‘পয়ৈতু মৃত্যুমৃতংম ঐতু’।
মৃত্যুপরগত হোক অমৃত্যুতে, জীবন পূর্ণ হোক।
প্রাচীন ভারতীয় মহান ঋষিদের মতো যোগেশচন্দ্র ঘোষের জীবনব্রতও এ রকমই ছিল। তার সাধনা ঔষধালয় সেই সাক্ষ্য হাজির করে আজো। শত বছরের ব্যবধানে দেশে-বিদেশে যা জারি আছে ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে। সাধনার এ সাফল্যকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, শিকড়ের ডানা হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
সাধনা উপমহাদেশের আধুনিক আয়ুর্বেদ ঔষধালয়ের অন্যতম পথিকৃত্ এক প্রতিষ্ঠান, যা আজ একটি নাম, একটি ইতিহাস! এর শেকড় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় হলেও তা একদা ডানা মেলেছিল চীনসহ ইউরোপ-আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে। পাঁচ হাজার বছর ধরে যে চিকিত্সাব্যবস্থা আজো প্রচলিত রয়েছে, তার নাম আয়ুর্বেদ— যা কখনো কখনো মূল স্রোত থেকে সরে গেলেও তার উপস্থিতি লুপ্ত হয়নি; বরং সমাজের এক অংশের কাছে তার আবেদন আজো অটুট ও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
ভারতবর্ষে আয়ুর্বেদের ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরের পুরনো হলেও এ শাস্ত্রের প্রথম লিখিত বই ‘চরক সংহিতা’। বইটির রচয়িতা চরকের জন্ম ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সংস্কৃতে লিখিত বইটি অনূদিত হয়েছে লাতিন, আরবি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায়। আজ থেকে হাজার বছর আগে যখন আজকের পাশ্চাত্যে হাসপাতালের ধারণা ছিল না, তখন এখানে আয়ুর্বেদের বেশ কয়েকটি আরোগ্যশালার উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয়, আয়ুর্বেদ এখানে আমজনতার চিকিত্সা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ছিল। বেদে এর কথা বহুস্তরে বহুভাবে এসেছে।
‘‘প্রাচীন ভারতের ঋষি পতঞ্জলি দেড় হাজারের অধিক বছর আগে ‘যোগসূত্র’ রচনা করেছিলেন। সেটি মানুষের চিত্তবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে সমাধির মাধ্যমে তাকে মোক্ষলাভের দিকে পরিচালিত করার একটি আধ্যাত্মিক প্রয়াস। মধ্যযুগে এ সূত্র নিয়ে মানুষের উত্সাহ জন্মায়। ইসলামিক পণ্ডিত আল-বিরুনি যোগসূত্রের অনুবাদ প্রকাশ করেন। তার পর আর এক দীর্ঘ ‘সমাধি’র পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ‘যোগসূত্র’র পুনর্জন্ম হয় স্বামী বিবেকানন্দের প্রচেষ্টায়।’’ (যোগে বাণিজ্য : সুমিত মিত্র, দেশ, ২ জুলাই ২০১৬)।
আয়ুর্বেদের দীর্ঘ ইতিহাসে এ ধারাবাহিকতায় নিজেকে কর্মযোগী এক ঋষিমানব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন যোগেশচন্দ্র ঘোষ। তার জীবন তিনি এ শিল্পের প্রতি উত্সর্গ করেছিলেন। এ শুধু কথার কথা নয়, জীবন দিয়ে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন।
অন্যদিকে তার মৃত্যু যেমন ছিল বেদনাবিধুর, তেমনি দেশপ্রেমের অনন্য এক অমোঘ মন্ত্র।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার অনেকেই শহর ছেড়ে পালিয়েছেন। পুরো এলাকায় বাড়ি কাম কারখানায় কেবল যোগেশ বাবু রয়ে গেলেন। বিরাট এলাকাজুড়ে সাধনা ঔষধালয় কারখানা। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়, করেছেন গবেষণা। তার একমাত্র সাধনাস্থল এ কারখানা। এখানকার একেকটা ইটে আছে তার মমতার ছোঁয়া! নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সঙ্গী ছিলেন কারখানার শ্রমিকরা। সবাই যখন কাজ সেরে ফিরে যেতেন, তখন কেবল থাকত সুরুজ মিয়া ও রামপাল। সুরুজ মিয়া ও রামপাল কারখানার দারোয়ান। তারা দীর্ঘ ১৭ বছর যোগেশ বাবুর সঙ্গে কাটিয়েছেন। ২৫ মার্চের পর সবাই যখন একে একে যোগেশ বাবুকে ফেলে চলে গেলেন, গেলেন না কেবল এ দুজন!
