উনিশ শতক একটা সামাজিক বিবর্তন, নগরায়ণ ও আধুনিকতা একটা বিপর্যয় ও ছেদ নিয়ে আসে সনাতন ঐতিহ্য আর ধারাবাহিকতায়। এ নিয়ে দুটি গল্প বিখ্যাত, একটি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের, অন্যটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর। আজকের বিশেষ উপলক্ষটিতে আবদুল করিমের গল্পটিই প্রাসঙ্গিক। মুহম্মদ এনামুল হকের কথনে:

“তখন বটতলার ছাপা ‘পদ্মাবতী’ লোকে ঘরে ঘরে পড়তো। এই ছাপা পুঁথির বিজ্ঞাপন দেখে আবদুল করিম ধরে নিয়েছিলেন, কবি আলাওল শ’খানিক বছর আগের লোক। কারণ ছাপাখানার মালিকের ঘোষণায় লেখা ছিল, আলাওলের নাতির কাছ থেকে পুঁথির মালিকানা স্বত্ব তিনি কিনে নিয়েছেন। পাণ্ডুলিপিতে কবির বিবরণ দেখে করিম সাহেব বিস্মিত হলেন। তাঁর মনে হলো, আলাওল কয়েক শত বছর আগের লোক। বিশেষ করে ছাপার পুঁথিতে আলাওলকে হত্যা করা হয়েছে দেখে তাঁর মনে দারুণ আঘাত লাগল। তবু এ পাণ্ডুলিপি তাঁর মনে যে বিশ্বাস জন্মাল, তাই আজ বাংলার মুসলমানের মুখরক্ষা করেছে! আজ বাঙালি মুসলমান দেখতে পেয়েছে, জানতে পেরেছে, বাংলার প্রাচীন সাহিত্য-সাধনার ক্ষেত্রে তারা এতিম নয়। তাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য আর কারো চাইতে হীন তো নয়ই, বরং কোন কোন বিষয়ে শ্রেষ্ঠ।”

এ আবিষ্কারটিই বাংলা সাহিত্যের এ যাবত্ জানা ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল। আগেকার সব ইতিহাস-রচয়িতা বাধ্য হলেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নতুন দুটি অধ্যায় যুক্ত করতে— একটা স্বাধীন সুলতানী আমলের, আরেকটা নবাবী আমলের বাংলা সাহিত্য। আবদুল করিম নিজের এ আবিষ্কারটি নিয়ে লিখেছিলেন ‘আলাওল গ্রন্থাবলীর সময় বিচার’ নামের একটি প্রবন্ধ, এটি আলোকিত করেছিল আলো নামের একটি সাময়িক পত্রিকাতে, বাংলা জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়, ১৩০৭ সালে (ইংরেজি ১৯০১-২)! অবশ্য এর আগেই বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছেন ভুলে যাওয়া প্রাচীন কবিদের নিয়ে, এর মাঝে কয়েকটি ছিল আলাওলকে নিয়ে। ‘নূতন মুসলমান বৈষ্ণব কবি’ নামের অন্য একটি প্রবন্ধও আলোড়ন তৈরি করেছিল। বৈষ্ণব সাহিত্যে যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মুসলমানদের অধিকার ছিল, শিক্ষিত সমাজে এ সত্যটি সেই প্রথম সামনে এলো। তার প্রথম প্রবন্ধ ছিল ‘অপ্রকাশিত প্রাচীন পদাবলী’, প্রকাশিত হয়েছিল অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত পূর্ণিমা পত্রিকায় ১৮৯৬ সালে (বাংলা ১৩০২ মাঘ)। কবি নবীনচন্দ্র সেন এ প্রবন্ধ পড়ে তাকে চিঠি দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালের দীর্ঘস্থায়ী এক বন্ধুত্বের সূচনা সেখান থেকেই।

২. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের এ আবিষ্কারটির জন্ম হয়েছিল তার প্রথম যৌবনের একটি ‘প্রশ্ন’ থেকে। নিজের সংগ্রহ করা প্রাচীন পুঁথি নিয়ে তিনি যে সময়টাতে প্রবন্ধ লিখতেন, মীর মশাররফ হোসেন ছাড়া কোনো মুসলমান তখনও সাহিত্যিক খ্যাতি পাননি; যদিও মোজাম্মেল হক, কায়কোবাদ প্রমুখ আরো কয়েকজন সাহিত্যক্ষেত্রে সাহিত্যবিশারদের অগ্রজ ছিলেন। ফলে করিম সাহেবের ভাষায়, “আমি যে-কালে (আমার আঠারো বত্সর বয়সে) সাহিত্যক্ষেত্রে প্রবেশ করি, তখন দ্বিতীয় মুসলমান কেহ ছিল না বলিলেই হয়। হিন্দু পুস্তক-পত্রিকা পাঠ করিতে করিতে একটা প্রশ্ন আমার মনে আন্দোলিত হইত যে, আধুনিক কালের মত প্রাচীন কালেও কি মুসলমানের কোনো সাহিত্য ছিল না?’

আবিষ্কারটি আরো আগেই হতে পারত। কেননা এ দেশেরই গ্রামীণ সমাজে তখনও এসব পুঁথি বিস্তর পঠিত হতো। আবিষ্কারটা হয়ে ওঠেনি দুটো কারণে। একদিকে মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের বিরাট ভূমিকা থাকলেও ঔপনিবেশিক আমলে সনাতন ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ শিক্ষা ও জীবনব্যবস্থা ধ্বংস কিংবা সেগুলোর গুরুত্ব হ্রাস, বেশ ক’টি ধর্মীয় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কার প্রবর্তন এবং আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার—এ তিন টানের ঘূর্ণিপাকে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যিক পরম্পরা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে নতুন শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজে। ফলে নিজেদের ইতিহাস বিষয়ে একদিকে সাধারণ অজ্ঞতা, অন্যদিকে অবজ্ঞা— এ দুইয়ের মিশ্রণে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে বাংলা ভাষা ও বাঙালি আত্মপরিচয় নিয়েই এক ধরনের সংশয় ও দ্বিধা সৃষ্টি হয়। ওই কারণেই আবদুল করিম তার সাহিত্য সৃষ্টির যুগটিতে সামান্য সংখ্যক মুসলমানকেই সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন। উনিশ শতকেই উর্দু ও ইংরেজিকে সংস্কৃতি ও জীবিকার যোগাযোগের মাধ্যম করার একটা প্রবণতা চলছিল। প্রথমটির সামাজিক-আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগ ও দ্বিতীয়টির ক্ষমতা-কাঠামোগত গুরুত্বের কারণে।

দ্বিতীয় কারণটিও বলা যাক। ওই সময়েই যে হিন্দু মধ্যবিত্ত আধুনিক যুগের বিপুল সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন মাতৃভাষায় এবং যাদের মাঝে আত্ম-অন্বেষণও এরই মধ্যে বেশ কিছুদূর অগ্রসর হয়েছে, তারাও বাঙালি সংস্কৃতিতে মুসলমানদের খানিকটা বহিরাগত ও ঐতিহ্যিক পরম্পরাহীন বলেই মনে করতেন। সে কারণেই মুহাম্মদ বরকতুল্লাহর ভাষায়, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস লেখক ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনও বহু প্রাচীন পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু তিনি মুসলিম বাংলা পুঁথিগুলোকে এড়িয়ে গেছেন। কেননা এগুলো তার ভাষায়, ‘আরবী-ফার্সী শব্দ দ্বারা কণ্টকিত বলে। ফলে এ কাজ অপেক্ষমাণ ছিল আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো একজন জ্ঞানতাপসের জন্য।’ সাহিত্যবিশারদ এভাবে যাদের পুঁথি সংগ্রহ করেছেন, মুহম্মদ বরকতুল্লাহ্ এক নিঃশ্বাসে তাদের কয়েকজনের নাম নিয়েছেন— সৈয়দ সুলতান, মুহম্মদ খান, সৈয়দ মরতুজা, আব্দুল হাকিম, সাবিরিদ খান, ফকীর গরীবুল্লাহ, হায়াত মা’মুদ, দৌলত কাজী, আলাওল, শেখ চাঁদ ও সৈয়দ মুহম্মদ আকবর।

