কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) এসেছিলেন ঘোর গ্রাম থেকে। সেকালের বাংলাদেশে সফল ব্যক্তিদের অনেকে গ্রাম থেকেই কেন্দ্রে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই কাজী সাহেবের মতো উচ্চাভিলাষী হতে পারেননি। ছাত্র হিসেবে ভালো ছিলেন এবং নিয়মিত বৃত্তি পেতেন। বৃত্তির টাকাতেই আসলে তাঁর পড়ার খরচটা চলেছে। ভালো ছাত্র হিসেবে নিজের জোর বুঝতে পারাই কি তাঁর উচ্চাভিলাষের উত্স? সেকালের মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে বিজ্ঞান পড়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিশেষ দেখা যায়নি। তিনি বিজ্ঞান পড়েছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম হয়েছিলেন অনার্স আর মাস্টার্সে। ১৯২১ সালে যে বছর তিনি এমএ পাস করেন, সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি একাই। বোঝা যায়, বেশ উজিয়ে ভিন্ন পথে হাঁটার মতো মন আর মগজের জোর ছিল তাঁর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটা পেয়েছিলেন সহজেই। এতেই হয়তো অন্যদের কাজ চলত। তাঁর চলেনি। তিনি শিগগিরই গণিত ও পরিসংখ্যানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কর্মজীবন শুরু করার প্রায় ২৭ বছর পর ১৯৪৮ সালে পরিসংখ্যানে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য থিসিস দাখিল করেন। এত উদ্যম, শ্রম আর সাফল্য সচরাচর চোখে পড়ে না।
প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য পাওয়ার বহু আগেই অবশ্য তিনি সুনাম কুড়িয়েছিলেন তরুণ চিন্তক হিসেবে; মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা শিখা গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে। কাজী মোতাহার হোসেন ও তাঁর বন্ধুরা ঢাকায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের আলোড়ন তুলেছিলেন। তখনকার কালের সাপেক্ষে, বিশেষত মুসলমান সমাজের সাপেক্ষে তাঁদের চিন্তাচেতনা অগ্রসর ছিল। তাঁরা কলকাতায় বিকশিত শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোয় নিজেরা উজ্জীবিত ছিলেন, আর চাইতেন নিজেদের সমাজও সে ধারায় অগ্রসর হোক। কাজী নজরুল ইসলামের সাফল্য এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তাঁদের প্রেরণা জুগিয়েছিল। কিন্তু চিন্তার পদ্ধতি ও সিদ্ধান্তের ধরনের দিক থেকে এ গোষ্ঠী স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার। বলা দরকার, যেমন নজরুল তেমনি শিখা গোষ্ঠীর তরুণরাও অসহযোগ আন্দোলনের ফসল। তাঁদের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও হিন্দু-মুসলমান মিলনচিন্তা সেকালে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে আর কোনো সামষ্টিক কর্মকাণ্ডে এতটা প্রতিফলিত হয়নি। শিখা গোষ্ঠীর অন্য সব তরুণের মতো কাজী মোতাহার হোসেনও যুগদুর্লভ উদারনৈতিক মানবতাবাদী চিন্তাচেতনায় স্নাত ছিলেন।