গভীর রাত। একটি মিলিটারি জিপ এসে থামল। পাঁচ থেকে ছয়জন সশস্ত্র সৈনিক জিপ থেকে নামল। তাদের সবার হাতে ভারী অস্ত্র। একে একে গেটের তালা ভেঙে ফেলল তারা। কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ল। পাহারাদার সুরুজ মিয়ার হাতের বন্দুকও গর্জে উঠল। সেনাদের দিকে তাক করে তিনিও গুলি ছোড়া শুরু করলেন। শুরু হলো অসম যুদ্ধ। সামান্য অস্ত্র, সামান্যতম অস্ত্র চালনায় পারদর্শী এক সাধারণ বাঙালি সুরুজ মিয়া পাহারাদারের কাছে হার মানল পাকিস্তানি সৈন্যরা। রাতের আঁধারে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে গেল। সুরুজ মিয়া যোগেশ বাবুকে বললেন পালিয়ে যেতে। যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এসব ছেড়ে আমি কোথায় যাব?
কয়েকদিনের ব্যবধানে পাকিস্তানি আর্মি আবার ফিরে এলো বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও লোকবল নিয়ে। পাকিস্তানি সেনারা নিচে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করাল।
এরা যোগেশ বাবুকে উপরে নিয়ে যায় এবং বুলেটের গুলিতে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। জানা যায়, পাকিস্তানি আর্মিরা শুধু তাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লুটে নিয়ে গিয়েছিল যোগেশ বাবুর অর্জিত অনেক অর্থসম্পদ। সেদিন ছিল ৪ এপ্রিল।
যোগেশচন্দ্র ঘোষ দীর্ঘসময় জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। অবসরের আগের দুই বছর সেখানে অধ্যক্ষ ছিলেন। রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রির ফেলো এবং আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির এ সদস্য পরে আয়ুর্বেদে আগ্রহী হন। বিখ্যাত টুথপাউডার ‘সাধনা দশন’ থেকে শুরু করে ‘শ্রী গোপাল তেল’ তারই সৃষ্টি। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা যোগেশচন্দ্র ঘোষ ৮৪ বছর বয়সে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রাণ হারান। যোগেশ বাবুর অমর সৃষ্টি সাধনা ঔষধালয় সম্পর্কে একদা আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছিল, ‘সাধনা ঔষধালয়ের অধ্যক্ষ মহাশয় নিজে বিশেষভাবে সমগ্র প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধান করেন। তিনি যত্নসহকারে পরীক্ষা করিয়া না দেখিবার পূর্বে সাধনা ঔষধালয়ের কোনো ঔষধ বাজারে বাহির করা হয় না। কাজেই সাধনা ঔষধালয়ের ঔষধের বিশুদ্ধতা ও কার্যকারিতা গ্যারান্টি প্রদত্ত।’
অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ এ দেশের আয়ুর্বেদশাস্ত্রের এক কিংবদন্তিতুল্য নাম। তিনি তার প্রতিষ্ঠিত ‘সাধনা ঔষধালয়’-এর মাধ্যমে এ সুনাম অর্জন করেন। পৃথিবীতে যত দিন আয়ুর্বেদশাস্ত্র থাকবে, তত দিন এ চিকিত্সা বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্রের নাম। দুঃখের বিষয়, এ প্রজন্ম তো বটেই, এ দেশের শিক্ষিত জনদের অনেকেই তার সম্পর্কে কোনোকিছু জানেন না। তার চেয়েও দুর্ভাগ্য, তার রক্ত ও ঘামে গড়া প্রতিষ্ঠান সাধনা ঔষধালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কিছু জানেন না। অথচ তার সম্পর্কে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী মন্তব্য করেছেন এভাবে— “লুপ্তপ্রায় আয়ুর্বেদের পুনরুজ্জীবনের জন্য অধ্যাপক শ্রীযোগেশচন্দ্র ঘোষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কাহিনী আমি অনেক দিনই শুনিয়াছি। তাহার সাধনা ঔষধালয়ের নামও আমার নিকট বিশেষ পরিচিত। আয়ুর্বেদীয় চিকিত্সা পদ্ধতি আমাদের দেশের নিজস্ব সম্পদ। এ কারণেই আয়ুর্বেদ সম্বন্ধে চিরকালই আমার একটা গর্ব ও মমত্ববোধ আছে। বিভিন্ন ঔষধ প্রস্তুতরত সাধনা ঔষধালয়ের কারখানাটি পরিদর্শন করিয়া আজ আমি বিশেষ আনন্দ লাভ করিয়াছি।
