আলোকিত বিজ্ঞানী ও সমাজচিন্তক মেঘনাদ সাহা (১৮৯৩-১৯৫৬) বিজ্ঞানের ইতিহাসে একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। একজন বিজ্ঞানী, শিক্ষক, বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সফল প্রতিষ্ঠাতা, জনপ্রতিনিধি, চিন্তাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক— এ ধরনের বহু অভিধায় তাকে পরিচিত করিয়ে দেয়া যায়। বহুগুণের সমন্বয় একজন মানুষের ভেতরে কীভাবে ঘটতে পারে, তার সবচেয়ে কাছের উদাহরণ মেঘনাদ সাহা। তিনি এ ঢাকার সন্তান, এ দেশের আলো-বাতাসেই বেড়ে উঠেছেন। অবিভক্ত ভারতের ঢাকার শহরতলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম এ পথপ্রদর্শক, দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে তার সে অবদানের কথা। তিনি পৃথিবীর সামনে ‘আনয়নের সমীকরণ’ রহস্য উন্মোচন করে কার্যত পৃথিবীখ্যাত বিজ্ঞানীদের সামনে ঘোর তৈরি করেন।
দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া মেঘনাদ সাহা তাঁর সমকালের অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। পরবর্তীতে যার অনন্য গুণ আর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছেন পৃথিবীখ্যাত, নোবেল পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানীরাও। তত্কালীন বিজ্ঞানের গতিধারার সঙ্গে ভারতের বিজ্ঞানচর্চার একটি অপূর্ব সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জয়জয়কার ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা নেয়ার জন্য তাকে কল্পনাতীত সংগ্রাম করতে হয়েছে, প্রাথমিক পাঠ শেষ হওয়ার পর তার মুদিদোকানি পিতা সন্তানের জন্য এর বেশি পড়াশোনায় আগ্রহ দেখাননি। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় তার শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়। এভাবে শেষ পর্যন্ত মেঘনাদ সাহাই তাঁর সমকালের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনন্য উচ্চতায় আরোহণ করেন, নোবেল কমিটিতে অন্তত চারবার পেয়েছেন মনোনয়ন। সারা জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য ফেলোশিপ ও সম্মাননা।
দেশে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর হাতেখড়ি তার হাত ধরেই। ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স, ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি প্রভৃতি বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার নেতৃত্বেই আলোয় আসতে পেরেছে। শুধু প্রবল আগ্রহ আর ইচ্ছাশক্তির জোরে গণিতের ছাত্র হয়েও শিখরে পৌঁছেছেন পদার্থবিদ্যায়; যার প্রমাণ মেলে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা যখন তার লেখা ‘টেক্সট বুক অব হিট’ বইটি আবশ্যক মনে করে পড়েন। রাজনীতিসচেতন এ বিজ্ঞানী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভারতের লোকসভার সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। উপমহাদেশে প্রথম বিগ ব্যাং, পারমাণবিক তত্ত্বের পরীক্ষণ সহজ করা যন্ত্র সাইক্লোট্রনের প্রতিষ্ঠাও হয়েছে তার হাতে।
নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় সমগ্র ঢাকা জেলার মধ্যে প্রথম হয়ে মাসিক ৪ টাকা বৃত্তিলাভ মেঘনাদের বড় হওয়ার মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিল সেই ছেলেবেলাতেই। এন্ট্রান্স ও উচ্চ মাধ্যমিকে পূর্ববঙ্গে প্রথম হওয়া ছিল তারই ধারাবাহিকতা। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় কলেজ ম্যাগাজিনে হ্যালির ধূমকেতু নিয়ে প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ হয় তার। কথিত আছে, ভীষণ ঝড়বৃষ্টির মধ্যে জন্মেছিলেন বলে ঠাকুর মা তার নাম রেখেছিলেন মেঘনাথ, পরে স্কুলে ভর্তি হলে নাম হয় মেঘনাদ।
কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১৩ সালে গণিতে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় হয়ে বিএসসি পাস করেন মেঘনাদ। প্রেসিডেন্সিতে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখ ছিলেন তার সরাসরি শিক্ষক। বিএসসি পড়ার সময় সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে যথাসম্ভব দূরে সরিয়ে রাখলেও নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু, বাঘা যতীন প্রমুখ বিপ্লবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল ধর্মীয় শ্রেণীবৈষম্যে বিরক্ত মেঘনাদের। বয়সে সুবাস চন্দ্র বসুর চেয়ে তিন বছরের বড় ছিলেন মেঘনাদ। ১৯১৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় হয়ে এমএসসি পাস করেও টিউশনি ছিল তার উপার্জনের একমাত্র উপায়, কারণ মেঘনাদের সঙ্গে বিপ্লবীদের যোগাযোগ রয়েছে বলে সরকারের কাছে রিপোর্ট ছিল।
কলকাতায় বিজ্ঞান কলেজে গণিতের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স না হয়েও বছর না পেরুতেই যোগ দেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। পড়াতে পড়াতে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভালোবাসায় পড়ে যান মেঘনাদ সাহা।
ক্যারিয়ার:
কলকাতার ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্সের গণিত বিভাগে তিনি ১৯১৬ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে প্রথাগত শিক্ষকতা জীবনে প্রবেশ করেন। প্রায় একই সময়ে একই কলেজে তাঁর সহপাঠী সত্যেন্দ্রনাথ বসুও শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিছুদিনের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা দুজনই গণিত বিভাগ ছেড়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। তখন যদিও ওই কলেজটির কোনো সমৃদ্ধ গবেষণাগার ছিল না, তবু শিক্ষকতার পাশাপাশি মেঘনাদ সাহা গবেষণায় আগ্রহ দেখান।