৩. মুসলমানের বাংলা সাহিত্যে অবদান বিষয়ে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজেরই যে প্রচলিত অজ্ঞানতা ছিল, তার স্বাভাবিক পরিণামেই মুসলমান পুঁথিগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রান্তিও হয়েছে। যেমন— মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার জানিয়েছেন, “দীনেশবাবু সুপ্রসিদ্ধ ‘মাগন ঠাকুর’কে শুরুতে ‘মগ’ মনে করেছিলেন। এ ভুল সংশোধন করেছিলেন প্রথমে সাহিত্যবিশারদ। ‘বঙ্গ ভাষা ও সাহিত্য’ এবং ‘প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে মুসলমানদের অবদান’— এ দুই গ্রন্থে সাহিত্যবিশারদের বহু উপকরণ ব্যবহূত হয়েছে... ডক্টর সুকুমার সেন সম্প্রতি বাঙ্গালা সাহিত্যের যে বিরাট ইতিহাস লিখছেন, তাতেও সাহিত্যবিশারদের মাল-মসলা কম নাই।”

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ নিজেই এ নিয়ে লিখেছেন:

“আমার সহকর্ম্মীরা আরবী, ইরানী, তুরানী জাতভাইদের কীর্ত্তিকলাপ আলোচনা করিয়াছেন, বাঙ্গালা ভাষার ভিতর দিয়া তাহা আমাদের সমীপে উপস্থিত করিয়াছেন; কিন্তু আমি করিয়াছি আমার পাশের বাড়ীর মুসলমানের, আমার দেশের জাতভাইদের সাহিত্যের ক্ষেত্রে কীর্ত্তিকলাপ সংগ্রহ। আমি সোজা কথায় ইহাই বুঝি, আমার দেশের জাতভাইরা দেশের ভাষার জন্য কি করিয়াছিলেন, তাহাই যদি জানিতে না পারিলাম, তবে পরের দেশের ও বিদেশীয় ভাইদের কথা জানিয়া কি হইবে?”

৪. আব্দুল করিমের কাজ শুধু প্রাচীন মুসলমানের সাহিত্যকীর্তি উদ্ঘাটনে নিয়োজিত থাকেনি। তিনি বড় হয়েছেন সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের এক আবহে। নিজের কথায়: “অল্প বয়সে আমি মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগী হই। চণ্ডীদাসের পদাবলী পাঠ করিয়া—বিশেষত বাড়িতে পূর্বপুরুষের সঞ্চিত প্রাচীন পুঁথিপত্রের স্তূপ দেখিয়া সেই অনুরাগ বিশেষভাবে সমুত্থিত হইয়া উঠে। নিজ বাড়ীতে ও পাড়াপ্রতিবেশীর বাড়িতে তখন হামেশাই পুঁথি পড়ার মজলিস বসিত। কিছু না বুঝিলেও সেই মজলিসে গিয়া আলাওলের পুঁথি পড়া শুনিতাম। শুনিয়া শুনিয়া আমার ভাবপ্রবণ কিশোর হূদয়ে যে আনন্দ জন্মিত তাহার স্মৃতি এখনও মুছিয়া যায় নাই।”

এ সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের ঐতিহ্যে বেড়ে ওঠার ফলেই কোনো সংস্কার ছাড়াই তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধরনের পুঁথি সংগ্রহেই একই রকম নিষ্ঠা ও শ্রম দেখাতে পেরেছেন। যদিও কাজটি সহজ ছিল না। তার নিজের স্মৃতিচারণে: “হিন্দুর বাড়ী গিয়া এমনও দেখিয়াছি— গোঁড়া হিন্দু আমাকে পুঁথি ছুঁইতে দেয় নাই— সে পাতা মেলিয়া ধরিয়াছে— আর আমি নোট লিখিয়া লইয়াছি।”

৫. বিনয় করে সাহিত্যবিশারদ নিজের সম্পর্কে বলেছেন বটে যে— “বঙ্গ-সাহিত্যের জন্য আমি এমন কিছু করি নাই, যাহা লইয়া আমি গর্ব করিতে পারি। আমাদের পূর্বপুরুষের প্রচুর সাহিত্য-সম্পদ (যাহাকে রত্নসদৃশ্য মনে করা যাইতে পারে) ভূগর্ভে প্রোথিত হইয়া গিয়াছিল। সে সকল রত্ন ভূগর্ভ উত্খাত করিয়া আমি লোকলোচনের গোচরীভূত করিয়াছি। তজ্জন্য আমাকে অনেকে কতকগুলি পুঁথির সংগ্রাহক মাত্র মনে করেন এবং আমিও নিজেকে তদধিক কিছু মনে করি না।”