আমাদের দেশের শতকরা ৯০ জন লোকই হইল দরিদ্র। অধিক মূল্যের বিদেশী ঔষধ ক্রয় করিয়া রোগের চিকিত্সা করা তাহাদের পক্ষে একান্তই অসাধ্য ব্যাপার। সুলভমূল্যের আয়ুর্বেদীয় ঔষধাদির প্রয়োজন এ দেশে অবশ্য স্বীকার্য্য। সাধনার ঔষধাদি সেবনে বহুলোক উপকৃত হইতেছেন। তাই সাধনা ঔষধালয়ের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হউক, ইহাই আমি আন্তরিকভাবে কামনা করি।”
এ লেখা তৈরির সময় তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেও এ ব্যাপারে যোগেশচন্দ্র ঘোষ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। যতটুকু সম্ভব হলো, তা শুধু ইন্টারনেটের কল্যাণে। একাধিক ওয়েবসাইট, ব্লগ ও ব্যক্তিপর্যায়ের লেখালেখি থেকে।
যোগেশচন্দ্র ঘোষের জন্ম ১৮৮৭ সালে শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার জলছত্র গ্রামে। তার বাবার নাম পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। গ্রামের বাড়িতেই তার ছেলেবেলা কাটে। গ্রামের এক স্কুলেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ও মেধা দেখে পূর্ণচন্দ্র ঘোষ তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। তখন পুরান ঢাকাই ছিল মূল শহর। সেখানে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা জুবিলি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। ১৯০২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে যোগেশচন্দ্র ঘোষ প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। তার পর ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন। বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর রাখতেন তিনি। তার বন্ধুদের অনেকেই তখন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি সরাসরি এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন— এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে স্বদেশচিন্তা যে তার ভেতরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যার প্রমাণ বিদেশী ওষুধের চেয়ে তিনি দেশীয় গাছগাছড়ার মাধ্যমে চিকিত্সাকে গুরুত্ব দিতেন। যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন, তার পর চলে যান পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে গিয়ে কোচবিহার কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে কোচবিহার কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এমএ ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পান প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে। ধীরে ধীরে তার সঙ্গে রায়ের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। প্রফুল্লচন্দ্র রায়ই তাকে দেশজ সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগানোর জন্য ব্যাপক উত্সাহিত করেন। বলা যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ই তাকে স্বদেশপ্রেমের বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়া হাতেনাতে শিখিয়ে দেন। ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করার পর তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ইংল্যান্ড চলে যান। সেখান থেকে এফসিএস ডিগ্রি লাভ করেন। তার পর তিনি আমেরিকায় যান এবং সেখান থেকে এমসিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরিবাকরি নিয়ে আমেরিকায় বেশ স্বচ্ছন্দেই জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে দেশে ফিরে আসেন। ১৯০৮ সালে দেশে ফিরেই যোগেশচন্দ্র ঘোষ যোগ দেন ভাগলপুর কলেজে। সেখানে একটানা চার বছর রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে গৌরবের সঙ্গে কাজ করেন। পরে চলে আসেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। ১৯১২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর তিনি জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেন। জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তার চিকিত্সা বিজ্ঞানের কাজকেও একই গতিতে এগিয়ে নিয়ে যান। অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ কিশোর বয়স থেকেই দ্রব্যগুণ সম্পর্কে যে উত্সাহ লাভ করেছিলেন, যৌবনে শিক্ষাগুরু বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি এ বিষয়ের ওপরই গবেষণা শুরু করেন। যোগেশ বাবুর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান দেখে প্রফুল্লচন্দ্র রায় লিখেছিলেন— ‘প্রফেসার শ্রীযোগশচন্দ্র ঘোষ, আয়ুর্বেদশাস্ত্রী, এমএ, এফসিএস (লন্ডন), এমসিএস (আমেরিকা) কর্তৃক পরিচালিত সাধনা ঔষধালয়ের কারখানা পরিদর্শন করিয়া বড়ই প্রীতি লাভ করিলাম। এখানে বহুল পরিমাণে ঔষধাদি প্রস্তুত হইয়া থাকে এবং প্রফেসার ঘোষ স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া কারখানা তত্ত্বাবধান ও ঔষধাদি প্রস্তুত করিয়া থাকেন। ঔষধগুলি যাহাতে বিশুদ্ধ ও অকৃত্রিম হয় তত্প্রতি অধ্যক্ষের বিশেষ দৃষ্টি আছে। এই কারখানার ঔষধ বিশুদ্ধভাবে প্রস্তুত করা হয় বলিয়াই এখানকার ঔষধগুলি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য দেশসমূহে খুব কাটতি হইতেছে— ইহাই আমার বিশ্বাস ও ধারণা। প্রফেসার ঘোষ আমার একজন প্রাক্তন ছাত্র। আয়ুর্বেদে তাহার এই অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়া বড়ই আনন্দ লাভ করিলাম।”
মানুষকে রোগ থেকে স্বল্পমূল্যে মুক্তি দিতে যোগেশচন্দ্র ঘোষ দেশীয় গাছপালা থেকে ওষুধ তৈরির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তিনি ১৯১৪ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী গেণ্ডারিয়ায় ৭১ দীননাথ সেন রোডে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’। এ প্রতিষ্ঠানের ওষুধ পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটি একটি মহীরুহে পরিগণিত হয়। ব্যক্তি যোগেশ ও তার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু লিখেছেন— “আমি ঢাকার সাধনা ঔষধালয় পরিদর্শন করিয়াছি এবং তাহাদের ঔষধ সুসংরক্ষণ, প্রস্তুত প্রণালী ও সৌষ্ঠবযুক্ত কার্য্যসম্পাদন-ব্যবস্থা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি। সাধনার প্রস্তুত ঔষধাবলীর শাস্ত্রীয়তা ও অকৃত্রিমতা সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণরূপে নিঃসন্দেহ হইয়াছি। অধ্যক্ষ মহাশয়ের জনহিতৈষণার মনোভাবও বিশেষ প্রশংসার যোগ্য। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ম্মপ্রচেষ্টাকে সমর্থন করিলে আয়ুর্বেদকেই সমর্থন করা হইবে। সত্যাসত্যই আয়ুবেদানুসারী বলিয়া সাধনার প্রস্তুত ঔষধাবলীর ব্যবহারের দ্বারা যে কেবল রোগ-আরোগ্যের পক্ষে বাঞ্ছিত লাভই হইবে তাহা নয়, পরন্তু ঔষধগুলির এই প্রকার ফলপ্রসূশক্তি আয়ুর্বেদীয় চিকিত্সকগণের জনপ্রিয়তাকেও বহুল পরিমাণে বর্দ্ধিত করিবে। ঢাকার এই সর্ব্বপ্রধান ঔষধালয়ের কর্তৃপক্ষ যেরূপ নিষ্ঠা ও সফলতার সহিত আয়ুর্বেদের সেবা করিতেছেন, তাহাতে আমি তাহাদিগকে অভিনন্দিত না করিয়া পারিলাম না।”
