দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বয়স ১৪ বিলিয়ন বছরের কাছাকাছি। পদার্থবিজ্ঞানীরা এ মহাবিশ্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কণা, শক্তি, তরঙ্গ— এ শব্দত্রয়ের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তবে মনে রাখা ভালো, কণা, শক্তি, তরঙ্গ— এ শব্দগুলোর দৈনন্দিন জীবনে যে অর্থ, তা কিন্তু সবসময় পদার্থবিজ্ঞানের ধ্যানধারণার সাথে মেলে না। পদার্থবিজ্ঞানে কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা (wave-particle duality) আছে, আছে ক্ষেত্রতত্ত্বে (field theory) শক্তিকণা আর বস্তুকণার ভেতরকার রূপান্তর, যা অহরহ ঘটে চলে। এ জগত্ যেন এক ছায়াজগত্, যেখানে রূপান্তর ও সতত পরিবর্তনই মুখ্য, ‘আসল’ চেহারা নিয়ে কেউ যেন ধরা দিতে চায় না। হয়তো ‘আসল’ চেহারার ধারণাটিই নকল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ ছায়াজগতের বাসিন্দারা সদাপরিবর্তনশীল হওয়া সত্ত্বেও কিছু নিয়মনীতির বাঁধনে দৃঢ়বদ্ধ। শক্তি, কণা বা তরঙ্গ যে চেহারাতেই প্রতিভাত হোক না কেন, শেষ বিচারে মহাবিশ্বের সব মৌলিক উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা চলে বোসন (Boson) আর ফার্মিয়ন (Fermion)। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। এ বোসন নামটি এসেছে বিখ্যাত বাঙালি পদার্থবিদ অধ্যাপক সত্যেন বোসের নামানুসারে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অভিধানে বোসন শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত গুটি কয়েক শব্দের অন্যতম। বছরখানেক আগে হিগস্ (Higgs) বোসন নিয়ে মাতামাতি আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি।
অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষা ও পারিবারিক জীবন নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়েছে। পিতা সুরেন্দ্রনাথ বসু ও মা আমোদিনী বসুর সাত সন্তানের ভেতর সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রথম। দুই পুরুষ ধরে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এ পরিবারটিতে একই সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বিলেতি সংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায়। সত্যেন বসু ১৯০৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। শৈশব থেকেই প্রতিভাবান সত্যেন বসু প্রেসিডেন্সি কলেজে এসে সহপাঠী হিসেবে পান মেঘনাদ সাহাকে। মেঘনাদ সাহা কালক্রমে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বসু ও সাহার ভেতর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং তাঁরা একত্রে বেশকিছু প্রকল্প নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান।
সত্যেন বসু ১৯১৩ সালে বিএসসি ও ১৯১৫ সালে এমএসসি সমাপ্ত করেন। উভয় পরীক্ষায়ই তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। দ্বিতীয় স্থানটি ছিল মেঘনাদ সাহার। সে যুগেও চাকরি পাওয়া সহজ ছিল না। বসু ও সাহা দুজনকেই একটি বছর বেকার থাকতে হয়। এ দুঃসময়ে আশীর্বাদ হিসেবে উদয় হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জী। তিনি রত্ন চিনতে ভুল করেননি। ১৯১৬ সালে বসু ও সাহা উভয়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসিক ১২৫ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন।
বিংশ শতাব্দীর কুড়ির দশক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য এক দারুণ সময়। প্ল্যাঙ্ক, বোর, আইনস্টাইন তাঁদের যুগান্তকারী সব আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগিয়েছেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা তার শিকড় বিস্তার করছে। বোলত্সম্যান আর গিবস পরিসংখ্যানিক বলবিদ্যাকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। বিজ্ঞান জগজ্জুড়ে এক অতুলনীয় রোমাঞ্চ। এ পটভূমিতে বসু ও সাহা ছাত্রদের কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও আপেক্ষিক তত্ত্ব পড়াতে শুরু করেন।
