‘আমি নিজেকে পৃথিবীর একজন নাগরিক ভাবতে ভালোবাসি। মানুষ হিসেবে আমাদের মানুষের প্রতি মমত্ব বোধ যদি সর্বজনীন না হয়, তবে আমরা কখনই যুদ্ধবিগ্রহ কাটিয়ে উঠতে পারব না।’
কথাগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এমন একজন ব্যক্তিত্বের মুখনিঃসৃত, যাকে অবিসংবাদিতভাবে কাঠামোগত প্রকৌশলবিদ্যার আইনস্টাইন বলা হয়ে থাকে। বিংশ শতাব্দী তো বটেই, এমনকি আজকের দিনেও শতাধিক তলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণে আর যেকোনো প্রকৌশলীর চেয়ে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি। একের পর এক অভূতপূর্ব ভবন নির্মাণের ধারণা প্রবর্তন করে মানুষের সামর্থ্যের সর্বাধিক সীমাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি ড. ফযলুর রহমান খান। পৃথিবীব্যাপী যিনি এফ আর খান হিসেবে পরিচিত।
ড. খান ছিলেন সুউচ্চ ভবনের কাঠামোগত নির্মাণ পদ্ধতির পথপ্রদর্শকদের অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা সভ্যতা তখন ঝুঁকে পড়ছিল সুউচ্চ ভবন নির্মাণের নিত্যনতুন আঙ্গিকে। তত্কালীন নির্মাণশিল্পের নকশাকারীরা তাদের মেধার সবটুকু দিয়ে সর্বোচ্চ চূড়াটি অর্জন করে নিতে মরিয়া। কিন্তু শুধু স্ট্রাকচারাল সিস্টেম সমাধান করাটাই যথেষ্ট ছিল না। এর সঙ্গে প্রয়োজন অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য। ড. খানের উদ্ভাবনী ‘টিউবুলার ডিজাইন’ পদ্ধতি তখনকার সময়ে স্কাই স্ক্রাপার নকশায় রেনেসাঁর সূচনা করেছিল। তাঁর উদ্ভাবিত তত্ত্ব এখনো সুউচ্চ ভবন নির্মাণে মৌলিক পাঠ্য হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়। শুধু তা-ই নয়, এফ আর খান টিউবুলার থিওরি, ফ্রেম টিউব, বান্ডল টিউব, ট্রাসড টিউব, ক্রস ব্রেসিং সিস্টেমের মতো আরো কিছু নতুন ধারণা নিয়ে আসেন; যার সামগ্রিক প্রতিফলন দেখা যায় সে সময়ের সর্বোচ্চ কাঠামোগুলোয়। ড. খানের অনবদ্য নকশায় ১১০ তলা সিয়ারস টাওয়ার (বর্তমান উইলিস টাওয়ার) ১৯৭৩ সালে উদ্বোধনের পর পৃথিবীর সর্বাধিক উচ্চতাবিশিষ্ট হাইরাইজের আখ্যা পায়। প্রায় ২৫ বছর এ সম্মান অটুট থাকে, যা এখনকার সময়ে অকল্পনীয়! একই সময়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অট্টালিকার নকশাও ছিল এফ আর খানের ঝুলিতে। জন হ্যানকক টাওয়ার, যেটিতে ড. খান সর্বপ্রথম স্কাই লবি ও ইনডোর সুইমিং পুলের ধারণা নিয়ে আসেন। তখনকার সময়ে তাঁর এ উদ্ভাবনী চিন্তা এক যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করে। প্রথমবারের মতো মানুষ স্কাই স্ক্রাপার বা সুউচ্চ ভবনে একই সাথে থাকা ও কাজ করার সুবিধা খুঁজে পেল, যা কাঠামোগত উদ্ভাবন তো বটেই, মানুষের জীবনযাত্রায়ই নতুন এক মাত্রা যোগ করে। প্রথাগত স্টিল ফ্রেমের ব্যবহার থেকে সরে এসে বান্ডল টিউবের সংযোজন সুপার স্ট্রাকচারের আপাতভারবাহী ক্ষমতাও বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। ফ্রেম টিউব ব্যবহারের ফলে অভ্যন্তরের কলাম থেকে কলামের মধ্যে দূরত্ব বাড়ল। ফলে কলামসংখ্যা কমে আসায় বেড়ে গেল ব্যবহারযোগ্য মূল্যবান ফ্লোর স্পেস। এফ আর খান এখানেই থেমে থাকলেন না। এবার তিনি গবেষণায় নেমে গেলেন কীভাবে টিউবুলার কনসেপ্ট থেকে নির্মাণসামগ্রীর পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়, যার ফলে কমে আসবে প্রতি বর্গফুটে নির্মাণ খরচ। একই সাথে স্থাপনাকে করা যায় আরো খোলামেলা। টিউবের ধারণার সাথে নিয়ে এলেন পরিধি বরাবর স্টিল কলাম ব্যবহারের কনসেপ্ট। এ পদ্ধতি ব্যবহারে খরচ কমে এল ১৫ শতাংশ এবং স্টিলের পরিমাণ কমিয়ে আনা গেল প্রায় ৫০ শতাংশ।