অনেকের ধারণা, তিনি নিজের স্ত্রীর নামে এ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করেছিলেন, কিন্তু তা নয়। তিনি নিজের স্বপ্ন-সাধনা থেকে প্রতিষ্ঠানের এরূপ নামকরণ করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে এটি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও সুনাম অর্জন করে; দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে এর শাখা ছড়িয়ে পড়ে। তার গবেষণা, অদম্য সাধনা ও কর্মোদ্যমের ফলে আয়ুর্বেদ চিকিত্সা ও আয়ুর্বেদীয় ওষুধ প্রস্তুতপ্রণালি আধুনিক মানে উন্নীত হয়।
কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এক পত্রে সেই সত্যই যেন উত্কলিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন— “কিছুদিন হইতে আপনাকে পত্র লিখিব লিখিব মনে করিতেছিলাম। কারণ— আপনার সর্বজ্বর বটী খাইয়া আমার জ্বর সারিয়াছে, এই কথাটা ইচ্ছা ছিল আপনাকে কৃতজ্ঞতার সহিত নিবেদন করিব। আমি মুখ মুখেও বহু পরিচিত ব্যক্তিকে ইহার উল্লেখ করিয়াছি।”
অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ নিজের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশজ মানুষের সংযোগের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, “ব্যক্তিগত কল্যাণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া দেশের বৃহত্তম কল্যাণ কামনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করিলে সেই প্রতিষ্ঠান দেশেরও প্রিয় হয়। সিংহ যখন জাগে, তখন তাহার স্বপ্ন, তন্দ্রা এবং নিদ্রা যায় না, তাহার সিংহত্ব জাগে। জাতি যখন জাগে, তখন সকল দিক দিয়াই জাগে। একার চেষ্টাতে জাগে না, সকলের চেষ্টাতেই জাগে। সর্বপ্রকার পরিপুষ্টি লইয়া দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হউক, এই কামনা প্রতিদিনের কামনা। সুতরাং জনসাধারণ সাধনা ঔষধালয়কে তাহাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বলিয়া গণ্য করিবেন না কেন?”
অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ জগন্নাথ কলেজ থেকে অবসরগ্রহণের পর আয়ুর্বেদ ওষুধের উত্কর্ষসাধন ও আয়ুর্বেদ ওষুধকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলতে নিজস্ব গবেষণাগারেই তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। এসবই প্রমাণ করে তিনি কতটা কর্মযোগী ঋষিমানব ছিলেন। শুধু রোগী দেখা ছাড়া খুব একটা জনসমক্ষে আসতেন না। এ সময় তিনি রোগব্যাধির কারণ ও লক্ষণ, আয়ুর্বেদ চিকিত্সার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব, আয়ুর্বেদ ওষুধের ব্যবহার পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘অগ্নিমন্দা ও কোষ্ঠবদ্ধতা’, ‘আরোগ্যের পথ’, ‘গৃহচিকিত্সা, চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি’, ‘চক্ষু কর্ণ নাসিকা ও মুখ রোগ চিকিত্সা’, ‘আয়ুর্বেদ ইতিহাস’, ‘টেক্সট বুক অব এন অরগানিক কেমিস্ট্রি’, ‘সিম্পল জিওগ্রাফ’, ‘সিম্পল এরিথমেটিক’ ইত্যাদি।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে এদেশের বহু হিন্দু পরিবার ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ ফেলে দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে যান, কিন্তু যোগেশচন্দ্র ঘোষ তা করেননি। তিনি দেশের মায়ায় বাঁধা পড়ে এখানেই থেকে যান। বারবার তার জীবনে নানা দুঃসময় এসেছে, তবু কেউ তাকে নিজ দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি। তিনি ভালোবাসতেন এ দেশকে আর এ দেশের মানুষকে। ১৯৬৪ সালে যখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার শহর হিসেবে ঢাকার কুখ্যাতি