১৯২১-এ সত্যেন বসু সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে রিডার (সহযোগী অধ্যাপক সমতুল্য) পদের জন্য আবেদন করেন এবং যোগদানের সুযোগ পান। বেতন মাসিক ৪০০ টাকা। বসুর ওপর দায়িত্ব বর্তায় তড়িত্গতিবিদ্যা ও তাপগতিবিদ্যা বিষয় দুটির। তাপগতিবিদ্যা পড়াতে গিয়েই বসু প্ল্যাঙ্কের বিকিরণতত্ত্বে অন্তর্গত এক অসংলগ্নতা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্ল্যাঙ্কের যুগান্তকারী বিকিরণতত্ত্বে শোষিত ও বিকিরিত আলোকে বিচ্ছিন্ন শক্তিকণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে শক্তি ঘনত্বের জন্য রাশিমালায় একটি প্রাক-গুণিতক (pre-factor) নির্ণয় করা হয়েছে আলোকরশ্মিকে নিরবচ্ছিন্ন তরঙ্গ কল্পনা করে। এ অসঙ্গতি সম্পর্কে আইনস্টাইনসহ আরো কিছু বিখ্যাত পদার্থবিদ সচেতন ছিলেন। তবে এ ত্রুটি দূর করার কোনো উপায়ই তাঁরা খুঁজে পাননি। সত্যেন বসু আলোককণাগুলোকে (ফোটন) সমরূপ (indistinguishable) বিবেচনা করে সমাহারতত্ত্বের (combinatorics) একটি চমত্কার প্রয়োগ করেন। সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ ছিল প্রাক-গুণিতকটি নিরূপণে দশা-স্থানের (phase-space) একটি ক্ষুদ্রতম আয়তনের ধারণা। সত্যেন বসু বললেন, এ ক্ষুদ্রতম আয়তন হচ্ছে h3, যেখানে h হচ্ছে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক। অধ্যাপক বসুর এ ধারণা উদ্দীপ্ত ভাবনার (inspired thinking) একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। সংক্ষেপে বলা যায়, সত্যেন বসু প্ল্যাঙ্কের বিকিরণতত্ত্বের এমন একটি বিকল্প প্রতিপাদন পেশ করেন, যা অন্তর্নিহিত অসংলগ্নতা থেকে মুক্ত। বসুর এ আবিষ্কার কোয়ান্টাম স্ট্যাটিসটিক্যাল মেকানিকসের সূচনা।
বসু তাঁর কাজটি বিলেতের ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেন ১৯২৪ সালের প্রথম দিকে। পত্রিকার সম্পাদক প্রায় ছয় মাস পর ‘প্রকাশনার অনুপযুক্ত’ বলে তা ফেরত পাঠান। সত্যেন বসু হতোদ্যম হননি। তিনি আইনস্টাইনের শরণাপন্ন হলেন এবং তাঁকে অনুরোধ জানালেন প্রবন্ধটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে সাইটশ্রিফট ফুর ফিজিকে (Zeitscrift fur Physik) প্রকাশের উদ্যোগ নিতে। প্রবন্ধের তাত্পর্য বুঝতে আইনস্টাইনের বেগ পেতে হয়নি। তিনি অকপটে স্বীকার করলেন, প্রবন্ধটি পদার্থবিজ্ঞানে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। জার্মান ভাষায় অনূদিত প্রবন্ধটি বসু ও আইনস্টাইনের যৌথ নামে দ্রুত ১৯২৪ সালেই প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির শিরোনামের ইংরেজি অনুবাদ— Planck’s Law and Light-Quantum Hypothesis। বিজ্ঞানজগত্ এক নতুন পরিসংখ্যানের সাথে পরিচিত হয়, যা আজ বসু-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিকস নামে বিজ্ঞানের ছাত্রদের কাছে অবশ্যপাঠ্য। এ পরিসংখ্যান যেসব কণা মেনে চলে, তাদের বোসন বলা হয়। যত দিন বিজ্ঞান আছে, তত দিন বোসন নামটির ভেতরে সত্যেন্দ্রনাথ বসু অমর হয়ে থাকবেন। এর পর ১৯২৬ সালে দুই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ফার্মি ও ডিরাক আরেকটি কোয়ান্টাম স্ট্যাটিসটিকসের ধারণা প্রকাশ করেন, যা ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিসটিকস নামে পরিচিত। এ পরিসংখ্যান ফার্মিয়নদের জন্য প্রযোজ্য। ফার্মিয়নরা পাউলির বর্জননীতি মেনে চলে, অন্যদিকে বোসনরা বর্জননীতির তোয়াক্কা করে না।
সত্যেন বসুর এ আবিষ্কার বিশ্বমানচিত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশিষ্ট আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। বোসের এ আবিষ্কার বিংশ শতাব্দীর অন্যতম তাত্পর্যপূর্ণ আবিষ্কার বললে ভুল হবে না। বোসের এ আবিষ্কারের পথ ধরেই বসু-আইনস্টাইন ঘনীভবনের (Bose-Einstein condensation) ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা থেকে ল্যাবরেটরিতে বাস্তবতায় রূপ নিতে বসু-আইনস্টাইন ঘনীভবনের সময় লাগে প্রায় ৭০ বছর। আবিষ্কারকারীরা নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
প্রকৃতপক্ষে বসুর এ আবিষ্কারের পূর্ণ তাত্পর্য তখনকার পদার্থবিজ্ঞানীরা পুরোটা অনুধাবন করতে পারেননি। এমনকি আইনস্টাইন নিজেও নন। প্ল্যাঙ্কের সূত্রের প্রতিপাদনের ক্ষেত্রে বসু প্রাক-গুণিতক নির্ণয় করতে গিয়ে প্রথমে যা পান, তা ঈপ্সিত মানের অর্ধেক। বসুকে এ মানটির সাথে দুই গুণ করতে হয়। এ দুইয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বসু ফোটনের স্পিনের ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। কিন্তু স্পিনের ধারণা আইনস্টাইন পছন্দ করেননি। তিনি পোলারাইজেশনকে ভিত্তি করে দুই সংখ্যাটিকে সামনে নিয়ে আসেন। কিছুদিন পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, ফোটনের স্পিন আছে এবং বসু সঠিক পথেই ছিলেন। ফোটনের স্পিনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার কৃতিত্ব বসুর হাতছাড়া হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বসু দুঃখ করে বলেছেন, ‘বুড়ো কেটে দিল, একটা পার্টিক্যালের আবার পোলারাইজেশন কি রে?।’ আইনস্টাইনের প্রতি প্রবল শ্রদ্ধাবোধ থেকেই বসু এ ব্যাপারে কখনো উচ্চবাচ্য করেননি। আজীবন আইনস্টাইন বসুর কাছে ছিলেন পরম আরাধ্য।
১৯২৪ সালের আবিষ্কার সত্যেন বসুর জন্য প্রথিবী উন্মুক্ত করে দেয়। ১৯২৫ সালে ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ আসে। তিনি ফ্রান্সে মাদাম কুরির গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন। ডি-ব্রগলির গবেষণাগারেও কাজ করার সুযোগ পান। সংস্পর্শে আসেন ল্যাঞ্জেভাঁর মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের। কিছু সময় জার্মানিতে কাইজার ভিলহেলম ইনস্টিটিউটে কাজ করেন এক্স-রে নিয়ে। ঢাকায় ফিরে তিনি নিজ বিভাগে একটি এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ল্যাবরেটরি গড়ে তোলেন।
অধ্যাপক সত্যেন বসু পদার্থবিজ্ঞানের অনেকগুলো শাখায় কাজ করেছেন। প্রথম দিকে মেঘনাদ সাহার সাথে কাজ করেছেন চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালে কাজ করেছেন কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম পরিসংখ্যান নিয়ে। এছাড়া কাজ করেছেন গাণিতিক পদার্থবিদ্যা ও একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব নিয়ে। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কোয়ান্টাম স্ট্যাটিসটিক্যাল মেকানিকসে তাঁর অবদানই তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
সত্যেন বসুর বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন দিক অল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনার উল্লেখ করে এ লেখার ইতি টানব। ১৯৪৫ সালে অধ্যাপক বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কলকাতায় ফিরে যান। সেখানে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারতের বিভিন্ন আইআইটিতে (IIT) অধ্যাপক বসু সিলেকশন বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ব্যাপারে তিনি আপসহীন ছিলেন। একবার একটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জনৈক প্রার্থীর নিয়োগের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। সত্যেন বসুকে টলানো যায়নি। বরং সত্যেন বসু এমন ব্যবস্থা নিয়েছিলেন যে, ভারতে আইআইটিগুলোয় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সংশ্লিষ্ট হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। দ্বিতীয় ঘটনা অনেক সময় আগের। ১৯২৬ সালে সত্যেন বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করেন। এক্সপার্ট হিসেবে ছিলেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফেল্ড। সমারফেল্ডের বিবেচনায় প্রথম পছন্দ হিসেবে সত্যেন বসু স্থান পাননি! অথচ আজকাল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অতি সহজেই সবাই অধ্যাপক হচ্ছেন। যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধরনের অধঃপতন ঘটে গেছে।
অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৮০ বছর বয়সে কলকাতায় পরলোকগমন করেন। সত্যেন বসু বাঙালি বিজ্ঞানীদের অনুপ্রেরণার নিরন্তর উত্স।
লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়






