great Masters of Bangladesh : Zainul Abedin বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ গ্রন্থটি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ব্যাপক আন্তর্জাতিক প্রচারে কাজ করছে।

বাংলাদেশে চারুকলার উন্নয়নে জয়নুল আবেদিন তাঁর অবদানের যথার্থ সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছেন ‘শিল্পাচার্য’ সম্বোধনে। এ শিরোপা তাকে উপহার দিয়েছেন তারই গুণমুগ্ধ শিষ্যরা। জয়নুল আবেদিন উপমহাদেশ তথা বিশ্বের এক বিস্ময়কর শিল্প-প্রতিভা। তিনি যেমন ছিলেন শিল্পাচার্য, তেমনি ছিলেন শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের এক বিরল উদ্যোগী ও সফল মানুষ, জনদরদি, দেশপ্রেমিক ও খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতির আদর্শ প্রতিনিধি। তাঁর মৃত্যুর ৪০ বছর পর আমরা বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে জয়নুল আবেদিনের ভূমিকা ও গুরুত্ব প্রবলভাবে উপলব্ধি করছি। এ দেশে শিল্পকলা আন্দোলন ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে, সমৃদ্ধ হচ্ছে। এসবের মূল প্রেরণা অবশ্যই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

দায় স্বীকার: বর্তমান লেখক রচিত জয়নুল আবেদিন: তাঁর কাজ ও কথা (২০০২) গ্রন্থ ও জয়নুল বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য রচনা

 

লেখক: শিক্ষাবিদ ও শিল্প লেখক