শান্তিনিকেতন ও মুজতবা আলী বিষয়ে অনেকগুলো প্রায় স্বতঃসিদ্ধ তথ্য সম্বন্ধে লেখকের শতবর্ষের স্মারকগ্রন্থে বিনায়ক চক্রবর্তী বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছেন। তার মধ্যে একটি হলো, মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনের প্রথম মুসলমান ছাত্র। কথাটি কি একেবারে নির্ভুল? মুজতবা আলীর সমর্থন সত্ত্বেও? না, তাঁর শান্তিনিকেতনে পৌঁছার এক বছর আগে জাফর আলী নামে এক দক্ষিণ আফ্রিকার (প্রবাসী ভারতীয়?) ছাত্রের উল্লেখ পাই দীনবন্ধু অ্যানড্রুজের চিঠিতে। ওই উল্লেখমাত্র, তাঁর সম্বন্ধে আর কোনো বিবরণ কোথাও নেই। প্রথম হন আর দ্বিতীয় হন, শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম হলো ১৯০১ সালে, আর সেই ১৯২১ সালে, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরম্ভ পর্বে মুজতবা শান্তিনিকেতনে ছাত্র হিসেবে গৃহীত হলেন।

প্রথম (বা দ্বিতীয়) মুসলমান ছাত্র— এই অনন্য ঐতিহাসিক মর্যাদাও তাঁর নাও জুটতে পারত। বৈদিক তপোবনের আদর্শ ছিল শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার মূলে, সেখানে মুসলমান শুধু নয়, অব্রাহ্মণ ছাত্র গ্রহণ করা হবে কিনা, তাই নিয়েই একসময় দ্বিধা ছিল, রবীন্দ্রনাথের মনে না হোক, অন্তত কোনো কোনো আশ্রমিকদের মনে। রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার রাজকুমারকে অবশ্য ‘ক্ষত্রিয়’ (মূলত তারা ছিলেন ত্রিপুরার আদিবাসী ত্রিপুরী সম্প্রদায়ভুক্ত) আখ্যা দিয়ে শান্তিনিকেতনে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, শিক্ষকরাও এই সংকীর্ণতার শিকার হয়েছেন। শিক্ষক কুঞ্জলাল ঘোষ ছিলেন কায়স্থ ও ব্রাহ্ম। এই উভয় ‘কলঙ্কে’র জন্য তাকে বিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রণাম করবে কিনা, এ নিয়ে আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তখন তাকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি। প্রথমদিকে তাঁর মনে এই দ্বিধা দেখি— প্রাচীন ভারতের এক কবি-কল্পিত হিন্দু ব্রাহ্মণ্য আদর্শ তাঁকে কয়েক বছরের জন্য এমনই সম্মোহিত করে রেখেছিল।

ক্রমে এ সম্বন্ধে তাঁর সংশয় দূর হয়। নৈবেদ্য (১৯০০) থেকে গীতাঞ্জলি (১৯১০)তে রবীন্দ্রনাথের উত্তরণ এক হিসেবে তাঁর প্রাচীন আর্যত্ব ও হিন্দুত্বের ওই সংকীর্ণ কল্পনা-বিশ্বাস থেকে ভারতীয় মানবতার এক পরিব্যাপ্ত ধারণায় উত্তরণ— যেখানে ‘শক-হুনদল-পাঠান-মোগল এক দেহে হলো লীন। তার দু-এক বছরের মধ্যেই দেখি শান্তিনিকেতনের বোর্ডিং বিদ্যালয়-এ একটি মুসলমান ছাত্রকে গ্রহণ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রধান শিক্ষক নেপালচন্দ্র রায়কে বারবার অনুরোধ করছেন। ছেলেটির নাম ছিল রবীন্দ্র কাজী, সে আগরতলার ডা. কাজীর পুত্র। রবীন্দ্রনাথের আশঙ্কা ছিল আশ্রমের ট্রাস্টি দ্বিপেন্দ্রনাথের এতে আপত্তি হবে। নেপালচন্দ্রও তত উত্সাহ দেখাননি। রবীন্দ্রনাথ নেপালচন্দ্রকে দ্বিতীয় যে চিঠিটি লেখেন, তা প্রশান্তকুমার পাল উদ্ধৃত করেছেন, তা এখানেও উদ্ধারযোগ্য— ‘মুসলমান ছাত্রটির সঙ্গে একটি চাকর দিতে তাহার পিতা রাজী অতএব এমন কি অসুবিধা, ছাত্রদের মধ্যে এবং অধ্যাপকদের মধ্যেও যাহাদের আপত্তি নাই তাহারা তাহার সঙ্গে একত্র খাইবেন। শুধু তাই নয়— সেই সকল ছাত্রের সঙ্গেই ওই বালকটিকে এক ঘরে রাখিলে সে নিজেকে নিতান্ত যূথভ্রষ্ট বলিয়া অনুভব করিবেন না। ...আপাতত শাল বাগানের দুই ঘরে নগেন আইচের তত্ত্বাবধানে আরো গুটিকয়েক ছাত্রের সঙ্গে একত্র রাখিলে কেন অসুবিধা হইবে বুঝিতে পারিতেছি না। আপনারা মুসলমান রুটিওয়ালা পর্যন্ত চালাইয়া দিতে চান, ছাত্র কি অপরাধ করিল? এক সঙ্গে হিন্দু মুসলমান কি এক শ্রেণীতে পড়িতে বা একই সঙ্গে খেলা করিতে পারে না? ...প্রাচীন তপোবনে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাইত, আধুনিক তপোবনে যদি হিন্দু-মুসলমান একত্রে জল না খায় তবে আমাদের সমস্ত তপস্যাই মিথ্যা, আবার একবার বিবেচনা করিবেন ও চেষ্টা করিবেন যে আপনাদের আশ্রমদ্বারে আসিয়াছে তাহাকে ফিরাইয়া দিবেন না— যিনি সর্ব্বজনের একমাত্র ভগবান তাঁহার নাম করিয়া প্রসন্নমনে নিশ্চিন্ত চিত্তে এই বালককে গ্রহণ করুন; আপাতত যদি কিছু অসুবিধা ঘটে সমস্ত কাটিয়া গিয়া মঙ্গল হইবে।’ (রবিজীবনী, ষষ্ঠ, ২৪৭)