এফ আর খান পৌঁছতে চেয়েছিলেন স্থাপনার সর্বোচ্চ উচ্চতায়, কিন্তু মাটিকে তিনি কখনই ভুলে যাননি। খানের নকশায় সবসময় আমরা মাটির মানুষের প্রতি মমত্ব দেখতে পাই। প্রতিটি ভবনের নিচতলার প্রতি খানের ছিল অসামান্য মনোযোগ। ভবন যত উঁচুই হোক না কেন, তার নিচের চত্বরে শহর ও মানুষ মিলে যায়। তার সব ডিজাইনে প্লাজা ছিল রাস্তার সঙ্গে উন্মুক্ত। প্লাজায় গাছ, পানির ফোয়ারা, মানুষের বসার জায়গা অন্তর্ভুক্ত করে যেন স্বাগত জানাতেন নগরকেই। এফ আর খান সবসময় চাইতেন তার নকশার মাধ্যমে নাগরিক ও শহুরে বৈশিষ্ট্যকে উদযাপন করতে।
এফ আর খানের প্রতিভা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তাঁর এক সহকারী রিচার্ড এফ কিয়েলার খানকে এভাবে তুলে ধরেন। ১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল, ঢাকার আগামাসি লেনে জন্ম নেয়া ফযলুর রহমান খান ম্যাট্রিক পাস করেন আরমানিটোলা গভ. হাই স্কুল থেকে। ছোটবেলা থেকেই খান গণিতের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। তার পিতা খান বাহাদুর আব্দুর রহমান খান ছিলেন কলকাতায় গণিতের গোল্ড মেডেলিস্ট এবং গণিতের পাঠ্যপুস্তকপ্রণেতা। শেষ বয়সে তিনি জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। পিতার অনুপ্রেরণায় এফ আর খানের গণিতের প্রতি ভালোবাসা আরো বাড়তে থাকে। ম্যাট্রিকুলেশনের পর খান পদার্থবিজ্ঞান অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং— এ দুটো থেকে কোনটি বেছে নেবেন, সে বিষয়ে অনিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা ছিলেন দূরদর্শী। তিনি খানকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভবিষ্যত্ সম্ভাবনা ও নতুন কিছু করার চ্যালেঞ্জ নিতে বলেন। বুয়েট থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ পেয়ে ১৯৫২ সালে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার্থে গমন করেন। তাঁর অসামান্য মেধার আরেকটি নমুনা আমরা দেখি যখন তিনি মাত্র তিন বছরে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দুটি মাস্টার্স ও একটি পিএইচডি অর্জন করেন।
১৯৫৫ সালে এফ আর খান একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন, যা পরবর্তীকালে নির্মাণশিল্পের ইতিহাসে অনেক বড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছিল। একাধিক প্রতিষ্ঠানের আবেদন অগ্রাহ্য করে খান যোগ দেন স্কিডমোর ওয়ইং মেরিল (SOM) নামের এক ফার্মে। পরবর্তীকালে খানকে তার এ সিদ্ধান্তের কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি অকপটে জানান তাকে শুরুতেই অনেক কঠিন একটি প্রকল্পে সুযোগ দিয়েছিল এবং তিনি এ চ্যালেঞ্জ লুফে নেন। সহজ কাজ খানকে কখনই টানতে পারেনি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই তার এ মনোভাব তাকে যে বহুদূর নিয়ে যাবে, তা ছিল বলাই বাহুল্য। আর এ SOM-এর সাথে মিলেই এফ আর খান কয়েক বছরের মধ্যেই ইতিহাস রচনা করে তৈরি করলেন তার অসাধারণ সব সৃষ্টিকর্ম।