এমন বিনয় সত্ত্বেও তিনি যে কেবল পুঁথি সংগ্রাহক নন, বরং গবেষক হিসেবেও অতুল কীর্তিত, তার কিছুটা পরিচয় পাওয়া যাবে আহমদ শরীফের বর্ণনায়: “তাঁরই সাধনা ও গবেষণার ফলে বাঙালী জনসাধারণ জানল যে, বাংলা সাহিত্যের আদি কবি মুসলমান, বাংলা সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র্য প্রদান করেন মুসলমান কবি মরদন ও মাগন ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যের ভাষাকে প্রথম শালীনতা দান করেন মুসলমান কবি আলাওল। এক কথায় তিনিই জানিয়ে দিলেন যে, বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি, পুষ্টি ও বৈচিত্র্য সাধনের মূলে রয়েছে প্রথমত ও প্রধানত মুসলমানের সাধনা।” আবদুস্ সাত্তারের ভাষায়: “প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে হিন্দু লেখকগণ লৌকিক দেবদেবীর অলৌকিক লীলা-মাহাত্ম্য বর্ণনায় ছিলেন মুখর এবং সেখানে মানবিক উপাদানের চেয়ে ধার্মিকতার স্ফুরণই ছিল অধিক। কিন্তু আরাকান রাজসভার বাঙালী মুসলিম কবিগণ যথা আলাওল-দৌলত কাজী প্রমুখ সেই গতানুগতিক ধারায় এক বিস্ময়কর পরিবর্তন সাধন করেন।” প্রধানত আবদুল করিমের মালমসলা ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এনামুল হকের সঙ্গে তার যৌথ কাজ ‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে। মধ্যযুগের বাংলার বিকাশ ঘটেছিল হিন্দু সম্প্রদায়গুলোর ধর্মীয় বিবাদকে কেন্দ্র করে, বলেছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন। কিন্তু সাহিত্যের মানবিক চেহারা দেয়ার কাজটি মধ্যযুগে মুসলিম সাহিত্যিকরা করতে পেরেছিলেন। কেননা এ পুরাণ-লোককথা ও ইতিহাসের চরিত্রগুলোর ধর্মীয় মূল্যের চাইতে সাহিত্যিক মূল্য তাদের কাছে ছিল বেশি।

৬. গবেষক হিসেবে তার কৃতিত্বের অজস্র পরিচয় আছে। ‘রাধিকার মানভঙ্গ’ (প্রকাশকাল ১৯০১) নামের নরোত্তম ঠাকুরের প্রাচীন পুঁথিটির সম্পাদনার গুণে এবং পাণ্ডিত্যে বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ভূমিকায় যা লিখেছিলেন তার সামান্য অংশ উদ্ধৃত করা যাক: “তিনি এই দুর্লভ গ্রন্থের সম্পাদনাকার্যে যেরূপ পরিশ্রম, যেরূপ কৌশল, যেরূপ সহূদয়তা ও যেরূপ সূক্ষ্মদর্শিতা প্রদর্শিত করিয়াছেন, তাহা সমস্ত বাঙ্গালায় কেন, সমস্ত ভারতেও বোধহয় সচরাচর মেলে না। এক একবার মনে হয় যেন কোনো ‘জর্মান এডিটর’ এ গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।”

মুসলমানী পুঁথি নিয়ে কাজ করলেও সাম্প্রদায়িকতার গ্রাসে কখনো আক্রান্ত হননি সাহিত্যবিশারদ। মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহার জানিয়েছেন, “প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করতে গিয়ে সাহিত্যবিশারদ আর একটি নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাঙ্গলা ভাষা লিখতে মুসলমান সাহিত্যিকরা বাঙ্গলা বর্ণমালার পরিবর্তে আরবী বর্ণমালার ব্যবহার আরম্ভ করেছিলেন। এসব পুঁথি থেকেই আলাবিয়া প্রেসের মওলবী জুলফিকার আলী বাঙ্গলা ভাষায় আরবী অক্ষর প্রচলনের আন্দোলন আরম্ভ করেন।”