এর অনুষঙ্গ আমরা পাই ১৯৩১ সালে মুজতবার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথোপকথনে—

‘বলতে পারিস সেই মহাপুরুষ কবে আসবেন কাঁচি হাতে করে?

আমি অবাক। মহাপুরুষ তো আসেন ভগবানের বাণী নিয়ে, অথবা শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম নিয়ে। কাঁচি হাতে করে? হাঁ হাঁ কাঁচি নিয়ে। সেই কাঁচি দিয়ে সামনের দাড়ি ছেঁটে দেবেন, পেছনের টিকি কেটে দেবেন। সব চুরমার করে একাকার করে দেবেন। হিন্দু-মুসলমান আর কতদিন আলাদা হয়ে থাকবে?’

রবীন্দ্রনাথের এ প্রশ্নের কোনো উত্তর আমরা এখনো তৈরি করতে
পারিনি।

যা-ই হোক, আরম্ভের সময় থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সমাজতত্ত্বের এবং তার প্রতিষ্ঠার সমাজ-ভাবনার এ পরিবর্তনের ছবিটি নির্মিত হওয়ার পরও শান্তিনিকেতনে প্রথম (বা দ্বিতীয়) মুসলমান ছাত্র হিসেবে প্রবেশ করেন মুজতবা আলী ওই ঘটনার দশ বছর পর। শান্তিনিকেতনে এলেন ১৯২১-এর জুলাইয়ে— সে তারিখ নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। এমনকি বিভ্রান্তি আছে শান্তিনিকেতনের তিনি প্রথম স্নাতক ছিলেন কিনা, তাই নিয়ে। তবে ১৯২১ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত যে তিনি শান্তিনিকেতনের কলেজ পর্যায়ের ছাত্র ছিলেন, এ সম্বন্ধে মোটামুটি নিশ্চিত সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্বভারতীতে মজুদ আছে।

২.

নামের আগে সৈয়দ কথাটি মুসলমান সমাজে কৌলীন্য ও আভিজাত্যের সূচক, মুজতবা তত্কালীন শ্রীহট্টের এক অভিজাত পরিবারের সন্তান। রবীন্দ্রনাথ শ্রীভূমি বা শ্রীহট্টে গিয়েছিলেন ১৯১৯ সালে, সেখানে রবীন্দ্রনাথকে মুজতবা প্রথম দেখেন। তার পর নানা দুর্যোগে শ্রীহট্টে মুজতবার স্কুলের শেষ পরীক্ষা দেয়া হয় না, তাঁর বাবা সিকন্দর আলী তাঁর পড়াশোনা বন্ধ করার উপক্রম করেছিলেন বলে শোনা যায়, তখন মুজতবা শান্তিনিকেতনে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় নিরুপায় অভিভাবক তাকে শান্তিনিকেতনে পাঠান। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মুজতবার পত্রালাপের খবরও পাই, জানি না তাঁর শান্তিনিকেতনে আসার আগ্রহের পেছনে রবীন্দ্রনাথের উত্তরের কোনো ভূমিকা ছিল কিনা।

কিন্তু শান্তিনিকেতনে তিনি কি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন? এ নিয়েও বিনায়কবাবু নানা সংবাদ উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন। মুজতবার নিজের কথা এবং তাঁর জীবনীকারদের কথা এ বিষয়ে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। শান্তিনিকেতনের পর মুজতবা আলিগড়ে কিছুদিন পড়েন, তার পর বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেটা ছেড়ে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন ইসলামী খোঁজা সম্প্রদায় সম্বন্ধে। কিছুদিন কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি পড়েছিলেন ইসলামের ধর্মশাস্ত্র। প্যারিসের সরবোর্নেও তার পাঠের সুযোগ ঘটে। তার পর বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে সেখানে জীবিকাগ্রহণ। আরো নানা জীবিকা-পরিক্রমা।

প্রশ্ন উঠবে, শান্তিনিকেতনে পাঁচ-ছয় বছর থাকলেন, কোনো ডিগ্রি করলেন না, তা হলে শান্তিনিকেতন থেকে তিনি কী অর্জন করলেন, কী আহরণ করলেন? কেন শান্তিনিকেতন তাঁর জীবনে এমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?

আমরা প্রথমে দেখি, কী শিখলেন শান্তিনিকেতনে— যে শিক্ষা যে কোনো ডিগ্রি বা ডিপ্লোমার চেয়ে অনেক বেশি বড়। মুজতবার লেখা থেকেই আমরা জানি, তিনি কী শিখবেন, তাঁর দিকপথটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন আর কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কথাগুলো তুলে দিই—

‘প্রথম সাক্ষাতে গুরুদেব জিজ্ঞাসা করলেন, কি পড়তে চাও?

আমি বললুম, তা তো ঠিক জানিনে তবে কোনও একটা জিনিস খুব ভাল করে শিখতে চাই।

তিনি বললেন, নানা জিনিস শিখতে আপত্তি কি?

আমি বললুম, মনকে চারদিকে ছড়িয়ে দিলে কোনও জিনিস বোধ হয় ভাল করে শেখা যায় না।

গুরুদেব আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, একথা কে বলেছে?

আমার বয়স তখন সতেরো— থতমত খেয়ে বললুম, কনান ডয়েল।

গুরুদেব বললেন, ইংরেজের পক্ষে এ বলা আশ্চর্য নয়।

কাজেই ঠিক করলুম, অনেক কিছু শিখতে হবে। সম্ভব অসম্ভব বহু ব্যাপারে ঝাঁপিয়ে পড়লুম। গুরুদেবের সঙ্গে তখন সাক্ষাত্ হত ইংরেজি ও বাংলা ক্লাসে। তিনি শেলি, কীটস আর বলাকা পড়াতেন।’

রবীন্দ্রনাথ এবং শান্তিনিকেতন মুজতবাকে জ্ঞান ও দীক্ষার এমন এক বহুত্বের দিকে ঠেলে দিলেন যে, তিনি তাঁর সম্পূর্ণ স্বাদগ্রহণ করতে করতে পদে পদে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন। ভাষা শিখতে শুরু করলেন জার্মান, ফরাসি, ইংরেজি ও হিন্দি। রুশ প্রাচ্যবিদ পণ্ডিত পিতার বোগ্দানোফের কাছে শিখতে লাগলেন আরবি ও ফারসি। এছাড়া এ সময় রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের মহা মহা পণ্ডিতকে শান্তিনিকেতনে ডেকে এনেছিলেন— ‘সিলভ্যাঁ লেভি, মরিস, কলিন্স, অ্যানড্রুজ, বেনোয়া, বোগ্দানোফ, ফ্লাউম, তুচ্চি, ফর্মিকি’ যেমন, আর তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হলেন ভারতের বিধুশেখর শাস্ত্রী, ক্ষিতিমোহন সেন, জগদানন্দ রায় প্রমুখ— তাঁদের ক্লাসে না বসে মুজতবার উপায় ছিল না কারণ একেবারে প্রথম থেকেই তিনি বিরল মুসলমান ছাত্র হিসেবে নয়, উদ্যমী ও উজ্জ্বল ছাত্র হিসেবে একেবারে প্রথম সারিতে এসে পৌঁছেছেন। তখন বিশ্বভারতী সম্মিলনী নামে ছাত্র ও শিক্ষকদের যে সমিতি গড়ে উঠেছিল, তার একাধিক অধিবেশনে তরুণ মুজতবাকে বিচিত্র বিষয়ে প্রবন্ধ পড়তে এগিয়ে আসতে দেখি।

৩১ ভাদ্র ১৩২৮ তারিখের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন রবীন্দ্রনাথ, মুজতবা আলী প্রবন্ধ পড়ছেন ঈদ উত্সব সম্বন্ধে। সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সভার শেষে প্রবন্ধ লেখককে ধন্যবাদ ও আশীর্বাদ জ্ঞাপন করেন। ১৩ মাঘ ১৩২৮-এর সভায় সভাপতি বিধুশেখর শাস্ত্রী, মুজতবা পড়ছেন ‘শিশুমারী’ সম্বন্ধে একটি সুচিন্তিত ও সুলিখিত প্রবন্ধ। ১০ শ্রাবণ ১৩৩০-এর সভায় সভাপতি মুজতবা আলী, প্রমথনাথ বিশী সে সভায় পাঠ করেছেন ‘রথযাত্রা’ নাটক, যা রবীন্দ্রনাথকে রথের রশি লেখার প্রেরণা দিয়েছিল। ২৬ শ্রাবণ ১৩৩০-এর সভায় মুজতবা আবার পাঠ করেন আন্তন চেকভের ছোটগল্প সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ— তাও উচ্চপ্রশংসিত হয়। ১৩৩১ সালে সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন মুজতবা এবং পরের বছরেও তাঁর সম্পাদকত্ব বহাল থাকে। এর মধ্যে সমিতির বিতর্ক সভাতেও তাঁকে সোত্সাহে যোগ দিতে দেখি। সমিতির হাতের লেখা পত্রিকা বিশ্বভারতীতেও এই সময় মুজতবার একাধিক রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রথম গল্প ‘নেড়ে’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও স্পিটলার’ নামে একটি প্রবন্ধ এবং ‘শ্রীহট্টের দুই একটি গীত’— ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে লিখেছেন তিনি।

অর্থাত্ বিচিত্রের পথিক ও বিচিত্রের দূত হিসেবে শান্তিনিকেতন মুজতবাকে নির্মাণ করে চলেছিল এই সময়। পল্লীবাংলার এক দূর প্রত্যন্ত থেকে এসে কীভাবে এত সহজে মুজতবা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এই অগ্রণী ভূমিকা এত অনায়াসে দখল করলেন, তার ইতিহাস আমরা জানি না, কিন্তু অনুমান করি যে, পরিবারে পড়াশোনার একটি আবহাওয়ার মধ্যে তিনি কিছুটা মানসিকভাবে পরিণত হয়েই এসেছিলেন। নইলে রবীন্দ্রনাথের কথার উত্তরে কনান ডয়েলের নামটি তাঁর মুখে অমনভাবে উঠে আসত না। শান্তিনিকেতন তাঁর এ বহুধা কৌতূহলকে আরো বেশি তীব্র করল এবং নানা ভাষার অলিন্দ খুলে দিয়ে তাঁর সম্মুখে জ্ঞানের অনেকান্ত দিগন্ত উন্মাচিত করে দিল। একেবারে আক্ষরিক অর্থে শান্তিনিকেতন হয়ে উঠেছিল তাঁর আলমা মাতের বা বিদ্যামাতৃকা।

তাঁর এই মাতৃকার কাছে ফিরে এসেছিলেন মুজতবা। রবীন্দ্রনাথকে তিনি কথা দিয়েছিলেন যে, ‘বিশ্বভারতীর সেবার জন্য যদি আমাকে প্রয়োজন হয়, তবে ডাকলেই আমি আসব। যা দেবেন হাত পেতে নেবে।’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে ফিরতে পারেননি। পরে যখন এলেন ছয়ের দশকে তখন তাঁর পণ্ডিত বা প্রশাসকের পরিচয় প্রায় অন্তর্ধান করেছে, তিনি বাংলা সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ লেখক হয়ে উঠেছেন। ১৯৪৮-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত দেশে বিদেশে থেকে মুজবতার অন্য সব কেজো পরিচয় গৌণ করে গিয়েছে। রম্য প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, স্মৃতিচিত্রণ— নানা অভিমুখে তাঁর কলম স্বচ্ছন্দ স্ফূর্তি লাভ করে বিচিত্র রচনায় বাঙালিকে অন্তহীনভাবে আমোদিত করেছে। এও এক ধরনের ঋণশোধ।