১৯১৭ সালে তিনি সিলেক্টিভ রেডিয়েশন প্রেসার বিষয়ে একটি দীর্ঘ আর্টিকেল রচনা করেন এবং জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান-বিষয়ক জার্নালে প্রকাশের জন্য পাঠান। কিছুদিন পর তাঁর গবেষণার একটি সংক্ষিপ্ত নোট জার্নালটিতে ছাপা হয়।
১৯১৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর তিনি তাঁর গবেষণার (Harvard Classification of Stellar Spectra) জন্য প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন।
১৯২০ সালে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের ওপর তাঁর চারটি গবেষণা প্রবন্ধ ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশ হয়। মূলত তিনি তাঁর এসব গবেষণাপত্রে (Thermal Ionization) তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছর তিনি তাঁর এ গবেষণার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Griffith Prize লাভ করেন।
প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি নিয়ে তিনি অধিকতর গবেষণার উদ্দেশ্যে দুই বছরের জন্য ইউরোপে পাড়ি জমান, আলফ্রেড ফুলারের সঙ্গে কয়েক মাস কাজ করার পর তিনি বার্লিনে যান পদার্থবিজ্ঞানী ওয়াল্টার নার্নেস্টের গবেষণাগারে গবেষণা অভিজ্ঞতাকে ঋদ্ধ করার জন্য। এর পর দেশে ফিরে ১৯২৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং পরবর্তী ১৫ বছর সেখানেই কাটান। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন এবং ১৯২৫ সালে তাকে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়।
১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন, এ সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের এমএসসি সিলেবাসে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স যুক্ত করেন। সেখানে পরমাণু বিদ্যার ওপর স্নাতকোত্তর-পরবর্তী একটি কোর্সও চালু করেন।
একজন মহান বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি বহু প্রতিষ্ঠানের পত্তন করেছেন। কলকাতায় ১৯৩৫ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ অ্যাসোসিয়েশন, ১৯৫০ সালে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স প্রতিষ্ঠা করেন। এবং তিনিই মূলত দমোদর ভ্যালি প্রজেক্টের প্রকৃত ডিজাইনার।
চিন্তাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক:
একজন বিজ্ঞানী এবং রাজনীতিসচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি একটি ম্যাগাজিন পত্রিকা প্রকাশের গুরুত্ব অনুভব করেন। যেখানে বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিজ্ঞজনদের লেখা প্রকাশ হবে। এভাবে বন্ধু এবং সহকর্মীদের সহায়তা নিয়ে তিনি সায়েন্স এবং কালচার নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন।
পত্রিকাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমাজের শিক্ষিত মানুষকে সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষার সংকট ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সচেতন করা এবং সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করা। তিনি তাঁর অনেক প্রবন্ধে দেখানোর চেষ্টা করেছেন একই সমস্যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশ কীভাবে সমাধান করেছে। যেহেতু তাঁর সময়ের যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আজকের তুলনায় দুর্বল ছিল। সে সময়েও তিনি তাঁর ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয় এবং অন্যান্য প্রবন্ধে অভূতপূর্ব চমক দেখান। যেমন ধরা যাক, হাইড্রোলিক গবেষণাগার, ভারতের সেচ পদ্ধতির গবেষণা, দমোদর ভ্যালির পরিকল্পনা, ভারতের বহুমুখী নদী প্রকল্পের উন্নয়ন, জনগণের জন্য বিদ্যুতায়ন, তেল এবং অদৃশ্য সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয় জ্বালানি নীতি ইত্যাদি।
ক্যালেন্ডার পুনর্গঠন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম একটি বড় অবদান, তাকে ১৯৫২ সালে ক্যালেন্ডার পুনর্গঠন কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়। এ সময় তিনি কঠোর পরিশ্রম করে ভারতের বিভিন্ন অংশের অন্তত ৩০টি ক্যালেন্ডার এবং পৃথিবীর ক্যালেন্ডারগুলো অধ্যয়ন করেন।
মেঘনাদ সাহার বিভিন্ন লেখা, তাঁর বক্তৃতা এবং গবেষণা, ক্যালেন্ডার পুনর্গঠনে ভূমিকা, স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে বিভিন্ন কমিশনের নেতৃত্ব দেয়া— এসবই এ বিজ্ঞানীকে একজন মহান সমাজ সংস্কারকের সারিতে স্থান দেয়।
মেঘনাদ সাহা তাঁর সারা জীবনের চিন্তা-গবেষণায় দেখিয়ে গেছেন যে, কীভাবে যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষা, বস্ত্র, ক্ষুধা এবং প্রযুক্তির অপ্রতুলতার সংকট কাটিয়ে উঠতে হয়। কীভাবে বিজ্ঞানের সুফল ঘরে তুলতে হয়। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বিশেষভাবে বাঙালির এ পরম ঘনিষ্ঠজনের অবদান আজো এ উপমহাদেশের মানুষকে আলো দিয়ে চলেছে, করছে আলোকিত।
লেখক: অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রেসিডেন্ট, রিসার্চ ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব কমপ্লিট এডুকেশন