৭. দূর মফস্বলবাসী এবং সামাজিক প্রতিপত্তিহীন আবদুল করিম বহুবার আরো বেশি রকমের অশিষ্ট আচরণের এবং ক্ষেত্রবিশেষে বড় রকমের অবিচারেরও শিকার হয়েছেন। অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যই ‘গোপীচন্দ্রের গান’ নিয়ে যে শঠতার বর্ণনা করেছেন, তা মর্মান্তিক। আবদুল করিম ভবানী দাস বিরচিত ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এর একটি খসড়া তৈরি করে পাঠিয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু “কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ‘খসড়া’খানি লইয়া কি করিয়াছিলেন, তাহা প্রকাশ করিয়া বলেন নাই; দীনেশচন্দ্র সেন কেবলমাত্র উল্লেখ করিয়াছিলেন যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘গোপীচন্দ্রের গানে’র ‘সংস্করণে শ্রীযুক্ত বসন্তরঞ্জন রায় মহাশয় মুনশী সাহেবের পাঠ হইতে বহুল পরিমাণে সাহায্য গ্রহণ করিয়াছেন... কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দীনে শচন্দ্র সেন, বসন্তরঞ্জন রায় এবং বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য এ তিনজনের নামে সম্পাদিত হইয়া ‘গোপীচন্দ্রের গান’ নামক যে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, তাহার শেষাংশে মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কর্তৃক চারিখানি পুঁথি মিলাইয়া ভবানী দাসের যে পুঁথি সম্পাদিত হইয়াছিল, তাহা আনুপূর্বিক প্রকাশিত হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তাহাতে মুনশী সাহেবের নাম উল্লিখিত হয় নাই।”  এ কাহিনী নলিনীকান্ত ভট্টশালীও তার সম্পাদিত সুকুর মহম্মদের ‘গোপীচাঁদের সন্ন্যাস’ গ্রন্থের সম্পাদকীয় মন্তব্যে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন।

নাথ সম্প্র্রদায়ের পূজিত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকীর্তি ‘গোরক্ষ বিজয়’ কবীন্দ্র দাস, ফয়জুল্লা, ভীমদাস ও শ্যামদাস এ চারজন ভণিতাকারের মাঝে আসলে ফয়জুল্লাহই এর রচয়িতা, সে সম্পর্কেও সাহিত্য-বিশারদই আমাদের নিশ্চিত করেন। অথচ আশুতোষ ভট্টাচার্য আমাদের জানিয়েছেন, “তিনি ‘গোরক্ষ বিজয়’ নামের একখানি পুঁথি সম্পাদন করিয়া বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষত্ হইতে ১৩২৪ সনে প্রকাশিত করেন। এ গ্রন্থের তিনি যে একখানি পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভূমিকা রচনা করিয়াছেন, তাহা পরবর্তীকালের প্রায় সকল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখকই ভিত্তিরূপে ব্যবহার করিয়াছেন, অথচ এ বিষয়ে তাহাকে যথোচিত স্বীকৃতি দেওয়া হয় নাই।”

সাহিত্য পরিষদের কর্ণধার ব্যোমকেশ মুস্তফী (১৮৬৮-১৯১৬)-এর মৃত্যুর পর সাহিত্যবিশারদের কাজগুলোর প্রতি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ আগ্রহ দেখায়নি। আবদুল কাদিরের ভাষায় : “১৩১৪ সালের পর বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের সহিত আবদুল করিমের যোগ আর দেখা যায় না।” এ প্রতিষ্ঠানটির যত্সামান্য অর্থানুকূল্য সামান্য কেরানির চাকরি করা আবদুল করিমের পুঁথি সংগ্রহ ও গবেষণা পরিচালনায় বিরাট ভূমিকা রাখত। বহুবার তিনি সামান্য টাকার অভাবে মূল্যবান পুঁথি হাতছাড়া করতে বাধ্য হওয়ার বেদনার কথা উল্লেখ করেছেন।