ছড়িয়েছে, তখনো নির্দ্বিধায় সব সংকট মোকাবেলা করেছেন তিনি। সে সময়ের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আসিফ সিরাজ বলেন, “সেই দুর্যোগকালে আমরা তার কাছে ছুটে যাই তার সাহায্যের আশায়। তিনি আমাদের বিমুখ করেননি। তার সাধনা ঔষধালয়ের বিরাট লৌহকপাট খুলে দেন। গেণ্ডারিয়া, দনিয়া ও শনিরআখড়ার ভীতসন্ত্রস্ত হিন্দু পরিবার তার কারখানায় নিশ্চিন্তে আশ্রয় পায়, বেঁচে যায়। দারোয়ানরা বন্দুক হাতে পাহারা দিতেন, আর আমরা ছেলেরা রাস্তায় লাঠি-হকিস্টিক নিয়ে এবং কারখানার ভেতরে হামলা হলে তিনি দারোয়ানদের গুলি চালানোর হুকুম দেয়ায় রায়টকারীরা হামলা করার সাহস পায়নি। এখন ভাবি, কারখানার নিরাপত্তা, লুটপাটের কথা ভেবে তিনি তো আমাদের ফিরিয়েও দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, আর এখানেই তার মহানুভবতা, মানবতাবোধ। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। এমন মানুষকেও মরে যেতে হয় হায়েনাদের হাতে। গেণ্ডারিয়ার এমন কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন নেই, যারা তার কাছ থেকে কমবেশি আর্থিক সহযোগিতা পায়নি।”
অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি ছিলেন সদালাপী। মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত সহজেই মিশতে পারতেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ পরিবারের সদস্যের মতোই আপন করে নিতেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। শেষে খুব বেশি একটা বাইরে বেরোতেন না; শুধু নিজের পড়াশোনা আর গবেষণা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন; সকাল-বিকাল ঘরের সামনের খোলা ছাদে পায়চারি করতেন। প্রতিদিন ঘণ্টাখানেকের জন্য নিচে নেমে আসতেন, রোগী দেখতেন, ব্যবস্থাপত্র দিতেন। এছাড়া অফিস ও কারখানার কাজকর্ম তদারকি করতেন এবং ‘সাধনার বাঁদর’ বলে খ্যাত কুঠুরি মৃগয়াদের খাদ্য খাওয়াতেন। এ ছিল তার দৈনিক রুটিন।
সাধনা ঔষধালয় পরিদর্শন করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা, এ তালিকায় কাজী নজরুল ইসলামও রয়েছেন। সেই সময়ের সমাজ-রাজনীতি-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রায় সকল বিদ্বজ্জনেই সাধনা দর্শন করেছেন, তাদের মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন।
শহীদ যোগেশচন্দ্র ঘোষ আমাদের কাছে বিস্মৃতপ্রায় নাম হলেও তার অবদান লুপ্ত হওয়ার নয়। তার জীবন ও কর্ম আমাদের, নতুন প্রজন্মকে নানাভাবে আলোকিত করার অমিয় সুধায় পূর্ণ। ভারতে ‘পতঞ্জলি’ নতুন করে আয়ুর্বেদের বিপ্লব ঘটাচ্ছে। আমাদের দেশেও এখন নতুন করে আয়ুর্বেদের কদর পরিলক্ষিত হচ্ছে। ‘অরগানিক’প্রীতি ও সচেতনতা বাড়ছে। অথচ আজ থেকে শত বছর আগে শহীদ যোগেশচন্দ্র ঘোষ এ বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। সাধনা— সেই বিপ্লবের স্বর্ণশস্য।সাধনার মধ্য দিয়ে যোগেশ বাবু ওষুধকে সহজলভ্য করেছিলেন, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করেছিলেন। তাকে বিস্মৃত হলে আমাদের দেশপ্রেম, আমাদের কর্মযোগ, আমাদের মানবতাবাদ বাধাগ্রস্ত হবে, অপূর্ণ থেকে যাবে। এ কারণে শহীদ যোগেশচন্দ্র ঘোষের আগুনের পরশমণি সবার প্রাণে ছোঁয়ানো শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্যও বটে।
তথ্যঋণ: ১. উইকিপিডিয়া ২. বাংলাপিডিয়া ৩. গুণীজন ওয়েবসাইট ৪. বিভিন্ন ব্লগ ৫. সাধনা ঔষধালয় লিমিটেড ৬. আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ৭. দেশ
লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক






