বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা প্রধানতম কবি জীবনানন্দ দাশ কলকাতায় এক ট্রাম দুর্ঘটনায় যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁর বয়স ৫৫ বছর। তাঁর এই নাতিদীর্ঘ জীবনের শেষ বছরটি ছাড়া একটা ভদ্রোজনোচিত কর্মসংস্থানের জন্য তিনি তাঁর শিক্ষা-পরবর্তী জীবনের বিশাল একটা অংশ পার করেছেন বেকারত্বে এবং দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে। জীবদ্দশায় তাঁর কাব্য প্রতিভার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হয়নি, যতটুকু মূল্যায়ন হয়েছে বুদ্ধদেব বসু প্রমুখদের দ্বারা, তার চেয়ে ঢের বেশি হয়েছে বিরূপ সমালোচনা ও তাচ্ছিল্য। এই সঠিক মূল্যায়নের কিছুটা আস্বাদ তিনি লাভ করতে শুরু করেছিলেন মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে থেকে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নিয়তি তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিল, তিনি পেয়েছিলেন একটা ভদ্রোচিত জীবিকার সন্ধান, পাঠক ও সম্পাদক মহলে পেয়েছিলেন সমাদর ও স্বীকৃতি। নিভৃতচারী এবং ‘নির্জনতম’ এই কবির যে বিপুল অপ্রকাশিত রচনা তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত হয়, তাতে তাঁর প্রচারবিমুখতা প্রমাণিত হয় বটে, কিন্তু তাঁকে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের অবকাশও পাওয়া যায় তাঁর রচনার সমগ্রতা থেকে।

জীবনানন্দ মানসিক গঠনে মুখচোরা ও লাজুক স্বভাবের হলেও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে— তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব সামান্য হলেও তিনি ছিলেন কবি। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশ কবি না হলেও ছিলেন স্কুলশিক্ষক ও ধর্মযাজক (ব্রাহ্ম)। জীবনানন্দ তাঁর পিতা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘প্রায় রোজ শেষ রাতে বিশেষত হেমন্ত ও শীতকালে উপনিষদের শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে তিনি আমাদের অপরূপ সূর্যচেতনার প্রভাতে নিয়ে আসতেন।’ মা-বাবার এ গুণের যুগলবন্ধনে জীবনানন্দের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল। তাঁদের পরিবারেও ছিল সাহিত্যচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ। ফলে জীবনানন্দ খুব অল্প বয়স থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। সেসব অপক্ব কবিতা কখনই পাওয়া যায়নি। তবে ছোট ভাই অশোকানন্দ স্মৃতি থেকে তাঁর কিশোর অগ্রজের কাব্যপ্রয়াসের প্রমাণ দিয়েছেন একটা কবিতার দুটো লাইন উদ্ধৃত করে: ‘এল বুঝি বৃষ্টি এল/ পায়রাগুলো উড়ে যায় কার্নিশের দিকে এলোমেলো।’ কিশোর জীবনানন্দের বাগান করার শখও ছিল প্রবল। এখনকার সময়ের মতো তখন বরিশালে এত নার্সারি ছিল না হয়তো। তাই তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়ি থেকে ফুলের বীজ বা চারা জোগাড় করে আনতেন। কখনো কাউকে দিয়ে কলকাতা থেকেও বীজ আনাতেন তিনি। স্কুলে পড়ার সময় তিনি যে কবিতা চর্চা শুরু করেছিলেন, সেটি কলেজে গিয়েও অব্যাহত রেখেছিলেন। সে সময় ইংরেজিতেও কবিতা লিখতেন তিনি। একই সঙ্গে কিছু গানও রচনা করেছিলেন। জীবনানন্দের প্রথম জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায়ের তথ্যসূত্রে জানা যায়, স্কুলের উপরের ক্লাসে থাকতেই ছবি আঁকতে শুরু করেছিলেন তিনি, তবে সেগুলোর সবই পেন্সিল স্কেচ। এ প্রসঙ্গে তাঁর ছোট বোন সুচরিতা দাশ লিখেছেন, ‘তাঁর ছবি আঁকার নেশা ছিল, আলতো পেনসিলের মৃদু চঞ্চলতার অস্ফুট আলোছায়াময় কতই না ছবি ফুটে উঠত।’  তাঁর সেই সময়ের কবিতা, গান বা চিত্রকর্ম— কিছুই পরবর্তী সময়ে আর পাওয়া যায়নি। তবে এটুকু নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে, ছাপার অক্ষরে তাঁর প্রথম কবিতা ছিল ‘বর্ষ-আবাহন’, এটি ছাপা হয়েছিল বরিশালের ব্রাহ্ম সমাজ থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা ব্রহ্মবাদীর ১৩২৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায়। মজার বিষয়, কবিতাটি জীবনানন্দের নামে ছাপা হয়নি, রচয়িতার নামের জায়গায় কেবল ছিল ‘শ্রী...।’ বছর শেষে সারা বছরের লেখকদের যে সূচি ছাপা হয়, তাতেই দেখা যায় কবিতাটির রচয়িতা ছিলেন ‘শ্রী জীবনানন্দ দাস বিএ’।