তাঁর নকশায় শুধু কাঠামোগত সমাধানই নয়, বরং নান্দনিকতার মিশেলও লক্ষণীয়। এফ আর খান সেসব বিরল প্রতিভাবানের মধ্যে অন্যতম, যিনি ভবন নির্মাণকে স্থপতির শিল্পরুচি ও প্রকৌশলীর সংগঠনমূলক দৃষ্টিতে দেখেছেন। ফলে ড. খান ক্রমান্বয়ে বেশকিছু অসাধারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়ে যান। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে ডে উইট অ্যাপার্টমেন্ট শিকাগো (১৯৬৩), হজ টার্মিনাল, কিং আবদুল আজিজ এয়ারপোর্ট জেদ্দা (১৯৭৪-৮০), কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটি জেদ্দা (১৯৭৭-৭৮), ওয়ান ম্যাগ্নিফিসেন্ট মাইল শিকাগো (১৯৮৩), অন্টেরি সেন্টার শিকাগো (১৯৮৬), ইউএস ব্যাংক সেন্টার (১৯৭৩), ওয়ান শেল প্লাজা (১৯৭১) অন্যতম।
আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব স্টিল কনস্ট্রাকশনসহ অসংখ্য বিখ্যাত সংস্থা তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মানে সম্মানিত করে। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শিকাগোয় তাঁর নামেই একটি সড়কের নামকরণ হয়েছে। ১৯৮২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস স্থপতিদের প্রতি এফ আর খানের অবদানের কথা স্মরণ করে একটি সম্মাননাপত্র প্রকাশ করে।
ড. খান স্বপ্ন দেখতেন, বাংলাদেশের মাটিতেও একদিন শততলার দালান হবে। তার ইচ্ছা ছিল দেশীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেই দেশের আবহাওয়ার উপযোগী স্কাই স্ক্রাপারের নকশা করবেন। এফ আর খান প্রকৌশলবিদ্যার মানুষ হয়েও সবসময় চেয়েছেন জীবন ও মানবিক মূল্যবোধকে সবার আগে রাখতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসীদের একত্র করে দেশে তহবিল পাঠিয়েছেন, প্রতিবাদের কণ্ঠে সমালোচনা করেছেন যুদ্ধের। ছিলেন শিল্প, সংগীত, নাটকের ভক্ত। যখনই সুযোগ পেতেন রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন ও গাইতেন। তাঁর ছোট ভাইয়ের বর্ণনায় জানা যায়, এফ আর খানের গানের গলা ছিল অসাধারণ। যেকোনো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে যেতেন এবং কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই গাইতেন। শিল্পকর্মের প্রতি ছিল তার অপরিসীম শ্রদ্ধা। তাঁর স্ত্রী লিসোলেট ও কন্যা ইয়াসমিনের বর্ণনায় এফ আর খানের পেইন্টিং ও আর্টের প্রতি আগ্রহের কথা জানা যায়। গগেনহেইম আর্ট গ্যালারির প্রায় সব ছবির অসাধারণ বর্ণনা দিতে পারতেন ড. খান। একজন প্রকৌশলী হয়েও মানুষ ও শিল্পের প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসাই বলে দেয়, এফ আর খানের মানবীয় দিক তার নকশায় কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অসামান্য মেধাবী ড. খানের স্থান, কাল ও পাত্রের প্রতি অপূর্ব সংবেদনশীলতা প্রতিফলিত হয় তাঁর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে, স্থাপনারীতির নতুনত্বে। একজন প্রাযুক্তিক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে পৃথিবীর নাগরিক হিসেবে ভাবতে ভালোবাসতেন, যা আবশ্যিকভাবেই সম্ভব হয়েছে তার এ সংবেদী মননশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে। ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ মাত্র ৫২ বছর বয়সে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এফ আর খান। তাঁকে সমাহিত করা হয় শিকাগোর গ্রেস ল্যান্ড সিমেট্রিতে। আজন্ম রবীন্দ্রভক্ত এফ আর খানের কবরের ফলকে তারই প্রিয় গানের স্তবক লিখিত আছে— তোমার হল শুরু, আমার হল সারা—
তোমায় আমায় মিলে এমনি বহে ধারা
লেখক: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, বাংলাদেশ