শান্তিনিকেতনের একটি অনুপম চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর ‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’ বইয়ে। এতে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে দ্বিজেন্দ্রনাথ, বিধুশেখর, ক্ষিতিমোহন, মহাত্মা গান্ধী প্রমুখ গুরুতর মানুষদের কথা আছে, আছে বাচুভাই শুক্ল, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ সহপাঠীদের হূদ্য স্মৃতিচারণ। কিন্তু প্রায় অচেনা মানুষও তাঁর কলমে এমন মর্মগ্রাহী মূর্তি পেয়েছে, যা আমাদের ভেতর থেকে দুলিয়ে দেয়। উদ্ধার করি সেই দামাল মারাঠি বালক ভাণ্ডারের আখ্যান।

শান্তিনিকেতনে তাকে পড়তে (না দুষ্টুমি শোধরাতে?) পাঠানোর আগে ভাণ্ডারের ঠাকুমা তাকে ঠাকুর-দরবেশ দেখলেই কিন্তু দান করার উপদেশ দিয়েছিল।

শান্তিনিকেতনে এসে একদিন ভাণ্ডারে দেখে শালবীথির রাস্তা ধরে বিপুল সাদা দাড়িওয়ালা জোব্বা-পরা একজন লাইব্রেরির দিকে হেঁটে চলেছেন। ভাণ্ডারে লাফিয়ে উঠে ভাবল— যাক, এত দিনে একজন দরবেশ পাওয়া গেল। সে ছুটে গিয়ে তাকে একটি আধুলি নেয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করতে লাগল। দরবেশটি কিছুতেই নেবেন না, কিন্তু ভাণ্ডারের সঙ্গে এঁটে ওঠা তাঁর সাধ্য ছিল না, তাই তিনি বাধ্য হয়ে আধুলিটি নিয়ে তার জোব্বার পকেটে রেখে দিলেন।

অন্যরা দূর থেকে রুদ্ধশ্বাস হয়ে এই বিচিত্র দৃশ্যটি দেখছিল। ভাণ্ডারে ফিরতেই তারা তাকে পাকড়াল— ‘গুরুদেবকে কী দিলি রে?’

ভাণ্ডারে রুখে উঠে বলল, ‘গুরুদেব কৌন? ও তো দরবেশ হ্যায়। হাম উসকো এক অঠন্নি দিয়া।’

কিছুদিন পরেই ভাণ্ডারের দুরন্তপনায় শান্তিনিকেতন প্রায় বিপর্যস্ত। তখন হেডমাস্টার জগদানন্দবাবু ভাণ্ডারের অদম্য দস্যুবৃত্তির কথা রবীন্দ্রনাথকে জানাতে বাধ্য হলেন।

রবীন্দ্রনাথ ‘‘ভাণ্ডারেকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ রে ভাণ্ডারে এ কি কথা শুনি।

ভাণ্ডারে চুপ।

গুরুদেব নাকি কাতর নয়নে বললেন, ‘হ্যাঁ রে ভাণ্ডারে, শেষ পর্যন্ত তুই এ সব আরম্ভ করলি? তোর মতো ভাল ছেলে আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। আর তুই এখন আরম্ভ করলি এমন সব জিনিস যার জন্যে সক্কলের সামনে আমাকে মাথা নিচু করতে হচ্ছে। মনে আছে, তুই যখন প্রথম এলি তখন কীরকম ভাল ছেলে ছিলি? মনে নেই, তুই দান-খয়রাত পর্যন্ত করতিস। আমাকে পর্যন্ত তুই একটি পুরো আধুলি দিয়েছিলি? আজ পর্যন্ত কত ছাত্র এল গেল কেউ আমাকে একটি পয়সা পর্যন্ত দেয়নি। সেই আধুলিটি আমি কত যত্নে তুলে রেখেছি? দেখবি?।’’

এ পর্যন্ত মুজতবার শোনা কথা। এর দু-এক বছর পর মুজতবা শান্তিনিকেতনে প্রথম আসেন। তিনি পরে নিজের দেখা ইতিহাসটুকু এভাবে সাজিয়ে দেন— ‘মারাঠি সঙ্গীতজ্ঞ স্বর্গীয় ভীমরাও শাস্ত্রী তখন সকালবেলার বৈতালিক লীড করতেন। তার কিছুদিন পর শ্রীযুক্ত অনাদি দস্তিদার। তার পর ভাণ্ডারে।

চল্লিশ বছর হয়ে গিয়েছে। এখনও যেন দেখতে পাই ছোকরা ভাণ্ডারে বৈতালিক গাইছে,

এ দিন আজি কোন্ ঘরে গো

খুলে দিল দ্বার।

আজি প্রাতে সূর্য ওঠা

সফল হল কার।।’

[পুনর্মুদ্রণ]

 

লেখক: প্রাবন্ধিক