তবে অন্যদের তুলনায় তাঁর কর্মপরিধি আর চিন্তার জগত্ যথেষ্ট প্রসারিত ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর ক্ষেত্র ছিল কলা ও মানববিদ্যা। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড ও গবেষণায় তিনি কাজ করেছেন বিজ্ঞানের এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াতেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা, গণিত আর পরিসংখ্যান। ১৯৫০-৫১ সালে পরিসংখ্যান বিভাগ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তিনি এ বিভাগের প্রথম রিডার ও বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন। পরিসংখ্যানে কোনো প্রকার পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি ‘ডিজাইন অব এক্সপেরিমেন্ট’ বা ‘পরীক্ষণের কাঠামো’ নামে অভিসন্দর্ভ রচনা করেন। তাঁর খ্যাতিমান পরীক্ষকরা গবেষণাকর্মটি সম্পর্কে উচ্চ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। কার্যত এ গবেষণায় তিনি এক নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যা ‘হোসেনের শৃঙ্খল-নিয়ম’ নামে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করে।
এ বিশুদ্ধ একাডেমিক অর্জনের সঙ্গে ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাঁর অর্জনকে চট করে এক সুতায় মিলিয়ে নেয়া খুব সহজ নয়। হাইজাম্প ও লন টেনিসে তিনি বহু বছর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। আর দাবা খেলায় একনাগাড়ে চার দশক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের। ক্রীড়া-সংগঠক হিসেবে কাজ করতেও তিনি পছন্দ করতেন। এর সেরা ফল ফলেছে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন গড়ে তোলায়; আমৃত্যু তিনি এ ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত চর্চার মধ্যে আর বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় গানের কথা। তিনি গান গাইতেন; সংগীতচর্চা করতেন। সংগীতের তাত্ত্বিক-প্রায়োগিক বিচার-বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য কুশলতা হাসিল করেছিলেন। এর প্রত্যক্ষ ফল ফলেছে তাঁর সংগীত-বিষয়ক লেখালেখিতে; আর পরোক্ষ এবং সম্ভবত গভীরতর ফল ফলেছে তাঁর সন্তানদের সংগীতচর্চায়। তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম যে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, তার কৃতিত্ব অন্তত অংশত কাজী মোতাহার হোসেনেরই প্রাপ্য।
সব মিলিয়ে তাঁর কাজে, আগ্রহে আর সাফল্যে এমন এক মাত্রার বৈচিত্র্য ছিল, চট করে যার জুড়ি মেলানো মুশকিল। তাঁর একজন জীবনীকার আবদুল্লাহ আল-মূতী তাঁকে যথার্থই ‘রেনেসাঁ-পুরুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। লিখেছেন, ‘ইউরোপের রেনেসাঁর যুগে নানামুখী কর্মধারার মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণ সংস্কৃতিমান মানুষ হয়ে ওঠার যে সাধনা দেখা দিয়েছিল, কাজী মোতাহার হোসেনের মধ্যে যেন তেমনি এক আদর্শের বিরল রূপায়ণ লক্ষ করা যায়।’
কাজ যেমন তিনি করেছিলেন দেশ ও দশের জন্য, সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক-রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও তেমনি পেয়েছিলেন পর্যাপ্ত। ১৯৫৩ সালে হয়েছিলেন পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর। ১৯৬১ সালে নিয়মিত চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর একই বিভাগে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। তিন বছর পর ১৯৬৪ সালে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের নবপ্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের প্রথম পরিচালক হিসেবে। এর পর ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ইমেরিটাস অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেয়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় অধ্যাপকের পদ প্রবর্তন করলে তিনি প্রথম দফায় এ পদ লাভ করেন। পাকিস্তান সরকার তাঁকে ১৯৬০ সালে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান বিজ্ঞান সম্মেলনের পদার্থবিদ্যা ও গণিত শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।
তাঁর লেখালেখিতেও বৈচিত্র্য ছিল। প্রথম প্রবন্ধের বই সঞ্চরণ প্রকাশ হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। বইটি বহু পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিল। অন্য অনেকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বইটির প্রশংসা করেছিলেন এর ‘প্রাঞ্জল ভাষা’, ‘বলার সাহস এবং চিন্তার স্বকীয়তা’র জন্য। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে ‘সেই পথ লক্ষ্য করে’ [১৯৫১], ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ [১৯৫৫], ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ প্রথম খণ্ড [১৯৭৬] প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলা একাডেমি তাঁর দুই খণ্ড রচনাবলি প্রকাশ করেছে। তাঁর অন্যান্য কাজের মধ্যে বিশেষভাবে বিজ্ঞান-বিষয়ক পাঠ্য বইয়ের উল্লেখ করা দরকার। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে বিজ্ঞানের পঠন-পাঠন যাতে বাংলা ভাষায় সম্ভব হয়, সে উদ্দেশ্যে তিনি ‘তথ্যগণিত’ [১৯৬৯], ‘গণিতশাস্ত্রের ইতিহাস’ [১৯৭০], ‘আলোক বিজ্ঞান’ [১৯৭৫] প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন।
এবার তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বৈশিষ্ট্যের দিকে খানিকটা নজর দেয়া যাক। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র অন্য সহকর্মীদের মতো কাজী মোতাহার হোসেনেরও মূল অবলম্বন ছিল মুসলমান সমাজ। কথাটা সতর্কতার সঙ্গে পাঠ করা দরকার। মুসলমান সমাজকে বাংলার হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা করে পড়ার এ ধারা মুসলমানদের আবিষ্কার নয়। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক কলকাতায় এর যাবতীয় এনতেজাম সমাপ্ত হয়েছিল। ওই শতকে বাংলার ইতিহাস-সংস্কৃতি-সাহিত্যে ও রাজনৈতিক চর্চায় বিভাজিত ভাষা-পরিভাষা এমনভাবে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যে, মুসলমান লেখকদের পক্ষে কোনো সার্বিক সম্বোধন সম্ভবপর ছিল না। তাই শিখা গোষ্ঠীর এতটা ‘অসাম্প্রদায়িক’, এতটা ‘উদারনীতিবাদী’, এতটা ‘মানবতাবাদী’ তরুণগোষ্ঠীকেও সম্প্রদায়গত নাম নিয়েই কাজ করতে হয়েছে। দ্বিধারা বিভাজন আগেই তৈরি হয়েছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলো সাক্ষ্য দেয়, তিনি এ ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কিন্তু তিনি আর তাঁর বন্ধুরা চেয়েছিলেন বিভেদ যথাসম্ভব কমিয়ে মৈত্রীর পথ তৈরি করতে। ‘বাঙালীর সামাজিক জীবন’ এবং ‘বাংলা সাহিত্যের স্বরূপ’ প্রবন্ধ দুটিতে লেখক স্পষ্টতই দ্বিবিভাজিত সমাজ ও সংস্কৃতিরই পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু যেমন শিরোনামে, ঠিক তেমনি প্রবন্ধের অন্তঃস্থ অভিপ্রায়েও সমন্বয়ের আকাঙ্ক্ষা জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
তরুণ বয়সে কাজী মোতাহার হোসেন যখন লিখছিলেন, তখন বাংলা অঞ্চল রীতিমতো দাঙ্গাকবলিত। ১৯২৬ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত বছরগুলোয় উপমহাদেশ সবচেয়ে বেশিবার দাঙ্গার মুখোমুখি হয়েছে। মোতাহার হোসেন এ বাস্তবতার উল্লেখ করেছেন। দাঙ্গার পেছনে যে ক্ষমতা-সম্পর্কের প্রত্যক্ষ বোঝাপড়া কাজ করছে, সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এর ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক কারণগুলোও উল্লেখ করতে ভোলেননি। প্রশ্ন হলো, তাহলে তাঁর সমন্বয়-আকাঙ্ক্ষার যৌক্তিক ভিত্তি কী? আসলেই কিন্তু তিনি বা তাঁর সহকর্মীরা বাস্তবের ভিত্তিতে এ-জাতীয় কোনো কর্মসূচি প্রণয়ন করেননি। তাঁরা কাজ করেছেন বিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক যুক্তিতে। সংস্কৃতি বলতে তাঁরা জনসংস্কৃতি বুঝতেন না, কিংবা নৃবিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞান শাস্ত্রে যাকে সংস্কৃতি নামে ডাকা হয়, তা বুঝতেন না, বরং জনগোষ্ঠীর বিকশিত অংশের অনুভূতি ও চর্চার প্রকাশ বুঝতেন। মোতাহের হোসেনের ‘সংস্কৃতি কথা’ প্রবন্ধে প্রস্তাবিত সংস্কৃতির যে সংজ্ঞা বাংলাদেশে প্রায় কিংবদন্তিতুল্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র সাধারণ সংজ্ঞা হিসেবে গৃহীত হতে পারে। সঞ্চরণ গ্রন্থের নানা প্রবন্ধে সংস্কৃতি শব্দটির এ রকম ব্যবহারই আছে। এ বড় প্রকল্পটি তাঁরা সরাসরি পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র তরুণদের সঙ্গে তরুণ নজরুলের সম্পর্কের ধরন বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। মুসলমান সমাজের সমালোচনা ও কল্যাণ কামনার দিক থেকে এঁদের সঙ্গে নজরুলের গভীর মিল আছে। একে প্রত্যক্ষ প্রভাবও বলা যেতে পারে। হিন্দু-মুসলমান মিলনের আকাঙ্ক্ষার দিক থেকেও তাঁরা সমধর্মী। কিন্তু পদ্ধতির দিক থেকে তাঁরা একেবারেই আলাদা। নজরুল প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক এবং সে রাজনীতি সর্বার্থেই বিপ্লবী ঘরানার। অন্যদিকে শিখা গোষ্ঠী বস্তুত বিপ্লববিরোধী; তাঁদের কর্মসূচি সংস্কারমূলক ও সংস্কৃতিনির্ভর। কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে নজরুলের গভীর সখ্য হয়েছিল। নজরুল তাঁকে ‘মোতিহার’ বলে সম্বোধন করতেন। নজরুলকে নিয়ে কাজী মোতাহার পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থও প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু তাঁর ভাবনা-চিন্তার পরিগঠনে নজরুলের প্রত্যক্ষ প্রভাব নেই। সঞ্চরণ গ্রন্থে নজরুল কার্যত অনুপস্থিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আছেন— নামে অনেকবার আর বেনামে গ্রন্থটির প্রায় সর্বত্র। খোন্দকার সিরাজুল হক তাঁর মুসলিম সাহিত্য-সমাজ: সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম [বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪] নামের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে যথার্থই শনাক্ত করেছেন, চিন্তাপদ্ধতির দিক থেকে কাজী মোতাহার হোসেন ও তাঁর সহকর্মীরা রাবীন্দ্রিক বলয়েরই বাসিন্দা। রবীন্দ্রনাথের দুটি সুপরিচিত সিদ্ধান্ত সঞ্চরণের অনেকগুলো প্রবন্ধের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। একটি হলো সমষ্টির মুক্তির প্রাথমিক শর্ত ব্যক্তির মুক্তি। দুই. বিকশিত মনই ক্রমশ
সঞ্চারিত হবে চারপাশে; আলোকিত করবে বহু মানুষকে। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে যে বিপুল প্রবন্ধ রচনা করেছেন, তাতে ব্যাপারটাকে মুখ্যত ব্যক্তিগত ও সামাজিক কুসংস্কার আর অন্ধত্ব হিসেবেই দেখা হয়েছে। কোনো কাঠামোগত বিবেচনা সেখানে প্রাধান্য পায়নি। প্রেক্ষিতগত খানিকটা ফারাক থাকলেও কাজী মোতাহার হোসেনের বিবেচনাও একই ঘরানার। তিনি চেয়েছেন, বিকশিত হিন্দু সমাজের মতো মুসলমান সমাজও এগিয়ে যাক। তাতেই কেবল কাঙ্ক্ষিত সমন্বয় সম্ভবপর হবে।
অবশ্য সাধারণভাবে ধর্মের তাত্ত্বিক বিচার-বিশ্লেষণের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। নিজে তিনি ধর্মকর্ম করতেন। ধর্ম পালন কীভাবে উদারনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, সে তত্ত্বতালাশ করাকে তিনি সম্ভবত দায়িত্ব হিসেবেই নিয়েছিলেন। ‘নাস্তিকের ধর্ম’, ‘ধর্ম ও সমাজ’, ‘আর্টের সহিত ধর্মের সম্বন্ধ’, ‘মানুষ
মোহাম্মদ’ প্রভৃতি প্রবন্ধ এ ব্যাপারে তাঁর নিবিড় আগ্রহ আর বিশ্লেষণক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করছে। এর মধ্যে ‘নাস্তিকের ধর্ম’ প্রবন্ধের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। এ প্রবন্ধে তিনি যেভাবে নাস্তিককেও ধর্মবলয়ের অঙ্গীভূত করে নিয়েছেন, তা তাঁর উদারনীতির শক্ত ভিত্তিরই নিশ্চয়তা দেয়। উল্লেখ্য, উদারনীতি কথাটা এখানে বিশেষ সংজ্ঞা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, মূল্য বিচার অর্থে নয়। পার্থ চট্টোপাধ্যায় উনিশ শতকের প্রথমাংশের কলকাতায় শনাক্ত করেছেন এক উদারনীতিবাদী আধুনিকতা, আর শতাব্দীর শেষাংশে কলোনিয়াল আধুনিকতা, যার প্রধান প্রকাশ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে। এর অনুসরণে ঢাকার শিখা গোষ্ঠীর চর্চাকে লিবারেল আধুনিকতা আর পরের প্রজন্মের চর্চাকে জাতীয়তাবাদী আধুনিকতা নাম দেয়া চলে। কাজী মোতাহার হোসেনের সাহিত্যচর্চা ও চিন্তার ধরন এ লিবারেল বা উদারনীতিবাদী আধুনিকতার প্রকৃষ্ট নজির।
কথাটা তাঁর চিন্তাপদ্ধতির দিক থেকেও গভীরভাবে সত্য। লেখক সাধারণভাবে কোনো আদর্শ ধরে নিয়ে অবরোহী পন্থায় বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। সমাজের বাস্তবতা তাঁর বিবেচনায় ছিল, এমনকি কোথাও কোথাও তাঁর উচ্চারণও অভিজ্ঞতাবাদীদের মতো; কিন্তু সেগুলো তাঁর চিন্তার দিক-নির্ণায়ক হয়ে ওঠেনি। আদর্শ নির্ধারণে স্বভাবতই কলকাতার প্রতিষ্ঠিত বয়ানের ওপরই তিনি নির্ভরশীল ছিলেন। যেমন— ‘বাঙালীর গান’ প্রবন্ধের যাবতীয় ভাষ্যই কলকাতার ভাষ্য। এ কারণেই পূর্ব বাংলার গানের ধারা এক প্রকার অনুল্লিখিতই থেকে গেছে। এমনকি লালন বা হাছন পর্যন্ত। অবশ্য সেকালের বাস্তবতা মনে রাখলে একে অস্বাভাবিক মনে হবে না। অবরোহী পন্থার উদাহরণ হিসেবে ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধটি পড়া যেতে পারে। পশ্চাত্পদ মুসলমান সমাজের প্রতি সহানুভূতিই যে প্রবন্ধটির উত্স, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ‘আনন্দ’ কথাটি এখানে ব্যবহার হয়েছে সার্বিক সংজ্ঞা হিসেবে। ধরে নেয়া হয়েছে, আনন্দের সর্বজনীন কোনো রূপ আছে এবং বাঙালি মুসলমান তা থেকে বঞ্চিত। এ প্রবন্ধ থেকেই আরেকটি সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, যা কাজী মোতাহার হোসেনের চিন্তাচেতনার শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। এই যে আনন্দের সার্বিক রূপটি স্থির করা হলো, তাতে প্রান্তের কি কোনো ভূমিকা আছে? প্রান্তস্থ মানুষ যে ধরনের আনন্দ-উদযাপন করে, ধরা যাক এ প্রবন্ধের গরিব বাঙালি মুসলমানরা, তার কোনো উপাদান, কোনো অনুভূতি বা কোনো প্রকাশভঙ্গি কি আনন্দের সংজ্ঞায়নে ব্যবহূত হয়েছে? লিবারেল ডিসকোর্সে এ ধরনের চর্চা বিরল এবং কাজী মোতাহার হোসেনও তা করেননি। তিনি বহুবার উল্লেখ করেছেন, সমাজে ভেদাভেদ প্রাকৃতিক ব্যাপার এবং এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপকারীও। আদর্শ সঞ্চিত হবে উচ্চকোটি ব্যক্তির মধ্যে এবং সঞ্চারিত হবে দশের সীমানায়। খাঁটি উদারনৈতিক পদ্ধতি। তাঁর প্রথম বইয়ের নাম সঞ্চরণ সে ইচ্ছারই প্রকাশ।
কাজী মোতাহার হোসেনের আরেকটি বড় সাহিত্যিক কৃতিত্ব সাহিত্যে বিজ্ঞানরস পরিবেশন। তাঁর ‘কবি ও বৈজ্ঞানিক’ উত্কৃষ্ট সাহিত্যিক প্রবন্ধ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ‘অসীমের সন্ধানে’ প্রবন্ধে মহাবিশ্বের প্রাঞ্জল পরিচয় আছে। ‘শব্দ ও তাহার ব্যবহার’ প্রবন্ধটি তিনি লিখেছিলেন, তাঁর ভাষায়, ‘উচ্চবিজ্ঞানের কথাও যে বাংলা ভাষায় সহজেই লেখা যায়, তা দেখানোর জন্য।’ এসব প্রবন্ধে আধুনিক বিজ্ঞানের সাংস্কৃতিক অবদান সম্পর্কে তিনি বিশেষভাবে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি একজন পথিকৃত্ ছিলেন। ‘তথ্যগণিত’ বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘১৯৩৬-৩৭ সালের দিকেই খ্যাতনামা অধ্যক্ষ সত্যেন বসু মহাশয়ের সমর্থনে (আইনত তাঁহার যোগসাজশে) বেআইনিভাবেই বাংলা ভাষায় পদার্থবিদ্যা পড়াইতে আরম্ভ করিয়াছিলাম বিএ ও এমএ ক্লাসে।’ এই যে প্রবন্ধ প্রণয়ন ও বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষাদান, এর উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করা, সাহিত্যাকারে বিজ্ঞানরস পরিবেশন আর জনসমাজে বিজ্ঞানের বোধ সঞ্চারিত করা। গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান লেখক জগদীশ চন্দ্র বসু ও সত্যেন বসু এ উদ্দেশ্যেই বাংলায় বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখালেখি করতেন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক আবদুল্লাহ আল-মূতী লিখেছেন, বাঙালি মুসলমানের মধ্যে এ ব্যাপারে কাজী মোতাহার হোসেন অগ্রদূত।
কাজী মোতাহার হোসেনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের চিন্তাচর্চার একটা বিশেষ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক পাঠের অংশ হয়ে বহুদিন গুরুত্বপূর্ণ থাকবেন। তাঁর একাডেমিক অর্জন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কুলজির অংশ হয়ে থাকবে। তাঁর গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর কর্মের স্মৃতি বহন করবে। কিন্তু অন্তত দুটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই, যার বর্তমান তাত্পর্য বিশেষভাবে উপলব্ধি করার মতো। এক. লিবারেল ডিসকোর্সে ধর্মের পর্যালোচনা। কাজটি কাজী আবদুল ওদুদও করেছিলেন। পাকিস্তান-পরবর্তী দশকগুলোয় এ ধরনের চর্চা বাংলাদেশে চূড়ান্ত মাত্রায় হ্রাস পেতে পেতে আজ প্রায় শূন্যের কোটায় ঠেকেছে। সার্বিক বিচারে তা কল্যাণের কারণ হয়নি। দুই. উচ্চশিক্ষায় বাংলার ব্যবহার। নিও-লিবারেল শিক্ষানীতির জমানায় আজ আর এ কথা মুখে আনার জো নাই। কাজী মোতাহার হোসেনের মরিয়া চেষ্টা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তিনি ঠিক কাজটিই শুরু করেছিলেন, আমরা তা চালিয়ে যেতে পারিনি।
লেখক: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