জীবনানন্দের প্রকাশিত প্রথম কাব্যপ্রয়াসে ছদ্মনামের ব্যবহার আমাদের আবার স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর লাজুক স্বভাবের কথা, কিংবা হতে পারে কবিতাটি নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল। এমনো হতে পারে কবিতাটি কারো অনুরোধ বা নির্দেশে লিখেছিলেন বলে তিনি নিজের নামটা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। এসব ধারণার সঙ্গে গোপালচন্দ্র রায়ের অভিমত, ‘যেহেতু ব্রহ্মবাদী ব্রাহ্মদের পত্রিকা এবং জীবনানন্দ নিজে ব্রাহ্ম হলেও ব্রাহ্মদের আচার অনুষ্ঠান, এমনকি সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানই এড়িয়ে চলতে ভালবাসতেন, সেই জন্যই হয়ত ঐ পত্রিকায় নাম প্রকাশ করতে চাননি।’

জীবনের প্রথম প্রকাশিত কবিতাটিতে নিজেকে অপ্রকাশ্য রাখার যে চেষ্টা আমরা দেখলাম, সেটি কেবল বিভিন্নজনের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর অমিশুক নিভৃতচারী স্বভাবের সঙ্গেই সমিল নয়, মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত তাঁর বিপুল অপ্রকাশিত রচনাসম্ভার লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে দেয়ার বিষয়টিকেও তার সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়। তাঁর গোপনে সংরক্ষিত লেখাগুলো নিয়ে কি তবে তাঁর সংশয় ছিল কিংবা ছিল কি কোনো অতৃপ্তি? তা না হলে তাঁর জীবদ্দশায় সেসব প্রকাশের কোনো ব্যবস্থা কিংবা কোনো তাগিদ অনুভব করেননি কেন তিনি? এসব প্রশ্নের জবাব আর কখনই পাওয়া যাবে না।

আমরা জানি, জীবনানন্দ ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পাস করেছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণীতে। এ ফলাফল নিশ্চয়ই তাঁর কাম্য ছিল না। তবে এ উপলক্ষে সর্বানন্দ দাশের দৌহিত্র ও দৌহিত্রীরা বিএ, বিএসসি ও এমএ পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে সর্বানন্দ ভবনে এক বিশেষ ব্রাহ্ম ধ্যানানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি যখন এমএ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন অসুখে পড়েন, সে কারণে তাঁর প্রস্তুতি ভালো ছিল না। জীবনানন্দ চেয়েছিলেন সে বছর পরীক্ষাটা না দিয়ে পরের বছর আরো ভালো প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসতে, যাতে প্রথম শ্রেণী নিশ্চিত হয়। কিন্তু তাঁর বাবা ছেলের একটি বছর সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী ছিলেন না, তাই ছেলেকে তিনি উপদেশ দেন যাতে সে বছরই পরীক্ষাটা দিয়ে ফেলেন। ভালো প্রস্তুতি না থাকায় এমএ-তেও জীবনানন্দ দ্বিতীয় শ্রেণীতে পাস করেন। জীবনানন্দের চরিত্রের এ দিকটি লক্ষণীয়, কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবক শিক্ষাজীবনের শেষে এসেও পিতার উপদেশ শিরোধার্য করে জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বদলে দিচ্ছে। পিতার উপদেশ মেনে নিতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে বঞ্চিত হওয়া নিয়ে তাঁর খেদ ছিল কিনা আমরা জানি না, কিন্তু একটি প্রথম শ্রেণী না থাকায় তিনি কোথাও শিক্ষকতার চাকরি জোটাতে পারছিলেন না। একাধিকবার কলেজ ও সংবাদপত্রের (স্বরাজ) চাকরি থেকে পদচ্যুত হওয়ার পর দারিদ্র্য তাঁর পিছু ছাড়ছিল না। সেই দুর্বিষহ বেকার জীবনে তাঁকে গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য যেকোনো ধরনের কাজ করতে হয়েছে, এমনকি ইন্স্যুরেন্সের দালালির মতো চরম অসম্মানজনক কাজও করেছিলেন তিনি। সেই বেকারত্ব, প্রথম শ্রেণী না পাওয়ার আক্ষেপ এবং অর্থকষ্ট তাঁকে তাড়া করে ফিরেছে আমৃত্যু। তাঁর সে সময়কার হীনম্মন্যতা ও মানসিক অবস্থার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় অশোক মিত্রের লেখায়, “জীবনানন্দের সঙ্গেও কলকাতায় এলে নিয়মিত দেখা হতো, তিনি ক্রমশ উদভ্রান্ত, ক্রমশ আত্মবিশ্বাসরহিত। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা, যেমন প্রেমেন্দ্র মিত্র, যেমন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত সচ্ছলতার মুখ দেখেছেন...  অথচ তিনি নিজে একটি ভদ্রগোছের অধ্যাপনার কাজ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারছেন না। পরিচিত এঁকে-তাঁকে ধরেও কোনো ফল হচ্ছে না, আমরা যাঁরা তাঁর ভক্ত শুভানুধ্যায়ী, তাঁরাও কিছু করে উঠতে পারছি না। একদিন, বর্ষার এক সন্ধ্যা, রাসবিহারী এভিনিউর প্রায় মোড়ে, ল্যান্সডাইন রোডের গলিতে তাঁর একতলার ফ্ল্যাটের বহির্দুয়ার দিয়ে ঢুকেছি, হঠাত্ আমাকে টেনে এক কোণে, নিচু নিমগাছের ডালের আড়ালে নিয়ে গেলেন, কানে-কানে তাঁর অস্ফুট প্রশ্ন: ‘আচ্ছা, আপনি কি জানেন, বুদ্ধদেব বাবুর নাকি পঞ্চাশ হাজার টাকার ফিক্সড আছে?’ (‘আপিলা চাপিলা’, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা)।”