বেঁচে থাকতে তিনি আলাওলের পদ্মাবতীর একটি প্রামাণ্য পাঠ প্রকাশিত অবস্থায় দেখে যেতে পারেননি। কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, রাজশাহীর বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি, চট্টগ্রামের প্রবর্তক প্রেসসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এর দায়িত্ব গ্রহণ করেও পিছিয়ে যায়। একদিকে যেমন ছিল তার সংগ্রহ ও গবেষণা কাজকে আত্মসাত্ ও যথেচ্ছভাবে স্বীকৃতিহীন ব্যবহার, অন্যদিকে তার অবদানকে করা হয়েছে অন্তরালবর্তী।

৮. নানা প্রকার বঞ্চনা ও দারিদ্র্যের শিকার হলেও সম্মানের অভাব তার হয়নি। ১৯৪০ সালে পটিয়ায় বিশাল এক রবীন্দ্র-জয়ন্তীর আয়োজন করা হয়। উদ্যোক্তা মহকুমা মুন্সেফ শৈলেন্দ্রনাথ মিত্র। তিনি তার পরম শ্রদ্ধেয় ক্ষিতিমোহন সেনকে আনিয়েছিলেন আয়োজনের সভাপতিত্ব করার জন্য। ক্ষিতিমোহন সেন কথায় কথায় শৈলেন্দ্রনাথকে জানান যে, ওখানে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের বাড়ি। বাকিটুকু মাহ্?বুব-উল্? আলমের স্মৃতিচারণে:

“শৈলেন্দ্রনাথ কবিতা লেখেন, আবদুল করিমের নাম শোনেননি। মনে এ বুজুরকিও হয়তো ছিল: ওস্তাদকে দেখিয়ে দেই মহকুমা মুন্সেফের ক্ষমতা কত!

সুতরাং জবাব দিলেন: তা বেশ, তাকে ডাকিয়ে আনান যাবে!

ক্ষিতিমোহন গরম হয়ে গেলেন, অবাকও হয়েছিলেন। বললেন: কি বললে, তাকে ডেকে আনাবে! তিনি আমাদের অগ্রণী, আমাদের নমস্য, তাকে ডেকে আনাবে কি, আমরাই তার কাছে যাব!

মহকুমা মুন্সেফ এতটুকু হয়ে গেলেন! বললেন, আমরাই তার কাছে যাব!

আমরা চলেছিলাম তার কাছে: ক্ষিতিমোহন সেন, শৈলেন্দ্রনাথ ও আমি। তাকে দেখা যাচ্ছিল বাড়ির দরজায় আমাদের অভ্যর্থনার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। দূর থেকে দেখে ক্ষিতিমোহন বললেন: উনি ব্যক্তিমাত্র নহেন, উনি একটা প্রতিষ্ঠান।”

বাংলা ভাষায় এর আগে কিংবা পরে এমন প্রতিষ্ঠান অল্প কটিই গড়ে উঠেছে।   

মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের জন্ম ১৮৬৯ সালে, একটি পুরনো সংস্কৃতিমনা পরিবারে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার মহকুমায় তিনিই প্রথম এন্ট্রান্স পাস করা লোক ছিলেন। ‘সম্ভবত বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত নিয়ে এন্ট্রান্স পাস করেন’ জানিয়েছেন আহমদ শরীফ। যথাক্রমে সীতাকুণ্ড মাইনর স্কুলে শিক্ষকতা, জজ আদালতের অস্থায়ী কেরানি, কবি নবীন চন্দ্রসেনের ব্যক্তিগত সহকারী, ষড়যন্ত্রের শিকারে বরখাস্ত হয়ে দীর্ঘদিন আনওয়ারা ইংরেজি স্কুলে প্রধান শিক্ষক এবং এর পর শিক্ষা বিভাগের দ্বিতীয় কেরানির পদে বাকি জীবন কাটিয়ে ’৩৩ সালে অবসর নেন। চট্টল পণ্ডিতসমাজ তাকে ‘সাহিত্যবিশারদ’ এবং নদীয়া সাহিত্য সভা তাকে ‘সাহিত্য সাগর’ উপাধি দেয়। আজীবন সাহিত্যবিশারদ উপাধিটি তিনি নামের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মহান এ বিশারদ মৃত্যুবরণ করেন ১৯৫৩ সালে।

 

লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী