আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ (১৯৩১-৯৮) এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক আলোকচিত্রের শিক্ষাগুরু। এ দেশে আলোকচিত্র শিক্ষাদানে তাঁর অবদান স্মরণীয়। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই বাংলাদেশে আলোকচিত্রের এ মহীরুহের অবদান অনেক। আলোকচিত্র আবিষ্কারের বছর ১৫ পরই তা ভারতবর্ষে চলে আসে। এ আন্দোলন ঢাকায় শুরু হয় তারও ১০ বছর পর ১৮৫০ সালে। তখন আলোকচিত্র ছিল ধনিক শ্রেণীর বিষয়। নওয়াব-জমিদার আর ব্রিটিশ সরকারে নথির জন্য ছবি তোলা হতো। এ দেশে শুরুর দিকের যেসব আলোকচিত্র পাওয়া যায়, তা বেশির ভাগই ভিনদেশী আলোকচিত্রীর তোলা। তার পর ১০০ বছরের আলোকচিত্র কী হয়েছে, তা গবেষণার বিষয়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকাসহ অনেক স্থান থেকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পত্রপত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে। এ সময়ে সরকারি তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তরে আলোকচিত্র তোলার ব্যবস্থা করা হয়। আলোকচিত্র তোলা শুরু হয় সরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম প্রচারের জন্য। ঠিক এ সময়েই আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ আলোকচিত্রচর্চা শুরু করেন। তার ১০ বছর পর তিনি বাঙালিকে আলোকচিত্র শিক্ষাদানে ব্রতী হন। আমৃত্যু তিনি কাজটি করেছেন দক্ষতার সাথে।

বর্তমান আলোকচিত্র সাংবাদিকদের বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে মনজুর আলম বেগের সংস্পর্শে এসেছিলেন। আবার কেউ কাজ শুরু করছেন তাঁর ছাত্রের কাছে শিক্ষা নিয়ে। শুরু থেকেই তিনি সামান্য বিনিময়ে মূল্যবান এ শিক্ষা বিলিয়ে দিতেন। ফিল্ম ডেভেলপ, প্রিন্টের কাগজের খরচ মেটাতেন এ থেকেই। শুরুর দিকে তাঁর অনেক ছাত্র দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করতেন। তার পর আমৃত্যু মনজুর আলম বেগের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন তারা। তাঁর সর্বশেষ ব্যাচের এক ছাত্রের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন সুপুরুষ। পোশাক-পরিচ্ছদে সবসময় পরিপাটি থাকতেন। যদিও তখন তিনি ছিলেন অনেকটা অসুস্থ। এ সময়ে ছাত্রদের শেখাতেন তাঁর বারান্দায় বসিয়ে। এ শিক্ষক বন্দুক নিয়ে বসতেন মোড়ার ওপর। ক্লাসের শুরু করতেন ডানোর পট দিয়ে তৈরি পিনহোল ক্যামেরা দিয়ে। তার পর ছবি তোলা, ফিল্ম ডেভেলপ, ছবি প্রিন্ট শেখাতেন ধাপে ধাপে। ঠিকমতো কাজ না করলে বন্দুক দেখিয়ে বলতেন, গুলি করবেন। এ বন্দুকের কোনো দিনও একটি গুলি ছোড়েননি। তার পরও সবাই এ বন্দুকের ভয়ে থাকত। কখনো ভালোবেসে কখনো ভয় দেখিয়ে এ দেশে আলোকচিত্রের বিস্তার ঘটিয়েছেন। গড়েছেন দক্ষ আলোকচিত্রী। আজকের ক্যামেরায় যে উন্নয়ন, তা এক দশক আগেও ছিল স্বপ্নের মতো বিষয়। আলোকচিত্র ছিল তখন কঠিন এক প্রক্রিয়ার বিষয়। কঠিন এ বিষয়টি হাতে-কলমে মানুষের মাথায় সেট করে দিয়েছেন মনজুর আলম বেগ।

মনজুর আলম বেগ এমএ বেগ বা বেগ সাহেব নামেও পরিচিত। এ দেশে ফটোগ্রাফি উন্নয়নে তিনি কাজ করেছেন নানা মাধ্যম নিয়ে। তিনি নিয়মিত লিখেছেন ফটোগ্রাফি সম্পর্কে। এমএ বেগের পৈতৃক নিবাস নদীবিধৌত বরিশাল জেলায়। ১৯৩১ সালে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব-কৈশোর জীবন কেটেছে তার বরিশালে। বাবা ছিলেন কলেজ শিক্ষক। শৈশবে মায়ের মৃত্যুতে সম্ভ্রান্ত বংশের এ ছেলেটির জীবনে ছন্দপতন ঘটে। বিমাতার সংসারে জীবনের বড় একটা সময় কাটে কষ্টের ভেতর। বাবাও খবর রাখেননি প্রতিভাবান এ ছেলেটির। তার পরও তিনি খেলাধুলা নিয়ে মেতে ছিলেন শৈশব থেকেই।

অমনোযোগিতার মধ্য দিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৪৮ সালে। তার এক বছর পর তত্কালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। বিমান বাহিনীর সাধারণ কাজ তাকে একটুও টানেনি। তিনি কায়দা-কানুন করে করাচি বিমান বাহিনীর টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ছয় বছর বিমান বাহিনীতে ফটোগ্রাফার হিসেবে চাকরি করেছেন তিনি একাধারে। ১৯৫৫ সালে স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ দেখিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। দেশে ফিরে এসে চাকরি নেন ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসের মোশান পিকচার্স সেকশনে। সে কাজ করতে হয়েছিল তাকে ময়মনসিংহ গিয়ে। সেখানে তিনি শিক্ষিত যুবকদের ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণ দেন। তিনি জীবনের বড় একটা সময় ফটোগ্রাফার হিসেবে চাকরি করেছেন সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে।

১৯৬০ সালে তোপখানা রোডে ‘রকসি ফটো সার্ভিস’ নামে একটি স্টুডিও চালু করেন। সে বছরের ডিসেম্বরে ‘বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন বয়সের শিক্ষিতজনদের ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। শিক্ষক ছিলেন তিনি একাই। প্রথম ব্যাচে ছাত্র ভর্তি হয়েছিলেন ২০ জন। তা থেকে কোর্স সমাপন করেছিলেন ১০-১২ জন। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই এ দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ফটোগ্রাফি শিক্ষার বিস্তার ঘটে। পরবর্তী সময়ে বেগার্টের ছাত্ররা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এমএ বেগ ১৯৬৮ সালে ব্রিটেনের ‘হার্টফিল্ড কলেজ অব টেকনোলজি’ থেকে রিপ্রোগ্রাফি ও ‘কোডাক ফটোগ্রাফিক স্কুল’ থেকে রঙিন ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে এসে তার শিক্ষা ছড়িয়ে দেন ছাত্রদের মাঝে। তিনি ১৯৭৮ সালে জার্মানির ‘ফটোকিনা’ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে ভারতের ‘ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অব দমদম’ তাঁকে সে বছরের পৃথিবীসেরা ১১ জন আলোকচিত্রীর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ আলোকচিত্রের সাথে বসবাস করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তার লেখা আলোকচিত্রের ওপর বই ‘আধুনিক ফটোগ্রাফি’ দুই বাংলার ফটোগ্রাফারদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। আলোকচিত্রে অবদানের জন্য তাঁকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।

আলোকচিত্রজগতে প্রচলিত আছে, মনজুর আলম বেগ চারুকলা ইনস্টিটিউটের মতো একটি প্রতিষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন আলোকচিত্রের ওপর, যে বিদ্যাপীঠে সবসময় আলোকচিত্র পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন শিক্ষার্থীরা। সে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে দক্ষতার সাথে কাজ করবেন দেশের সব প্রতিষ্ঠানে। চাকরিতে এ প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য হবে অন্যান্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো। সে স্বপ্ন নিয়ে অনেক কাজও করেছিলেন শুনেছি। কিন্তু কেন সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়নি, তা জানা যায় না। তাই বলে বাংলাদেশের আলোকচিত্র থেমে নেই। শিল্পকলা মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এসেছে আলোকচিত্রের মাধ্যমেই। আলোকচিত্রের অস্কারখ্যাত ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস’ পুরস্কার এসেছে এ পর্যন্ত সাতটি। ছোটবড় ব্যক্তিপর্যায়ে আন্তর্জাতিক যে পুরস্কার আলোকচিত্রে এসেছে, তা লিখতে গেলে কয়েক ভলিউম হয়ে যাবে। অবাক হওয়ার মতো বিষয়, এ শিক্ষার জন্য সরকারি বা সরকার সমর্থন করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। মনজুর আলম বেগের স্বপ্নের পথ ধরে ‘পাঠশালা’ হলেও এর নেই কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এটা না স্কুল, না কলেজ, না বিশ্ববিদ্যালয়। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অনেক অর্জন হলেও এর সার্টিফিকেট কোনো কাজে আসে না। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি শিল্পের সব শাখার জিম্মাদার। এ সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিল্পের সব বিষয়ে আলাদা আলাদা বিভাগ আছে। নেই শুধু আলোকচিত্রে। অথচ শিল্পকলা একাডেমির চিত্রকলা প্রদর্শনীগুলোয় আলোকচিত্রের প্রাধান্য দেখা যায়। সেসব প্রদর্শনীতে আলোকচিত্র প্রাধান্য পেলেও সেখানে আলোকচিত্রীদের কাজ ঠাঁই পায় না। ব্যতিক্রম শুধু ঢাকা আর্ট সামিট। তারা শিল্পকলার অন্যান্য বিষয়ের সাথে আলোকচিত্রও স্থান দিয়েছে সমানভাবে। এত কিছুর পরও আশা রাখি আলোকচিত্র সামনে এগোচ্ছে, এগোবেই। এগোবে মনজুর আলম বেগের স্বপ্ন।

আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ আলোকচিত্রের পেছনে সময় না দিলে অনেক বড় কর্মতর্কা হয়ে সুখে জীবন যাপন করতে পারতেন। তা না করে তিনি কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছিলেন আলোকচিত্রকে ধারণ করে। তার প্রতিদান আমরা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। তার নামে আমরা কিছুই করতে পারিনি। পারিনি ‘বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব স্কুল’ জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনতে। সে দায়িত্ব বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এড়াতে পারে না। পারে না এ দেশের আলোকচিত্রী সমাজ।

লেখা তৈরিতে সহায়তা নিয়েছি: আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ ও সমকালীন আলোকচিত্রের বিবর্তন, জাহাঙ্গীর সেলিম

চারু ও কারুকলা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি

 

 লেখক: আলোকচিত্রী সাংবাদিক