একজন ইংরেজির অধ্যাপনা চাকরিপ্রার্থী প্রথম শ্রেণীবঞ্চিত মানুষের এই যন্ত্রণা, হতাশা ও আক্ষেপ প্রতিফলিত হয়েছে জীবনানন্দের ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাসে। উল্লেখ্য, ‘মাল্যবান’ কিংবা ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাসদ্বয়কে যেমন জীবনানন্দের আত্মজীবনীমূলক বলে সহজে চিহ্নিত করা যায়, ‘সুতীর্থ’-কে শুরুতে তেমনটি মনে হলেও পরে সেই ধারণা আর থাকে না। তবে উপন্যাসটির শুরুতে পেশাগত জীবনের চাপে এবং সময়ের অভাবে একজন কবি যে লেখা ছেড়ে দিয়েছেন, সে ইঙ্গিত আছে। এমনকি তাঁর নিকটতম দোসর দারিদ্র্র্যই যে কবিতা লেখা ছেড়ে দেয়ার মূল কারণ, সে কথাও আছে এভাবে, “... নিজে অনেক দিন থেকে কিছু লিখছে না বটে কিন্তু সেটা অক্ষমতার জন্যে নয়, অবসরের অভাবে। অর্থের সচ্ছলতা নেই। এই নিরেট পৃথিবীতে টাকা রোজগার করতে গিয়ে মূর্খ ও বেকুবদের সঙ্গে দিন-রাত গা ঘেঁষাঘেঁষি করে মনের শান্তিসমতা যায় নষ্ট হয়ে।’

আমরা জীবনানন্দের জীবনসমগ্র যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই, কৈশোরে কবিতা লেখা, ফুলের বাগান করা, ছবি আঁকার চেষ্টা করা, তারুণ্যে ও যৌবনে কবিতার চর্চা করা একজন মানুষ কেবল পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে হীনম্মন্য হয়ে যাচ্ছেন তা নয়। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া বিভিন্নজনের ভাষ্যে জানা যায়, তিনি ছিলেন কিছুটা খাপছাড়া, যথেষ্ট মুখচোরা এবং সবার্থে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। তাঁর খাপছাড়া চরিত্রের আভাস মেলে সর্বশেষ কর্মস্থল হাওড়া গার্লস কলেজ থেকে আচমকা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। তাঁর আগের কর্মস্থল থেকে নানা ছুতোয় অনুপস্থিত থাকার বহু কারণ ছিল, কিন্তু বহুদিন বেকার থাকার পর তাঁর পছন্দসই একটা চাকরি জোটার পরও তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কিংবা মৌখিক অনুমোদন না নিয়ে হাওড়া থেকে দিল্লির মতো দূরত্বে চলে যাওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে বাস্তবরহিত খাপছাড়া এক কবি। এমনকি জীবনানন্দের প্রথম জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায়ের মতে, হাওড়া গার্লস কলেজের চাকরির জন্য তিনি প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করতেও অনিচ্ছুক ছিলেন এবং দেখা করেনওনি। পরে জীবনানন্দ যখন প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করেন, তিনি তাঁকে শুধু একটা দরখাস্ত পূরণ করতে বলে জানিয়ে দেন যে তাঁকে নিয়োগ দেয়া হবে। তাঁর কবিখ্যাতির কারণেই বোধকরি খুব দ্রুত চার-পাঁচজনকে ডিঙিয়ে বিভাগীয় প্রধান করে দেয়া হয় তাঁকে। ভাইস প্রিন্সিপাল করার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছিল একসময়। গোপালচন্দ্র জানান, এ প্রস্তাবে জীবনানন্দ রাজি না হয়ে বরং বলেছিলেন, ‘আর না, বেশ আছি।’

জীবনানন্দের আত্মসম্মানবোধ কেমন প্রখর ছিল, সে প্রসঙ্গে গোপালচন্দ্র রায়ের লেখা থেকে জানা যায়, জীবনানন্দ যখন বরিশাল বিএম কলেজের অধ্যাপক, তখন সেখানে এসডিও হয়ে এসেছিলেন অবনীমোহন কুশারী। তিনি ছিলেন জীবনানন্দের কবিতার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। অবনীমোহন একবার তাঁর দাফতরিক কাজে কয়েক দিনের জন্য সরকারি বোটে যাত্রা করেছিলেন বিভিন্ন এলাকা সফরে, সঙ্গে নিয়েছিলেন জীবনানন্দ এবং তাঁর সহকর্মী হেরম্ব চক্রবর্তীকে। সেই ভ্রমণের সুবাদে কবি উপভোগ করেছিলেন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু অবনীমোহন যতই তাঁর কবিতার অনুরাগী হন না কেন, তাঁদের যাত্রাবিরতির সময় স্থানীয় মানুষ স্বভাবতই এসডিওর মতো একজন উচ্চপদস্থ রাজপুরুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ হতে চাইবেন, সে সময় এসডিওর সঙ্গে থাকা মানুষদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র দেখায়। এ বিষয়ে হেরম্ব চক্রবর্তীর মনোভাব জানা না গেলেও জীবনানন্দ অবনীমোহনের তুলনায় তাঁর খাটো অবস্থানটা মেনে নিতে পারেননি, তাই পুরো সফরসূচি শেষ না করে ফিরতি লঞ্চে বরিশাল ফিরে এসেছিলেন তিনি।

বুদ্ধদেব বসু তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে নির্জন, সবচেয়ে স্বতন্ত্র।’ বুদ্ধদেব বসুর এ কথায় জীবনানন্দ একদিন তাঁর সহকর্মী অধ্যাপক নিরঞ্জন চৌধুরীকে বলেছিলেন, ‘নির্জন কবি, নির্জন কবি বলে বুদ্ধদেব বসু আমার সম্বন্ধে একটা লিজেন্ড খাড়া করেছেন, যেটা আমার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ঠিক নয়।’ অথচ জীবনানন্দের সঙ্গে মিশেছেন এমন অনেকের ভাষ্যে জানা যায়, তিনি কোনো অর্থেই সামাজিক ও মিশুক প্রকৃতির ছিলেন না। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘সে যেন এই সংগ্রাম-সংকুল সংসারের জন্য নয়, সে সংসার-পলাতক।... যেখানে অনাহূত ধ্বনি ও অলিখিত রং জীবনানন্দের আড্ডা সেইখানে (কল্লোল যুগ)।’ এ মন্তব্যের সূত্র ধরেই হয়তো জীবনানন্দের ছোট বোন সুচরিতা দাশ তাঁর মৃত্যুর পর লিখেছিলেন, ‘দাদার সম্পর্কে অনেক জনশ্রুতি প্রচলিত। তিনি জীবন থেকে পালিয়েছেন। তিনি মানুষের সখ্য সহ্য করতে পারেন না। তিনি নির্জন, তিনি নিরিবিলি। সব কোলাহল থেকে দূরে। এসব বাক্য গঠনের সত্য-সত্যতা কতটুকু তা আমার বিবেচ্য নয়, যদিও এসবের অনেকগুলোই ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে হয়ত এতদিন।’

সবার কাছ দূরে থাকার মনোভাবটি জীবনানন্দ পোষণ করতেন আত্মসম্মানবোধ থেকে, তাঁর ধারণা ছিল অনেকের সাথে মিশতে গেলে আত্মসম্মানের বিষয়টি কোনো কোনো সময় উপেক্ষা করতে হয়, এটি তিনি মেনে নিতে পারতেন না। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার থেকে স্বতন্ত্র, একাকী ও নিভৃতচারী। তাঁর এই স্বভাব তাঁকে কী দিয়েছিল আমরা জানি না, কিন্তু বাংলা কবিতাকে দিয়েছিল নতুন মাত্রার সন্ধান। তাই তিনি লিখতে পারেন, ‘প্রকৃতির আবিল কিছু, তবু মানুষের প্রয়োজন মতো তাতে নির্মলতা আছে।’

 

লেখক: ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক